সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

দেহ এক দীপাধার… মন জ্বালো

এই সভার কথা শুনে সোমা বলল, ‘আমাকে বলতে পারতিস!’

তাকে বলার কথা আমি ভুলে গিয়েছিলাম, এটা জানিয়ে বললাম, ‘এই মনখারাপ করা ভুল কেন হল কে জানে! স্যরি!’

‘ঠিক আছে। বল্‌! সেদিনের কথা শুনি।’

সভার গল্প শুনে সোমা বলল, ‘শুনতে শুনতে আমার মনে একটা ছবি ভেসে উঠেছিল— সেই যে, ঋষিপত্তনে বুদ্ধ তাঁর পাঁচ শিষ্যের সঙ্গে কথা বলছেন! এই ছবিটা।’ আমি একটু চমকে গেলাম! সোমার মনের গঠন এ রকম ছবি তুলে আনবে, স্বাভাবিক হলেও আমার কেমন অস্বস্তি লাগছিল। বললাম, ‘আমি তো কোনও সত্যে পৌঁছয়নি সোমা!’

‘আমি তা বলছি না! জাস্ট মনে হল। বললাম!’ তার পর কী ভেবে সে বলল, ‘কিন্তু আবারও বলছি, ইউনিক, ব্যাপারটা ইউনিক!’

‘ইউনিক— তা হলে এদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাকেও ইউনিক বলতে হবে!’

‘হ্যাঁ, বলাই যায়।’

‘কিন্তু কোন্‌ উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এই সম্পর্ক রেখেছি— কী বলবি?’

চট করে কিছু বলতে পারল না সোমা। সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট কামড়ে কী যেন ভাবল, বলল, ‘ভাবতে হবে। উদ্দেশ্যটাও নিশ্চয়ই ইউনিক হবে!’

প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললাম, ‘যাই হোক, নেক্সট সিটিংয়ে তুই কিন্তু থাকছিস! এবার বল, নিজেকে নিয়ে তোর বিব্রত হওয়ার কথা!’

‘শুনতেই হবে?’

‘অন্তত নিজেকে জানতে হলে— শুনতেই হবে!’

ভীষণ সুন্দর হাসল সোমা। আমার মনে পড়ে গেল, এমনই সুন্দর হেসেছিলাম আমি আর আশ্চর্য! ছেলেটির মুখও মনে পড়ল… সোমা বলল, ‘মেয়ে হয়ে না জন্মালেই ভালো হত।’ শুনতেই মুখখানা মিলিয়ে গেল।

আমি বললাম, ‘সত্যিরে, আমারও মনে হয়, কেন যে মেয়ে হয়ে জন্মালাম!’

অদ্ভুত হেসে সোমা বলল, ‘এ ছাড়া বাঙালি বৌদ্ধ ঘরে জন্মেছি বলে প্রেম ভাবনায় স্বতঃস্ফূর্তি নেই।’

আরও পড়ুন: গামছার গান

‘মানে?’

‘মানে, ছেলেটি যেন বৌদ্ধ হয়! কেবল বৌদ্ধ হলে হবে না, যেন যোগ্য হয়! আমাদের উদ্বাস্তু কলোনির বৌদ্ধঘরে যোগ্য ছেলেমেয়ে পাওয়াও মুশকিল— এ সব শুনতে শুনতে যত বয়েস বেড়েছে ততই আমার ভেতরের ‘খুকি’টা গুটিয়ে গেছে!’ একটু থেমে, কী সব ভেবে বলল, ‘বুঝতে পারছিস কেন নিজেকে নিয়ে বিব্রত?’ কেমন করুণ চেয়ে থাকল সে আমার মুখের দিকে। আমার কেমন মনে হল, সোমার চোখ যেন শ্রুশ্রূষা চাইছে। কোনও কিছু না পেয়ে যেন সে আবার বলল, ‘নিজের কমিউনিটির বাইরে কোনও ছেলের দিকেও আমার নজর যায়নি… কিন্তু এক দিন মনে হল, তুই আমাকে টানছিস, আমি তোকে ভালোবাসতে শুরু করেছি!— এও কি কম বিড়ম্বনা!’

এটা আমার কাছে চমকানোর মতো ব্যাপার ছিল না (কেন? নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ), গল্প শোনার ভঙ্গিতে বললাম, ‘তার পর?’

‘তার পর—’ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘সামাজিকভাবে এ এক অবাস্তব সম্পর্ক, আমার কাছে কোনও সংশয় নেই, এ এক প্রেমের সম্পর্ক— এটা যে এক তরফা নয়, বুঝেছি; ছেলে-মেয়ের প্রেম বলতে যা বোঝায়, এ তা নয়, এ হল সমপ্রেম— এ সবও জেনেছি…’

‘কই আমাকে তো জানাসনি কিছু!’

‘তুইও জানিস— খবরের কাগজে মাঝেমধ্যে দু-একটা অন্যরকম আত্মহত্যা খবর হয়, পড়েছিস হয়তো— সেখান থেকেই আমি প্রথম সমপ্রেমের ব্যাপারটা জানতে পারি। তার পর— সেবার বইমেলা থেকে ‘স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি’ নামে এক সংগঠনের স্টল থেক দু’টি বই কিনি আর আমার বোঝাটা পরিষ্কার হয়ে যায়, তোর প্রতি আমার যে আকর্ষণ তা আমার পুরুষালি মনের ব্যাপার। তুই সাড়া দিয়েছিস এ আমার সৌভাগ্য বাট হোয়াট ইজ নেক্সট— জানি না।’

‘মানে?’

সোমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ, তার চোখ দু’টো ভীষণ করুণ আর আর্ত দেখাচ্ছিল, এক সময় বলল, ‘কী সব আজেবাজে স্বপ্ন দেখি, ভাবনা আসে— কল্পনাও বলতে পারিস।’

‘যেমন?’

‘তা হলে শোন্‌! একটা  গল্প বলি। মমতা আর মোনালিসা নামের দু’টি মেয়ে পরস্পরকে গভীরভাবে ভালোবাসে। এক সময় তাঁরা ভাবল সারা জীবন একসঙ্গে থাকবে। এই ভাবনা থেকে তাঁরা কোর্টে গিয়ে পার্টনারশিপ ডিড অফ এগ্রিমেন্ট করল এই মর্মে যে, তাঁরা একসঙ্গে থেকে জীবিকা অর্জন করবেন। কিন্তু মোনালিসার বাবার বদলির চাকরি। বদলির নির্দেশ জারি হতেই সমস্যায় পড়ল মোনালিসা। কোনওভাবেই তাদের সেই প্রেমভূমিতে থেকে যেতে পারবে বলে মোনালিসার মনে হল না। মমতা-মোনালিসা দু’জনেরই মনে হল অন্যত্র বিয়ে করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলো একসঙ্গে মরে বাঁচার! মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাঁরা আমের শরবতে মেশানো বিষ খাওয়ার পর হাত-পায়ের শিরা কেটে ফ্যালে। মোনালিসার মৃত্যু হয়। কিন্তু মমতার মৃত্যু হয় না। দীর্ঘ চিকিৎসার পর মমতা জীবনে ফেরে— (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) জানি না বেঁচে থাকাটা মমতার কেমন হয়েছে? যদি গল্পটা আমাদের জীবনে ফলে! তুই মমতা আমি মোনালিসা— এই ভাবনা আসে।’ 

‘আর?’

‘প্রায়ই স্বপ্নে দেখি আমি তোকে লতার মতো জড়িয়ে আছি— তুই ছাড়িয়ে চলে যেতে চাইছিস…’

‘তার পর?’

‘তার পর— সবই তোর জানা!’

‘একটা ব্যাপার-কিন্তু আজও আমি বুঝতে পারিনি— আমাকে তুই প্রণাম করেছিলি কেন?’

‘তুই সংসার-আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেছিস— এটা ইউনিক ব্যাপার, বলেছিলাম না!’

‘হু!’

আরও পড়ুন: চূর্ণী নদীর তীরে…

‘তখন আমার বুদ্ধের মুখ মনে পড়েছিল আর তোর মুখটাও— কেমন বদলে যেতে দেখলাম, কয়েক সেকেন্ড স্থির একটা ছবি, কবেকার দেখা— তোর মুখে মিলিয়ে গেল… মনে পড়ছে, আমার মাথা নত হল— বুদ্ধের করুণায় তুই তখন আমার কাছে প্রণম্য হয়ে উঠেছিলি— বুঝলি এবার?’

‘কী ছবি দেখেছিলি তুই?’

‘আশ্চর্য এক জ্ঞানদীপ্তির ছবি দেখেছিলাম তোর মুখে। হয়তো দেখিনি, প্রজ্ঞাপারমিতার ছবি থেকে আমার মনই তৈরি করে নিয়েছিল তোকে!’

আমার চোখেমুখে তখন বুঝতে না-পারা অভিব্যক্ত হওয়ায় সোমা বলল, ‘মানে— সরস্বতীর ছবি—’

আমার না-বুঝতে পারা আরও গভীর হল। শব্দটা আমার চেনা। অর্থও আন্দাজ করতে পারি কিন্তু সরস্বতী মানে প্রজ্ঞাপারমিতা!— হতে পারে। ভাবনা থেকে বেরিয়ে দেখলাম, সোমা আমার মুখের দিকে নিবিড় তাকিয়ে আছে। কেমন গম্ভীর দেখাচ্ছে তাকে। তার পর সে নদীর জলে দৃষ্টি রাখল। কয়েক মুহূর্ত পর গুটিয়ে এনে আবার আমার মুখে ছাড়ল। বলল, ‘সরস্বতী মানে বিদ্যার দেবী— বুদ্ধের আদর্শ জ্ঞানমূলক— এ কথা বোধহয় আজ অনেকেই জানেন— এই আদর্শ যখন ধর্মের রূপ পায় স্বাভাবিকভাবে তখন আগেকার জ্ঞান-দেবীর ধারণা থেকে, মানে সরস্বতী-ধারণা থেকে— এক প্রতিমা তৈরি হয়েছিল, তিনি নির্বাণ-জননী— মা-তারা, বিভিন্ন রূপে তাঁকে পূজা করা হয়; এক রূপে তিনি বোধির দেবী! বোধি মানে— জানিস তো!’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, জ্ঞান।’

‘সাধারণ অর্থে বোধি মানে জ্ঞান-ই জেনেছি আমরা’ বলল সোমা, ‘যেমন বুদ্ধ মানে জ্ঞানী; কেন-না, সিদ্ধার্থ বোধি লাভ করে বুদ্ধ হয়েছেন!’

আমার তখন সুজন মিত্রের কথা মনে পড়ল, তিনি অবশ্যই জ্ঞানী মানুষ, কিন্তু… বললাম, ‘তা হলে তো সকল জ্ঞানী-ই বুদ্ধ নামে আখ্যাত হতেন! তা তো হয়নি!’

‘তা হলে’ যেন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইল সোমা, ‘বোধি মানে বিশেষ জ্ঞান বুঝতে হবে!’ আমি সায় দিলে সে বলল, ‘বল তো সেই বিশেষ জ্ঞানটি কী?’

তখন সিদ্ধার্থের বোধিলাভ পর্ব আমার মনে পড়ে গেল। পড়তে গিয়ে যে ছবি আমি দেখেছিলাম সেই ছবিই ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে, যেন দেখতে পেলাম, ‘তাঁর প্রজ্ঞানেত্রের সম্মুখে জন্মমৃত্যুর সকল রহস্যের উন্মোচন ঘটছে’… যেন তিনি ‘দুঃখ’ শব্দটা উচ্চারণ করলেন আর আনন্দ-আলোয় ভরে উঠল তাঁর নিমীলিত মুখমণ্ডল! আমিও অনুভব করলাম সেই আলো… বললাম, ‘বোধি মানে দুঃখ নিবৃত্তির জ্ঞান!’

আমার চোখমুখ থেকে যেন সেই আলো ঠিকরে পড়ল সোমার মুখে, না কি পড়ন্ত বেলার কারসাজি? কিছুই বুঝলাম না কিন্তু দেখলাম আবারও সেই হাসি! হাসির রেশ ধরেই সে বলল, ‘এই আলোর দেবী প্রজ্ঞাপারমিতা! তোর মুখে সেই আলো!’

আমার মুখমণ্ডলে তার চোখ। চোখের চঞ্চল তারা থির হলে পর সে বলল, ‘সেই আলো আমি দেখেছি, দেখছি!’

আমি বললাম, ‘আমিও তো দেখছি! তা হলে কি আমরা একই আলোর মধ্যে আছি?’

সোমা মাথা কাত করে সায় দিলে আমি জানতে চাইলাম, ‘আলোর উৎস?’ তার চোখ দিয়ে সে আমার বুক ইশারা করে বলল, ‘চোখ বুজে একটা প্রদীপ কল্পনা কর!’

তার স্বরে কী ছিল কে জানে, আমি চোখ বন্ধ করলাম, মনে পড়ল বাড়ির লক্ষ্মীর আসনের সামনে রাখা পিলসুজ, তাকে দেখতেও পেলাম, তার উপরে নিভে থাকা প্রদীপ; শুনতে পেলাম, ‘দেখতে পাচ্ছিস?’ আমি হ্যাঁ বললাম, সোমা যেন নির্দেশ দিল, ‘প্রদীপটাকে বুকের ভিতর নিয়ে যা!’ নির্দেশ পালন করতেই দেখি, প্রদীপ জ্বলছে! আমি যেন ভয়ে বিস্ময়ে চোখ খুলে বলে উঠলাম, ‘কে জ্বালাল আগুন?’ সোমা বলল, ‘আমি!’ আর তখন কেন জানি না মনে পড়ে গেল আমার সেই জন্মদিনের কথা। সোমা প্রদীপ জ্বালাচ্ছে। আমার আর-কোনও ভাবনা এলো না। কেবল অনুভব করছিলাম… টের পাচ্ছিলাম যোনির স্পর্শকাতরতা! সেই যোনিমনস্কতা থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়ে একটা ভাবনা এল, মানুষের পৃথিবীতে আলোর উৎস তবে যোনির অন্ধকার! আর তখনই সোমা বলে উঠল, ‘প্রজ্ঞাপারমিতাকে তুমি দুঃখ নিবৃত্তির জ্ঞানদাত্রী নাও ভাবতে পারো! কিন্তু তাকে কর্তব্য-জ্ঞান ভাবতেই হবে। বস্তুত, এটা তা-ই— বোধিসত্ত্ব মানে জানিস তো?’ হ্যাঁ-ভঙ্গিতে আমার ঘাড় একটু কাত হলেও সে জানতে চাইল, ‘বল! মানেটা কী?’ বললাম, ‘বুদ্ধত্ব অর্জনের আগের পর্যায়ে রয়েছেন যিনি!’

‘অর্থাৎ’ বলল সে, ‘দুঃখ নিবৃত্তির জ্ঞান-অন্ত প্রাণই— বোধিসত্ত্ব! প্রজ্ঞাপারমিতা হল তাঁর পালনীয় কর্তব্যসমূহ।’

তার মানে, ভাবনা এলো, প্রজ্ঞাপারমিতা— মানে জ্ঞান-অনুগ কতকগুলি কর্মের সমাহার! সেই কথা বলতেই সোমা বলল, ‘হ্যাঁ, তা তো বটেই!’ শিশুর জ্ঞানপ্রকাশে মা যেমন মুগ্ধ হন, সোমার মুখে যেন সেই মুগ্ধতা— জ্ঞানের গভীরতা বোঝার জন্যই বুঝি সে জিজ্ঞেস করল, ‘বল তো কৃত্যগুলি কেমন?’

নিজের মধ্যে অনেক কথা কাটাকুটি করে বললাম, ‘কর্মগুলি ঠিক কী, জানি না; তবে অনুমান করতে পারছি, কর্মগুলি থেকে দুঃখ নিবৃত্তির জ্ঞান উৎপন্ন হয়!’

‘অর্থাৎ—’ বলল সোমা, ‘কৃত্যগুলি বিশেষ!’

আমি বললাম, ‘তার মানে বোধিসত্ত্বের কর্ম থেকে যে জ্ঞান উৎপন্ন হয় তা সাধারণ মানুষের মনে উৎপন্ন হতে পারে না!’

‘এক কথায়, না। কিন্তু তাঁর কর্মজাত জ্ঞান সকলের!’ এই কথা বলে সোমা যেন খেয়াল করল, আমার বোধে কথাটা ঠিক ঠিক ছড়ায়নি— সে ওষুধের উদাহরণ দিল, ‘এক জন বা কয়েক জন মিলে ওষুধ আবিষ্কার করেন, তাই না! কিন্তু উপশম বা রোগমুক্তির জন্য যে কেউ তা ব্যবহার করতে পারে— দুঃখমুক্তির জ্ঞানও সেই রকম, তাঁর কর্ম থেকে পাওয়া জ্ঞান বোধিসত্ত্ব সংসারী মানুষকে দিয়ে থাকেন!’

আমি জানতে চাইলাম, ‘কেন দেন?’

কী ভেবে সোমা বলল, ‘আমি একবার বাবাকে ঠিক এই কথাটাই জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন দেন? বাবার উত্তরটা মনে আছে— সেটাই বলছি তোকে, বাবা বললেন, জ্ঞান হল শক্তি, তা কর্মে রূপান্তরিত হতে পারে; জ্ঞান কর্মে রূপান্তরিত হোক— এই আকাঙ্ক্ষায় অর্জিত জ্ঞান বোধিসত্ত্ব সংসারী মানুষকে দিয়ে থাকেন!

‘আমার মধ্যে তখন নস্যাৎ করার একটা মানসিকতা তৈরি হয়েছিল, জানতে চেয়েছিলাম, তাতে বোধিসত্ত্বের লাভ কী?’

আমি বললাম, ‘এ রকমই তো ভাবছিলাম আমি! তা বাবা কী বললেন?’

‘বাবা পাল্টা প্রশ্ন করলেন, এই যে ক’দিন আগে আমি তোমাকে বললাম, মেলেমেশার ব্যাপারে একটু চুজি হয়ো, সতর্ক থেকো! কথাটার মধ্যে তিনটি কাজের কথা আছে— মেলামেশা করা, চুজি হওয়া আর সতর্ক থাকা। তুমি যদি এই কাজ তিনটি করো— তাতে আমার কী?

‘আমাকে ভাবতে দেখে বললেন, প্রথমে ভাবো, যদি পালন করো, তোমার কী লাভ হবে— উত্তর তিনিই দিলেন; প্রথমত, কুসঙ্গের দুঃখ তোমাকে স্পর্শ করবে না; দ্বিতীয়ত, দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা হেতু উৎপন্ন বিপদ থেকে তুমি মুক্ত থাকবে, আর তিন হল, সমভাবনার আনন্দ… তা হলে এক কথায়, তোমার আনন্দ-মুখ দেখে আমিও আনন্দ পাবো! আর যদি পালন না করো— তোমার পাওয়া সমস্ত দুঃখে আমি বিব্রত হব। তাই না?

‘আমি সায় দিলে বাবা বললেন, বোধিসত্ত্বের জ্ঞান থেকে যদি কর্ম সৃষ্টি হয়, সন্দেহ নেই সেই কর্ম দুঃখনিরোধক— এক জন সংসার-বাসনারহিত মানুষ এক জন সংসারী মানুষকে সুখের পথ দেখিয়েছেন, মানে তাঁর জ্ঞানের যথার্থতা প্রমাণ হল— এর চাইতে বড় লাভ আর কী হতে পারে! জানি না এক জন বোধিসত্ত্ব এ রকম ভাবেন কি না— তুমি ভাবতে পারো!’ তারপর সে আমাকে বলল, ‘তুইও ভাবতে পারিস!’

আরও পড়ুন: গড়িয়ার রথবাড়ি

আমরা দু’জনই চুপ করে বসেছিলাম। আমি আমাকে, সোমাকে বুঝতে চাইছিলাম। এক সময় জিজ্ঞেস করলাম, ‘কল্পনার কথা কী যেন বলছিলি?’

‘তা হলে আর একটা গল্প বলতে হবে— তুই স্যাফোর গল্প তো জানিস ?’

‘খুব ভালো জানি না— প্রাচীন গ্রিসের তিনি একজন কবি ছিলেন, এইমাত্র!’

‘খুব ভালো জানার কিছু নেই, মানে আমিও জানি না; কবি হিসেবেই তাঁর খ্যাতি আর লেসবিয়ান হিসাবে তিনি নিন্দিত এবং বন্দিতও বটে— সে যা-ই হোক— গল্পটাও এক কবির। নাম শাহ হোসেন। সাধক কবি। সুফি সাধক। এক দিন এক ঘোড়সয়ারি বালককে যেতে দেখে তিনি অবাক হলেন। বালকটি আশ্চর্য হেসে গিয়েছিল। কী ছিল সে হাসিতে— তিনি তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। ছেলেটি ফিরে গেল আবারও হেসে। যেন বলে গেল আবার দেখা হবে। আর শুরু হল সাধকের প্রতীক্ষা। একদিন বালকের ঘোড়া সাধকের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বালকের নাম মাধো। এক সময় তাঁরা জানতে পারলেন, দু’জন অসম বয়সি বিধর্মী পুরুষ পরস্পরকে ভালোবাসছেন। কী ছিল সেই ভালোবাসায়, আমি জানি না, কেবল এটুকু জেনেছি যে, সাধক কবি হিসাবে শাহ হোসেন খুব একটা পরিচিত নন, নিজেকে পরিচিত করিয়েছেন ফকির মাধো লাল হোসেন নামে, সাধারণ মানুষের কাছে এই নামেই তাঁর পরিচিতি। সাধক কবির কবরের পাশেই তাঁর প্রেমিক মাধো লালের কবর— ফুলে ফুলে ঢাকা! সেখানে রয়েছে এক অগ্নিকুণ্ড, প্রায় সাড়ে চারশো বছর ধরে তা জ্বলছে! ভাবা যায়—

কথা থামিয়ে কী যেন ভাবছিল সে। তাকে আর তত বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল না। আমি বললাম, ‘তুই কি বই দুটো আমাকে দিবি?’

কী ভেবে সোমা বলল, ‘না। তোর যা ভাবনা, কংক্রিট হোক আগে— তার পর।’

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশগুলি পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *