Latest News

Popular Posts

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৪)

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৪)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

যোনিজ পাপ কামসূত্র যৌনতার নিবৃত্তিপথ

‘যৌনতা নিবৃত্তি’— এটা একটা অসম্ভব ব্যাপার বলে মনে হয়েছে সে দিন। আমি সায়নের কথা না বলেই সোমাকে জানালাম ব্যাপারটা। সে কারণ জানতে চাইলে, ব্যাপারটা স্বপ্নে ঘটেছে বললাম, সোমা বলল, ‘কোয়াইট ন্যাচারাল খিদে-ঘুমের মতোই স্বাভাবিক। জানিস তো মানুষ স্বপ্নেও খায়!’

‘জানি। পেটখারাপ করে।’

‘আর এটায় মনখারাপ!’ বলে সোমা হাসল। তার পর কী ভেবে বলল, ‘দ্যাখ, আমরা ভাবনা শুরু করেছিলাম আমাদের দুর্দশা থেকে; আমার মনে হয়েছিল, তুই যোনিজ পাপ থেকে মুক্তির পথ খুঁজছিস, খুঁজছিসই তো! সন্দেহ নেই আর আমার মনে হয়েছে, তুই ঠিক পথেই হাঁটছিস, শ্রমণ-পথ! একটা স্বপ্ন দেখেই তোর মনে হল, মিশন ইম্পসিবল! এটা তো বাস্তবেও ঘটতে পারে।’ নিজের অজান্তেই যেন আমার ভ্রূ কুঁচকে গেল। একই সঙ্গে ‘যোনিজ পাপ’ কথাটা মাথার মধ্যে ভাসতে শুরু করেছে। ‘কিন্তু…’ বলল সোমা, ‘খেয়াল রাখতে হবে তা যেন ব্যভিচার না হয়!’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘যোনিজ পাপ বলতে তুই কী বোঝাতে চাইছিস?’

‘ভেরি সিম্পল। যোনিতে জন্ম যে পাপের।’

‘তার মানে নারী নরকের দ্বার— কথাটা তুই ঠিক বলে মনে করিস?”

‘তুই যে সিনেমার গল্পটা বলেছিলি, নিম্ফোম্যানিয়াক মেয়েটির যে পাপ, ধর্ষণের অপরাধে এখনও পর্যন্ত যাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, তাদের পাপ; এ ছাড়া ব্যভিচার, মেরিটাল রেপ, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যোনির ব্যবহার, এ সবই যোনিজ পাপ! ক্লিয়ার?’

আরও পড়ুন: কালীকথা

‘তা হলে যোনি ব্যবহার করে যাদের বাঁচতে হয়?’

‘তারা তো— আমি তোর কাছ থেকেই শিখেছি, যোনি পুরুষের সুখ উৎপাদনের যন্ত্র, তারা তো দেহ ভাড়া দেয় মাত্র!

‘কেবলমাত্র বেঁচে থাকার জন্য বলে যোনির এই ব্যবহার পাপ নয়। তাই তো?’

‘তোর কী হয়েছে বল তো!’

‘কনফিউজড লাগছে— মানবিক যৌনতার স্পেচ কোথায়?’

‘সুজন মিত্র কী বলছেন?’

কল্যাণের মতো সুজন মিত্রও আমার একটা নাম দিয়েছেন, দীপ্তি! তাঁর কথায়, হাবভাবে একটা ‘ডাক’ আছে বলে মনে হয়েছে।

‘মানে কোকিল যেমন ডাকে! যৌন আবেদন— আমি অনুভব করেছি। কিন্তু মানবিক যৌনতার ব্যাপারে তাঁর স্পষ্ট ধারণা নেই। একই উপলব্ধি তাঁর স্ত্রী, অণিমারও! সত্যি বলতে আকর্ষণ হারিয়েছি কিন্তু অণিমা এক কথায় দারুণ! মানবিক যৌনতা তাঁর কাছে এক আঁতেল ব্যাপার মনে হলেও মনে হল, ব্যাপারটাকে তিনি বাতিল করতে চান না বরং উপলব্ধিতে আনতে চান, আমার গাইড হতে তাঁর আপত্তি নেই। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বাৎস্যায়নের মতো আর একখানা কামসূত্র লেখার কথাও বলেছেন, যৌথভাবে।’ একটু চুপ থেকে বললাম, ‘বুঝতে পারছিস আমার অবস্থা? মানবিক যৌনতাকে বোঝা, আদি পাপ, যোনিজ পাপ, কামসূত্র-এর সঙ্গে মিশেছে কৃষক মুক্তি। এসবের মধ্য দিয়ে আমাকে পৌঁছতে হবে যৌনতা নিবৃত্তির জ্ঞানে।’ সোমা উৎসাহ দেখিয়ে বলল, ব্যাপারটা তো আর তোর একার নেই। তবে তুই-কিন্তু আমাদের শ্রমণ-ই থাকবি!’ (এই সমাজ-সংসারে শ্রমণের কাজ কী তুমি নিশ্চয়ই জানো, এক কথায় ‘আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটানো— ব্যাপারটা অস্পষ্ট হয়ে আছে, সোমা আমাকে যথেষ্ট পরিষ্কার করতে পারেনি। অথচ আমার কাছ থেকে সে ওই কাজই ডিমান্ড করছে। কেবল এ-ই নয়, তত্ত্বগতভাবে যতটুক জেনেছি শ্রমণকে যৌনতা বর্জন করতে হয়।) আমি আর একটু পরিষ্কার হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘শ্রমণদের কি কামসূত্র জানতে হয়?’ ঠোঁট কামড়ে সোমা না-ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, ‘এ ব্যাপারে কিছুই জানা নেই।’ আমি বললাম, ‘তুই বাৎস্যায়ন পড়েছিস?’ এবারও সে মাথা নাড়ল। আমি বললাম, ‘শ্রমণকে কামশাস্ত্র জানতে হয় কিনা, এটা আমাকে জানাবি। আর যদি পারিস কামসূত্র পড়বি।’ সোমা কিছু ভাবছিল। আমি প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য বললাম, ‘এবার অন্য কথায় যাই তোকে বলছিলাম না আমাদের পাশের থানায় প্রোগ্রামের কথা! সেটা খুবই ভালো হয়েছে। সুব্রত আমার সঙ্গে গিয়েছিল। আমার ভাষণে ছেলেদের নিয়ে সেমিনার করা যায় কি না, ভাবতে বলেছি। ব্যাপারটা প্রসঙ্গক্রমেই এসেছে, আমি একটু অবাকই হয়েছি বলতে পারিস।’

সোমা জানতে চাইল, ‘কীরকম?’

‘এবার শুরু করছিলাম সমাজ থেকে সমাজের একটা ডেফিনিশন রেখে তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মধ্যে আলোচ্য বিষয়টাকে তুলে ধরছিলাম… এক সময় নিজের অজান্তেই যেন নিজের কথা বলতে শুরু করলাম, আমি এমন একটা পরিবারে বড় হয়েছি, যেখানে যেন ধরেই নেওয়া হয়েছিল, আমি রেপ হতে পারি বা আরও সব দুষ্কর্ম আমার সঙ্গে হতে পারে, তা যাতে না হয়, তার জন্য আমাকে সাবধান হতে শিখিয়েছিল… সঙ্গে এটা উদাহরণ রেখে বলেছি, এক কথায় আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে মেয়েদের শেখানো হয়, টু বি কেয়ারফুল, যথেষ্ট সতর্ক থেকো যাতে ধর্ষিত না হতে হয়, নট টু গেট রেপড! আশ্চর্য!’

‘‘তার পর, সেই খবরটা, সেই যে, পরীক্ষা শেষের ‘আনন্দ’ উল্লেখ করে বললাম, সাত জন কিশোর! আমরা কি মৃত মেয়েটির পোশাক নিয়ে প্রশ্ন ভুলব? বা অত রাতে কেন সে একা বেরিয়েছিল, জিজ্ঞেস করব? না কি ওই সাত জনকে এই প্রশ্ন করা উচিত, তুমি যা করেছ তা তুমি কেন করলে? তোমাদের মনে তখন কী ঘটছিল? সম্ভবত আমাদের সমাজ এই প্রশ্ন করতে শেখেনি। কিন্তু আমরা ছেলেদের অন্তত এই শিক্ষা দিতে পারি, নট টু রেপ! পারি কি না তা আপনারা ভাবেন।’ ফেরার পথে সুব্রত অনেক ক্ষণ কোনও কথা বলেনি। একটু গম্ভীর দেখাচ্ছিল তাকে। আমি ওর পিঠে আলতো হাত রাখলাম। ওর কেঁপে ওঠা টের পেলাম। বাইকের গতি কমিয়ে জানতে চাইল আমি কিছু বলব কি না। আমি বললাম, ‘একটু দাঁড়াও!’ তখন পড়ন্ত বিকেল। সুব্রত বাইক দাঁড় করাল। আমি নেমে দাঁড়ালাম। হেলমেট খুলে হাতে নিতেই এক ঠান্ডা অনুভূতি আমার মাথাটাকে জাপটে ধরল। সুব্রত হেলমেট খুলে ভিউফাইভারে আটকে দিল। কিন্তু বাইক থেকে নামল না। আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তার চোখ স্থির। আমি বললাম, ‘ভুল করেছি কিছু?’

আরও পড়ুন: হানাবাড়ির কথা

ভ্রূ কুঁচকে সে বলল, ‘হঠাৎ এ কথা?”

‘তুমি তো কোনও কথাই বলছিলে না।’

‘ভাবছিলাম। এক সময় মনে হচ্ছিল, তুমি কী এক কষ্ট চেপে চেপে কথা বলছ! ভাবছি ক্লাবের পক্ষ থেকেই সেমিনারটা করাব।’

‘থ্যাঙ্কু!’ আমার চোখে তখন কী দৃষ্টি এসেছিল জানি না, আমি ওকে মুগ্ধ দেখছিলাম। আমি বুঝতে চাইছিলাম, সুব্রত কীভাবে আমার যন্ত্রণাকে বুঝতে পারছিল! আমি নিজেকে ফিরে দেখার চেষ্টা করলাম।

এসব বলে আমি খেয়াল করলাম সোমা আমার দিকে অদ্ভুত তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, ‘কী হল?’ সোমা আদুরে ভঙ্গিতে বলল, ‘ভীষণ ইচ্ছে করছে!’ আমি ন্যাকামি করে বললাম, ‘কী?’

(আমি আর লিখছি না। সোমার উত্তরটা তুমি কল্পনা করে নিতে পারো। কিন্তু একদম ঈর্ষা করবে না কিন্তু!)

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৩)

ছবি ইন্টারনেট

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *