সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

বেঁচে থাকার পদ্ধতিতে আমরা প্রকৃষ্ট জ্ঞান যথার্থ মেশাতে পারিনি

যে কথায় আমরা শেষ করেছিলাম বিকেলের দিকে সেই কথা দিয়ে শুরু হল। ‘বেঁচে থাকা মানেই হিংসা-পাপে জড়াতে হবে, মানে দুঃখ!’ বললাম আমি, ‘এটা মেনে নিয়েই আমাদের বাঁচতে হয়, কেন?’

সুজন মিত্র ভাবছেন। আমি আরও একটা প্রশ্ন রাখলাম, ‘এখানে কি কোনও অনিবার্যতার তত্ত্ব ভাবা যায়?’

‘তোর কাছে কি তেমন কোনও তত্ত্ব আছে?’ যেন পরিত্রাণ চাইলেন সুজন।

বললাম, ‘না। তবে এটা একটা ভাবনার বিষয় বলে মনে হয়। যেমন আদিপাপের একটা ধারণা আছে। সেই পাপ-ই আমাদের বেঁচে থাকায় প্রকাশ পাচ্ছে এটা যদি স্বীকার করে নিই, বা প্রকাশ পাচ্ছে কি না— এটা যদি অনুসন্ধানের বিষয় করি, তা হলে, আদিপাপের কার্যকারণ অনুমান করতে হবে। আবার সেই পাপ-ই কারণ হয়ে আরও পাপকার্য ঘটিয়ে আরও সব দুঃখজনক কাজের কারণ তৈরি করেছে এভাবেই পাপমূলক কার্যকারণ মানুষের মধ্যে বয়ে চলেছে— এমনটা ভাবা যায়!’

যেন অনুধাবন করে সুজন মিত্র বললেন, ‘তার মানে তুই অনিবার্যতার তত্ত্ব ভাবতে বলছিস?’

‘না। আমি তা বলছি না। ভাবছি— আদিপাপ একটি ঘটনা, তা কারণ ছাড়া ঘটেনি। আমরা যদি এটা মনে রাখি তা হলে তত্ত্বটাকে খারিজ করা সম্ভব!’ সুজনের মৃদু মাথা নড়া দেখে মনে হল, তিনি ব্যাপারটা নিতে পারছেন না; বললাম, ‘তা ছাড়া বেঁচে থাকার মধ্যে হিংসাকে মিনিমাইজ করাও তো ঘটনা— পুণ্যবাসনায় মানুষ তীর্থভ্রমণও করে!’ মনে হল তাঁর দৃষ্টি বুদ্ধ মূর্তিতে, আমি প্রশ্ন তুললাম, ‘তা হলে কেন ভাবব বেঁচে থাকা মানে কেবল হিংসা-পাপে জড়ানো?’ এবার বুদ্ধমূর্তি যেন আমার দৃষ্টি টেনে নিল, যেন তাঁকে সাক্ষী রেখে বললাম, ‘জীবন মানে হিংসা-পাপে না জড়ানোর অনুশীলন— এমনও তো ভাবতে পারি আমরা।’ তার পর আমি বুদ্ধের ‘পঞ্চশীল’-এর কথা বলে বললাম, ‘এর মানে তো স্যার, পাপকর্মগুলো চিহ্নিত হয়ে আছে সেই কবে থেকে!’

স্যার যেন অনুধাবন করছেন অথবা হয়তো পঞ্চশীল ভাবছেন।

(তুমি কি গৌতম বুদ্ধের পঞ্চশীল জানো? আমি যেমন জানতাম না। সোমা আমাকে জনিয়েছে। ওর দেওয়া বইতেও পেয়েছি। খুবই সাধারণ কতকগুলো বিষয়, যা বেঁচে থাকতে হলে যেন না করে বাঁচা যায় না, সেগুলো না করাই হল শীলপালন; যেমন প্রথম শীল হল, প্রাণী হত্যা না করা! আচ্ছা, পরের চারটেও লিখে রাখছি। চুরি না করা, ব্যভিচার না করা, মিথ্যা না বলা আর মদ না খাওয়া)।

আরও পড়ুন: রাঢ়ের আর্যায়ণ প্রক্রিয়া

সুজন যেন স্বগতভাবে বললেন, ‘তার মানে পাপকর্মগুলো ছিল বলেই পালনের নির্দেশ! তবু তা আছে, মানে সমাজ নির্দেশ পালন করেনি।’ মনে হল এখনই একটা প্রশ্ন উঠবে, কেন? কিন্তু তাকে ভাবতে দেখে বললাম, ‘তোমার নিশ্চয় মনে আছে গৌতমবুদ্ধের আগেও নির্দেশ পাওয়া গেছে, প্রায় একই রকম।’… মনে হল স‍্যার মনে করতে পারছেন না, বললাম, ‘ওল্ডটেস্টামেন্ট-এর নির্দেশ-এর কথা বলছি!’ যেন তাঁর মনে পড়ল কিন্তু সে বিষয়ে কোনও কথা বললেন না। আমার মনে হল যেন ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। তাঁর মাথাটা নুইয়ে পড়ল। চেয়ারের হাতলে রাখা ডান হাত ভি-শ্যেপ হয়ে মাথাটাকে ধরল যেন। দু’ ভ্রূর উপর-কপালে তর্জনী আর মধ্যমা যেন তাল দিচ্ছে। আমি একটা ছবি নিলাম। অনেকক্ষণ পর মাথা তুলে বুদ্ধের দিকে তাকালেন। তাঁকে শান্ত দেখাচ্ছিল। আত্মগত স্বরে বললেন, ‘কমবেশি চার হাজার বছর নির্দেশ অমান্যের শাস্তিবিধান সত্ত্বেও মানুষের বেঁচে থাকায় এই হত্যা পাপ কীভাবে জড়াতে পারল?’ আমাকে দেখলেন। দৃষ্টি শান্ত। তাঁর চোখ যেন নিমীলিত হল। অবনত হল মাথা। আমি দেখলাম স্যার আমাকে প্রণাম করছেন! (আজও কল্পনা করলে দেখতে পাই, তাঁর আনত মুখমণ্ডল, চিবুক ছুঁয়েছে দুই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, প্রণামমুদ্রার অন্য আঙুলগুলো যেন পদ্মকুঁড়ি!)

স্বাভাবিক হলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্তভাবে বললেন, ‘আশ্চর্য এক সত্য পেলাম কে দিল বল তো!’

‘কে?’

‘তুই!’

আমার বলতে ইচ্ছে হল, তোমার মাথাটা ঠিক আছে তো? কিন্তু বললাম, ‘সত্য দিলাম আমি? অথচ আমিই জানি না! সত্যটা কী শুনি!’

‘মানুষের বেঁচে থাকার পদ্ধতিতে প্রকৃষ্ট জ্ঞান যথার্থ মিশতে পারেনি! এই ভাবনা।’

‘কথাটা তো ভারী! এ কথা আমি বলেছি বলে তো মনে পড়ছে না!’

‘না, তুই বলিসনি, কিন্তু পাওয়ার পথ দেখিয়েছিস— ওই যে বললি গৌতম বুদ্ধের আগেও প্রায় একই রকম নির্দেশ পাওয়া গেছে, সত্যিই আমি ভুলে গেছিলাম, মনে পড়ল ‘টেন কম্যান্ডমেন্টস’ সিনেমার অস্পষ্ট কিছু দৃশ্য— ঢিলেঢালা লম্বা পোশাকের নারী-পুরুষ, মেয়েদের মাথা ঢাকা, পুরুষের লম্বা চুল-দাড়িগোঁফ… মিছিল। মরুপথ প্রান্তর। দৃশ্যের কোলাজ তৈরি হল। কষায় কাপড় জড়ানো বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, মুণ্ডিত মস্তক… স্পষ্ট শুনতে পেলাম বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি… তার পর-পরই ভয়ংকর বীভৎস সব দৃশ্য ভেসে উঠল… আর এই সব চলমান দৃশ্য-কোলাজের মধ্যে দেখলাম তুই দাঁড়িয়ে আছিস! বেদনার্ত চোখে তোর অনন্ত জিজ্ঞাসা।’ আমার মনে পড়ল রুদ্রর দেখা স্বপ্নের কথা, বললাম, ‘তার পর?’

‘তার পর দৃশ্যেরা মিলিয়ে গেল। মনে হল আবর্জনার মতো শিলালিপি ফেলে দেওয়া এক প্রান্তরে আমি দাঁড়িয়ে আছি একা। দিশাশূন্য। নজর পড়ল শিলাখণ্ডে, তাজা রক্ত ছিটানো… আর তখনই দেখলাম ওই কথাটা আমার মনে ভেসে উঠছে!’

মনে মনে আমি কথাটা আওড়ালাম, একবার, দু’বার… কয়েক বার কথাটা বলার পর আমি বলে উঠলাম, ‘বাঃ! বেঁচে থাকার পদ্ধতিতে আমরা প্রকৃষ্ট জ্ঞান যথার্থ মিশাতে পারিনি! দারুণ উপলব্ধি! এবার বোধ হয় তুমি একটা লক্ষ্য পাবে!’

‘কীরকম?’

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *