Latest News

Popular Posts

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৭)

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৭)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

রান্নাঘরের মন কেউ বোঝে না

এই সময় সায়নের মোবাইল বেজে উঠল। রিসিভ করে বলল, ‘হ্যাঁ, মা। স্যরি! আসছি।’ ফোন রেখে বলল, ‘বাবা, তুমি-কিন্তু তোমার পরিবারেই তোমার নীতি প্রয়োগ করতে পারছ না। সমস্ত আলোচনা থেকে মাকে দূরে রেখেছ মা তোমার মন কী করে জানবে আর তুমিই-বা জানবে কী করে মায়ের মন!’ সঞ্জয়কাকু যেন ভাবলেশহীন। সায়ন উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে বলল, ‘বিনতা, তুমি যেন এটা ভেবো না, তোমার সামনে বাবাকে বকলাম! প্রায় একই কথা, কতবার যে বলেছি, সময়টা খেয়াল রাখো!’ আমি বললাম, ‘না, ভাবছি না। প্রায় সব সংসারের সমস্যা এটা— রান্নাঘরের মন কেউ বুঝতে চায় না।’

রান্নাঘরের মন— কথাটা কি আগে শুনেছ? সঞ্জয়কাকু সম্ভবত শোনেননি। কথাটা তাঁর খুব পছন্দ হয়েছে। খাবার টেবিলে তিনি কথাটা জানালেন। কিছু কথাও হল। রান্নাবাটি খেলা থেকে একটি মেয়ের শ্বশুরবাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে পড়ার গল্পটা বেশ মনে ধরল। কাকিমা প্রতিক্রিয়া জানালেন, বাপের বাড়ি যে একটি মেয়ের নিজের না, এটা তো তার পুতুলখেলার বয়স থেকেই জানানো হয় আর বিয়ের পর সে যেখানে যায়, সেটা শ্বশুরবাড়ি— এটা আমার শ্বশুরবাড়ি, গোপালপুরে বাপের বাড়ি― আমার বাড়ি কোথায়?’ কেমন যেন হাহাকারের মতো শোনাল কথাটা।

আরও পড়ুন: সাক্ষাৎকার: চিত্রপরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য

‘নেই।’ আমাদের খাওয়া থেমে গেছিল, সেটা লক্ষ করে কাকিমা বললেন, ‘কী হল, খাও! স্যরি! আসলে এ-সব কথা তোমাকে বললাম, মা! তুমি তো কোনও বাড়ির বউ হবে। একটা রান্নাঘর পাবে।’ আশ্চর্য! কথাটার বিরোধিতা করতে পারলাম না আমি; এমনকী, কাকু বা সায়ন কেউই আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালও না। আমি খাওয়া শুরু করে কাকিমার অভিমান বোঝার চেষ্টা করলাম। কুকুর-বিড়াল সহ এ-বাড়ির কাউকে আমার অসুখী মনে হয়নি। কতরকমের পাখি, কাকলি! কাকিমা বললেন, ‘একেবারে চুপ হয়ে গেলে যে সবাই!’ কাকু বললেন, ‘ভাবছি।’ সায়ন বলল, ‘বাবা, তুমি বোধহয় মায়ের মন বুঝতে পারোনি।’ আমি বললাম, ‘সায়নদা, এটাই আমাদের সমস্যা।’ কাকু যোগ করলেন, ‘বিশেষ করে দাম্পত্যের সমস্যা থেকে এর শুরু, মনে হয়; আইডেন্টিটি ক্র্যাইসিস।’ বলে তিনি এক গাল ভাত মুখে তুললেন, চিবানো আর ভাবনা যেন একসঙ্গে চলছে। ভাত গিলে বললেন, ‘এটা নিয়ে আমরা পরে কথা বলব। পরমা তুমিও থাকবে।’

পরে আমাদের যেসব কথা হয়েছিল, তার ভিত্তিতে আমার মনে হয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠানে এ-রকম আলোচনার প্রচলন হওয়া উচিত। এবং এই ঘটনাটি আমি ঘটাতে পারি। আমি দেখতে পেলাম সঞ্জয়কাকু বক্তব্য রাখছেন। তিনি অঘোষিতভাবে প্রধান বক্তা। বক্তব্যে আবহসংগীত রাখার রীতি আছে কি না, জানা নেই, তবে এখানে সানাই বাজবে মৃদু।

দু’জন জ্ঞানী মানুষের সান্নিধ্য আমাকে ঋদ্ধ করেছে। কিন্তু তাঁদের স্ত্রীদের বিক্ষোভ-অনুযোগ আমার মধ্যে সংশয় জাগিয়ে তুলেছে। তাঁদের জ্ঞান অর্জনে কোথাও ফাঁক থেকে গেছে বলে মনে হয়। আমার বাবা তাঁর মতো করে অবশ্যই জ্ঞানী (তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, নিজেকে জানতে হলে কুকুর-পর্যবেক্ষণ করতে হবে আর বেঁচে থাকা বুঝতে হলে যেতে হবে ধানগাছের কাছে!) কিন্তু মায়ের জীবনকে তিনি বুঝতে পারেননি। এ-রকম ভাবনা নিয়ে সেদিন সাইকেল না চালিয়ে পথ হাঁটছিলাম। সঙ্গে সায়ন ছিল। তখন বিকেল। সায়ন আমাকে এগিয়ে দিতে এসেছিল। সে বলে উঠল, ‘বুঝতে পারছি না, রান্নাঘরের মন কথাটায় মা এত রিঅ্যাক্ট করলেন কেন!’ বুঝতে পারলাম সায়নও ভাবনার মধ্যে ছিল। আমার মনে হল সায়ন চাইছে, ব্যাপারটা নিয়ে আমি একটু ভাবি। বললাম, ‘কথাটার মধ্যে মনে হয় তুচ্ছজ্ঞান করার মতো কিছু আছে। যদিও কথাটা আমি ভেবেচিন্তে বলিনি। রান্নাঘরে একঘেয়েমি কাজ করতে করতে একটি মেয়ের যে মন তৈরি হয়, সত্যিই কেউ তার খোঁজ রাখে না, আমার মাকে তো দেখেছি। এ রকম একটা অভিজ্ঞতা থেকে কথাটা বলেছি।’

‘তোমার ভাবনায় ভুল নেই। এটাও তো ঠিক ‘রান্নাঘর’-কে আমরা মর্যাদা দিইনি!’ আক্ষরিক, ভাবগত দুই অর্থেই কথাটা ঠিক মনে হতেই বললাম, ‘রান্নাঘর আর কৃষিক্ষেত্র— মর্যাদার প্রশ্নে একই রকম, তাই না?’ কথাটা শুনে সায়ন আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকল এবং আমাদের চলন থমকে গেল যে, আমার মনে হল যে-তোমাকে উদ্দেশ্য করে আমার এই লেখা, সায়ন-ই সেই তুমি! অবশ্য এর আগেও এ রকম মনে হয়েছে, মনে হয়েছে সোমা-ই তুমি! আজ কেন এমন মনে হল বুঝতে পারলাম না। সায়ন বলল, ‘কেন মেয়েরা রান্নাঘরে বন্দি আর কৃষকের বন্দিত্ব কোথায়― কেন এবং কোথায়-এর মধ্যে নিশ্চয় কোনও সম্পর্ক আছে— বাবা যখন এই বিষয় দু’টি নিয়ে ভাবতে হবে বলেছিলেন তখন থেকেই ভাবছি…’ সাইড ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে বলল, ‘ভাবনার একটা উৎস বলতে পারো, এই বই; কিন্তু ওই কেন-কোথায়-এর সম্পর্ক ঠিক কোথায়, বুঝতে পারছি না— পড়ে দেখো!’ বইটা নিয়ে দেখলাম, পরিবার ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি লেখক ফ্রেডরিক এঙ্গেলস— নামটা আমার চেনা। বইটা বামপন্থী রাজনীতিকদের পড়তে হয়। এও জানা। সায়ন ছাত্ররাজনীতি থেকে জনগণের রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছে। হয়তো এসব কারণে আমার মনে হল সায়ন তার রাজনীতির দিকে আমাকে টানতে চাইছে। আশ্চর্য! সায়ন যেন তার বাবার-ই মতো আমার মন পড়তে পারল, নইলে বলবে কেন, ‘আমরা যতই চিন্তা করি না কেন যতক্ষণ না তা রাজনীতি-চিন্তার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারছে, তার কোনও ব্যবহারিক মূল্য পাওয়া যাবে না।’ আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। সায়ন খেই ধরে রেখেছিল, বলল, ‘রাজনীতিকদের দৈন্যও বলতে পারো এইখানে— দলের বাইরে ব্যক্তিচিন্তাকে মোটেই তাঁরা পড়তে চান না।’ আমি কীভাবে সাড়া দেব বুঝতে না পেরে বললাম, ‘এই বিষয়ে আমার কোনও ধারণা নেই সায়নদা।’ সায়ন কী ভেবে বলল, ‘সে আমি জানি। কিন্তু ধারণা দরকার।’ আমি একটু অবাকই হলাম, যে ধারণা না রেখেই তিরিশটা বছর কেটে গেল, তা এখন দরকার। রাজনীতি করিয়েরা কি এভাবেই মানুষকে দলে টানে? সায়নের প্রতি যে অনুরাগ একটু আগে অনুভবে এসেছিল, তা যেন মিলিয়ে গেল। খানিক বাঁকাভাবে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার রাজনীতির ধারণা দরকার— এটা তোমার মনে হচ্ছে কেন?’

আরও পড়ুন: হারিয়ে যাওয়া গবেষণাগারের খোঁজে

‘কারণ, তুমি কৃষকরাজ-এর কথা ভাবছ। কৃষক মুক্তি— ব্যাপারটা রাজনীতি ছাড়া কী করে সম্ভব? তোমার মামারা কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন– তুমি নারীমুক্তির কথাও ভাবছ— এ সবই তো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।’ একটু চুপ থেকে বলল, ‘নিজের অজান্তেই তুমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়েও গেছ বিনতা, রাজনীতিই করছ।’

‘কীরকম?’

‘স্কুলে স্কুলে তুমি লেকচার দিচ্ছ। এর অর্থ সরকারের নীতিকে তুমি কার্যকর করছ। অর্থাৎ রাজার নীতিতে তোমার অংশ রয়েছে। এই হল জড়িয়ে পড়া। আর ছেলেদের জন্য তুমি যে প্রস্তাব রেখেছ, এটা তোমার রাজনীতি— আসলে তা মেয়েদের পক্ষে! তাই না?’ ব্যাপারটা অনুধাবন করতে গিয়েই যেন প্রকাশ পেল আমার নীরবতা আর থমকে দাঁড়িয়ে সায়ন বলল, ‘ঠিক আছে! আর যাচ্ছিনা।’ শেষপর্যন্ত আমি অনুশোচনা টের পেলাম। বললাম, ‘আচ্ছা। এ বিষয়ে আমরা পরে কথা বলব। থ্যাঙ্কস!’

‘ফর হোয়াট?’

আমি ততক্ষণে সাইকেলে বসেছি। একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। কোথা থেকে রবীন্দ্র গানের এক টুকরো ভেসে উঠল আমার মনে, বললাম, ‘এই লভিনু সঙ্গ তব…’ আমি যেন তার প্রতিক্রিয়া দেখব না বলেই প্যাডেলে চাপ দিলাম!

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৩)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৪)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৫)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৬)

ছবি ইন্টারনেট

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *