সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

গণতন্ত্র  না-থাকা  সময়  মানে  ভয়

এবার বোধহয় আর-একটু স্পষ্ট হল!

অন্তত আমার মনে হচ্ছে, অস্পষ্ট এক পথরেখা দেখতে পাচ্ছি। যেন খুলে যাচ্ছে এক অ্যাভেনিউ। আমি বুঝতে পারছি, মাথাটা বেশ হালকা লাগছে।

আচ্ছা ধরো, যদি এমন হত, সেই ছেলেটি হারিয়ে যায়নি, তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে, আমরা সংসার করছি… আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, আমাদের সংসার যাপনের আদর্শ গণতন্ত্র। কিন্তু আমার মনে শান্তি নেই। সম্ভবত আমার স্বামীও অশান্তিতে ভুগছেন। আমরা দু’জনই কষ্ট পাই। আমাদের কথা বলতে ভালো লাগে না। কারণ, আমরা কোনও সমাধানে পৌঁছতে পারি না। শেষপর্যন্ত আমরা যেন পরস্পরকে আক্রমণ করি, যেমন, আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি কি রেপ করতে পারো? তার উত্তরে আমার স্বামী হয়তো বললেন, তোমার প্রেমিকের সহযোগিতায় তুমি কি আমাকে খুন করতে পারবে? এই সব নেগেটিভ ঘটনাগুলো আমাদের সংসারে ঢুকে পড়েছে। শ্বশুর-শাশুড়ি-দেওর-ননদ— সবার সঙ্গে মানিয়ে চলার দায় যেন সবই আমার— আমরা অন্তত একটা বিষয়ে সহমত— মানুষের জীবনে গণতন্ত্র নেই! মানে, নেই বলেই বধূনির্যাতন, যৌন অত্যাচার, স্বামী কিংবা প্রেমিক হত্যা… এ-সব মেনে নিয়ে বাঁচতে হবে এমনকী আমাদের জীবনে তা ঘটতে পারে… এর থেকে পরিত্রাণ কীভাবে সম্ভব?

আমার স্বামী বললেন, নেইকে আছে করা।

মানে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার? সে তো হয়েই চলেছে! বিপন্ন গণতন্ত্র। পরিবর্তন চাই! দেওয়াললিখন এখনও পড়া যাচ্ছে কোথাও কোথাও।

এবং এটাই চলবে যত দিন না আমরা তাকে রক্ষা করতে শিখি!

এ কথা তো সেই কলেজ জীবন থেকে শুনে আসছি…

কেউ আমাদের শিখিয়েছিল, শুনেছি, বলেছি…

ইন প্র্যাক্টিস— আমরা কেউই গণতান্ত্রিক মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি। না সংসারে, না সমাজে… আমরা বড় অসহিষ্ণু!

এবং এক দিন এ রকম কোনও এক না-পারাকে আমরা একই সঙ্গে খুব বড় হাঁ করে বলে উঠলাম, হো-ও-য়া-আই?

আসলে আমরা একে অন্যকে অভিযুক্ত করলাম। অন্তত আমার এ-রকমই মনে হল। আমি শান্তভাবে বললাম, তার মানে প্রশ্নটা হল, তুমি-আমি কেন ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক মানুষ হয়ে উঠতে পারলাম না!

হয়তো সমাজতান্ত্রিকভাবে আমরা ভাবতে পারিনি বলে!

আমি ভাবলাম, তা হতে পারে। আমাকে চুপ থাকতে দেখে সে বলল, আমাদের বোধহয় কারণটা খোঁজা উচিত হবে!

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)

এবং গল্পটা যদি শেষপর্যন্ত এ-রকম হত যে, এক ওয়ান ফাইন মর্নিং ‘আমি’ মেয়েটি মানে বিনতা ঘুমন্ত স্বামীর শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর একটি চিরকুট মেলে ধরে পড়ল, ‘আমাকে খুঁজো না, আমি এক খোঁজে বেরিয়েছি’— চিরকুটটা মাথার কাছে রাখল। তারপর সন্তর্পণে দরজা খুলল… আর-একবারও পিছন ফিরে না তাকিয়ে সে ঘর ছাড়ল… # কেমন হত তা হলে? প্রিয় বন্ধু! এটা নিয়ে তুমি মাথা ঘামাতে না-ই পারো কারণ ছেলেটির সঙ্গে আমার এমনটি ঘটার মতো সম্পর্ক তৈরিই হয়নি। তা ছাড়া দাম্পত্য অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও আমি অলীক কল্পনা করেছি, এমনও মনে হতে পারে তোমার। তা যদি হয়, আমি মনে করিয়ে দেব, অপ্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে-কিন্তু কল্পনা করা সম্ভব। আরও একটা বিষয়ে তোমার আপত্তি থাকতে পারে, গণতন্ত্র বিষয়ে— দু’টো মানুষ, নারী ও পুরুষ, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে গণতন্ত্র! এটা একটা বাজে ধরনের আঁতলামি হয়ে গেল না! তোমার এ-রকমও মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি করিয়েদের মুখে এ রকম কথা-কিন্তু আমি শুনেছি। শুনতে শুনতে এ রকম গল্প তৈরি হয়েছে; এটা না-ই শোনাতে পারতাম। কেন শোনালাম বলো তো! যাতে তুমি আমার মনের গলিঘুঁজিতে ঢুকতে পারো। তাতে আমার সমস্যা বুঝতে যেমন সুবিধে হবে তেমনই আমার কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়াকে তুমি সহজেই জাস্টিফাই করতে পারবে। যাই হোক, আমার অপ্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার গল্পটা এবার তোমাকে শোনাই!

নীহারিকা নামে আমার এক ক্লাসমেট ছিল, এর কথা তো আগেই বলেছি— গল্পটা তার।

একদিন, সে অবশ্য বছর দু’য়েক আগের কথা— আমাদের প্ল্যাটফর্মে একটা বিষণ্ণ বউকে বেঞ্চে বসে থাকতে দেখে মনে হল চেনা। সঙ্গের বাচ্চাটি তাকে ভীষণ জ্বালাতন করছিল। আমি বউটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে সে ম্লান হাসল। ওই হাসি দেখেই মনে পড়ল তার নাম। ‘এ কী চেহারা হয়েছে তোর?’ এবার তার হাসিতে ফুটে উঠল বেদনা।

ক্লাস টেনে পড়ার সময় তার বিয়ে হয়। এক বছরের মাথায় এক মেয়ের মা। মেয়ের বয়স ছ’মাস হতে না হতেই আবার কনসিভ, অ্যাবোরশন… তিন বছরের মাথায় আবার কনসিভ… আবার মেয়ে… এই সময়ে সুতিকা রোগ ধরেল তাকে… শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মনে করে সে কখনও ছেলে দিতে পারবে না।

‘আমি প্রতিবাদ করি’ বলল নীহারিকা ‘জীবনবিজ্ঞান বইতে পড়েছি, ছেলে হবে না মেয়ে হবে তা নির্ভর করে স্বামী কী ধরনের বীজ দেবে তার উপর।’

এ তত্ত্ব তার স্বামী যে জানত না, তা নয়। কিন্তু কেন যে তার উপর নীরব অত্যাচার শুরু হল! স্বামীও তাকে অবহেলা করছে, বুঝতে পারত।

‘কিন্তু কখনও কখনও… ধর্ষণের খবর দেখিস তো? আমি তাদের যন্ত্রণা বুঝতে পারি, আমি কাঁদি, খবর হওয়া মেয়েটির জন্য, না কি আমারই যন্ত্রণা অনুভব ক’রে, আমি তো কখনও খবর হব না— ঠিক বুঝি না!’ একটু চুপ থেকে সে বলল, ‘রোগ আর অনাদর— আমাকে এই রূপ দিয়েছে! কোথায় যাব এই রূপ নিয়ে? তবু বেরিয়ে পড়েছি…’ (বুঝতে পারছ, জরা-ব্যাধির ক্রম বদলে যাচ্ছে— ব্যাধি ডেকে আনছে জরাকে, জরা হাত ধরে নিয়ে যাবে মৃত্যুর দিকে— তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে বুদ্ধের গল্পে সিদ্ধার্থ পুরুষের জরা ব্যাধি ও মৃত্যু দেখেছিলেন, এমনকী সন্ন্যাসও নিয়ে থাকে পুরুষ— নারী সংসর্গ ত্যাগ করা তার প্রথম কৃত্য! মানে জরা ব্যাধি মৃত্যুর কারণ নারী— তা হলে নীহারিকা এমন ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে সংসার থেকে বেরিয়ে এল কেন?)।

‘কোথায় যাবি?’

‘জানি না। বাচ্চাটাকে রেখে আসতে চেয়েছিলাম… দুধের বাচ্চা— দেখি— বাপের বাড়িতে কী অভ্যর্থনা পাই!’ বাচ্চাটার মুখে দুধ গুঁজে দিয়ে বলল, ‘ঘর-সংসার করতেই চেয়েছি… মনে হয় বেঁচে থাকার কোনও মানে নেই… এই দ্যাখ, আমি কেবল আমার কথাই বলে গেলাম—’

সে আমার মুখের দিকে তাকাল। আমার সিঁথি লক্ষ করল, ‘বিয়ের কথা ভাবিসনি?’ আমার মুখে না শুনে সে আর কোনও কথা বলল না। হঠাৎ আমার খেয়াল হল, নীহারিকা বাপের বাড়ি যাবে বলল, তা হলে এখানে বসে কেন? কৌতূহল প্রকাশ করতেই সে বলল, ‘ফিরে যাব কি না ভাবছি… মাথা কাজ করছে না। এর বাবাকে দু’টো কথা লিখে এসেছি, খোঁজ করো না। একটার দায় আমি নিয়ে যাচ্ছি।— কোথায় যাব?’ যেন আমাকেই জিজ্ঞেস করল, আমি তাকে বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা বলেছিলাম… বোঝা গেল?

মানে যদি আমি নীহারিকা হতাম! বা হই!

পুরুষের  ছোঁয়ায়  প্রকৃতির  প্রকৃতি  লুটায়

সেই থেকে নীহারিকা বোধহয় আমার মাথার মধ্যে এক সতর্ক-প্রতিমা হয়ে ছিল। আমার বিয়ের প্রসঙ্গ যে দিন প্রথম উঠেছিল, আমাকে দেখতে আসবে এ রকম কথাবার্তা চলছে তখন… তখনই মনে পড়েছিল নীহারিকার ভাঙাচোরা শ্রীহীন মুখখানা আর আমি অস্বাভাবিকভাবে বলেছিলাম, ‘না! আমাকে কনে-দেখানোর কোনও উদ্যোগ তোমরা নিও না!’ আর আমাকে বলেছিলাম, আমার মুখ অমন ভেঙে যাক, আমি চাই না!

তার পর অনেক কথা— আমি যাতে মত দিই তার জন্য মা-পিসি, দিদা-ঠাকুমাদের কত চেষ্টা! তাঁদের কথার নির্যাস, পরের ঘরে না গেলে, মানে পুরুষ না নিলে (কথাটা দিদার) নাকি মেয়েজন্ম সার্থক হয় না! প্রায় সকলকেই বলেছি, সার্থকতার যে রূপ আমি দেখেছি— তোমাদের মধ্যেও! আমি এ ঘরেই থাকব! দিদাকে বলেছি, পুরুষ আমি নেব না!

যাই হোক, এ সবের মধ্যেই কবে একদিন স্টুডেন্ট আন্দোলনের সেই ছেলেটির কথা ভেবেছি, যদি আমার প্রেম মুকুলেই ঝরে না যেত… তা হলে একটা সংসার থেকে বেরিয়ে যেতে পারতাম! অথবা, যারা আমাকে অ্যাপ্রোচ করেছিল তাদের একজনকে যদি অ্যাকসেপ্ট করতাম, তা হলেও যে ভালো কিছু হত, তেমন একটা গল্পও আমার জানা নেই, তা হলেও সংসার ত্যাগ করা হয়তো সহজ হত।

এ বার তুমি বলতে পারো যা ঘটেনি, তা নিয়ে এত ভাবনার তো কোনও মানে নেই! একশো ভাগ সত্যি মেনে তবু আমি বলব, এ রকম কিছু, মানে সংসার থেকে বেরিয়ে যাওয়া— আমি ঘটাতে চাই! কিন্তু আমার তো সংসারই নেই! তবু আমি সংসার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছি! কেন? 

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

জানি না। তবে এভাবে দৃঢ় প্রত্যয়ে আমি কখনও বলিনি যে, আমি যা ঘটাতে চাই, তা ঘটানো সম্ভব! একটা ঘটনা অবশ্য ঘটিয়েছি!

কিন্তু আমি কী ঘটাতে পারি?

বুঝতে পারছ, এই ভাবনা— আমাকে পেয়ে বসেছে। কিন্তু বুঝতে পারছি অনেক কিছু বিষয়ে আমার ধারণা অস্পষ্ট। যেমন, আমার বেঁচে থাকার যাবতীয় উপকরণ এখনও বাবার দেওয়া টাকা থেকে আসে। আমি সমস্তটাই বাবার খরচের খাতায়। মানে লায়েবল্‌। দায়! কন্যাদায় কথাটার অন্তঃসারে তবে কি এ-ই লায়েবেল্‌টি? তার জন্য বিয়ে! বিয়ে মানে কি দায়-হস্তান্তর? বিয়ের জাঁকজমকের আড়ালে এই সত্যটা চাপা পড়ে যায়— এ রকম মনে হল আমার— এটা নিশ্চয়ই সত্য নয়! তা হলে এই যে জগৎ-সংসার চলছে, তা চলতে পারত না! তবে সত্যটা কী? কোথায় খুঁজব তাকে? কিংবা ধরুন, আমি যে পথে নামব, লক্ষ্য কী হবে?

এক এক বার আমার মনে হয়, ওই ঘটনাটা না ঘটালেই বা যদি আম্রপালির মতো ঘটনা ঘটত, তা হলে একটা পুরনো খাঁতে জীবনটাকে বইয়ে দেওয়া যেত! মাথাটা এত জটিল হত না। এক এক দিন এ রকমও মনে হয়, মাথাটা ঠিকমতো কাজ করছে না। আবার করছেও নইলে এ রকম মনে হওয়ার মুহূর্তে নীহারিকার কথা মনে পড়বে কেন? সেও তো এ রকমই একটা কথা বলেছিল!

এই যে আমি ভাবনা লিখছি, কত কথা! বাস্তবে, মানে নিত্য দিনযাপনে আমার কথার প্রয়োজন-কিন্তু কমে গেছে। খুব কম। মা, বাবা, দাদা; অন্য আত্মীয়-স্বজন— সবার ক্ষেত্রে কথার প্রতিক্রিয়াও কম কথায় মিটে যায়। যদিও বডিল্যাঙ্গুয়েজ প্রকট হয়েছে। বাড়ি থেকে খুব একটা বের হই না। ইচ্ছে করে না। ঘর গোছাই, ঘর ঝাঁট দিই। কখনও দোকানেও বসি। এর বাইরে আমার পাঠ্যবই নতুন করে পড়ছি। ইতিহাস, দর্শন পড়তে ভালো লাগছে। কখনও পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ি। সংঘটিত অপরাধের নাট্যরূপ দেখি টিভিতে। বাবা বকাবকি করেন। মা বাবা দাদা— সকলেই আমার মানসিক সুস্থতা সম্বন্ধে সংশয়ে আছেন। তাঁদের কথা আমি চুপ করে শুনি।

এক দিন আমার সেই মাসিমা এলেন। বিয়ের ব্যাপারে অনেক কথা হল। বুঝলাম তিনি আমাকে বোঝাতে এসেছেন। আমার দাদা নাকি জানিয়ে দিয়েছে, আমার বিয়ে না দিয়ে সে ঘরে বউ আনবে না! সন্তানের বিয়ে দেওয়া বাবা-মা’র সামাজিক কর্তব্য। বংশ রক্ষা-টক্ষা এ রকম কী সব কথা— আমার মনে নেই যার মোদ্দা কথা হল আমি এই কর্তব্য পালনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছি। এ কথা জেনে আমার মধ্যে বাজে ধরনের প্রতিক্রিয়া হল।

দু’দিন পর রাতে খাবার টেবিলে আমি ‘বিয়ে করব না’ বলে ঘোষণা রাখলাম।

দাদা জিজ্ঞেস করল, ‘কী করবি?’

আমি বললাম, ‘বিয়ের বিকল্প কিছু আছে না কি ? জানি না।’

দাদা বলল, ‘বিয়ের বিকল্পের কথা বলছি না— অনেকেই বিয়ে করে না অন্য কিছু করবে বলে!’

‘তেমন কিছু ভাবিনি। তবে গবেষণার কথা ভাবছি।’

বাবা জানতে চাইলেন, ‘গবেষণা শেষ হতে কত দিন লাগবে?’

‘জানি না। তবে গবেষণা শেষ হলে-যে আমি বিয়েতে বসব, আমি-কিন্তু তা বলছি না! এ রকম ভেবো না যেন। মানে কথা হল, আমি কুত্তির জীবন চাই না!’

বাবার প্রতি এ আমার এক ধরনের আক্রমণ (জানি না, তুমি বুঝতে পারলে কি না)। বাবার স্মৃতি ঠিকঠাক কাজ করছিল কি না,

জানা নেই; তিনি কী বলবেন, যেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।

এবার মা বললেন, ‘কী বলছিস কী তুই!’

আমার মুখে বাঁকা এক হাসি ফুটে উঠল। বললাম, ‘মা, আমি কোনও পুরুষকে নরকগামী করতে চাই না!’ মার বোধশূন্য তাকিয়ে থাকা দেখে বললাম, ‘বুঝলে না তো? মানে আমার জন্য কোনও পুরুষের জীবন নষ্ট হোক, আমি চাইছি না (মাকে আমি মনে করিয়ে দিতে পারতাম, এ রকম কথা মা, তুমি অনেকবার বাবার মুখ থেকে শুনেছ)। বা কোনও পুরুষকে যেন আমার বলতে না হয়, তুমি আমার জীবনটাকে নষ্ট করে দিয়েছ (বাবাকে অনেক বারই এমন কথা মায়ের মুখে শুনতে হয়েছে)! আমি জেনে গেছি মা, বিবাহিত জীবন খুব কষ্টের!’ তার পর দাদাকে বললাম, ‘দাদা, বিয়েটা তুই করে ফেল! আমার কোনও দায় তোর নিতে হবে না! ইনফ্যাক্ট, আমি দায় দেব না!’

দাদা সহানুভূতির সঙ্গে বলল, ‘তুই এ-রকম করে ভাবছিস কেন, বিনু?’

‘জাস্ট আমার ভালো লাগছে না!’

আমাদের খাওয়া থেমে গেছিল। বাবা বললেন, ‘ভালো লাগছে না কেন?’

বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তাঁর চেপে রাখা ক্ষোভের আঁচ আমি টের পেলাম, আর তাঁর রুক্ষ রাগি প্রোফাইল আমার মনে পড়ে গেল, আমি বললাম, ‘বাবা, চাষির আত্মহত্যার কথা শুনে তোমার মন ভালো থাকে না, তার খালি পায়ে রক্ত দেখে নিজের পায়ে হাত বোলাও, তাই না?— এও ঠিক সে রকম এক ব্যাপার বাবা, মেয়েদের ধর্ষণ ও কষ্টের খবরগুলো, বিশেষ করে বিয়ের পরে যা ঘটে, বাস্তবে, সিনেমা সিরিয়ালে যা ঘটছে, আমার মন খারাপ করে দিয়েছে। আমার জীবনে তা ঘটুক, আমি চাইছি না।’ খাওয়া ফের শুরু করে বললাম, ‘আমি বোধহয় বোঝাতে পারলাম! এ বিষয়ে আর যেন কোনও কথা, অশান্তি না হয়!’

আরও পড়ুন: আঁকা-লেখা

আমার এই সিদ্ধান্তের কথা প্রথমে সোমাকে জানালাম। খুব নিস্পৃহ স্বরে সে একটি শব্দ পাঠাল, ‘তার পর?’ আমি কেমন উদাস কণ্ঠে বললাম, ‘জানি না!’ # বললাম, ‘সাক্ষাতে কথা হবে।’ তারপর কী খেয়াল চাপল কে জানে, আমার সেই ‘প্রেমিক’দের, যাদেরকে আমি বন্ধু সম্বোধনে আমন্ত্রণপত্র দিয়েছিলাম, তাদের কথা মনে রেখে একটা মেসেজ লিখলাম— আমি বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দিস ইজ ফর ইনফরমেশন। ভালো থাকবেন!

পাঁচ জনকেই পাঠালাম।

আমরা যদি মুখোমুখি বসে কথা বলতাম, এখন তুমি নিশ্চয়ই বলে উঠতে, তার পর? আমি তোমাকে রিপ্লাইগুলো দেখাতে পারতাম। এক জন সাত-সাতটা বিস্ময় চিহ্ন (!) পাঠিয়েছে। আর-এক জন একটা মাত্র ?-চিহ্ন। আর তিন জন লিখেছে— তাদের কথাগুলো লিখছি—

১. উদ্দেশ্য সফল হোক!

২. আপনার জীবন নিশ্চয় সুন্দর হবে!

৩. বন্ধু হাত বাড়িয়ে আছে… শুভ কামনা!

কেন বলতে পারব না, বন্ধুদের কাছ থেকে এ রকম উত্তর পেয়ে আশ্চর্য এক অনুভূতি হল আমার! পরের দিন আমি সকলকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য ফোন করলাম। সকলের সঙ্গে খুব আন্তরিকভাবে কথা হল। আর আমার মনে হল, ঠিক কী মনে হল, বলতে পারব না, কেবল এ টুক বলা যায়, আমি অন্য রকম কেউ হয়ে উঠছি, অন্তত ওদের চোখে… খুব সহজ ভঙ্গিতে আমরা তুমি-সম্বোধনে কথা বলতে পারছিলাম। আমার মনে হল নতুন কোনও শক্তি আমার মধ্যে জেগে উঠছে…   

তার পর, এক দিন মনে পড়ল, কলেজ লাইফের সেই ‘প্রেমিক’ ছেলেটিকে যে আমার চুলের প্রশস্তি করতে গিয়ে একবার একটা গানের কলি ব্যবহার করেছিল ‘তোমার চুলের মতো মেঘ সব’… সিদ্ধান্ত নিলাম চুল যেন-আর মেঘের মায়া না ছড়াতে পারে। আমার চুল ছেঁটে ফেলা দেখে মা কেমন আর্তনাদ করে উঠলেন! স্বাভাবিক— কত যত্ন করে মা আমার কোমর-ছোঁয়া চুল তৈরি করে দিয়েছিলেন!

তার পর আমি টিপ পরা ছাড়লাম। এটা ছাড়ারও একটা গল্প আমি তোমাকে বলতে পারি। তখন বোধহয় ইলেভেন— আমার এক ক্লাসমেট কথা প্রসঙ্গে এক দিন বলেছিল, আমি যদি কালো টিপ পরি, দু’ভুরুর ঠিক মাঝখানে, তা হলে আমাকে নাকি যথার্থ চন্দ্রমুখী দেখাবে!

অনেক আগেই নাকের গয়না খুলে ফেলেছিলাম। এবার অলংকার শূন্য হল কান। মুখ দেখে চট করে কেউ আমাকে মেয়ে ভাবতে পারছে না। পাছা-বুকের আভাসকে ঢিলেঢালা পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে ফেলেছি। ঠোঁটে-আঙুলে রং নেই।

আমার এই নতুন প্রোফাইল দেখে সোমা বলেছিল, ‘কী হয়েছে তোর?’ আমি বললাম, ‘সবই তো জানিস! আর—’ বলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবছি, কথাটা কীভাবে বলব, অনেকদিন আগে সোমা আমাকে একটা বই দিয়েছিল, বুদ্ধের জীবন ও দর্শন বইটির বিষয়, সেই বইটির কোনও প্রভাব আমার এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে থাকতে পারে, এটা আমি বলতে চাই— জানি না, বইটা না-পড়লে আমার এটা হত কি না— আমি বললাম, ‘ভালো করে দেখ্‌ আমাকে অন্য রকম দেখাচ্ছে কি না, দেখ্‌!’    

কেমন দুখি-দুখি মুখ করে সে বলল, ‘তোকে একটুও ভালো দেখছি না আমি!’ উচ্ছ্বাস দেখিয়ে আমি বললাম, ‘থ্যাঙ্কু! আমি এটাই চেয়েছি— মেয়েলি সৌন্দর্যের টানে আর যেন কেউ আমাকে অ্যাপ্রোচ করতে না পারে! রেপড্‌ হওয়ার সম্ভাবনাও  কমে গেল খানিকটা বল্‌!’

সোমা অন্যমনস্কভাবে সায় দিল। তারপর আমার মুখের দিকে বিষণ্ণ তাকিয়ে থেকে, কী ভেবে বলল, ‘হ্যাঁ, অন্য রকমই

দেখাচ্ছে— একেবারেই অন্য রকম!’

‘কী রকম?’

‘তুই মেয়ে জীবনের বহিরাবরণ বর্জন করেছিস! মানে নিজেকে সাজানোর ব্যাপারটা আর নেই তোর মধ্যে।’

‘তা বলতে পারিস।’

‘কেন— যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, কী বলবি?’

‘বলব, বাইরের আবরণে মানুষ যাতে বিভ্রান্ত না হয়!’

‘কিন্তু তোর ভিতরটা— কাউকে তো চাইবে?’

‘এ পৃথিবীর নিয়ম তো এই, মেয়েদের কোনও চাওয়া থাকতে নেই— এটা আমি জেনেছি, আর বিয়ে না-করার সিদ্ধান্তটা এই জানা থেকেই!’

‘এই জানার মধ্যেও তো ভুল থাকতে পারে!’

‘তখন না হয় শুধরে নেওয়া যাবে!’

ওঃহো! বলতে ভুলে গেছি— আমরা কথা বলছিলাম নদীর পরিত্যক্ত এক ঘাটের সিঁড়িতে বসে। আমাদের দু’জনেরই বসতি থেকে দূরের এই নদীর কাছে আমরা কথা বলতে আসি। এর নাম ইছামতী। সোমা বলে ইচ্ছামতী— কবে একদিন তার মনে হয়েছিল, এই নদীর সঙ্গে তার জীবনের মিল না কি ষোলো আনা! কেন, কী বৃত্তান্ত জানা হয়নি। সোমা জলের দিকে তাকিয়ে ছিল। জলে ভাসছে মেঘের রঙিন ছায়া। সেখানে চোখ রেখেই সে বলল, ‘তার মানে তুই সংসার— যাকে বলে ত্যাগ করা, করেছিস!’ বলে আমার মুখের দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা। আমার মনের বুঝতে না-পারা ফুটিয়ে তুলেছে চোখ। সোমা বলল, ‘মানে তুই সংসার-আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেছিস। এটা একটা ইউনিক ব্যাপার!’

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: গৌরচন্দ্রিকা

তার পর আমার মুখের দিকে অদ্ভুত তাকিয়ে থাকল। সিনেমায় যেমন প্রেমিক তার প্রেমিকার মুখ তৃষ্ণার্ত দেখতে থাকে, অনেকটা যেন তেমন কিন্তু তা যে নয় বোঝা গেল একটু পরে, দেখলাম তার চোখ ছলছল, গভীর কোনও আবেগকে সে সংহত করল প্রণামের মুদ্রায়। তার পর সত্যি সত্যিই সে আমার পা ছুঁল! ব্যর্থ হল আমার বাধা দেওয়ার দুর্বল আয়োজন। আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।

জানি না সোমা আমার মুখে কী দেখেছিল। বাড়ি ফিরে আমিও ঘরের সব কটা আলো জ্বেলে আমার মুখের রূপান্তর বুঝতে চাইলাম। আয়নার কারসাজি কি না কে জানে, আটপৌরে মুখখানাই দেখলাম। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম এল না। চোখের পাতা এক করলেই ভেসে উঠছিল সোমার জল-ছলছল চোখ আর মনে পড়ছিল নিজের সাদামাটা মুখখানা দেখে নিজেই কেমন হতাশ হয়েছি। কিন্তু আমি কী দেখতে চেয়েছিলাম? সোমাও-বা কী দেখেছিল আমার মুখে? নানান কথার মধ্যে মনে পড়ল, সোমাকে জড়িয়ে ধরে রাখার ইচ্ছা আমার তীব্র থাকলেও  কয়েক মুহূর্ত পরেই সোমা নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছিল… পূর্ব অভিজ্ঞতাকে সে যেন আর ফিরে পেতে চায়নি। তবে কি আমার ভেতরে তখনও কোনও চোরাস্রোত বইছিল, আমি ধরে রাখতে চেয়েছিলাম? কেনই-বা জল-ছলছল হয়েছিল সোমার চোখ? প্রিয় বন্ধু, এ প্রশ্ন আপনার জন্যও রইল!

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • বাসুদেব রায়

    হৱদয়কে বিদ্ধ করল। কান্না পাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *