সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৬)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য জানে তোমার সামাজিক মন

‘হ্যাঁ, কাকু। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটা সমস্যায় পড়েছিলাম। সমস্যাটা হল বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য— কী? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, মানুষ কেন বাঁচে? সমস্যাটা যে মিটেছে তা নয়। তবে নানা জনের কথায় এটা মনে হয়েছে, কৃষক ও নারীর বেঁচে থাকা খুব কষ্টের। এর থেকে ওই মুক্তির ধারণা এসে থাকতে পারে, ঠিক জানি না।’

সঞ্জয়কাকু কী ভেবে বললেন, ‘যেভাবেই আসুক, তোমার উপলব্ধি যথার্থ। আমি কেবল অন্নদাতার কথা ভেবেছি। তুমি জন্মদাত্রীর কথাও ভাবছ। কিন্তু মা, তুমি কি নির্বিশেষ নারীদের কথা ভাবছ? মানে ফুটপাথ থেকে ‘রাজপ্রাসাদ’…?’

আমি বললাম, ‘আমি ঠিক বলতে পারব না। উচ্চবর্গের নারীদের কষ্টকথা আমার জানা নেই। তবে বলতে পারেন যে মেয়েদের বেঁচে থাকা কেবল যোনি নির্ভর, যোনি যাদের বেঁচে থাকারও থ্রেট— সার্বিক এই প্রেক্ষাপটে যারা বেঁচে আছে, তাদের কথাই ভাবছি, বলতে পারেন।’ মনে হল আমার কথাগুলো অনুধাবন করতে সঞ্জয়কাকুর অনেকটা এনার্জি লস হয়েছে, শব্দ করে নিশ্বাস ফেললেন। আমি বললাম, ‘কাকু, আমাকে বলুন, ভীষণ কষ্টের মধ্যে থেকেও মানুষ কেন বেঁচে থাকতে চায়? এবং শেষপর্যন্ত অনেককেই মৃত্যু বেছে নিতে হয়। যদি কেবল চাষিদের কথাই ধরি— কেন?’ আমার উচ্চারণে বোধহয় যন্ত্রণা ফুটে উঠেছিল। কাকু বললেন, ‘গভীর যে যন্ত্রণাবোধ থেকে তোমার প্রশ্ন উঠে এসেছে, তার উত্তর দিতে আমি অক্ষম, মা! তবু বলি, কষ্টের মধ্যেও যে মানুষকে আমরা বেঁচে থাকতে দেখি আসলে কিন্তু তা এক জৈব সত্তার বেঁচে থাকা, জীব দেহের নিয়মে বাঁচেন তিনি। একটা বেওয়ারিশ কুকুর আর একজন দুস্থ মানুষের বেঁচে থাকা পর্যবেক্ষণ করে আমার এ-ই মনে হয়েছে।” (আমার মনে পড়ল বাবার কথা। বলো তো কোন্ কথাটা! আমি আর বলছি না। দেখে নিও!) আমি বললাম, ‘আমার বাবার সঙ্গে আপনার অসাধারণ মিল!’

আরও পড়ুন: জীবননামা

‘কীরকম?’

‘বাবা মনে করেন, নিজেকে জানতে হলে কুকুরকে স্টাডি করা উচিত।’

কী একটা বিড় বিড় করে বললেন, ‘খুব গভীর কথা। এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন— কেবল চাষি কেন, যেকোনও দুস্থ মানুষ, যিনি তখনও মনে বেঁচে আছেন, আর তাঁর মন বলছে, কোথাও কোনও আশা নেই কোনও অপেক্ষা নেই, এক মৃত্যু ছাড়া আরও হয়তো ক্যালকুলেশন থাকে— নিস্তার পাওয়া, দেহকে বেঁচে থাকার নিয়ম থেকে মুক্তি দেওয়া। বিভিন্ন লেখাপত্র পড়ে এ-রকম ধারণা তৈরি হয়েছে আমার।’ আশ্চর্য! কথাগুলো থেকে কোনও প্রশ্ন তৈরি হল না তো কেবল মিচেল হেসম্যানের কথা মনে পড়ল। বললাম, ‘স্বেচ্ছামৃত্যুকে, মনে হয় কোনও সাধারণ নিয়মে ফেলা যায় না।’ তিনি বললেন, ‘তা বলতে পারো তবে যে নিয়মেই হোক, শেষ পর্যন্ত তা হল মনের বেঁচে থাকার ইচ্ছে আর না থাকা বা নষ্ট হয়ে যাওয়া, মনে হয়।’

আমি তার কথায় সায় দিয়ে হেসম্যানের কথা বললাম। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘তাই! জানি না তো! ইন্টারেস্টিং। তা হলে বুঝতে পারছ, মানুষ কেন বাঁচে, বলাটা মুশকিল।’ আমারও তা-ই মনে হল। পরক্ষণেই ভাবনা এলো, সত্যিই কি জীবনের কোনও মানে নেই? আমার মাথার মধ্যে কী যেন কী হল। জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত যদি অর্থহীন মনে হয় তা হলে— আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাকু, আমি কেন এখানে এলাম? তুমিই বা কেন ডাকলে আমাকে?’ এই আসা এই কথা বলা এসবের কোনও মানে নেই। ভাবলাম বটে কথাটা কিন্তু প্রকাশ পেল না। তবু এই ভাবনার রেশ ধরেই যেন  তিনি বললেন, ‘তোমার মন, আমার মন কাজ করে চলেছে, তা মূল্যবোধ ছাড়া ঘটছে বলে তো মনে হয় না। তুমি কি মনে করো?’ আমি বললাম, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘সেই কাজের সূত্রেই আমি তোমাকে ডেকেছি, তুমি এসেছ। আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম, তুমি উদ্‌গ্রীব ছিলে কখন পৌঁছবে। তাই না। এই যে কথা বলছি, সময়ের কাঁটা সরে যাচ্ছে— একে কেন বলব অর্থহীন, মানে নেই?’ আমি যেন তাঁকে কাউন্টার করবার জন্যই বললাম, ‘কেন বলব না?’

‘বলব না এ কারণে যে,’ বললেন তিনি, ‘আমি জানি, এ সবই ঘটছে মনে বা মন ঘটাচ্ছে মন কখনোই অর্থ-নিরপেক্ষ কাজ করতে পারে না— আমার বিশ্বাস।’

আমি যেন একটু পুলকিত হয়ে বলে উঠলাম, ‘তার মানে মন ইচ্ছা-নিরপেক্ষ কাজ করতে পারেনা!’

তিনিও উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘এক্সাটলি! অনৈচ্ছিক কাজ দেহের। কিন্তু মা, মনে রাখতে হবে এই মন কিন্তু সামাজিক মন— তা না হলে মনের কাজকর্ম বোঝা মুশকিল।’ ‘সামাজিক মন’ কথাটা মাথার মধ্যে ফিক্সড হয়ে গেল। মন জানা-বোঝার ব্যাপারে কয়েকটা কথা মনে পড়ল আর ফিরে এলো পুরনো এক প্রশ্ন, মনকে বোঝে কে, মন? (এই প্রশ্নের কথা তোমাকে কখনও বলা হয়নি)। এর আগে ‘সামাজিক মন’ কথাটা শুনেছি বলে মনে পড়ল না। আমি বললাম, ‘কাকু, মন-শব্দটা শুনলে বা ভাবলেই কি আপনি তাকে সামাজিক মন বুঝতে বলছেন?’

‘একদম। যখনই মন-শব্দটা আমরা বলব বা শুনব, খেয়াল রাখতে হবে যে, আমরা সামাজিক মনের কথাই বলছি!’ তবু আমার ঝাপসা লাগছিল। সে কথা বললে তিনি মন সম্পর্কে আমার ধারণা কী, জানতে চাইলেন। আমি বললাম, মনকে ষষ্ট ইন্দ্রিয় বলে জেনেছি।’

‘মানে আপাতদৃষ্টিতে পাঁচজ্ঞান-ইন্দ্রিয়ের স্টোররুম, অন্তরেন্দ্রিয়― এই যে মন, যা কিছু সে সঞ্চয় করছে তা দিচ্ছে ওই পঞ্চ ইন্দ্ৰিয়। আনছে কোথা থেকে? সমাজ থেকে— সমাজ থেকে পাওয়া জ্ঞানরাশিতে ভরে উঠছে মন আর সেখানেই প্রোসেস হচ্ছে বলে তার পরিচয় সামাজিক’— এক কথায় মন সমাজ-নিরপেক্ষ নয়। বোঝা গেল ?’

‘একটু খটকা লাগছে, মন-বোঝার ব্যাপারটা— কথায় বলেনা, মেয়েদের মন দেবতারও বুঝতে পারে না— ব্যাপারটা তা হলে কী?’

‘ধরো, আমি, মানে আমার মন, যদি কোনও বিষয়ে তোমার মন বুঝতে চায়, তা হলে সেই বিষয় সম্বন্ধে তোমার ধারণা আছে কি না, সেটা আগে আমাকে বুঝতে হবে, যদি থাকে, সেটা কী, না জানলে তোমার মন জানার চেষ্টা আমার সফল হবে না। আবার সেই বিষয়ে তোমার ধারণা নেই জেনেও যদি তোমার মন জানতে যাই, ব্যর্থ হব। তার পর আমি যদি সায়নকে বলি যে, অমুক ব্যাপারে তোর বন্ধুর মন ঠিক বোঝা গেল না। তখন সায়নও আমার কথা ঠিক ভেবে এই বিষয়ে আর তোমার মন জানার চেষ্টা না-ও করতে পারে, মনে হয়। তা যদি হয়, এই যে তুমি মেয়েটির মন দু’জন পুরুষের কাছে ওই বিষয় সাপেক্ষে না-জানা থেকে গেল— এ রকম অনেক না-জানা, মূলত দাম্পত্য ও তথাকথিত প্রেমের সম্পর্কের পরিসর থেকে মনে হয় ওই কথাটা প্রচার পেয়ে এসেছে।’ দাম্পত্য-শব্দটা থেকে বেরিয়ে পড়লেন অণিমা মিত্র, তাঁর শরীরে  সুজন মিত্র কী  যেন কী খোঁজেন। আমি বললাম, ‘তা হলে কাকু, কথাটা একটু র-ভাবে বললে বোধ হয় সত্যটা প্রকাশ পায় যথাযথ।’ ভ্রূ-কুঁচকে বললেন, ‘কীরকম?’ আমি বললাম, ‘দাম্পত্য সম্পর্কের পরিসর না বলে যৌন সম্পর্কের পরিসর বললে ব্যাপারটা যেমন ব্যাপ্তি পায় তেমনই এই প্রশ্ন তোলা যায়, যে সম্পর্কে পুরুষের ভূমিকাই প্রধান, সেখানে পুরুষ নারীর মন বোঝে না কেন?’ সঞ্জয় কাকুকে গম্ভীর দেখাচ্ছে, হয়তো সংকোচ অথবা আত্মমগ্নতা— আড়ালের ভাণ হতে পারে এটা। আমি তাঁকে স্বাভাবিক করতে চেয়ে বললাম, ‘আচ্ছা ধরুন, কোনও বিষয়ে আমার ধারণা আছে— এটা জানলেন, সেই ধারণা থেকে কীভাবে আমাকে বুঝবেন?’ সম্ভবত তিনি স্বাভাবিকই ছিলেন। আমার দেখাটা ভুল ছিল। ‘এই দ্যাখো!’ বলে তিনি বললেন, ‘আসল কথাটাই তো ভুলে গেছি— তোমার ধারণাটা যে স্থান-কালে বা সামাজিক পরিবেশে গড়ে উঠেছে, সেটা জানার চেষ্টা করব আর আমাদের কথা শুরু হলে সেখানে নিজেকে দাঁড় করাব, আমরা কথা বলব; আমি তখন তোমার সামাজিক পরিবেশকে বুঝে কথা বলার চেষ্টা করব, বুঝতে চাইব তোমার ইন্‌টেনশন, আর আমিও মেলে ধরব আমারটা। তুমি যদি আমাকে জানতে চাও, একই পদ্ধতি।’ আমার তখন ‘পদ্ধতি ও প্রজ্ঞা’র কথা মনে পড়ল। একটা ভাবনা আসতে চাইছে, তাকে দাঁড় করিয়ে বললাম, ‘তা হলে কাকু, কারও মন বোঝা মানে তার ইন্‌টেনশন বুঝতে পারা, একথা ভাবতে পারি?’

আরও পড়ুন: সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের নিরিখে বিরলতমদের একজন হাসান আজিজুল হক

‘অবশ্যই তুমি তা ভাবতে পারো, তবে ব্যাপারটা কিন্তু বিষয় সাপেক্ষ। বিষয় নিরপেক্ষভাবে মনে কী ঘটছে, তা-কিন্তু বলা মুশকিল; সেক্ষেত্রে বলা ভালো নারী-পুরুষ উভয়েরই মন জানা-বোঝা তথাকথিত দেবতাদের কাছেও মুশকিল।’

এই সময় টি-ট্রে হস্তে সায়নের প্রবেশ (ব্যাপারটা কেন জানি না আমার নাটকীয় মনে হয়েছিল)। আমি বলে উঠলাম, ‘এতক্ষণ কোথায় ছিলে!’ ট্রে নামিয়ে রেখে সায়ন বলল, ‘আমার বাবার একজন সম্মানীয় অতিথি আসার কথা ছিল, বাবা আমাকে বাজারে পাঠালেন!’ বসতে বসতে সায়ন বলল, ‘এতটা পথ তুমি সাইকেলে না আসলেই পারতে।’

‘হ্যাঁ, তা পারতাম কিন্তু আমার টাইম ম্যানেজমেন্ট এটা পারতে দিল না।’ কাকু জানতে চাইলেন, ‘কীরকম?’ বললাম, ‘মানে অটো-টোটোর পিছনে সময় দিতে চাইনি। অন্তত চল্লিশ মিনিট আর্লি অ্যারাইভ করেছি। মানে, ভাবো! চল্লিশ মিনিট আমি তোমাকে বেশি পেলাম! সায়ন থাকলে আরও ভালো হত।’ চায়ে চুমুক দিতে দিতে আরও কিছু হালকা চালের কথা হল। এক সময় সায়ন জানতে চাইল এতক্ষণ আমাদের কথার বিষয় কী ছিল। আমি বললাম, ‘মহামানব থেকে শুরু হয়েছিল আর তুমি আসার মুহূর্তে আমরা মন-এ থেমেছি।’ সায়ন বলল, ‘তার মানে মন-ই প্রধান। এটা মেনে নিয়ে আমরা কথা বলব?’

সঞ্জয়কাকু বললেন, ‘এ রকম অভিপ্রায় নিয়ে আমরা শুরু করিনি। কথায় কথায় মন বিষয় হয়েছে, এইমাত্র। আমি বললাম, ‘কিন্তু আমার মাথাটা একদম ক্লিয়ার হয়ে গেছে অন্তত মন বিষয়ে, মন-ই মনকে জানে।’ সায়ন বলল, ‘মনে হচ্ছে মিস করে ফেলেছি।’

‘নো প্রবলেম। কাকু, আমি একটু টিচারি করি।’ সঞ্জয়কাকু যেন অনুমতি দিলেন। আমি বললাম, ‘ধরো তুমি কোনও বিষয়ে আমার মন জানতে চাও, তোমার প্রথম কাজ হবে, কেন তুমি আমাকে জানতে চাইছ, মানে তোমার ইন্টারেস্ট, ইন্‌টেনশন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা করে নেওয়া। কি-কাকু! তাই তো?’ কাকুর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ যেন বলল, ক্যারিঅন। তাঁকে মান্য করেই বললাম, ‘দেন, তোমাকে জানতে হবে, তোমার জানার বিষয়টি আমার জানা আছে কিনা। যদি জানা হয় আমার জানার অভিপ্রায় কী ছিল, কোন ইন্টারেস্ট থেকে আমি জেনেছিলাম— এ সব তোমার জানার বিষয় হবে।’ আমার চোখ কথা বলল, বুঝলে? সঞ্জয়কাকু বললেন, ‘ব্যাপারটা হল, যখনই তুই জানলি বিষয়টি বিনতার জানা তখনই কথা শুরু হবে, নিজের অভিপ্রায় মেলে ধরতে ধরতে বিনতার অভিপ্রায় তোকে বুঝতে হবে।’ মনে পড়ল একটা বিষয় আমি বলতে ভুলে গেছি। কাকুর কথার খেই ধরে বললাম, ‘তোমাকে কিন্তু বুঝতে হবে আমার সামাজিক পরিবেশের উপর তুমি দাঁড়িয়ে আছ। কেন বলো তো!’

সায়ন বলল, ‘জানি না।’ কাকু বললেন, ‘কেন-না, বিনতার মনে জানাটা এসেছে তার সমাজ থেকে।’ সায়ন সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র বলে আমি তাকে বললাম, “সমাজের যে কোনও সংজ্ঞা থেকে তুমি মানুষ পেয়ে যাবে, মানে বলতে চাইছি, মানুষই আমাদের জ্ঞান দেয় এবং প্রকৃতি।’ সায়ন তার বাবার উদ্দেশে বলল, ‘মন নিয়ে বোধ হয় আমরা আগে কখনও কথা বলিনি!’ কাকু বললেন, ‘তাই হবে— মন হয়তো ইস্যু হয়নি। যাই হোক, মূল কথাটা হল, কোনও বিষয়ে মানুষের মন বুঝতে হলে, মনে হয়, তার সমাজকে জানতে হবে।’ বলে তিনি তাঁর দৃষ্টি সম্মুখ দেওয়ালে রাখলেন। যেন মহাপুরুষদের সমর্থন চাইলেন। আর একই সময়ে মেঝের দিকে ঝুঁকে থাকা সায়নের মাথাটা সোজা হল। এবং হালকা চালে সে বলল, ‘ওঃ! মন জানায় এত ঝামেলা! কী দরকার!’ আমিও হালকাভাবে বললাম, ‘মন নিয়েই তো যত ঝামেলা সায়নদা!” তখন কাকু যেন মনে করিয়ে দিলেন, ‘দেহ নিয়েও কিন্তু আমাদের কম ঝামেলায় পড়তে হয় না। (সায়নকে উদ্দেশ্য করে) বিনতা আমাকে আরও স্বচ্ছ করে নিয়েছে মানুষ দেহ-মনে বাঁচে— এটা আমরা কমবেশি জানি কিন্তু (আমাকে লক্ষ করে) তোমার সঙ্গে কথাবার্তার মধ্যে আমার মন নতুন একটা কথা দিল, বলতে পারো এই মাত্র।’ সঞ্জয়কাকুর মুখে আশ্চর্য আলো খেলা করছে। সায়ন অপেক্ষা করছে কথাটা শোনার জন্য। আমার যেন আর ত্বর সইছিল না, জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী কথা?’

কাকু বললেন ‘কথাটা কীভাবে এলো, সেটা আগে বলি— মানুষ দেহ-মনে বাঁচে, সত্য; তা হলে দেহ বাঁচে কীসে আর মনকেই-বা বাঁচায় কে? এই প্রশ্ন পেয়ে মনই উত্তর দিল, দেহ বাঁচে খাদ্যে আর মন বাঁচে জ্ঞানে। কথাটা হল, মানুষকে বাঁচায় অন্নজ্ঞান।’

বহুমাত্রিক এক ব্যঞ্জনায় অন্নজ্ঞান-শব্দটা আমার মাথার মধ্যে ঢুকে পড়ল। আমি শুনছি, ‘জ্ঞানই প্রধান ভেবে এই সব মানুষেরা মূলত মনে বেঁচে ছিলেন!’ বলে তিনি ডান হাতের তর্জনী তুলে হাতখানা বাঁ-দিক থেকে ডান দিকে ঘোরালেন। সায়ন বলল, ‘মানে এঁদের বেঁচে থাকা মন-প্রধান ছিল?’ সায়ন যেন তার বাবাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। একটু সময় লাগল তাঁর উত্তর দিতে, ‘ভালোই বলেছিস। থ্যট্ প্রোভোকিং! এ রকম ভাবিনি। এই ভাবনাটা কেন এল তোর?’ সায়ন বলল, ‘ভাবনাটা তো তুমিই দিয়েছ!’ যেন কাকুর হয়ে আমি জানতে চাইলাম, ‘কী রকম?’ সায়ন অন্নদাতা শব্দটা ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘অন্নদাতা— কথাটা তোমার মুখেই শুনেছি; অধিকাংশ মহামানব কৃষকের কথা ভেবেছেন বলে তো মনে হয় না।’ আমি বলে উঠলাম, ‘তার মানে, এঁদের দেহে বাঁচাটা ছিল অপ্রধান!’ সায় দিয়ে সায়ন বলল, ‘এঁদের দেহ-মনের বেঁচে থাকায় যদি ভারসাম্য থাকত তা হলে তাঁদের কল্যাণভাবনায় কৃষক ‘ব্রহ্ম’ তুল্য মর্যাদার অধিকারী হতেন, কারণ, এঁদের আগে পুরুষ-মনই তো অন্নকে ব্রহ্ম-আখ্যা দিয়েছে, অন্নব্রহ্ম। আর এই সূত্রে নারী পেতেন যথার্থ কল্যাণময়ীর মর্যাদা; কারণ কৃষি মেয়েদের আবিষ্কার!’

আরও পড়ুন: নিউজিল্যান্ডের কিছু সাহিত্য সাময়িকী ও লিটল ম্যাগাজিন

আমার মনে হল ‘কৃষকমুক্তি’ বা ‘অন্নদাতার মর্যাদা’ যা-ই আলোচনার বিষয় হোক না কেন, অলক্ষ্যে যেন তার সূত্রপাত ঘটে গেল; এমনকি, কৃষি-কৃষক আলোচনায় নারীর ভূমিকা যে আলোচনার বাইরে থাকবে না, এই আভাসও পাওয়া গেল। যেন আমার থ‍্যট্ রিডিং করেই সঞ্জয়কাকু বললেন, ‘তা হলে মুক্তি বা মর্যাদা, যা-ই বলি না কেন, ব্যাপারটা তো বেশ মুশকিল মনে হচ্ছে!’ সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’ কাকু বললেন, ‘আমি যে জানতাম না, তা নয়, তবে সেটা ছিল একটা ‘স্টেটমেন্ট’ মাত্র— তার বাইরে ভাবনা আসেনি, আমাদের বোধহয় জানতে হবে, মেয়েরা কেন কৃষিতে নেই তার সঙ্গে কৃষকের বন্দিত্ব’র কোনও সম্পর্ক আছে কিনা।’ সায়ন বলল, ‘বাবা, মেয়েরা-কিন্তু কৃষিতে আছেই কিন্তু তাদের কর্তৃত্ব নেই, এটাই বিষয়— মনে রাখতে হবে।’ আমি বললাম, ‘মানে পুরুষের আধিপত্য!’

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৩)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৪)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৫)

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *