সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

সংযোজন

প্রাজ্ঞসরকার পক্ষকে স্মরণ করানো যায়, পশুজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষ বেশ কিছু মানবিক (humane) গুণ অর্জন করেছে, ঠিকই; তবু তার যৌন আবেগ মানবিক হয়নি। এই ‘মানবিক-করণের দায় রাষ্ট্রের, বুদ্ধিজীবী’দের— একটা উদ্যোগের কথা আমাদের মনে পড়ছে, আমরা বাৎস্যায়ন ও তাঁর গ্রন্থ ‘কামসূত্র’র কথা বলছি… প্রসঙ্গত, তারও আগে ‘মানবিক যৌনতা’র পথ-কিন্তু প্রাচীন প্রাজ্ঞজনেরা দেখিয়েছিলেন। অন্তত কৌটিল্য ও অ্যারিস্টটলকে আমরা উল্লেখ করতে পারি। উল্লেখ করব এ কারণে যে, বিবাহ পবিত্র সম্বন্ধ বলে ‘বৈবাহিক যৌনতা’ স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই নৈতিকতা দাবি করে এবং স্বামী-স্ত্রী রাষ্ট্রের নাগরিক, নাগরিকের নৈতিক উৎকর্ষ বৃদ্ধির দায় পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের কিন্তু ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’-ব্যাপারে রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার যে অবস্থান নিয়েছে তা কেবল অসাংবিধানিক-ই নয়, ঐতিহাসিকভাবে তা রাষ্ট্রনীতিরও বিরুদ্ধে। কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, ‘যৌন নৈতিকতা’র উৎকর্ষ বিধানের দায় কীভাবে রাষ্ট্রের উপর বর্তায়? এ বিষয়ে আমরা খ্রিস্টপূর্ব ইতিহাস থেকে তথ্য নিতে পারি। বর্তমানে ব্যক্তির নৈতিক উৎকর্ষের বিষয়টি রাষ্ট্রনিরপেক্ষ হলেও সেই সময়ে ‘রিপুবর্জন নীতি’ অনুসরণ করা ‘রাজা’র অবশ্য কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়েছিল। ইন্দ্রিয় জয় সম্ভব না হলে সমস্ত পৃথিবীর অধীশ্বরও বিনষ্টির শিকার হবেন’ [অর্থশাস্ত্র ১/৬৪৩]। রাজা যদি জিতেন্দ্রিয় হন, তা হলে তাঁর প্রভাবে প্রজাসাধারণ বা জনগণ ইন্দ্রিয় জয়ের জন্য অনুপ্রাণিত হবে এবং ‘রাজার পাপে প্রজা মরে’— এই প্রবাদ-কথার বিপরীতে একটি তত্ত্ব গড়ে উঠবে, এমন আকাঙ্ক্ষা কৌটিল্যের ছিল বলে অনুমান করা সম্ভব। তাঁর মতে, শিক্ষাজাত বিনয়ের দ্বারাই ষড়রিপু দমন (রুদ্রকে মনে পড়ল, মানে পাপ দমন!) সম্ভব এবং রাজার অন্যতম ধর্ম, রাজধর্ম হওয়া উচিত: প্রজাদের বিদ্যশিক্ষা দ্বারা বিনয়ী-করণ [১।৭।৩]। অর্থাৎ ব্যক্তি উৎকর্ষের ব্যাপারটি ‘রাজনীতি-নির্ভর’ (তার মানে যৌনতা রাজনীতির বিষয়?)!

আরও পড়ুন: পঞ্চাশটি ঝুরোগল্পের ডালি ‘তরুণিমার কোনও অসুখ নেই’

আদর্শ রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক ভাবনায় এরিস্টটলও-কিন্তু অনুরূপ ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। (আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছি।) আকাঙ্ক্ষাজাত কতকগুলি বিষয়কে তিনি ‘ব্যাধি’ রূপে চিহ্নিত করে বলেছেন: ‘এই সব ব্যাধির প্রতিবিধান সম্পত্তিসমীকরণ থেকে মিলবে বলে আশা করা যায় না; মিলবে বরং সেই শিক্ষাপ্রণালী [=ষড়রিপু দমনের শিক্ষা] থেকে যা উচ্চতর স্বভাবকে করে লোভে পরাঙ্মুখ এবং নীচতার স্বভাবকে করে লোভে অসমর্থ [পলিটিক্স, আদর্শ রাষ্ট্র তত্ত্বে-২০]।

অতএব, যৌন নৈতিকতার উৎকর্ষ বৃদ্ধির জন্য সরকার ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’কে অপরাধ হিসাবে গণ্য করতেই পারে (কিন্তু প্রশ্ন হল, দাম্পত্যে ধর্ষণ— কীভাবে প্রমাণ করা যাবে?)!

শাশ্বত অন্ধকার, ব্যর্থ আলোর অভিযাত্রা

বুঝতেই পারছ, সুজন মিত্রের কাছে যাওয়ার আগে এটা ছিল একটা টেবল ওয়ার্ক! তবু, কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছিলাম না, সেটা বলতেই সুজন মিত্র বললেন, ‘সে তোকে দেখেই বুঝতে পারছি একেবারে ফুটছিস!’ আচমকা তাঁর সম্বোধন বদল— একটা ধাক্কা লাগলেও ভালো লাগল। তাঁর মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললাম, ‘হ্যাঁ, অনেক কথা!’ আমারও সম্বোধন বদলে গেল, ‘তোমাকেও কিন্তু একটু অন্য রকম দেখছি!’

‘স্বাভাবিক। তুই আসছিস, কত কথা হবে! একটু সাজবো না? দ্যাখ, ঘরটাও সাজিয়েছি!’ বুঝলাম ভাবের কথা কিন্তু ঘরময় ঘুরল তাঁর দৃষ্টি। তাজা পাঁচমিশেলি ফুলসমেত একটা ফুলদানি আমার নজর টানল। ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ‘এই বইয়ের সঙ্গে ঘর করা— তোমার উদ্দেশ্য কী?’

‘এক কথায়, যদি কোনও লক্ষ্য খুঁজে পাই!’

‘তার মানে তোমার জীবনে কোনও লক্ষ্য নেই।’

তিনি মাথা নাড়লেন। কেমন যেন ঝাপসা লাগছে। তবু আমার সেই পুরনো জিজ্ঞাসা নতুনভাবে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা হলে বাঁচছ কেন?’ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবলেন, তাঁর দৃষ্টিও কেমন অর্থপূর্ণ মনে হল, বললেন, ‘অনেক রকম উত্তর হতে পারে, যেমন, ধরো, এত দিন বেঁচেছি তোর সঙ্গে দেখা হবে বলে! তোকে পেলাম। এর পরের বাঁচাটা, বলতে পারিস এক নতুন জার্নি, তোর সঙ্গে সংঘর্ষ-সংলাপে, উদ্দেশ্য সেই লক্ষ্যের খোঁজ।’

আমার ভ্রূ কুঁচকে গেল তবু সহজভাবে বললাম, ‘যে যা খোঁজে সে তা-ই পায়— এমন একটা কথা শুনেছি, অনেকেই বলেন…’

‘ঠিকই শুনেছিস! আমি তো তোকেই খুঁজছিলাম, দেখেছিলাম কোথায় বল তো!’

‘কোথায়?’

আরও পড়ুন: জনপ্রিয়তা কি সীমাবদ্ধতাও

‘নট ইন অ্যাপিয়্যারেন্স বাট— কোনও এক বইয়ের মলাটে, এমন একটি মেয়ে মননদীপ্তিতে যে ছিল উজ্জ্বল! পেলাম তো! মানে তার সঙ্গে তুই মিলে গেলি।’ আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। খারাপ ধারণা তৈরি হচ্ছিল। এ কি অতিরঞ্জিত প্রশংসা নয়? মেয়েলি ভাবনা সরিয়ে রেখে আমার লক্ষ্যের কথা মনে করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তো তোমার লক্ষ্য সম্বন্ধে কি কোনও ধারণা আছে?’

‘না। তবে পড়তে পড়তে, হয়তো একদিন মনে হবে, পেয়েছি! এটাই আমার লক্ষ্য। তখন নতুন এক জার্নি।’ কী ভেবে বললেন, ‘একটা গল্প শোন! আমার এক বন্ধু, আমার মতো তারও বই পড়ার বাতিক ছিল। কী করে যেন তার মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছিল, এমন একটা বই আছে, যার মধ্যে সে পেয়ে যাবে ‘পৃথিবীর অসুখ’ নিরাময়ের ওষুধ! অফিস থেকে বেরিয়ে প্রায় দিন সে বই পাড়ায় পুরনো বইয়ের দোকানে বইটা খুঁজত। আর ঘরে ফিরতে দেরি হয়ে যেত… আমার সেই বন্ধু মারা গেছে। মরার আগে নিশ্চয় তার সেই বিশ্বাসটা মরেনি। তার কথা মনে পড়লে মন খারাপ হয়। পড়ার মধ্যে কখনও তার ‘অসুখ’ মনে পড়ে। তার লক্ষ্য ছিল একটা বই।’

‘পৃথিবীর অসুখ’ কথাটা মাথার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যা আমাকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া থেকে সরিয়ে রেখেছিল। হয়তো সে-কারণে তিনি বললেন, ‘আর-এক জনের কথা বলি। তিনি বিশ্বাস করতেন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া গরিব মানুষের মুক্তি অসম্ভব, তার দল সরকার চালাতে চালাতে হয়ে গেল বাস্তববাদী, তিনি কিন্তু আজও বিশ্বাস হারাননি লক্ষ্যে স্থির আছেন, লক্ষ্য বিপ্লব কিন্তু নিঃসঙ্গ!”

আমি বুঝতে পারছিলাম না সুজন মিত্র ঠিক কী বলতে চাইছেন। আমার মাথায় তখনও ‘পৃথিবীর অসুখ’ কাজ করছে। আমি চুপ ছিলাম। আমার মুখ নিরীক্ষণ করে সুজন মিত্র একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন, ‘দীপ্তি’, যেন ডাকলেন, হয়তো আমাকে, আমিও যেন সাড়া দিলাম, আমার ফিরে তাকানোটা তেমনই ছিল, আর আমি শুনলাম, ‘এখন থেকে তুই দীপ্তি— আমার তখন কল্যাণের কথা মনে পড়ল কিন্তু শুনছি, ‘যাই হোক, তুই কি বুঝতে পারলি, কেন আমার বেঁচে থাকায় লক্ষ্য নেই?’ এক লহমায় আমার মাথা যেন পরিষ্কার হয়ে গেল, বললাম, ‘লক্ষ্য— একটা বাইরে থেকে চাপানো বিষয়— এ রকমই মনে করো তুমি, এটাই বলতে চেয়েছ!’ তাঁর চোখের তারায় ঝিলিক উঠল, বললেন, ‘ঠিকই বলেছিস, যদিও গল্প দু’টো আমার অন্য ভাবনা থেকে, এক একটা ‘লক্ষ্য’— যে কার্যকারণ থেকে তৈরি হয়, লক্ষ্যপথে তা যদি মনে রাখা না হয়, ট্র্যাজেডি অনিবার্য, এটা আমি জানি— তুই ঠিকই বুঝেছিস!’

আর তখনই আমার মধ্যে সংশয় জাগল, আমার লক্ষ্যও কি বাইরে থেকে চাপানো নয়? ‘পৃথিবীর অসুখ’ সরিয়ে আমার ‘লক্ষ্যের কার্যকারণ’ ভেসে উঠতে চাইল। যেন তাকে রুখতে আমি বলে উঠলাম, ‘পৃথিবীর অসুখ মানে কী?’

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ রকম কথা কি শুনেছিস আগে?’

আমি মাথা নাড়লাম।

‘তার মানে তুই কবিতা পড়িসনে। এটা কবিতার ভাষা।’ বলে তিনি একটা বই পাশের র‍্যাক থেকে টেনে নিলেন। বললেন, ‘অনেকটা তোর মতোই আমি বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সে বলেছিল, এর মানে নেই, অনুভব আছে তার পর সে বলে উঠল, অদ্ভুত আঁধার— অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ…’ বইয়ের একটা পাতা মেলে ধরে তর্জনী ছুইয়ে বললেন, ‘এই কবিতাটা পুরো বলে সে বলেছিল, বুঝতে পারছিস অসুখটা? নে, পড়!’

পড়লাম। পড়া হয়েছে বুঝে সুজন মিত্র বললেন, ‘বুঝলি কিছু?’ আমি তখন চোখ বুজে কিছু ভাবতে চাইছি। একটা কথা ভেসে উঠল, আলোভুক অন্ধকার! বললাম, ‘বুঝেছি! কিন্তু আশ্চর্য, তিনি আর জানতে চাইলেন না। কিন্তু আমি বললাম, ‘স্যার, জীবন তো আলো-অন্ধকারময়!’ ‘হ্যাঁ, মানুষের জীবন আপাতদৃষ্টিতে তা-ই মনে হবে। তোর আমার, সবার!”

‘তা হলে প্রকৃত দৃষ্টিতে জীবন কেমন?’

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের বন্যা ও নদী ভাঙন: ফরাক্কা ব্যারেজের প্রভাব

‘এই মুহূর্তে এক কথায় বলতে পারব না, তবে বুঝতে পারি জীব হিসাবে মানুষের অবস্থান শাশ্বত অন্ধকারে আর এজন্যই সে ব্যর্থ আলোর অভিযাত্রী হয়ে আছে। মানুষের এই জীবনকে কি এক কথায় প্রকাশ করা যায়!’

যেন জিজ্ঞাসা। তার পর নিজের মনে মাথা নাড়লেন। আমার বলতে ইচ্ছে হল, ভেবে দেখি! কিন্তু যায় না ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে আমার মানুষের স্বরূপ বোঝার চেষ্টা থেকে ওই কথার রূপান্তর হল, মানুষ ব্যর্থ আলোর অভিযাত্রী কেন-না তার অবস্থান শাশ্বত অন্ধকারে। তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয়, মানুষ যদি আলো আবিষ্কার না করত!# আলোই এই অদ্ভুত অন্ধকারকে ডেকে এনেছে।’ কথাটা মনে ধরল কিন্তু একইসঙ্গে এই প্রথম আমার মনে হল, সুজন মিত্র বিজ্ঞানের বাইরে চলে যাচ্ছেন, তিনি বলছেন, ‘যেন অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের নিষ্ফল যুদ্ধ, অথচ প্রতিটা যুদ্ধে সে নিজেকে জয়ী মনে করে!’

‘তুমি নিজে কী মনে করো?’

‘মানে আমার জীবন কী? ঠিক বুঝি না। তবে অন্ধকারের সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই বরং সখ্যতা আছে!’

একেবারেই ননসেন্স টক মনে হলেও বললাম, ‘হেঁয়ালি মনে হচ্ছে— কিন্তু!’

‘সে কী! বুঝতে পারছিস না আমার কথা?’

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)

ক্রমশ…

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *