সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

এ জীবন আঁধার আবৃত পাপে জন্ম পাপেই মৃত্যু

এবার নেতাজি ক্লাবে আমাদের সিটিংয়ের কথা বলব। এটাও স্মৃতি লিখন। এবং সম্পাদনা করা হয়েছে। এই দ্বিতীয় সিটিংয়ের আলোচনার বিষয় তোমার মনে থাকার কথা। তবু মনে করিয়ে দিই। আমাদের (আমি ও আমার পাঁচ বন্ধু) এই বেঁচে থাকায় আমরা পরস্পরে কীভাবে ‘শেয়ার’ রাখতে পারি এটা পূর্ব নির্ধারিত বিষয়। এর সঙ্গে আলোচনার জরুরি বিষয় হয়েছে ‘পাপ’। আলোচনা শুরুর আগে সকলের সঙ্গে আমি সোমার পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে দেখলাম সোমার কথা কারও কারও মনে আছে— কল্যাণ তো বলেই বসল, ‘সেদিন দারুণ বলেছিলেন’, আরও দু’-একটা কথার পর আমি বললাম, ‘ফ্রেন্ডস! আশা করি, সোমা আর তোমরা সকলেই পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠবে!’ সোমা বলল, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় কারও কারও সঙ্গে আমি তো বন্ধু হয়েই আছি!’ সত‍্যব্রত বলল, ‘তাই! কে বলুন তো!’

আমিই— সোমা, প্রোফাইল ইমেজে অবশ্য আমার এই মুখ নেই। আছেন বুদ্ধ মাঝেমধ্যে আমি তাঁর বাণী পোস্ট করি! রুদ্র বলল, ‘হাঁ, মনে পড়ছে— আমি আপনার পোস্টে লাইক দিই, মাঝেমধ্যে শেয়ারও করি। গতকালই তো একটা শেয়ার দিলাম। এই মানবজন্ম আঁধার আবৃত/ আলোর অনুসন্ধান করো! তাই তো?’ মাথা নাড়িয়ে সোমা সায় দিল। সোমার মুখে স্মিত হাসি। কথাটা আমার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, টের পেলাম। রুদ্রকে দেখলাম তাকে অন্য রকম দেখাচ্ছে। ক্ষণিকের জন্য চোখ বন্ধ করে কথাটার ছড়িয়ে পড়া গভীর অনুভবে আনতে গিয়ে দেখলাম রুদ্রর অন্য রকম মুখ আরও স্পষ্ট, উজ্জ্বল! আর তখনই বোধহয় কথাটার গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করে কল্যাণ বলল, ‘দারুণ কথা! আর আশ্চর্য এই, এমন কথা আগে শুনিনি।’ আমি চোখ মেলেছি। সত্যব্রত যেন একটা ধারা তৈরি করতে চাইল, ‘আড়াই হাজার বছর আগের একটা কথা, বলা ভালো নির্দেশ― পালন করলে বোধহয় সমাজটা এত গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে যেত না!’

আরও পড়ুন: অশান্ত সময়ে ফিরছে আফগানিস্তান!

মিরিয়ান গোমেলির আঁকা ছবি

সায়ন বলল, ‘মানবজন্ম আঁধার-আবৃত― এর মানেটা বুঝলাম না!’ বলে সে সোমার দিকে তাকাল। সোমা বলল, ‘আমাদের বোধহয় আলোচনার নির্ধারিত বিষয়ে যাওয়া উচিত। এ ব্যাপারটা নিয়ে পরে আমাদের কথা হতে পারে। শেষ কথাটা সে সায়নের উদ্দেশে বলল। সুব্রত বলল, ‘হ্যাঁ, আমাদের বেঁচে থাকায় পরস্পরের অবদান― অবদানটা কেমন তার আভাস বিনতা সেদিন রেখেছিল, সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, কে কখন কার কাজে লাগব বলা মুশকিল, সেক্ষেত্রে আমরা কমিট করতে পারি, সমস্যা শেয়ার করব এবং সমাধানে যার যেমন সুযোগ কন্ট্রিবিউশন রাখব।’ সুব্রতর কথাটা আমার ভালো লেগেছিল। কথাটা অনুধাবন করতে গিয়ে শুনলাম, ‘কিন্তু’ বলছে সত্যব্রত, ‘আমাদের বেঁচে থাকা যেমন পরিবারগত তেমনই ব‍্যক্তিগত— ব্যাপারটা’…. হাত-ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়ে সুব্রত বলল, ‘সামাজিকও বটে— অর্থাৎ আমাদের বেঁচে থাকা একই সঙ্গে তিন রকমের— একটা বাদ দিয়ে আর একটা নয়। এবার বলো!’ সত্যব্রত বলল, ‘কী বলতে চেয়েছিলাম, ভুলে গেছি। তুমিই বলো! কোন্ সমস্যা শেয়ার করা যাবে?’ সত্যব্রতকে থামিয়ে দেওয়াটা আমার ভালো লাগেনি। আমি বললাম, ‘কথার মধ্যে কথা না বলাই ভালো। সত্যদার কথাটা আমাদের জানা হল না।’ সুব্রত বলল, ‘স্যরি। আমার মনে হয়, যে কোনও সমস্যাই আমরা শেয়ার করতে পারি।’ কল্যাণ বলল, ‘ইতিমধ্যে আমরা তার প্র্যাক্টিসও করেছি!’ সোমা জানতে চাইল, ‘কী রকম?’ রুদ্র বলল, ‘বিনতা দিদিমণি একটা সমস্যায় পড়ে আমাকে এসেমেস করে। আমি তা সকলকে ফরোয়ার্ড করি। সেই সমস্যা নিয়েও আজ আমরা কথা বলব।’ সোমা আমার দিকে জিজ্ঞাসা-দৃষ্টি ছুড়ল। আমি বললাম, ‘তুইও জানিস।’

তার পর আমাদের পাপ বিষয়ে কথা শুরু হল, আমি বললাম, ‘কেন এটা সমস্যা— খুব সহজ কথায়, পাপ আমার চিন্তাকে আটকে দিয়েছে। আমার মনে হয়েছে, এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট ধারণা নেই।’ নাটকীয় ভঙ্গির সঙ্গে জুড়ে গেল পরের কথাটা, ‘তোমরা আমাকে আলোকিত করো বন্ধু।’

প্রথমে পাপ-এর আভিধানিক অর্থ বলল কল্যাণ (আমি আর লিখছি না। তুমি অভিধান দেখে নিতে পারো)। তার পর সে তার মত জানাল, ‘অর্থগুলির নিরিখে বলা যায়, পাপের উৎপত্তিতে রয়েছে এক প্রকার জৈব শক্তি।’ যেন আমার হয়ে সোমা জানতে চাইল, ‘কী রকম?’ একটু ভেবে কল্যাণ বলল, ‘কোনও কাজ করবার পর যদি মনে হয় ঠিক হয়নি, যদি অনুশোচনা বা গ্লানিবোধ জন্মায় তা হলে এই মনে হওয়াটাই পাপ!’ সোমা যেন উদ্দীপিত হয়ে বলল, ‘তার মানে পাপ মনে জন্মায়!’ কল্যাণ বলল, ‘আমার তো তা-ই মনে হয়।’ সোমাকে বেশ খুশি দেখাল। কল্যাণের পর সত্যব্রত বলল, ‘ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা আদেশের বিরুদ্ধে করা যেকোনও কাজই পাপ।’ ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা কথাটা যেন অসম্পূর্ণ, আমি জানতে চাইলাম, ‘আর?’ সে বলল, ‘টেবল ওয়ার্ক করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। আর কিছু নেই!’

‘যদি একটু ব্যাখ্যা করেন। প্লিজ!’ বলল সোমা। সত্যব্রত বলল, ‘সারি। আমার একটু ভুল হয়েছে— ‘ঈশ্বর’ সম্বন্ধে আমার ধারণা জানিয়ে কথাটা বলা উচিত ছিল। আমি কার্যকারণ তত্ত্বে বিশ্বাস করি— যেসব কল্যাণকর ঘটনা আমাদের জীবনে ঘটে চলেছে তা এই তত্ত্ব অনুসারে বিশ্লেষণ করে দেখেছি, তারা সবই এক ‘মহাকারণ’ থেকে ঘটেছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে আর তাতেই আমার মধ্যে ‘মহাকারণ’ ইক্যুয়াল টু ঈশ্বর— এই ভাবনা এসেছে। একে আমি সত্য মনে করি এবং সহজেই এটা ভাবতে পারি যে, কল্যাণকর ঘটনার কারণগুলি যখন কেউ সূত্রবদ্ধ করছেন, তা-ই নির্দেশ বাক্য হিসাবে তিনি প্রকাশ করছেন। আর নিজেকে আড়ালে রাখতেই তিনি সেই মহাকারণে ব্যক্তিত্ব আরোপ করেছেন— এটা ভাবতে আমার কোনও অসুবিধা হয় না। এখনও পর্যন্ত যত নির্দেশ-বাক‍্য ঈশ্বরের নামে, এমনকি বুদ্ধ-কনফুসিয়াসের যেসব কথা কোলাহল করছে আমাদের চেতনায়, তা অমান্য করাকে আমি পাপ বলে মনে করি।’

আরও পড়ুন: গীতিকার টানে…

জেনিফার মাইনের আঁকা ছবি

সন্দেহ নেই খুব গম্ভীর কথা, গভীরও বটে। কোনও বিরোধিতা বা প্রশ্ন উঠল না। কথাশূন্য অবস্থাটা আরও গভীর হওয়ার আগেই সুব্রত বলল, ‘সত্যব্রতর ভাবনাটা— ঈশ্বর মঙ্গলময়— কথাটার সঙ্গে দারুণ মিলে যায় আর আমার মনে হয়, মঙ্গল ধারণায় ‘মহাকারণ’ একাধিক হওয়া সম্ভব না— এখানেই একটা পুরনো প্রশ্ন, এত মঙ্গলসূত্র থাকা সত্ত্বেও সমাজে এত পাপ কেন?’  

‘কারণ—’ বলল রুদ্র, ‘কারণ নিহিত রয়েছে আমাদের মধ্যেই, কোথায় যেন পড়েছি, রিপু তাড়না থেকে করা কাজই পাপ!’

আমার মনে পড়ল, কে যেন বলেছিল, ছয় ঋতু, ছয় রিপুর কথা, এক-একটা ঋতুতে নাকি রিপু তাড়না বাড়ে-কমে। তার মানে পাপ— প্রকৃতিগত! এই যখন ভাবছি তখন সায়ন বলল, ‘আমাদের টেবল ওয়ার্ক, বলা ভালো নেট সার্চ, অভিধান থেকে শাস্ত্র বেশ ভালোই হয়েছে— আমি বাবাকে জিগ্যেস করছিলাম, তিনিও মোর অর লেস একই কথা বলেছেন। এর সঙ্গে যেটা যোগ করার তা হল, আমরা তিন ভাবে পাপ করি— এক, শরীর‌ দিয়ে― যেমন হত্যা, হরণ, বঞ্চনা, পরস্ত্রী গমন; দুই, কথার মাধ্যমে— কুবাক্য, নিষ্ঠুরবাক্য, পরচর্চা, মিথ্যাপ্রতিশ্রুতি— এ সব তার উদাহরণ; আর মানসিকভাবে— লোভ, অনিষ্টকামনা— এই সব!’

‘তার মানে’ বলল সুব্রত, ‘বেঁচে থাকা প্রাক্টিসের মধ্যেই পাপ রয়েছে!’

‘তা হলে—’ বলল সোমা, ‘এই প্র্যাক্টিসের মধ্যেই পুণ্যকর্ম থাকা স্বাভাবিক?’ সুব্রত সায় দিলে সোমা বলল, ‘সেই কবে বুদ্ধ বলেছেন, সব শারীরিক, মৌখিক এবং মানসিক কর্ম প্রথমে মনে উৎপন্ন হয়। অর্থাৎ পাপ-পুণ্য যা-ই বলি না কেন তার উৎসভূমি মন! মনই সব।’

এই কথায় আমার কেমন যেন মনে হল একইসঙ্গে আমরা বুদ্ধের সময়েও আছি অথবা সেই সময় ছড়িয়ে আছে এই সময়ের মধ্যে! এর বেশি আর ভাবনা এগোলো না। আমি বললাম, ‘তা হলে আদিপাপ কী?’

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশগুলি পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *