সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)

দুই দেহ এক মন

বাড়ি ফিরে মনে হয়েছিল, আমি যেন এক ম্যারাথন ক্লাসের মধ্যে ছিলাম। মমতা-মোনালিসার গল্প ফের মানুষ কেন বাঁচে— এই প্রশ্ন জাগিয়ে তুলল আর মনে হল এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারে কেবল মন যে মন বিষ পান করছে হাত-পায়ের শিরা কেটে ফেলছে— সোমা দুঃস্বপ্ন দেখছে, আমি শুনতে শুনতে রক্ত দেখতে পাচ্ছিলাম। না, আমি মমতা হব না। সোমাকেও মোনালিসা হতে দেব না। বরং— ফকির মাধোলাল হোসেনের গল্পটা জানা যেতে পারে। একটা পথ যেন দেখা যাচ্ছে— বালিশে মাথা দিতেই ভাবনাটা আবারও এলো কিন্তু তার ওপর চেপে বসল ‘জ্ঞান-অন্ত প্রাণ’ কথাটা— একইসঙ্গে মনে পড়ল সোমার দীপ্তিমুখ, আমি তার কথা বলা ফিরে দেখছি, একটু আগেই আমার মধ্যে এক নতুন ভাবনা এসেছে, প্রদীপে যেমন আগুন জ্বালিয়ে আলো দিয়েছে সোমা (বাস্তবেও সোমা প্রদীপ জ্বালিয়েছিল, আমার জন্মদিনে— মনে পড়ছে?) তেমনই ওই ভাবনা সে-ই জাগিয়েছে, আমি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করলাম, সমস্ত জ্ঞানের উৎস যোনির অন্ধকার! এক জাদুবাস্তব ঘিরে ধরেছে আমাকে— সোমার ডান হাত সাপের মতো মন্থর নেমে যাচ্ছে… নাভিমূল ছুঁয়ে  আরও নেমে সে শান্ত হল যোনি-তটে… আমি উঠে বসলাম। ‘জ্ঞান-অন্ত প্রাণ’কে বিশেষ অর্থ দেওয়ার জন্য আমার ভাবনায় এলো ‘বোধি-অন্ত প্রাণ’-কথাটা। নিজেকে শাবাশি জানালাম, বাঃ! তা হলে যে মানুষের প্রাণ জ্ঞানে নিহিত তিনি তো ‘সরস্বতী’ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন না! মানে নারীতে সংলগ্ন থাকা তাঁর ভবিতব্য! আর একইভাবে জ্ঞানতাপসের সান্নিধ্য ছাড়া ‘প্রজ্ঞা’র কী মানে আছে আর!

কিন্তু ফকির মাধো লাল হোসেনের গল্পের সঙ্গে তো মিলছে না! আমি গুগল সার্চ করেছি— চারশো বছর ধরে তাঁদের মাজার সংলগ্ন অগ্নিকুণ্ড জ্বলছে অনির্বাণ— এই অগ্নি তো জ্ঞানের প্রতীক! তা হলে?

জানি না, জানার উপায়ও নেই— আমার কথা তুমি বুঝতে পারছ কি না। ওঃহো! যদি তুমি বাস্তব হতে, অন্তত আমি জিজ্ঞেস করতে পারতাম, তোমার যত জ্ঞান তার কতটা আমার থেকে পেয়েছ? আর এই ভাবনা আমার মধ্যে এক দুঃখবোধ জাগিয়ে তুলল। কোনও পুরুষকে তো আমি আমাতে সংযোগ ঘটাতে দিইনি! তবে পরক্ষণেই বোধটা ম্লান হল এই ভাবনায় যে, যদি আমি কিছুমাত্র জ্ঞান অর্জন করে থাকি (এই লেখার মধ্যে তা হয়তো তোমার নজরে পড়েছে), আমার বলতে দ্বিধা নেই আমি তা পেয়েছি সোমার কাছ থেকে— যেইমাত্র আমি এই কথাটা বলছি তোমাকে, টের পেলাম দুঃখবোধটা মিলিয়ে যাচ্ছে, আর মনে পড়ল, কল্যাণ একবার জ্ঞান আর প্রেমের সম্বন্ধ নিয়ে কি-একটা কথা বলেছিল— কথাটা ঠিকঠিক মনে পড়ছে না, তার ভাবটা বলি তোমাকে— সেই জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ যা প্রেম থেকে পেয়েছে আলো… আমার সমস্ত শরীরে শিহরণ জাগল। সেই শিহরণ অনুভবের গভীরে নিয়ে যেতে গিয়ে আমি বাইরের দৃশ্য সব মুছে দিলাম। আর আশ্চর্য! আমার চোখে সামনে ভেসে উঠল সেই অগ্নিকুণ্ড— ভক্তরা সেখানে ইন্ধন অঞ্জলি দিচ্ছেন…   

দূরে কোথাও কালীপুজো হচ্ছে। সন্ধে থেকেই শ্যামাসংগীত বাজছিল, শোনা যাচ্ছিল আবছা। রাত যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে কথা… আমার মাথার মধ্যে কখন ঢুকে পড়েছে ‘এমন মানব জমিন রইল পতিত/ আবাদ করলে ফলত সোনা/ মন রে কৃষি কাজ জানো না’— আমার কী হল কে জানে, বিছানা ছাড়লাম। ঘরের বাইরে এসে মনে হল, কেবল ওই কটা কথা আমি গুনগুন করছি। ‘মন রে কৃষিকাজ জানো না’— হ্যাঁ, জানিই না তো— কৃষিকাজ জানতেন আমার ঠাকুরদা থেকে তাঁর পূর্বপুরুষেরা তবু আমার বাবা বলেছেন, মানুষ কেন বাঁচে তা ধানগাছের কাছ থেকে জানা যেতে পারে। ধানগাছের কাছে যাওয়া— আমার আজও সময় হয়নি। চাষিঘরের মেয়ে, ধানগাছের কাছে যায়নি, ব্যাপারটা তেমনও নয়— বাবার জন্য ভাত নিয়ে গেছি, ধানগাছ দেখেছি। ধানগাছের গর্ভ হয়, জানি; ‘আশ্বিন যায় কার্তিক আসে’র-ভোরে তাকে ‘সাধ খাওয়ানো’ হয়— সেই সব রিচুয়াল একটু আধটু মনেও পড়ছে… তবু আমার মন কৃষিকাজ জানে না! আমি মানবজমিন ভাবনায় ঢুকতে গিয়ে বাধা পেলাম, ঊরু বেয়ে একটা সরু ভিজে অনুভূতি…

বুঝতে পারছ? কয়েক দিন পর আমার শরীরে জো আসছে। বীজ বোনার উপযুক্ত সময়… কত জো-ই চলে গেল, এবারও যাবে— এ দিক থেকে বলতে হয় আমার ‘মানব জমিন’ পতিত হয়ে আছে, আবাদ করলে নিশ্চয়ই সোনা-মনা ফলত! আমার মনে কি দীর্ঘশ্বাস জমল? কোনও চোরা ভাবনা নিশ্চয় চলেছে নইলে নীহারিকার কথা মনে পড়বে কেন!

‘মন! মরে গেছে।’ এই কথাটা বলার পর নীহারিকা আর যে কথাগুলো বলেছিল, অবিকল তা মনে নেই তবে ভাবনাটা মনে আছে— মেয়েরা যে মন নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যায়, মনে হয়, স্বামীর ইচ্ছেয় চিত-ভুট হয়ে তাকে শরীরে নিতে নিতে, সন্তান জন্ম দিতে দিতে বা গর্ভপাতের টেবিলে শুতে শুতে সেই মনের মরণ ঘটে!

কথাগুলো বলার পর সে চুপ ছিল। আমি কথাগুলো ভাবছিলাম। সেও কোনও ভাবনায় ছিল, এটা বোঝা গেল যখন সে বলল, ‘মন যে মরে গেছে— এটা বুঝতে পারি (আশ্চর্য! হুবহু মনে পড়ে যাচ্ছে), ধর্‌, আমি একটা পাখি দেখলাম— দেখলামই শুধু, কোনও ভাবনা এলো না— আমার গান শুনতে ভালো লাগে না। প্রেমের গানগুলো ভীষণ মিথ্যে মনে হয়।’ আমি কী বলতে পারি, ভাবতে গিয়ে ওর মেয়ের দিকে চোখ গেল, একমনে খেলছে মেয়েটি… বললাম, ‘তোর মেয়েকে নিয়ে ভাবনা তো হয়!’ মাথা নেড়ে তার ‘না!’ বলাটা যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। মন মরে গেলে একটি মেয়ে তবে এই রূপ পায়! কেন জানি না আমার মৃতপ্রায় নদীর কথা মনে পড়ল। নদী জীবনের উপমা হয়ে আছে বলে হয়তো। তার মানে জীবন প্রবহমান! কীসের প্রবাহ? মৃতপ্রায় নদীকে কি জীবনের সঙ্গে মেলানো যায়?

অনিবার্যভাবে সোমা আমার ভাবনায় ঢুকে পড়ল। সোমার জীবনটা ইছামতীর মতো— তার মনের গতিতে নানা বাধাবিপত্তি। সোমা চায় সম্পন্ন হোক ইছামতীর গতি! এ বিষয়ে তার অনুচিন্তা আন্দোলনের কথা ভাবে। তা হলে মন-ই কি ‘মানবজমিন’ নয়? মাথার মধ্যে যেন একটা ফ্ল্যাশ হল— মনকে ধারণ করে আছে এই দেহ, দেহকে ধরে আছে বিশ্বপ্রকৃতি— বিশ্বপ্রকৃতির ধারক— যেন আমি সূর্য দেখার জন্য আকাশের দিকে তাকালাম, ছাদে দৃষ্টি আটকে গেলেও আমি-কিন্তু সূর্যই দেখলাম— সূর্য (অবাক হচ্ছ? অথবা ভাবছ গুল মারছি? আরেন্না!) আমাদের প্রত্যেকটা ঘরের ছাদে খোদাই সূর্য আছে, আজ যেন এটা বিশেষভাবে নজরে পড়ল। কেবল নজরেই পড়ল তা নয়, প্রশ্নও জাগল, সূর্য কেন? আমরা কি কখনও সূর্যের উপাসক ছিলাম? ব্যাপারটা জানতে হবে তো!

সূর্যে চোখ রেখে আমি শুয়ে পড়লাম…

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশগুলি পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *