সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৩)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

ধানগাছের কাছে এসে জানা গেল নারী-পুরুষের আদি দ্বন্দ্ব, প্রথম ভ্রাতৃহত্যা… তবু প্রেম  

তুমি জেনেছ, সোমার ভাষায় আমার ‘পঞ্চশিষ্য’কে— এরা কিন্তু আমার ‘পঞ্চপ্রেমিক’ হতে পারে— প্রেম মানে আরও আলো মানুষীর তরে এক মানুষের গভীর হৃদয় (কল্যাণ বলেছিল কথাটা)— মননও বলতে পারো— মানুষীর তরে এক মানুষের গভীর মনন— এরা প্রত্যেকেই আমার যথেষ্ট খেয়াল রাখে। সুব্রত রুদ্র সত্যব্রত— এদের কথা তো জানোই, কল্যাণকেও অনুমান করতে পারো, আমি তার কাছে গার্গী, মনে করিয়ে দিলাম। এবার সায়নের গল্পটা বলব (এটাও স্মৃতি ও শ্রুতি থেকে)। তোমার মনে আছে, আদিপাপ— এই ব্যাপারটা নিয়ে কেউ আমাকে কোনও সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। চেষ্টায় ছিল। আমিই বরং নেট সার্চ করব বলে তাদের বিরত করেছিলাম। কিন্তু আমারও কিছু করা হয়নি। ব্যাপারটা যে ভুলে গেছি তাও না। যে কারণেই হোক, ব্যাপারটা আর মগজে ইস্যু থাকেনি। এক দিন সায়ন ওভার ফোন জানতে চাইল আদিপাপ নিয়ে আমি আর ভেবেছি কি না। আমার উত্তর শুনে সে বলল, ‘তা হলে তুমি যদি চাও, কথা বলা যেতে পারে!’ আমার একটু মজা করতে ইচ্ছে হল, ‘একান্তে?’ সায়ন বলল, ‘অ্যাজ য়ু লাইক!’ আমি সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললাম, ‘এই ব্যাপারটা একান্তই আমার, মানে ফ্যামিলি ম্যাটার— একান্তে হওয়াই ভালো, আমার ভালো লাগছে ব্যাপারটা নিয়ে তুমি ভেবেছ বলে!’ সায়ন বলল, ‘পাপটাপ কী আছে আমি জানি না, তবে বাবা কৃষকদের খুব রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলছেন, এটা অনেকবার শুনেছি, কৃষক আমাদের অন্নদাতা! একজন শিক্ষক কি এক জন চিকিৎসকের সমমর্যাদা তাঁর প্রাপ্য। তো সেদিনের আলোচনার পর, ভাবলাম, মর্যাদা নেই কেন? পাপের কারণে? তোমার বলা কৃষকের আদিপাপ মনে পড়ল— আদিপাপ সার্চ করলাম! যাই হোক সাক্ষাতে কথা হবে! তুমি জানিয়ে দিও!’ আমি তখন অন্য ভাবনার টানে পড়েছি, অন্যমনস্ক হয়ে ‘আচ্ছা’ বললাম। আসলে আমার মাথার মধ্যে তখন ‘অন্নদাতা’ শব্দটা কাজ করতে শুরু করেছিল। এই শব্দটা সায়নের বাবা বলেছেন! মানে তিনিও কৃষকরাজের কথা ভাবেন! কয়েক মিনিট পরেই আমি সায়নকে কল করলাম, কল রিসিভ করতেই বললাম, ‘বিকেলে তোমার সময় হবে?’ সে জানাল হবে। আমি তাকে সময় ও জায়গা জানিয়ে দিলাম।

আরও পড়ুন: বনলতা সেন: ক্লান্ত ও বিষণ্ণ প্রেমিকের শোকগাথা

কেন জানি না আমার মধ্যে অদ্ভুত এক ভাব জেগেছিল। আমরা দু’জনই সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছি। স্কুলের ছেলে-মেয়েরা যেভাবে সাইকেল চালায়, আমার মনে হচ্ছিল, ভাবটা অনেকটা যেন সে রকম। স্কুল জীবনে সাইকেল চালিয়ে টিউশন পড়তে গেছি, কয়েকজন ক্লাসমেট থাকা সত্ত্বেও সব সময় মনে হয়েছে আমি একা। আমার নামের আদ্য অক্ষরের পাশে প্লাস চিহ্ন দিয়ে আর একটা আদ্য অক্ষর কোথাও লেখা হয়নি। এসব কেন ভাবছিলাম, জানি না। খেয়াল করলাম, সাইকেলের চাকা একই গতিতে গড়িয়ে যাচ্ছে। যেমন টিন-এজারদের যায়। আমার ইচ্ছে করছে সায়নের কাঁধে হাত রাখতে। যেমন দেখি, দেখেছি অন্যদের। এই ত্রিশে এসব কী আর মানায়! যেন একটা দীর্ঘশ্বাস জমেছিল, ঝেড়ে দিলাম। আর তখন সায়ন আমার দিকে তাকাল। যেন জিজ্ঞেস করল, আর কত দূর? আমি বললাম, ‘আর মিনিট খানেক।’ যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, তার একটা বর্ণনা দিই। গ্রাম্য রাস্তা। কংক্রিট ঢালাই। রাস্তার দু’পাশে গাছগাছালি সহ ঘরবাড়ি। উঠোনে ছাগল-গরু বাঁধা, কুকুর-বেড়াল, মুরগি চরছে, হাঁস দেখলাম না। পুকুরও নেই মনে হল। বসতি শেষ হয়েছে মাঠের শুরুতে। পাকা ধানের মাঠ। ডাইনে-বাঁয়ে— দিগন্ত বিস্তৃত নয় ঠিকই, কিন্তু বেশ বিস্তৃত— বাঁ-দিকে পাড়াটা না থাকলে দিগন্ত দেখা যেত। ডান দিকের বিস্তারটা কম। আর সামনে রেল লাইন পুবের দিগন্তকে অদৃশ্য করেছে।

আমি সাইকেল থেকে নেমে পড়লাম। সায়নও সাইকেল দাঁড় করাল। বললাম, ‘এটুক হেঁটে যাই।’ রেল লাইনের গা-ঘেঁষে একটা বটগাছ, ঝুরিডালপালায় তার গা-ছমছম বিস্তার দেখিয়ে বললাম, ‘আমরা ওখানে গিয়ে বসব!’

এক জোড়া সাইকেল। কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না। গাছের তলায় এসে আমি ইচ্ছে করে বেল বাজালাম। চার পাশটা দেখে সায়ন বলল, ‘এই শ্মশানে নিয়ে এলে কেন?’ কোনও উত্তর না দিয়ে বললাম, ‘বোসো!’

আমরা বসলাম। দেখলাম সাইকেল দুটো চলে যাচ্ছে। অল্প বয়সি ছেলেমেয়ে দু’টির দিকে সায়নকে চেয়ে থাকতে দেখে বললাম, ‘বুঝলে, কেন এখানে?’ সায়ন বোঝেনি ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। আমি বললাম, ‘বেশ কিছু দিন আগের কথা, তখন মানুষ কেন বাঁচে— এই জিজ্ঞাসায় আমি খুব বিব্রত ছিলাম, একে ওকে জিজ্ঞেস করছি, একদিন বাবাকে বললাম, বাবা গুছিয়ে কিছু বলতে পারলেন না, কেবল বললেন, ধানগাছের কাছ থেকে ব্যাপারটা জানা যেতে পারে। কিন্তু ধানগাছের সঙ্গে কথা বলা হয়নি। তো মানুষের বেঁচে থাকার কারণ জ্ঞান ছড়িয়ে থাকা এই মাঠ, উ-ই জোড়া সাইকেলের হেঁটে যাওয়া বা এই বসে থাকা জোড়া সাইকেল আর ওই পোড়াকাঠ, কাঠকয়লা-ছাই— এই প্রেক্ষাপটে আদিপাপ জানব আমি! একটা দারুণ থ্রিলিং ব্যাপার!’

‘এত কিছু ভেবে তুমি এখানে এসেছ?’

‘আগে ভাবিনি। ট্রেনে যাওয়ার পথে এই জায়গাটা তো প্রায়ই দেখি— এই জায়গাটা নির্বাচন করেছি রাতে, আমি তোমাকে সাইকেল নিয়ে বাস’টপেজে আসতে বলেছিলাম। তার পর অনেকগুলো অপশন ছিল। এই জায়গাটায় অনেক দিন ধরে আসার ইচ্ছা, এটা যে শ্মশান, তা কিন্তু জানতাম না! তুমি কি ভয় পাচ্ছ?’

‘না। আমি ভাবছি তোমার বাবার কথা। ধানগাছের কাছ থেকে জানা যেতে পারে মানুষ কেন বাঁচে!’ তার পর সে উপর দিকে তাকাল। বটগাছের শাখাবিন্যাস, ঝুরি নামিয়ে দেওয়া সম্ভবত এসব দেখে, বা কিছুই না দেখে সায়ন আমার দিকে একটু ঘুরে দেখল। বলল, ‘ধানগাছের কাছ থেকে আমাদের পাঠ নেওয়া উচিত!’ আমি সায় দিলাম, ‘সিওর!’ সায়ন বলল, ‘পৃথিবীর সব দেশের বেঁচে থাকা ব্যাপারটার সঙ্গে পাপ ধারণা জড়িয়ে আছে। কিন্তু সব চেয়ে ভালো গল্প ‘জ্ঞানবৃক্ষের ফল ভক্ষণ’— তুমি জানো, এটা আদি পাপ, অরিজিনাল সিন হিসাবে প্রচারিত। এখানে অবশ্য আমাদের অন্নদাতা নেই। কিন্তু এই পাপকে আমরা যদি বংশের পাপ হিসাবে দেখি, তা হলে কৃষকেও কিন্তু এই পাপ বর্তায়— তুমি নিশ্চয় কয়িন ও হেবলের কাহিনি জানো!’ আমি বললাম, ‘স্যরি! জানি না।’ তখন সায়ন যেন একটু হতাশ হল। আর কাহিনিটা শোনাল। গল্পটা এ রকম।

আরও পড়ুন: ধর্ম সমন্বয়

আদম-ইভের দুই ছেলে। কয়িন বড়। ছোট হেবল। হেবল মেষপালক আর কয়িন চাষি। ঈশ্বরের নামে প্রথম উৎসর্গ কালে কয়িনের নৈবেদ্য ঈশ্বর গ্রহণ করলেন না। হেবলের নৈবেদ্য গৃহীত হল। ঈশ্বরের প্রতি কয়িন তখন ভীষণ ক্রুদ্ধ। পরিণামে সে হেবলকে হত্যা করল।

‘সেই ভাই হত্যার পাপ কৃষক-জীবনে বর্তেছে।’ বলল সায়ন, সন্দেহ নেই। কিন্তু তোমাদের পরিবারের গল্পের সঙ্গে তা মেলানো যাবে না!’ যেন একটু দম নিতে সে চুপ থাকল বা হতে পারে আমার কাছ থেকে সে কোনও কথা চাইছে। আমি বললাম, ‘তা হলে এই গল্পটার মধ্যেই আমরা কৃষক সমাজের আদি পাপ খুঁজতে পারি!’

‘আদি পাপের আর-একটা উল্লেখ পেয়েছি। পুঁজিবাদের একেবারে সূচনাতে যে আদিম সঞ্চয়নের কথা বলা হয়, সেটাই নাকি ‘অরিজিনাল সিন’-এর আভাস কিন্তু তোমার গল্পে আছে।’ আমি মনে মনে সায়নকে ধন্যবাদ জানালাম। দৃষ্টিতে শোনার আগ্রহ জাগিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। ‘কিন্তু’ বলল সে, ‘আমার মনে হয়, এই পাপ কোনও এক ব্যক্তি বা পরিবার থেকে শুরু হয়েছে, ভাবনাটা ভুল!’ তার পর অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আদম-ইভের গল্পটা ঠিক ঠিক মনে আছে তোমার?’

‘গল্পটা শোনা। পড়িনি।’

তার পর সায়ন গল্পটা বলল। নতুন মনে হল। জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাওয়ার আগে আদম-ইভের লজ্জাবোধ ছিল না। এই বিষয়টা মনে রাখতে হবে বলে সায়ন বলল, ‘কিন্তু ইহুদি সৃষ্টিপুরাণে আর একটি গল্প আছে। তাঁর নিজের সাদৃশ্যে ঈশ্বর মাটি দিয়ে আদমকে সৃষ্টি করেন। এবং আদমের একাকিত্ব দূর করবার জন্য সেই একই মাটি থেকে একটি নারী সৃষ্টি হয়। তার নাম লিলিথ।’ নামটা শুনে আমি অস্ফূট ‘বাঃ!’ বলে উঠেছিলাম। একইসঙ্গে সায়ন বলে উঠল, ‘কী সুন্দর নাম! না?’ আমি সায় দিলে সে বলল, ‘অথচ লিলিথ মানে রাত্রি।’ আমি বলে উঠলাম, ‘তাতে কী! তুমি কী রাতের সৌন্দর্য দেখনি?’ সায়ন বলল, ‘যাই হোক, লিলিথের মনে হল, আদম তার ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চাইছে। একই মাটি থেকে তারা তৈরি হয়েছে। তারা দু’জনই সমান। আদমের সঙ্গে লিলিথের যে দ্বন্দ্ব তার প্রকাশ ঘটে মূলত সঙ্গমের সময়। আদম তাকে বোঝাতে চায় লিলিথের জায়গা, নীচে। লিলিথ তা মানতে অস্বীকার করে। এবং এক দিন সে স্বেচ্ছায় স্বর্গোদ্যান থেকে মাটির পৃথিবীতে নেমে আসে।’

‘তার পর?’

‘তার পর আদম তার পিতার কাছে নালিশ জানায়। লিলিথকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলে।

তাকে শাস্তির ভয়ও দেখানো হয়। তবে লিলিথ আর ফেরেনি। তখন ঈশ্বর ইভকে তৈরি করেন আদমের বক্ষ-অস্থি থেকে….

‘এই লিলিথই নাকি ইভকে প্ররোচিত করেছিল, জ্ঞানফল খাওয়ার জন্য।’

 ‘তুমি এই গল্প শোনালে কেন?’

‘পাপ খোঁজার জন্য— পাপ আমাদের সম্পর্কের মধ্যে আছে কি না ভাবনার জন্য। তুমি ভাবতে পারো, কয়িনের অর্ঘ্য ঈশ্বরের কাছে কেন গ্রহণীয় হয়নি! কেনই-বা হেবলকে খুন হতে হল?’

“তুমি কি, মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি, এই তত্ত্ব বিশ্বাস করো?”

‘না কিন্তু এই গল্পগুলোতে আমার আগ্রহ আছে।’

‘কী রকম?’

‘এর মধ্যে সমাজ-মন বুঝতে পারা যায়। যেমন ধরো, ওই আদম-ইভের গল্পে পাপের শাস্তি— ইভের শাস্তি গর্ভযন্ত্রণা, আদমের শাস্তি ফসল ফলাতে তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, মনে হয় না কি আজও নারী সেই অভিশাপ বহন করে চলেছে, আর পুরুষ, বিশেষ করে চাষি পুরুষ, সেই অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারেনি।’

‘তার মানে, আদম-ইভের গল্পের মধ্যে চাষির আদি পাপের ধারণাটা-কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে।’

”কিন্তু, এখানে। একটা কথা আছে, যদি তোমার গল্পের কনটেক্সট-ই ধরো। তা হলে দেখা যাবে, চাষকাজ নারী-পুরুষ উভয়ই করে, তা যদি হয়, নারী কেন একই পাপে দু’বার শাস্তি পাবে?”

আমাকে চুপ থাকতে দেখে সায়ন বলল, ‘তা ছাড়া এখন তো সকলেই জানে, চাষবাস উদ্ভাবন করেছে মেয়েরা। ফলে আদম বা কয়িনের ফসল ফলানোতে সাফল্য না পাওয়ার অভিশাপ— ব্যাপারটা কিন্তু যথেষ্ট চিন্তার বিষয়।’

‘কেন, চিন্তার বিষয় কেন?’

‘কারণ, আমরা অন্নদাতার মর্যাদা চাইছি—’

কথাটা আমার মনে শিহরণ জাগালো। আর সায়নকে কেমন অচেনা মনে হল। আমি বললাম, ‘মুক্তি চাইছ না?’

সায়ন বলল, ‘আমরা মানে— এই আমরার মধ্যে তুমিও আছ, তোমার কৃষকমুক্তির ধারণার সঙ্গে আমার কোনও বিরোধ নেই— কৃষকমুক্তি মানেই পেশাজীবী হিসাবে অন্নদাতার শিক্ষক-ডাক্তারদের সঙ্গে সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া; কী, এটা ভাবা যায় তো?’ আমি নীরবে মাথা কাত করলাম। সে বলল, ‘তা হলে, লক্ষ্য হল মর্যাদা প্রতিষ্ঠা!’

‘তা হলে কৃষকরাজের স্বপ্ন?’

আরও পড়ুন: লক্ষ্মীকথা

‘তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে— কৃষকমুক্তির ব্যাপারে সুব্রতদা বাজে একটা রিঅ্যাকশন দেখিয়েছিল!’ আমার মনে হল ব্যাপারটা আমি ভুলে গেছি। বললাম, ‘একটু ধরিয়ে দাও!’ সায়ন বলল, ‘সত্যদা তার ‘মহাকারণ’ তত্ত্ব থেকে কৃষকমুক্তির কথা বলেছিল, মনে আছে? তখন সুব্রতদা বলেছিল না, নকশালরা তো করতে গিয়েছিল! কথাটার মানে তারা পারেনি।’ আমার মনে পড়ল। বললাম, ‘হু, মনে পড়ছে কৃষকের মুক্তি ব্যাপারটা কৃষকের নিজস্ব, তাকেই আনতে হবে মুক্তি— এ রকম একটা কথা সত্যদাই বলেছিল!’

‘তার মানে বুঝতে পারছ? নকশালরা পারেনি। সুব্রতর কথার মধ্যে ওই মুক্তি-ব্যাপারটা কেউ করে দেবে, এটা অসম্ভব! নকশালরা তা প্রমাণ করেছে। আর সত্যদা কৃষকের মুক্তি তাঁর নিজস্ব ব্যাপার, এই শর্তে হয়তো বা মুক্তি সম্ভব— ভেবে কথাটা বলেছে। আর এ-ও ঠিক, আমরা যারা ভাবছি, কেউই-কিন্তু কর্মী নই! কৃষকরাজের স্বপ্ন— কীভাবে আমরা তার রূপকার হতে পারি?’ আমার মাথায় একটা প্রশ্ন এলো, এখন কারা রাজ্যপাট চলাচ্ছে? প্রশ্নটা সায়নের সামনে রাখলাম। সে বলল, এক কথায় বলা মুশকিল— এক সময় শিক্ষক ডাক্তার উকিল রাজনীতিতে আসতেন, তার পর রাজনীতি গেল মাসলম্যানদের হাতে, এখন। রাজ্যপাট চালাতে সেলেব আর এক্স পুলিশ-আমলারাও আসছে!’

সেলিব্রিটিরা মূলত আসছে সিনেমাজগৎ থেকে এ কথাটা মনে হতেই আমি বললাম, ‘এদেরই নেক্সাস রাজ্যপাট চালাচ্ছে, বলা যায়, বলো!’

‘‘হ্যাঁ, তা-ই তো! আর কেমন চলছে খবরের কাগজ আর সিনেমার গল্প থেকে তার তথ্য নেওয়া যেতে পারে। দেখা যাবে সিনেমার গল্পে  কোথাও ‘অন্নদাতা’ নেই।”

একটু ভেবে বললাম, ‘তার মানে কৃষকের মুক্তি ব্যাপারটা…’ কী বলব কথা জোগাল না, সায়ন যেন পাদপুরণ করল, ‘আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।’ কৃষকের মুক্তির ব্যাপারটা আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কথাটা বার কয়েক নিজের মনে আওড়ালাম। আকাশটাকে বেশ উজ্জ্বল মনে হল। সূর্য বোধহয় ডুবে গেছে। হঠাৎ খেয়াল হল বটগাছে পাখিদের কনসার্ট। অণিমার কথা মনে পড়ল। সুজন মিত্রের ‘আলো-অন্ধকার’-তত্ত্ব একটা ফ্ল্যাশ দিয়ে যেন ধানক্ষেতের দিকে আমার দৃষ্টিকে নিয়ে গেল। আমি উঠলাম। কয়েক পা এগোলে ধানক্ষেত।

আমি ধানগাছ দেখছিলাম। একটা শীষ তখন হাতের তালুতে রেখে দেখছি। সায়ন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি বললাম, ‘দ্যাখো।’ সায়ন প্রায় আমার গা ঘেঁষে বসল। পাখিদের কিচিরমিচির শান্ত হয়ে আসছে। আমি বললাম, ‘বুঝলে কিছু?’ সায়ন বলল, ‘দেখলাম শুধু আমার কণ্ঠ গাঢ়ত্বরে একটা শব্দ উগরে দিল, ‘কী’ সায়ন বলল, ‘দেখলাম তোমার করতল যেন ভূমি ভূমি একটা বীজ ধারণ করে আছে। কথার মধ্যে আমরা উঠে দাঁড়িয়েছি। সত্যিই আমার বাঁ-হাতের তালুতে একটা ধান। একটা ধান- দারুণ দেখার জিনিস হয়ে উঠল যেন দেখতে দেখতে সায়নকে আলপথে ধানক্ষেতের মধ্যে নেমে যেতে দেখলাম যেন আমাকে ইশারা করছে ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। আচমকা পরিবেশটা কেমন বদলে গেল, আশ্চর্য এক রঙিন আলোয় আকাশ-মেঘ, গাছগাছালি, চারপাশ যেন রাঙানো আমার মনে হল, সেই কোন কালের দিদার আত্মা যেন আমার মধ্যে জেগে উঠছে… তখন সায়ন বলল, ‘কী এত ভাবছ? অন্ধকার নামছে যে!’ (বুঝতে পারছ, আমি একটা বিভ্রমে পড়েছিলাম। বা তুমি বলতে পারো, ভালো ফসলের আকাঙ্ক্ষায় আমার মধ্যে সঙ্গমবাসনা জেগেছিল)।

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, চলো! তুমিও তো কিছু ভাবছিলে, মনে হল।’

‘হ্যাঁ, ভাবছিলাম— কত রকম মুক্তির কথাই না ভেবেছে মানুষ!’

আমরা হাঁটছি। সায়ন খেই ধরে বলল, ‘লেটেস্ট নারীমুক্তি আর কৃষক মুক্ত— তুমি বলছিলে না লিলিথের গল্প আমি কেন শোনালাম— পশ্চিমের নারীমুক্তি আন্দোলন লিলিথকে অন্যতম প্রেরণা হিসাবে দেখছে।’ কথাটা আমার মাথায় ক্লিক করল। বললাম, ‘আচ্ছা সায়নদা মুক্তির কথা ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধনের স্বরূপ বোঝার একটা দায় তো থাকে না?’ সায়ন দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘মানে?’ আমিও দাঁড়িয়ে গেছি, ‘আমার বা আমাদের বা কারোর বন্দিত্ব ঠিক কোথায় না-জানলে কীভাবে মুক্তির কর্মসূচি নেওয়া যাবে!’

‘ইয়েস! এই কথাটাই আমার বাবা বলেন। তুমি আমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারো।’

আরও পড়ুন: ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপি সব ঘরে ঘরে’: সঞ্চয়ই লক্ষ্মী

আমরা হাঁটছিলাম। তখনও অন্ধকার গাঢ় হয়নি। পাড়ার ভিতরে লাইটপোস্টের আলো দু-একটা জ্বালিয়ে দিয়েছে কেউ। আলো তত উজ্জ্বল হয়নি। হঠাৎ কোথা থেকে একটা মেয়ে আমাদের সামনে এসে বলল, ‘ম্যাম ভালো আছেন?’ আমি ‘হ্যাঁ’ বলে মেয়েটিকে চেনার চেষ্টা করে বললাম, ‘তোমাকে কিন্তু আমি চিনতে পারিনি!’ মেয়েটি বলল, ‘আপনি চিনবেন কী করে! আমাদের স্কুলে আপনি লেকচার দিয়েছিলেন। এই পথে যাওয়ার সময় আমি ঠিকই চিনেছি!’ এই ব্যাপারটা আমি একদমই ভাবিনি, এ রকম ঘটতে পারে ভাবা উচিত ছিল, ‘ওঃ! তাই নাকি! কী নাম তোমার?’ মেয়েটি তার নাম বলল। সে তাদের বাড়িতে যাওয়ার কথা বলল। বারবার সায়নের দিকে তাকাচ্ছিল। আমি বললাম, ‘এ আমার বন্ধু!’ মেয়েটি বলল, ‘সে আমি বুঝেছি!’ আমার কৌতূহল হল, ‘কী করে বুঝলে?’ মেয়েটির উত্তর এখনও আমার কানে বাজছে, ‘লাইন পারের এই বটতলায় যারা আসে তারা— তারা বন্ধুই হয়! প্রেম করতে আসে, আমরা জানি। কী মনে হচ্ছে তোমার, প্রেম জাগছে আমার মনে?

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • অজয় মজুমদার

    কয়িন ছিল ইভ ও আদমের জেষ্ঠপুত্র ৷ তার ভাইকে খুন করেছিল ৷ কারণ তার ভাই ঈশ্বরের কৃপা পেয়েছিল, কিন্তু সে ঈশ্বর কৃপা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল ৷তা থেকেই ঈশ্বর তার ওপর রুষ্ট হয়ে অভিশাপ দিয়েছিলো । এখনো সেই অভিশাপ কয়িনদের উপর চলছে । বর্তমানে ভারতবর্ষে শাসন চলছে মামল পাওয়ারের।চাষীদের যে আন্দোলন চলছে- মাসল পাওয়ার তা মানতে নারাজ ৷তারা তাদের মত দাদাগিরি চালিয়ে যাচ্ছে৷

    এই যে আদম ইভ এর ঘটনার সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের যে দীর্ঘ বিবর্তন তুলে এনেছেন লেখক, সেটা আমার খুব ভালো লেগেছে ৷ অনেক পুরনো কথা জানতে পারছি ৷ এবারকার লেখাটাও খুব সাবলীল ৷ উপন্যাসটি লেখক চালিয়ে যাবেন আর তার থেকে আমরাও সমৃদ্ধ হবে এই আশা রাখি ৷ মানব অধিকারের বিষয়ে লেখকের ধারনাটা খুবই স্বচ্ছ, যা লেখার পরোতে পরোতে ফুটে উঠেছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *