Latest News

Popular Posts

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

মেয়ে মুখ ঢাকবে পানপাতায়, অ্যাসিডেও ভিজবে

না, তোমাকে আর মনখারাপের গল্প আর শোনাচ্ছি না। বরং ভালো খবর শোনাই। আমার দাদার বিয়ে। দিন-ক্ষণ ঠিক হয়ে আছে। আরও একটা খবর— আমাদের প্রতিবেশী থানা থেকে ফোন এসেছে, কতকগুলো স্কুলে প্রোগ্রাম করতে হবে, আমি সম্মতি জানিয়েছি। আচ্ছা বলো তো সুব্রতকে না জানিয়ে আমি কি ভুল করেছি? ভুল একটু করে ফেলেছি, মনে হয়— সম্মতি জানানোর আগে সুব্রতকে জানালে ভালো হত। একই সঙ্গে আমি ভুল করিনি— এর পক্ষেও যুক্তি সাজাতে চেয়েছি। কিন্তু কেন ঠিক বুঝতে পারছি না। যাই হোক, দেরিতে হলেও ব্যাপারটা সুব্রতকে জানানো উচিত বলে মনে হতেই তাকে ফোন করলাম। দুঃখ প্রকাশ করে ব্যাপারটা জানাতেই সে বলল, ‘দুঃখিত হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি! কারও সুপারিশ ছাড়া তুমি প্রোগ্রাম পেয়েছ— এটা দারুণ ব্যাপার। কনগ্রাচুলেশন!’ ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ‘তুমি কিন্তু আমার সঙ্গে থাকবে।’ একটু ভেবে সুব্রত বলল, ‘ঠিক আছে, যাব।’ তাকে আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে ছেলেদের স্কুলে সেমিনার-বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া গেল না। মনে হল, ব্যাপারটাকে সিরিয়াসভাবে নিচ্ছে না কেউ। সুব্রত অবশ্য জানাল সে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবনা ছাড়েনি। আমি বললাম, ‘মেয়েদের প্রতি যে ধরনের অত্যাচার ঘটছে, তা-কিন্তু মেয়েদের সচেতন করে রোখা যাবে না, এটা কিন্তু তোমার ভাবনায় রেখো!’ সুব্রত বলল, ‘এটা আমার মাথায় আছে— যেখানে মেয়েরা ভিক্টিম, তারা অপরাধ করছে না, ঠিকই। কিন্তু অপরাধ তো ঘটেই চলেছে… আমরা অপরাধ রুখতে চাই।’

আরও পড়ুন: বিজয়া

‘ওকে, থ‍্যাঙ্কু! কাটছি?’ ফোন রেখে আমি হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। কয়েক মুহূর্ত ছাদের দিকে চেয়ে থেকে চোখ বুজে দেখি চোখের পাতায় যেন সূর্যের ছাপ লেগে আছে। আবার চোখ মেলে আমি সুব্রতর কথা ভাবলাম, মেয়েরা অপরাধ করছে না। আবার করছেও তো! যেন সুব্রত আমার সামনে, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে শাশুড়ি-ননদের ভূমিকা থেকেই তো ‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’ কথাটা এসেছে! তার মানে― আচ্ছা, ব্যাপারটা কি এ রকম— পুরুষকে আড়াল করার জন্যই কথাটা বানানো হয়েছে? তোমার কী মনে হয়?

কী মুশকিল, দেখো! সুব্রত থেকেও নেই। মানে উত্তর পেলাম না। তোমাকে জিজ্ঞেস করলেও তো একই রেজাল্ট!

অগত্যা নিজেকেই বললাম, কি মেয়েদের ধোয়া তুলসীপাতা মনে করো? উত্তর খুঁজতে গেলে একটা সিনেমার কথা মনে পড়ল। সেখান থেকে একটা দৃশ্য ভেসে উঠল আর দৃশ্যটা আমার মাথাটাকে যেন না ভঙ্গিতে নাড়িয়ে দিল। অনেক দিন আগের কথা, সিনেমাটা দেখার পর থেকেই মাঝে মধ্যেই ওই দৃশ্যটা মনে পড়ত― চলন্ত মোটর বাইকের পেছনে বসে থাকা একটি মেয়ে কাচের গ্লাসে কিছু ঢালছে… মন্থর গড়াচ্ছে চাকা… সামনে আর একটি মেয়ে হাঁটছে… বাইক থেকে নামল মেয়েটি… হাতে গ্লাস মেয়ে হাঁটতে থাকা মেয়েটির কাছে পৌঁছে গেল দ্রুত, পেছন থেকে চুল ধরে মুখটা ঘুরিয়ে নিল নিজের দিকে আর সেই গ্লাসের তরল ঢেলে দিল সেই মুখে… বুঝতে পারছ অ্যাসিড হামলা! একটা মেয়ে আর একটা মেয়ের মুখ অ্যাসিডে পুড়িয়ে দিচ্ছে। তুমি বলো! ভাবা যায়? অথচ ঘটনাটা ঘটেছে। বাস্তব। এতটাই বাস্তব যে, অ্যাসিড বিক্রির উপর সরকার যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তা ওই ঘটনার মামলার ফল। সেই ঘটনা অবলম্বনে সিনেমাটা তৈরি। সব চেয়ে আশ্চর্য কী জানো। তিরিশ বছরের একটা ছেলে তার প্রতিবেশীর পনেরো-ষোলো বছরে এক মেয়েকে অ্যাপ্রোচ করেছে, মেয়েটি ফিরিয়ে দিয়েছে প্রস্তাব, তার পর, ছেলেটির যে কী হল, তার সম্পর্কিত বোনই বা কেন তুতো দাদার হয়ে অ্যাসিড ছুড়ল… এসব আমাকে ভীষণ ভাবিয়েছিল— ভাবনাটা নতুন করে ফিরে এল— ধর্ষণ সহ এ রকম ঘটনা যারা ঘটায় তাদের মনোজগতে সেই সময় ঠিক কী ঘটতে থাকে? কী ঘটেছিল— আদালতে কি এসব প্রশ্ন ওঠে না? সিনেমার আদালতে অবশ্য এই প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়নি। সারভাইভের জন্য ভিক্টিমের লড়াই অবশ্যই আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু ঘটনা যাতে না ঘটে, ঘটায় তো পুরুষ, পুরুষের মনে ঘটনাটা আগেই ঘটে, তার কার্যকারণটা জানতে পারলে, অন্তত সতর্ক হওয়া যায়। এই ভাবনাটা আমাকে বলতে পারো পেয়ে বসেছে, ঘটনার অব্যবহিত পর থেকে সাজাপ্রাপ্ত পুরুষের মনোজগতে কী ঘটতে থাকে— এটা জানতে পারলে বোধ হয় ধ্বংসাত্মক যৌনতা-নিবৃত্তির পথ পাওয়া যেত! তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ, আমার মাথা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছে। এক দিকে যৌনচেতনা থেকে কামসূত্র, তার সঙ্গে ধ্বংসাত্মক যৌনতা; আর-এক দিকে আদিপাপ থেকে সৌরচেতনা― মানুষের মুক্তি! সৌরচেতনা কথাটা প্রসঙ্গক্রমে সুজন মিত্র বলেছিলেন, এটাও কাব্যলোকের শব্দ, সৌরচেতনাই নাকি মুক্তির পথ দেখায়… কোনও দিকেই কোনও স্বচ্ছ ধারণায় পৌঁছনো যাচ্ছে না। তার মধ্যে আবার মেয়েদের সচেতন করা! এই কথাটা আমি কাকে শোনাব? প্রথমে সোমার কথা মনে পড়ল। তাকে বললে সে কী বলবে তা আমি জানি, বলবে, লক্ষ্যে অবিচল থাক! আমি বলব, আমি তো লক্ষ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি! বরং লক্ষ্যে পৌঁছনোর উদ্দেশ্য নিয়ে চলত চলতে সমস্যায় জড়িয়ে গেছি— কামসূত্র লেখার প্রস্তাব এসছে! সম্ভবত সোমাও বাৎস্যায়ন পড়েনি। সে বলতে পারে, বুঝলাম না! তখন তাকে জানানোর একটা ব্যাপার থাকবে। তার মানে ‘কামসূত্র’ বিষয়ে ধারণা না নিয়ে সোমার সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন: উত্তরবঙ্গের বনদুর্গা

আজ নিজেকে কেমন ঘোলাটে মনে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে এমন হয়। ধরে নিয়েছি আমার মধ্যে ‘সেডিমেন্ট’ আছে। মাঝেমধ্যে নাড়া খেলে খোলাটে তো হবেই! এই ব্যাপারটা নিয়ে যখনই আমি ভেবেছি, মন বলেছে, হয় নিজেকে পলিমুক্ত করো, না হয় পলিকে শিলীভূত করো! আজ কেন জানি না মন বিরোধিতা করে বলল, এসব অভিজ্ঞানের কথা, ছাড়ো! থিতিয়ে যেতে দাও! (অণিমার কথা মনে পড়ল)― শেষপর্যন্ত থিতিয়েই তো যায়! আজ আমি ‘নাড়া খাওয়া’ ব্যাপারটা বুঝতে চাইলাম। সন্দেহ নেই ‘নাড়া’টা বাইরের কোনও ‘ফোর্স’ থেকে আসে— মানে কোনও ঘটনা আমার মনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনাটা খুঁজতে হবে। কী ভাবছ, আমার কোনও কাজ করে খেতে হয় না! কেবল ভাবছি আর ভাবছি। আর তোমাকে লিখছি! না, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। ধরো এই যে এখন লিখছি— লেখাটা তো অনেকটা দিনলিপি লেখার মতো কাজের শেষে বা কাজের মধ্যে, সময় করে নিতে হয়। এই এখন যেমন, দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। খাওয়ার পর যে যার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে। আমিও— শুয়ে শুয়ে লিখছি। এটাই আমার বিশ্রাম। সকাল থেকে এই লিখতে বসার আগপর্যন্ত কাজের একটা ফিরিস্তি তোমাকে দিতে পারি, তাতে আমাকে কল্পনা করতে তোমার সুবিধে হবে। উঠোন ঝাঁট দিয়েছি। দোকান খুলেছি। বাবার দোকানদারিতে হাত লাগিয়েছি। খবরের কাগজে চোখ বুলিয়েছি। সুযোগমতো ঘর গুছিয়েছি। কখনও বই পড়েছি। কুটনো কুটেছি। আর এই সব কাজের মধ্যে আমি ভাবনার কাজটিও চালিয়ে গেছি।

মনে পড়ল, আজ যখনই মা বা বাবার কাছাকাছি থেকে কাজ করেছি, কথা বলতে হয়েছে, দাদার বিয়ের ব্যাপারে মতামত জানিয়েছি, দায়িত্ব নেবার কথা দিয়েছি। তার মধ্যেই একটা অন্য কথা মনে পড়ে গেছে, ঘরে বিবাহযোগ্যা মেয়ে রেখে কেন ছেলের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে― এ রকম একটা কথা উঠেছিল, আমার মাসি জানিয়েছিলেন, চাকরির জন্য চেষ্টা করছি― এটা ডাহা মিথ্যা, কেন বললেন কে জানে। আমার বিয়ে না করার সিদ্ধান্তটাকে জানানো উচিত হবে না, সম্ভবত এমন বিবেচনা করেছিলেন মাসি। এটা যখন আমার ‘বউমণি’ জানবে, নিশ্চয়ই মনখারাপ হবে তার― ননদ নিয়ে সংসার করতে কে-ই বা চায়। তুমি বোধহয় বিরক্ত হচ্ছ। আমার জীবনে তো আর কিছু ঘটছে না। যা ঘটছে গতানুগতিক। কোনও কাহিনি নেই। এমনকী, কোনও ঘটনা ঘটাতেও পারছি না আমি। একটা সিদ্ধান্ত নেব, তার আগে একটা নোট রাখতে চাই, বলেছিলাম। হয়তো ভাবছ, আর কত নোট পড়তে হবে সিদ্ধান্তটা আর নেবই-বা কবে! এ ভাবনা আসা স্বাভাবিক। যাই হোক, যদি পড়তে ইচ্ছে না করে, তুমি নাও পড়তে পারো। কিন্তু আমাকে লিখে যেতে হবে। তোমাকে উদ্দেশ্য করেই লিখব। সিদ্ধান্তের কথা উঠল যখন, বলতে ভুলে গেছি, বলি, কোন লক্ষ্য সামনে রেখে আমি সিদ্ধান্ত নেব ভেবেছিলাম, সেটা ভুলেছি। মানে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে আমি আর ভাবছি না। অর্থাৎ এখন তোমার আর পরামর্শ দেওয়ার দায় নেই, মুক্তমনে পড়তে পারো!

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)

ছবি ইন্টারনেট

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *