সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৫)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

মুক্তিপথে মহাপুরুষের কোলাহল

নিশ্চয় তোমার গল্প শোনার ইচ্ছা আর থাকছে না। তবু শোনো! দাদার বিয়ে উপলক্ষ্যে আর-একটা ঘটনা ঘটাব, প্ল্যান ছকেছি। সেই আমার জন্মদিনের মতো— আলোচনা সভা হবে। বলবেন সুজন মিত্র, অণিমা মিত্র, আমার হেড স্যার আর সঞ্জয় বিশ্বাস, সঞ্জয়কাকু— এঁর সঙ্গে তোমার পরিচয় হয়নি। বুঝতেই পারছ আমি সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছি। এই সম্পর্কে জড়ানোর গল্পটা তা হলে শোনো! একদিন একই নাম-নেই নম্বর থেকে তিনটে মিসকল দেখে কল ব্যাক করি। আর সঞ্জয় বিশ্বাসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি জানান, আমি তাঁকে না চিনলেও তাঁর কাছে আমি বিনতা বিশেষভাবে পরিচিত। কৌতূহল প্রকাশ করলে বললেন, ‘সায়ন তো তোমার বন্ধু!’ আমার বুকটা তখন কেন কেঁপে উঠেছিল জানি না, অস্বাভাবিক গলায় বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, তো!’ তিনি বললেন, ‘ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আমি সায়নের বাবা— ওর মুখেই তোমার কথা শুনতে শুনতে, বলতে পারো, আমিও তোমার অনুরাগী হয়ে আছি।’ কী এক আবেগে আমি বলে উঠলাম, ‘আপনাকে প্রণাম!’ আমি তখন প্রণাম-মুদ্রায় ঝুঁকে পড়েছি। আমি শুনলাম, ‘তোমার মস্তকে আমার কল্যাণ-কর!’ বললাম, ‘অনুভব করছি!’ শুনলাম, ‘কবে আসছ তুমি? যদি অসুবিধা থাকে আমিও যেতে পারি। আমার কোনও অসুবিধা নেই জানিয়ে কবে যাচ্ছি দিনক্ষণ বলে দিলাম। তার পর সায়নের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ওদের বাড়ির পথে আমার সাইকেল নির্দিষ্ট দিনে বেড়িয়ে পড়ল। সায়ন বলেছিল, ‘রাস্তার পাশেই— যে বাড়িতে পাঁচিল নেই সেটাই আমাদের বাড়ি।’ তার নির্দেশমতো তাদের পাড়ার রাস্তায় ঢুকে পাঁচিল না থাকা বাড়িটা সহজে পেয়ে গেলাম। উঠোনে সাইকেল থেকে নেমে কয়েক মুহূর্তে চার পাশটা দেখে নিলাম। একটা ছোট দোতলা বাড়ি। দৃষ্টিনন্দন। আমি আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। বেশ প্রশস্ত উঠোন। সিঁড়ির দু’পাশে দু’টো পাতাবাহার। আর এক পাশ থেকে উঠে গেছে মাধবীলতা। ফুল দুলছে হাওয়ায়। বেল বাজাতেই একটা কুকুর আমাকে স্বাগত জানাল, নীরবে, লেজ নেড়ে। পরক্ষণেই সঞ্জয়কাকু, তিনি আমার নাম ধরে বললেন ‘এসো এসো মা!’ আমার ভিতরে তখন ‘এসো মা লক্ষ্মী বোসো ঘরে’ বেজে উঠল। একইসঙ্গে শুনলাম, সম্ভবত কাকিমাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, ‘দেখ! কে এসেছে!’ আমি ততক্ষণে কাকুকে প্রণাম করে বারান্দায় উঠে এসেছি। দেখলাম, এক মহিলা উপরে ওঠার সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়ালেন, তাঁর পায়ের কাছে দু’টো বিড়াল। একটা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কাকু বললেন, ‘যে মেয়েটির আসার কথা ছিল, সে, সায়নের বন্ধু। বিনতা! ইনি সায়নের মা, পরমা!’ আমি তাঁকে প্রণাম দিলাম কাকু কাকিমাকে বললেন, ‘আমরা আপাতত উপরে বসছি!’

আমরা উপরে উঠে এলাম। উত্তর-পুবে দু’টো ঘর। উত্তর ঘরের পুব দেওয়াল দক্ষিণে প্রসারিত। এল-প্যাটার্নে তৈরি হয়েছে— উত্তর-ঘরের সামনে বেশ চওড়া বারান্দা। আমরা পুবের ঘরে ঢুকলাম।

কাকু বললেন, ‘এটা আমার পড়ার ঘর। গেস্ট রুম।’ একটা মাত্র বইয়ে আলমারি দেওয়াল জুড়ে মহাপুরুষদের ছবি (নামগুলো শুনলে তুমি নিশ্চয়ই চমকে যাবে, কয়েকজনের ছবি আমার অচেনা ছিল; পরে জেনে নিয়েছি যেমন ঋষি মনু, হেগেল, কনফুসিয়াস, জীবনানন্দ, চারু মজুমদার আর নর্মান বেথুন; আর অন্যরা হলেন বাবা সাহেব আর যুদ্ধ, কৃষ্ণ চৈতন্য, কবীর, লালন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও) আর বাণী, আর একটামাত্র স্থাপত্যের ছবি হজরত মহম্মদকে মনে রেখে এটা পরে জেনেছি। আমাকে বসতে বললেন। আমি বই দেখছি। ধর্মগ্রন্থ। অর্থনীতি রাজনীতি বিজ্ঞান দর্শন মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়, মানবাধিকার গণতন্ত্র সুশাসন! বই দু’টো ডিসপ্লে করে রাখা। গণতন্ত্র-প্রসঙ্গে আমার সেই ছেলেটির কথা মনে পড়ল (যার সঙ্গে আমি এক কল্প গণতান্ত্রিক সংসার যাপন করেছিলাম, মনে পড়ছে?) আর আমি যেন সেই সময়ের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, আমাকে ফিরিয়ে আনল কাকুর ডাক, ‘বিনতা!’ আমি ফিরে তাকালাম, ‘বসবে তো!’ আমি বসলাম। মহাপুরুষের ছবিগুলি আরও একবার দেখতে দেখতে ভাবনা এলো, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাকু, পৃথিবীতে কি একজনও মহামানবীর জন্ম হয়নি কখনও?’ তিনি বললেন, ‘আমার জানা নেই মা! প্রশ্নটা আমারও মনে হয়, মানুষের সমাজ-সংসার কেবলপুরুষ-চিন্তায় বয়ে চলছে।’ কাকু, আমার তাই মনে হয়, মনে হয় ঘরে-বাইরে অশান্তির এটাই কারণ।’

‘এ রকম মনে হওয়া— নাঃ! ভাবিনি।’

আমি বললাম, ‘আমার মনে হয় কাকু, একবগ্‌গা পুরুষ-চিন্তা নারী-চিন্তাকে চেপে দিয়েছে, তা না হলে নারীর এই দুর্দশা হয় না।’

‘ঠিকই বলেছ। তা যদি না হয় এখানে অন্তত দু-এক জন নারী থাকতেন। কিন্তু চিন্তাটা একবগ্‌গা বলে মনে হয় না কী বলব… মোনোক্রম বলা যেতে পারে, এক রঙের ওপর সেই রঙেরই বিভিন্ন শেড দিলে যেমন হয়, এ যেন তেমন— এক পুরুষের চিন্তার উপর অন্য পুরুষের চিন্তার ছাপ পড়েছে।’

‘তবু কাকু এও-কিন্তু সত‍্য― মেয়েরাও পুরুষ-চিন্তায় আবিষ্ট। অবশ‍্য ব্যতিক্রম আছে।’ ছবিগুলি আবারও দেখে আমি বললাম, ‘অন্তত ক্ষণার ছবিটা এখানে থাকতে পারত।’

আমার মুখের দিকে অদ্ভুত তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘ভালো বললে তো! থাকা উচিত ছিল। কী আশ্চর্য! কখনও মনে হয়নি।’

‘খনার ছবি কি পাওয়া যায়?’

‘জানি না। তবে কল্পিত ছবি নিশ্চয় পাওয়া যাবে। এরপর যখন আসবে, দেখবে খনার ছবি জ্বলজ্বল করছে।’ তিনি আমাকে ধন্যবাদ জানালেন। কিন্তু পরক্ষণেই যেন অনুশোচনা থেকে বললেন, ‘খনা তো আমাদের অন্নদাতার হয়ে কথা বলেছেন, তাঁর কথা আমি ভুললাম কী করে!’ আমি সান্ত্বনার স্বরে বললাম, ‘আপনি ভোলেননি কাকু, ওই যে বললেন, কখনও মনে হয়নি, সেটাই; আর তার কারণ বোধহয় এই যে, আমরা কৃষিকাজ থেকে সরে এসেছি।’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে সঞ্জয়কাকু বললেন, ‘তা হবে, না হলে তাঁর একটা বচন অন্তত এখানে থাকত— ওই সবুজ রঙের লেখাটা দ্যাখো!’ দেখলাম, ‘তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসো’— র‍্যাবাই হিলেল। আমি দৃষ্টি ফেরাতেই তিনি বললেন, ‘তখন কাশ্মীর মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠেছে, ছররাগুলিতে শিশুর মৃত্যু, অন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরগুলো খুব মনখারাপ করে দিত। কেন, এখন বলতে পারব না, আমার ইচ্ছে হয়েছিল ইহুদি-ইতিহাস জানার, তখন ওই কথাটা আমি জানতে পারি। যিশুর জন্মের কমবেশি একশো বছর আগে কথাটা বলেছিলেন ওই র‍্যাবাই হিলেল, একজন ইহুদি সাধু! দার্শনিক। অদ্ভুত এক আলো ছড়িয়েছিল কথাটা। আর আমি কথাটা ফ্রেমবন্দি করে রেখেছি। তুমি ঠিকই বলেছ মা, খনার সুন্দর কথাগুলো তো আর আমাদের চর্চার মধ্যে নেই। হিলেল-এর কথা চর্চা করলে সামরিক ব্যয় হয়তো জিরো হয়ে যেত। মানুষকে সন্ত্রাসবাদের শিকার হতে হত না।’ আমার মুখে কোনও কথা জোগাল না। কাকুই প্রসঙ্গ বদলে বললেন, ‘সায়ন বলছিল, তুমি নারীমুক্তি, কৃষক মুক্তির কথা ভাবছ…’

‘হ্যাঁ। কিন্তু কাকু, সায়ন আর কী বলেছে, জানি না। তবে আপনার ফোন পেয়ে আমি বুঝেছি, কিছু একটা বাড়িয়ে বলা হয়েছে।’

‘কিচ্ছু বাড়িয়ে বলেনি। তোমাদের পরিবারে গল্পটা আমি আগেই শুনেছিলাম। সেদিন কথায় কথায় তোমার কৃষকমুক্তির কথা বলে সায়ন জিজ্ঞেস করেছিল, তোমাকে ও আসতে বলবে কি না। জবাবে আমি তোমার ফোন নম্বরটা দিতে বলেছিলাম, এই!’

‘যাই হোক, আমার প্রতি আগ্রহ জন্মেছে, এটাই বড় কথা। যদি প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারি— এটাই ভয়।’

অন্যমনস্ক হওয়ার ফাঁকে তিনি বললেন, ‘আমার কোনও প্রত্যাশা নেই মা, নিশ্চিন্তে থাকতে পারো!’

আমি বললাম, ‘সায়ন কি বলেছে আমি বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি?’

কাকু সবিস্ময়ে বললেন, ‘না তো!’

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৩)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৪)

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *