সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

‘তুমি দারুণ একটা ছবি দিয়েছ। পরিত্যক্ত শিলালেখ-এ তাজা রক্তের ছিটে! প্রকৃষ্ট জ্ঞান যদি প্রজ্ঞা হয়, তুমি প্রশ্ন করবে না, কেন বেঁচে থাকায় পদ্ধতিতে প্রজ্ঞার যথার্থ মিলন ঘটেনি, কেন বেঁচে থাকা এত রক্তাক্ত?’

ভীষণ রকমের ভাবান্তরে সুজন মিত্র বললেন, ‘কনফিউজড লাগছে।’

‘কনফিউশনের কিছু নেই স্যার। সত্যতে কোনও ধুলো-শ্যাওলা নেই। স্পষ্ট। স্বচ্ছ। কেবল সত্য-নির্মাতা নিয়ে সংশয় আমাদের― কে নির্মাণ করেছে? তুমি বলেছ, ‘প্রকৃষ্ট জ্ঞান’। যে নাকি পদ্ধতির সঙ্গে ‘যথার্থ মিশতে পারেনি’ আর আমি বলছি, সত্য নির্মাতা— ‘আমরা’ই। পদ্ধতিতে প্রকৃষ্ট জ্ঞান আমরা যথার্থ মিশাতে পারিনি— এই পার্থক্য কেবল সত্য নির্মাণ-ক্ষেত্রে! ক্লিয়ার!’ মনে হল ক্যাবলাকান্তর মতো সুজন আমাকে হাঁ করে দেখছেন, যেন তা নজর করিনি এমন ভাবে বললাম, ‘তুমি-কিন্তু এখন লক্ষ্যশূন্যদশা থেকে মুক্ত হলে!’ তখন এ বাড়িতে শঙ্খ বাজল। শঙ্খধ্বনি মিলিয়ে গেলে আমি বললাম, ‘আমাদের লক্ষ্য পদ্ধতি-প্রজ্ঞার যথার্থ মিলন ঘটানো।’ কী এক উত্তেজনায় সুজন মিত্র উঠে দাঁড়ালেন। তাঁকে অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছিল। যেন নতুন এক আলোয় তিনি আলোকিত। কেন জানি না সেই মুহূর্তে আমার ‘সেলিগম্যান-এর কথা মনে পড়ছিল। ভাবনা এল, পদ্ধতি-প্রজ্ঞার মিলন— যদি লক্ষ্য হয়, লক্ষ্য অর্জন বা পূরণ, যা-ই হোক তার আফটার এফেক্ট-টা কী হবে? মানে সেটাই হবে লক্ষ্য। এই ভাবনার মধ্যেই আমি শুনলাম, ‘কী ভাবছ?’ বললাম, ‘একটু চুপ থাকি, ক্লান্ত লাগছে!’

আরও পড়ুন: ‘গুলিনদা’র জন্ম শতবর্ষ

আলোর পৃথিবীতে অন্ধকারের  আবাহন 

আমরা আর বিশেষ কথা বলিনি। তখনও ফেরার সময় ছিল। ফিরছি না বলে বাড়িতে জানিয়ে দিলাম। আমি থেকে গেলাম। অণিমা আর আমি অনেক রাত পর্যন্ত— কত কথা। আমাদের বাড়ির কথা। এ বাড়ির কথা। কথায় কথায় আমাদের সম্বোধন বদলে গেছে। আমার মনে আছে কথা বলতে বলতে আমরা ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছি। তোমার নিশ্চয়ই কৌতূহল হচ্ছে, আমরা কী কথা বলেছি, আমার রাত কেমন কাটল! বলছি শোনো! সুজন মিত্রের সঙ্গে যেসব কথা হয়েছিল, তার টুকরো টুকরো কিছু কথা আমি বলেছি এবং শেষপর্যন্ত আমরা যে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি, এও জানিয়েছি। সেই সূত্র ধরেই আমাদের কথা শুরু হয়েছে। ‘তার মানে’ বললেন অণিমা, ‘পদ্ধতি-প্রজ্ঞার মিলন ঘটানো— এটা লক্ষ্য হতে পারে বলে তোর মনে হচ্ছে না, তাই তো!’

‘হ‍্যাঁ!’

‘আমারও মনে হচ্ছে, ঠিকই ভেবেছিস। তোর স্যার কি এটা মেনে নিলেন?’

‘ঠিক বুঝিনি— আমার নিজের কাছেই ব্যাপারটা যে ঘোলাটে হয়ে গেল।’

‘পরিষ্কার হয়ে যাবে! তোর স্যারের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমার মনে হয়েছে— জ্ঞান মানে তো আলো! এক-একটা বই এক-এক রকমের আলো দেয়। কথাটা সুজনের মুখে শুনেছি। একটা ঘরের মধ্যে যদি অনেক রকমের আলো জ্বালানো হয়, যা দশা হবে, সুজনের অবস্থা তা-ই হয়েছে।’

‘কী রকম?’

‘ধর, আলো-অন্ধকারের কথা― ওঁর মতে, আলো আবিষ্কারই নাকি আলোর পৃথিবীতে অন্ধকার ডেকে এনেছে! কেউ ভাবতেই পারে এটা বাতুল-কথা। কিন্তু ভেবে দেখ্, এর  মধ‍্যে-কিন্তু যুক্তি আছে।’

আমি যুক্তিপথ খুঁজতে গিয়ে শুনলাম, ‘এ রকমই একটা আঁতেল-কথা, মানবিক যৌনতা, তোমরা যাতে মোহিত হয়েছ!’

‘তুমি হওনি?’

‘কথাটা নতুন, অন্তত আমার সামান্য পড়াশোনায় আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না কিন্তু নতুনেরও তো যুক্তি থাকবে! জানতে চেয়েছি। কথাও হয়েছে। বলেছে, কথাটা আচমকা যেন কানে এসেছে। বুঝতে পারছিস, মন ভরেনি। বরং প্রশ্ন উঠেছে, যৌনতা কেন কেবল পুরুষের হবে? ভেবেছ কখনও? উত্তর পাইনি।

আরও পড়ুন: দু’টি কবিতা

বিনতা, তোকে বলছি, নারীর কি মানবিক হওয়ার দায় নেই? ভাবিস তো! বা যৌনতার মানবিক হওয়া মানে কী?’

কীরে কথা বল!’

‘ভাবছি… আঁতেল-কথার আগে তুমি আমাকে বাতুল-কথাটার মধ্যে কী যুক্তি আছে, বলো!’

‘খুব সহজ— মানুষ ছাড়া আর সবাই সূর্য ওঠার সঙ্গে জাগে আর সূর্য ডোবার পর-পরই ঘুমিয়ে পড়ে— এটা তো এক শাশ্বত সত্য! এটা হল আলো-পৃথিবী।’

‘বাতিক্রম আছে, প্যাঁচা-বাদুড়!’

‘ব্যতিক্রম যা-ই থাক তা প্রাকৃতিক বা সূর্য-অনুসারী। একমাত্র মানুষ সূর্য ডোবার পরও জেগে থাকতে চেয়েছে, সূর্যকে ভুলেছে! আর আগুন থেকে সে আলো আবিষ্কার করেছে, রাতের অন্ধকারকে সরিয়েছে আলো, ঠিকই কিন্তু তাকে আরও জমাট বাঁধতে দিয়েছি, আরও নতুন নতুন আলো মানুষের মাথার মধ্যে অন্ধকার ঢুকিয়ে দিয়েছে— এ রকম মনে হয় আমার— আমরা যদি সব কাজ দিনের আলোতে সেরে নিতে পারতাম! কী ভালোই না হত!’

কথা বলার ধরনটা চমৎকার। আমি বলে উঠলাম, ‘ঠিকই বলেছ! সূর্যের আলোতে কাজ সেরে নেওয়ার অভ্যাসটা কেন যে হারিয়ে গেল! আচ্ছা, তোমার কেন মনে হয়েছে, স্যার এসব যুক্তি না জেনেই কথাটা বলেছেন?’  

‘যুক্তি-কথাগুলো তিনি জানেন না, তা আমি বলিনি, বলছিও না, যুক্তিগুলো তুলে ধরা, সাজিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে সুজনের সমস্যা আছে!’

‘লেখার ক্ষেত্রে কিন্তু তা মনে হয়নি।’

‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। আমি বলছি, কথা বলার ক্ষেত্রে এটা অতিজ্ঞানের সমস্যা।’

অতিজ্ঞান শব্দটা মাথার মধ্যে ঢুকে পড়ল। ভাবনা এলো, মানে সুষম জ্ঞানের অভাব! বললাম, ‘বাঃ! নতুন ভাবনা দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’

‘তা হলে আর-একটা ভাবনা দিই— পদ্ধতি-প্রজ্ঞার মিলন, কথাটা তোরও ভালো লেগেছে, কথাটার মধ্যে কী বিশেষ তাৎপর্য আছে? বল তো!’

‘পদ্ধতি শব্দটার আগে আর-একটা কথা কিন্তু আছে। পুরো কথাটা হল, বেঁচে থাকার পদ্ধতি—’

‘মানুষের বেঁচে থাকা ব্যাপারটাই তো ভীষণ গোলমেলে! তা হলে এসব তোমরা ভাবছ কেন?’

আমার মধ্যে বিস্ময় জাগছিল। মননে তো অণিমা ভীষণ ঋজু! তবু মননমন্থনে তিনি নিঃসঙ্গ! কেন? জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্যারের সঙ্গে বেঁচে থাকা নিয়ে কোনও কথা হয়েছে কখনও?’

‘ঠিক মনে নেই। তবে বেঁচে থাকা বুঝতে চেষ্টা করেছি। ছেলেদের বেঁচে থাকা আর মেয়েদের বেঁচে থাকায় কোনও মিল আছে বলে আমার মনে হয় না। এমনকী স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও সেই যে কে এক জন বলেছেন না, মেয়েদের বিয়ে মানে আইনি বেশ্যাবৃত্তি— এও তো একটা মেয়ের বেঁচে থাকার বাঁচিয়ে রাখার পদ্ধতি!’

‘এটা-কিন্তু এক সময় খুব অভিজাত বৃত্তি ছিল!’

‘জানি তো! প্রাচীন সাহিত্যে সেই অভিজাত মেয়েদের কেউ কেউ অমর হয়ে আছে, তাই না? (যেন শ্লেষ ঝরল বেঁচে থাকার পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে তুমি কোন প্রজ্ঞার মিলন ঘটাবে? বাৎস্যায়ন?’

আমার তখন মনে পড়ল ‘মানবিক যৌনতা’— সুজন মিত্রও তার লেখায় বাৎস্যায়নের কথা বলেছেন।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘কামসূত্র পড়েছ?’

‘এক সময় চোখ বুলিয়েছিলাম।’

আমার কৌতূহল জাগল, ‘বইটাতে কি মানবিক যৌনতার কোনও ধারণা আছে?’

‘এই কথাটাই তো তখন জানতাম না!’

‘তাহলে তুমি বিয়ের মাধ্যমে একটি মেয়ের বেঁচে থাকার যে পদ্ধতি তাতে যদি কামসূত্রের জ্ঞান মেশে― তাকে প্রশ্নাতুর করলে কেন?’

আরও পড়ুন: অতি ছোট, ক্ষমতায় সূর্যেরও বেশি

‘চৌষট্টি কলা— কথাটা শুনেছিস? জানিস কিছু?’ আমি মুখে জানি না-আওয়াজ করলাম। অণিমা বললেন, ‘জানিস জানিস, রান্না তো শিখেছিস, নিশ্চয়ই সেলাই-ফোঁড় করতে জানিস, গান শিখেছিস?…’ আমি না আর হ্যাঁ-বোধক আওয়াজ দিচ্ছিলাম— ‘এসবই এক-একটা কলা, মেয়েদের শিখতে হয়, পুরুষের যৌনসুখের জন্য, মেয়ে তার যোনির সুখ পেল কি না, এই বিষয়টার ক্ষেত্রে জোরাল কোনও কথা পেয়েছি বলে তো মনে পড়ছে না। তবে অধিকাংশ মেয়েই কয়েকটা মাত্র জেনে বেঁচে থাকার এই পদ্ধতির মধ্যে বেঁচে আছে! তুই বোধহয় জানিস, মেয়েদের একটা ম্যাগাজিনে বেরিয়েছিল, বেশিরভাগ বিবাহিত মেয়েরা নাকি জানেই না অরগ্যাজম ব্যাপারটা কী!’

কী ভেবে বললেন, ‘তখন— মানে বাৎস্যায়নের সময় নগরের মেয়েরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেছিল, এটা খুব ভালো বোঝা যায়, গণিকা, স্ত্রী আর দাসী— এখনও তা-ই আছে, গ্রাম শহর সবখানে; সকলকেই যোনি ব্যবহার করতে দিয়ে বেঁচে থাকতে হয়— ইনক্লুডিং মাই সেলফ!’

আমার যেন আর কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না।

‘কী রে চমকে গেলি নাকি?’ বললেন তিনি, ‘পুরুষ বাই নেচার বহুগামী— এটা নিশ্চয়ই জানিস! বলা হয়।’ আমি সাড়া দিলাম, ‘শুনেছি।’ বললেন, ‘সমস্যাটা এইখানে, যোনির বাজার বেড়েছে কিন্তু ‘গণিকা’র সেই দিন গিয়েছে, আর নাই! ‘আত্মার শান্তি’র জন্য পুরুষ আর গণিকার কাছে যেতে পারছে না, বই অবশ্য সেই অভাব মিটিয়ে দিচ্ছে কিন্তু নেচার তাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বউয়ের কাছে— আমার তখন ইচ্ছে নেই তবু যোনি পেতে দিতে হবে।’ শুনতে শুনতে অনেক কিছুই ঝাপসা লাগছিল, আমার মনে হল, অণিমা যেন আমার ভাষায় কথা বলছেন, নীহারিকার কথাও মনে পড়ল। ভাবনা এলো, দাম্পত্য জীবনে যে রেপ হয় এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ— এটা প্রমাণ করতে যিনি যুক্তি সাজিয়েছেন, সেই তিনি সুজন মিত্র কীভাবে এটা করতে পারেন? আমি জানতে চাইলাম, ‘অপরাধ নিও না ব্যাপারটা তো যন্ত্রণাদায়ক!’

উত্তরে বললেন, ‘সিদ্ধান্তটা বদল কর। যৌনতা নিয়ে গবেষণা করছিস, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ইনক্লুড করবি না!’

এবারও কথার পিঠে কোনও কথা জোগাতে পারলাম না। মনের উৎফুল ভাবটা কেমন যেন নেতিয়ে পড়ল। তিনি আবার যেন কথাটা বললেন, অভিজ্ঞতা ইনক্লুড করবি না!

‘কী রে ঘুমিয়ে পড়লি?’

‘না। ভাবছি।’ অণিমা যেন নিজের মনেই বললেন, ‘কত ভাবেই না মেয়েমানুষ বেঁচে থাকে। শেষপর্যন্ত তা মানিয়ে নেওয়া! নিস্তার চাওয়া!’ আমি কথাচালাতে চাইলাম, ‘কী রকম?’

আরও পড়ুন: হতভাগ্য স্বামীর বিলাপ

‘শোন তা হলে! আমার গল্পই বলি, নিস্তার চাওয়ার গল্প! ছেলে হওয়ার সাত বছর পর আমার মেয়ের জন্ম। এই দুই জন্মের মধ্যে তিন-তিনটে অ্যাবোরশন। (নীহারিকার কথা মনে পড়ল)। জন্ম-নিরোধের সমস্ত পদ্ধতি জানা সত্ত্বেও— এ এক রহস্য! তৃতীয় বার কনসিভ করেছি, মোচনের জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, সুজনকে বললাম, এক জন বুদ্ধ অনুরাগী হয়ে এভাবে তুমি প্রাণ হত্যা করতে পারো না! কথাটা মেনে নিয়ে সে বলল, প্রাণের মৃত্যু অনিবার্য, আর যতদিন সে বেঁচে থাকবে জীবনভর অনিবার্য দুঃখের হাত থেকে তার রেহাই নেই! আমি সায় দিলাম, ঠিক। সে বলল, কিন্তু গর্ভে কোনও প্রাণের মৃত্যু হলে জন্মের পর অনিবার্য দুঃখভোগের আর সম্ভাবনা থাকছে না! রাইট! অকাট্য যুক্তি! যেন নীরব থেকে স্বীকার জানালাম, শুনলাম, প্রাণ-হত্যার পাপ আমাকে স্পর্শ করবে ঠিকই, কিন্তু একইসঙ্গে তার দুঃখভোগের হাত থেকে রেহাই দিলাম, এর মধ্যে নিশ্চয়ই খানিকটা পুণ্য থাকবে। আমার তখন তোর স্যারকে সিনেমায় দেখা ঠান্ডা ভিলেন মনে হচ্ছিল, যন্ত্রণার কথা মনে পড়ছিল। আমি বললাম, একে তুমি জন্মাতে দাও! তার পর না হয় তুমি— তুমি তো জ্ঞানের খোঁজে ঘরছাড়ার কথা বলো— ছেড়ে যেও! না হয় আমিই চলে যাব তোমার জীবন থেকে, যাতে আর নতুন প্রাণের সৃষ্টি না হয়।’

‘কী বললেন?’

‘সে এক মধুর কথা— আহা! কী শুনিলাম। বলল, কোথায় যাব তোমাকে ছেড়ে? তোমাকেই জানতে পারলাম না। আমার তখন মনে হল, ঘর ছাড়ার জন্য কি বউকে জানতে হয়? সিদ্ধার্থ কি গোপা সম্পর্কে সম্যক জেনে তবে ঘর ছেড়েছিলেন? এ সব আমি জিজ্ঞাসা করলাম।’

‘তার পর?’

‘চুপ করে ছিল। আমি বললাম, আমার মনে হয় জীবের দুঃখ-নিরোধের ভাবনায় সিদ্ধার্থের যৌন তাড়না বোধহয় আর ছিল না, তাই তিনি ঘর ছাড়তে পেরেছিলেন— তুমিও তো মানুষের দুঃখ নিয়ে ভাবো, এমনকী একটা শুঁয়োপোকার প্রতি তোমার করুণা দেখার মতো জিনিস সেই তুমি আমার প্রতি এত নিষ্ঠুর কেন? তুমি আমার যন্ত্রণাটা বোঝো অন্তত! স্বামীদেবতার মুখে কোনও কথা নেই। বুঝলাম আমারও নিস্তারের পথ বন্ধ! বুঝতে পারছিস বেঁচে থাকার পদ্ধতি?’

আমি বললাম, ‘চেষ্টা করছি।’

‘মানুষের জ্ঞানচর্চা মানে’ বললেন অণিমা, ‘সুজনের কথাতেই বলি, বেঁচে থাকাকে আর-একটু মানবিক করার পথ খোঁজা! ভালো কথা। কিন্তু খেয়াল করে দেখিস, আমার মনে হয়েছে, জ্ঞানচর্চা মূলত পুরুষের। তুই সুযোগ পেয়েছিস, বিষয়টাও বেশ চ্যালেঞ্জিং— একটা নতুন কিছু বোধহয় পাওয়া যাবে। কেবল নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে কিন্তু ব্যাপারটা দেখিস না, প্রকৃতির দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাপারটা দেখবি।

আমি সোৎসাহে বললাম, ‘তোমাকেও আমি গাইড মানছি। আমার এক বন্ধু আছে, সোমা সেও আমাকে পথ দেখাচ্ছে!’

বাঃ! তা হলে আমরা সবাই মিলে তো আর একটা ‘কামসূত্র’ লিখতে পারি!’

আমার ইচ্ছে হল বলি, কী লাভ তাতে? ভাবনা এলো, সেই কবের লেখা— ক’জন পড়েছে? আমাদের বাড়ির কেউ কি পড়েছে। মনে তো হয় না। কিন্তু সুজন মিত্র অণিমা তো পড়েছেন— তা হলে… জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা দু-জনই তো বাৎস্যায়ন পড়েছ, তা হলে তো তোমার বেঁচে থাকা তো আনন্দময় হওয়ার কথা, হয়নি কেন?’

‘এক কথায় মনে হয় পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা যায়নি।’

‘প্রয়োগ করতে বাধা ছিল বলে মনে হয় তোমার?’

‘আমার কথা বলতে পারি— বিছানায় বাৎস্যায়ন মনে পড়েনি কখনও। এমনকী সুজন কখনও কামসূত্রর কথা তুলেছে বলে মনে  হয় না।’

আরও পড়ুন: এক বাঙালি ফুটবলপ্রেমীর শহিদের মৃত্যু: চল্লিশ বছর পরে কিছু কথা

‘তাহলে আর একটা কামসূত্র লিখে কী হবে?’ উত্তরের অপেক্ষায় থেকে নাকডাকার শব্দ পেলাম। আমার চোখের পাতা তখন বুজে এলো। আর ঘুম ভাঙল— যেন একটা স্বপ্ন আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। কোনও এক জংশন স্টেশনের ওভার ব্রীজে দাঁড়িয়ে আছি। প্ল্যাটফর্মে কোথাও কোনও যাত্রী-হকার নেই। এমনকী একটা কুকুরও নজরে এলো না। সিগনালের আলোগুলো, আপ-ডাউন দু-দিকেই, সব লাল। (তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ, আমার তখন ভয় করছিল! একদম না। মানুষই তো নেই, ভয় পাব কাকে?)। আমি লাইন বরাবর দৃষ্টি চালাতে গিয়ে যেন একটা খেলার মধ্যে ঢুকে পড়লাম, লাইনের কাটাকুটির ভিতর দিয়ে একটা লাইন দিয়ে দৃষ্টিকে ছোটাতে চাইছি। তখন নাম ধরে কে যেন ডাকল, ফিরে দেখি সেই ছেলে চোখ মেলে দেখলাম, অণিমা ডাকছেন। সেই ছেলে মানে বুঝতে পারছ, কে? সেই যে যাকে আমি হারিয়ে ফেলেছি মনে হয়। বিছনায় উঠে বসে টের পেলাম মনখারাপ।

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *