সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

সরকারি নীতির বাইরে বেঁচে থাকা…

খুব দ্রুত বসার ব্যবস্থা হল। সুব্রতদের ক্লাবঘরে আমরা বসব। দিন ঠিক হলে পর আমি সোমাকে জানিয়ে দিলাম। সকলকে ফোনে জানিয়েছি ‘পাপ’ সম্বন্ধে তারা যেন একটু টেবল ওয়ার্ক করে আসে। এই ‘টেবল ওয়ার্ক’ বলতে গিয়ে মনে পড়ল, একটা বিষয় বলতে ভুলে গেছি। আগে সেটা বলি। আলোচনার ব্যাপারে যাচ্ছি পরে।  

কয়েক দিন খবরের কাগজ পড়া হয়নি, এমনকী, দেখাও হয়নি খবর— তখন দেশজুড়ে নতুন করে ‘আজাদি’র আওয়াজ উঠেছে, একটা হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার আবহাওয়াও তৈরি হচ্ছিল, তো পুরনো খবরের কাগজ নিয়ে বসেছিলাম। একটা খবর চমকে দিল। পরীক্ষা শেষের ‘আনন্দ’! গণধর্ষণ, খুন কিশোরীকে খবরটা পড়ে আমার কী হয়েছিল বলতে পারব না। এটা বলতে পারি, ভীষণ অসহায় লাগছিল। যুক্তিবোধ কাজ করছিল না। সদ্য মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া সাত জন কিশোর তাদেরই গ্রামের ক্লাস সেভেনে পড়া এক ছাত্রীকে, উঃ! জাস্ট ভাবতে পারছিলাম না! কিন্তু— জানি না, তুমি বিশ্বাস করবে কি না— আমি বোধ হয় চূড়ান্ত এম্প্যাথেটিক অবস্থায় ছিলাম, যোনিতে তীব্র যন্ত্রণা টের পাচ্ছিলাম… সাত-সাত জন! সম্ভবত আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম… একটা গুঞ্জনের মধ্যে আমি যেন জেগে উঠলাম। মা বাবা দাদা সকলেই জানতে চাইছে, ‘কী হয়েছে তোর?’ আমি ধাতস্থ হয়ে বললাম, ‘কই কিছু না তো!’ তার পর একটু জোর দিয়ে বললাম, ‘পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!’ তবু দাদা কী ভেবে বলল, ‘শরীর খারাপ লাগছে না তো?’ আমি বললাম, ‘না না, ভাবনার কিছু নেই!’ তখন যন্ত্রণা ছড়িয়ে আছে বুঝতে পারছি, আমার কি মৃত্যু হতে পারত— এখন এটা কল্পনা করতে পারি, যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি জ্ঞান হারিয়েছিল! কিন্তু— ওই সাত জনের মধ্যে যে মেয়েটির  ‘প্রেমিক’ (!) ছিল! সে-ই তাকে শ্বাসরোধ করে মেরেছে— ভাবা যায় বলো!

তার পর?

আরও পড়ুন: ইমারজেন্সি এবং কিশোর কুমার: পুরনো বিতর্ক নতুন করে দেখা

আবারও বিভ্রম! অবশ্য তুমি আমার সামনে থাকলে, এমনই বলে উঠতে— যাই হোক, বিভ্রমে থাকাও থাকা, তুমি আছ— শোনো তবে, তার পর, খবরটা আমি ভুলতে পারছিলাম না। কিশোর-কিশোরীরা এক সঙ্গে পথ হাঁটছে, দাঁড়িয়ে কথা বলছে, এ রকম দৃশ্যে খবরটা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ক’ দিন পর আমি টের পেলাম যুক্তিবোধ ফিরে আসছে… খবরের কাগজটা নিয়ে আমি থানায় গেলাম। একা। এর আগে যত বার গেছি, সুব্রত সঙ্গে ছিল। বা বলা ভালো সুব্রতর সঙ্গে গেছি। থানায় আমি এখন পরিচিত মুখ। এক জন লেডি কনস্টেবল পরিচিতের হাসি হাসলেন। আমি প্রতিহাস দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ওসি স্যার আছেন কি না।… ওসির দরজার পর্দা সরিয়ে মুখ দেখিয়ে বললাম, ‘আসব স্যার!’ অনুমতি পেয়ে ভিতরে ঢুকতেই তিনি বললেন, ‘বসুন!’ বসলাম। আমার উদ্বেগ লক্ষ করে তিনি বললেন, ‘কোনও সমস্যা?’

‘হ্যাঁ স্যার!’ বলে আমি কাগজটা তাঁর দিকে এগিয়ে দিলাম। বললাম, ‘স্যার, ওই যে লাল দাগ দেওয়া— খবরটা একটু পড়ুন স্যার!’

ওসি খবরটা দেখেই বললেন, ‘খবরটা পড়েছি। সমস্যাটা বলুন!’ কাগজটা আমার দিকে ঠেলে দিলেন।

‘স্যার, যদিও ঘটনা আমাদের প্রতিবেশী রাজ্যের, এই রাজ্যেও যে এটা ঘটবে না, বলা মুশকিল। রেপ-এর ব্যাপারে আমাদের বোধহয় মেয়েদের পাশাপাশি বয়ঃসন্ধির ছেলেদেরকেও সচেতন করা দরকার— এ ব্যাপারে যদি কোনও উদ্যোগ নেওয়া যায়— বয়েজ স্কুলগুলোতে!’

ওসি সাহেব একটু গম্ভীর হলেন। এক সময় বললেন, ‘ওকে!’ তখন একটা ফোন এলো। ফোন অ্যাটেন্ড করে বললেন, ‘দেখছি!’ কথাটার সঙ্গে তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ যেন আমাকে বিদায় জানাল। আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। ‘দেখছি!’ কথাটা যত বার শুনেছি, খুব একটা সদর্থক মনে হয়নি কখনও। সে দিনও কিছু একটা ঘটবে মনে হল না। কেমন যেন হতাশ লাগছিল। হয়তো সে কারণে আমি সুব্রতকে ফোন করলাম। সে তখন একটা সভায় ছিল। ঘণ্টাখানেক পর দেখা হতে পারে, জানাল। আমি প্ল্যাটফর্মে থাকব, জানিয়ে দিলাম।

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশগুলি পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *