Latest News

Popular Posts

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ৩০)

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ৩০)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

পুরুষের যৌনতা আর নারীর কৃষিভাবনা মানুষকে যে কত রকমের বন্দিত্ব দিয়েছে

সেই দিন বাড়ি ফিরতে দেরি হয়েছিল। প্রায় ফিরেই খাবার টেবিলে বসেছিলাম। বাবা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। আমি ফোন করতে ভুলে গেছি। দাদা আমার পেছনে লাগার চেষ্টা করল, ‘বাবার টেনশনের কথা মনে থাকলে আর ভুল হত না।’

আমি বললাম, ‘দ্যাখ, বাবাকে অসুস্থ ভাবতে আমার একটুও ভালো লাগে না।’ মা আমাদের থামাতে চাইলেন। দেখলাম বাবার মুখে মৃদু হাসি। আমি দাদাকে বললাম, ‘বরং কাজের কথা বল। আমার তরফ থেকে নিমন্ত্রণ বলা যায় প্রায় শেষ— আর এক জায়গায় যেতে হবে, ভাবছি কাল যাব।’ দাদা জিজ্ঞেস করল, ‘কাল তুই কোন দিকে যাবি?’ আমি দিক বললাম। জায়গার নাম জানালাম। দাদা বলল, ‘ঠিক আছে, কাল তুই সেরে আয় তার পর দেখছি, তোকে আর কোথায় পাঠানো যায়।’ খাবার পর মনে হল খুব ক্লান্ত লাগছে। সত্যব্রতর বাবার মুখখানা মনে পড়ল। তিনি আমাকে আবার যেতে বলেছেন। কোনও কৌতূহল নেই। অন্যদের যেমন ছিল— কল্যাণের বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কী করছি। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী। কল্যাণের সঙ্গে কতদিনের পরিচয়। তিনি কিন্তু আমাকে আর যেতে বলেননি। সুব্রতর বাবা-মা দু’জনই আন্তরিক। তবে কোনও কৌতূহল প্রকাশ পায়নি। একমাত্র সত্যব্রতর বাবার সম্বোধনে ‘মা’ শব্দটা ছিল। সম্ভবত এ-কারণে আমি ওর বাবা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। প্রথম জীবনে মাছ বিক্রতা। একটু বেশি বয়স থেকে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি করেছেন। সবসময় কী যেন ভাবেন। ভাবনার প্রকাশ নেই। বন্ধু-বান্ধব নেই। বাড়ি থেকে বেরই হন না। এ-রকমই জানিয়েছে সত‍্যব্রত।

আরও পড়ুন: আফ্রিকার বড়দিন ও তার ইতিহাস

Jagori Grameen: Feminist Approaches to Community Impact - AIF

সুজন-অণিমাদির সঙ্গে যে মজা করব বলে ভেবেছিলাম, সেইমতো দু’জনকে একসঙ্গে রেখে, নিমন্ত্রণপত্রটা বের করলাম কিন্তু বলতে পারলাম না, শেষপর্যন্ত বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতেই হল। বললাম, ‘আষাঢ়ের চার তারিখ, আমার দাদার বিয়ে তোমাদের সবার নিমন্ত্রণ, ছয় তারিখে বধূবরণ’… তার পর ভাবনা মতোই আলোচনাসভা-বিষয়ে কথা হল।

আমি অণিমাদির কাছে সত্যব্রতর বাবার গল্প জানিয়ে বললাম, ‘দিদি ওই কাকুর মুখখানা এত বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল, কী বলব, বিছানায় চোখ বুজলেই মুখটা ভেসে উঠছিল, এক সময় মনে হল আমার মুখের দিকে চেয়ে আছেন; মনে পড়ল কয়েক মুহূর্ত তিনি আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলেছিলেন, আবার এসো মা।’ অণিমাদি বললেন, ‘এই গল্পটা তুই আমাকে কেন শোনাচ্ছিস?’

‘কী জানি! মনটা এলোমেলো হয়ে আছে, একটা কষ্ট আমি ফিল করতে চাইছিলাম, মা থেকেও না থাকা সন্তান হিসাবে, স্বামী হিসাবে হয়তো শেয়ার করার ইচ্ছে থেকে এটা বলছি।’

‘তুই নিশ্চয়ই স্বামী-সন্তান ত্যাগ করে চলে যাওয়া মেয়েটির কথা ভাবিসনি। ভাবতে চেষ্টা কর, দেখবি কষ্ট কমে গেছে। কামসূত্র তো পড়েছিস বললি, যৌনতার নিরিখে ভাব!’

আমার যে কামসূত্র ভাবনায় এসেছিল তা আর না জানিয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে। আমি এখন সুজনদার কাছে যাই।’

সুজনদা যেন আমার অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর ঘরে যেতেই বললেন, ‘কী এত কথা অণিমার সঙ্গে!’ আমি রহস্য ছড়িয়ে বললাম, ‘আছে আছে মশাই। দিদি-বোনের কত কথা।’ সুজন মজা করে বললেন, ‘তা জামাইবাবুর কথাও তো একটু ভাবতে হয়, না কি!’ আমি অভিমানের সুরে বললাম, ‘তুমি কী করে ভাবলে, আমি ভাবিনি! না ভাবলে কি এত তাড়াতাড়ি আসতে পারতাম বলো!’ সুজনদাও অভিমান ঝরিয়ে বললেন, ‘কী বলব!’ আমি বললাম, ‘রাজনীতি।’

সুজনদা সিরিয়াস, ‘আমার একদম অপছন্দের সাবজেক্ট।’

‘কেন?’

‘সমাজ-সংসার সর্বত্রই— রাজনীতি, না বুঝলে বেঁচে থাকাটা বড্ড ঝামেলার। তা তুই হঠাৎ রাজনীতি বুঝতে চাইছিস কেন?’

‘হঠাৎ কোথায়— সেই কবে আমাদের দেখা হয়েছে, তারও আগে থেকে— যৌনতা থেকে কৃষি, মানে কৃষকের মুক্তি-ভাবনা― বলতে পারো, এক জার্নি―’

‘বাঃ! ভালো বললি তো— যৌনতা থেকে কৃষি― মানুষের সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস— এই কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে…’ কেমন এক ভাব বিহ্বলতায় বললেন, ‘পুরুষের যৌনতা আর নারীর কৃষিভাবনা― মানুষের মাথায় যে কী ঘটিয়েছিল! তা থেকে মানুষের কত রকমের বন্দিত্ব— (বিহ্বল ভাবটা কাটিয়ে ) তুই ভাবছিস কৃষকের মুক্তি!’

‘কেবল ভাবলেই হবে না, এই সফরের এক সহযাত্রী এ-রকমই বলেছেন, ভাবনাকে প্রয়োগ করতে হবে― আর রাজনীতি না জানলে  নাকি প্রয়োগ অসম্ভব ব্যাপার, বুঝলে কেন বুঝতে চাইছি?’

‘হুউম্, বুঝলাম। রাজনীতির ডিকশনারি অর্থ নিশ্চয়ই তুই জানিস?’

আমি ‘হু’— আওয়াজ দিলাম।

‘রাজনীতির ব্যবহারিক অর্থ এখন লুটেপুটে খাওয়ার নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।’

নিজের মনেই বলে উঠলাম, ঠিক। মনে পড়ল সায়নের কথা। বললাম, ‘তা হলে অর্থটা কেবল অভিধানে আটকে আছে কেন?’

মাথাটা ঝুলিয়ে দিয়ে না-ভঙ্গিতে আন্দোলিত করে সুজনদা বললেন, ‘কেন— ভাবতে হবে।’

‘আচ্ছা, সংসারে সাম-দান-ভেদ-দণ্ড— এই নীতিগুলি কীভাবে চর্চা হয় বলে তুমি মনে করো।’ সুজনদা অদ্ভুত তাকালেন আমার দিকে― আমি কথা জারি রাখলাম, ‘আমার যা ধারণা হয়েছে তাতে বিবাহ-একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি— এই ব্যাপারটা যদি আলোচনা সভায় রাখা যায়—’

‘বিবাহ একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি— এটা তোর মাথায় কী করে এলো বল তো!’

‘তুমিই তো বললে, সমাজ-সংসারে সর্বত্রই রাজনীতি, এর আগেও শুনেছি কথাটা, তো মনে হল, নতুন সংসারের সূচনা তো বিয়ের মাধ্যমেই হয়ে থাকে— বোঝা গেল?’ অন্যমনস্ক সুজনদার বডিল্যাঙ্গুয়েজ বুঝে আমি বললাম, ‘তা হলে অমানবিক যৌনতা একটি রাজনৈতিক প্র্যাক্টিক্স হয়ে আছে বলতে হবে, উদারহণ হিসাবে আমরা মেরিটাল রেপ তুলে ধরতে পারি— পরিবার থেকে পার্লামেন্ট, রাজনীতির সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র— এ তো মিথ্যে নয়! যদি সুযোগ থাকে তুমি বাৎস্যায়নও বলতে পারো।’

‘তুই কামসূত্র পড়েছিস?’

আরও পড়ুন: শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের কবিতাভুবন: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

‘তোমার মানবিক যৌনতা বুঝতে গিয়েই তো পড়তে হল।’ এই কথা বলা মাত্রই একটা ভাবনা এলো, ভোগ-দখলের নীতি ছাড়া কামসূত্র আর কিছুই নয়। এই ভাবনার কথা অবশ্য সুজনদাকে না বলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কামসূত্রকে তোমার কী মনে হয়েছে?’ আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে যেন প্রশ্নটা অনুধাবন করে বললেন, ‘এক কথায় বলা মুশকিল— কাম ব্যাপারটা সেই সময় ধর্মপথের বাধা ছিল, কামকে অর্থনাশক বলে মনে করা হত— এটা মনে রেখেই বোধ হয় কামসূত্র লেখা হয়েছিল— কাম যে ধর্ম-অর্থের বাধক নয় বরং সাধক― এই সত্যের প্রস্তাবনা রয়েছে কামসূত্রে।’ এবার আমি ভাবনা অনুসারে বললাম, ‘কাম মানে যৌনতা, তা ধর্ম সাধক কি না, বলতে পারব না তবে কাম যে অর্থসাধক এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই।’

অণিমাদির সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে আমার ভাবনাটা অবশ্য ইনট্যাক্ট বলেছি। তিনি বললেন, ‘ভালোই ভেবেছিস। একটা শব্দ জুড়ে দিলে আরও প্রত্যক্ষ হয় বলাটা— পুরুষের ভোগ-দখলের নীতি…’ চার শব্দের কথাটা শুনে আমার ভীষণ আনন্দ হল। আর পরক্ষণেই জিজ্ঞাসা এল, এই নীতি কীভাবে গড়ে উঠতে পারল? তা প্রকাশ করলেই অণিমাদি বললেন, ‘এটা কি আজ আর জানা সম্ভব? তবে এর একটা আভাস-কিন্তু বাৎস্যায়ন দিয়েছেন, তাঁর আগেও কামশস্ত্র লেখা হয়েছে— শ্বেতকেতুর গল্প তো জানিস!’ আমি বললাম ‘না।’ তখন অণিমাদি গল্পটা বললেন। আমার কেমন অবিশ্বাস্য মনে হল। আমি বললাম, ‘এ রকম হয় না কি?’

‘এখনও হয় কি না বলা মুশকিল কিন্তু তখন হত।’

‘তখন মানে?’

‘মহাভারত-যুগের আগে― মহাভারতে শ্বেতকেতুর গল্পটা উপাখ্যান হিসাবে এসেছে…’

‘স্বামী-পুত্রের কাছে থাকা কোনও নারীকে কেউ নির্বিবাদে তুলে নিয়ে যাচ্ছে নারীর মধ্যেও যেন ইচ্ছা-অনিচ্ছার বালাই নেই… জাস্ট আমি ভাবতে পারছি না—’ কথাটা শুনে কিছু না বলে অণিমাদি উঠে বেরিয়ে গেলেন। একটা বই নিয়ে ফিরে এলেন। মহাভারত। বিশেষ এক জায়গা বের করে আমাকে পড়তে বললেন। আমি পড়লাম। বইটা একবার দেখে নিয়ে অণিমাদি উপাখ্যানের অনুকরণে বললেন, ‘বৎস! অবিশ্বাস করিও না। এ ভূমণ্ডলে রমণীমাত্রেই উন্মুক্তা। গোজাতি যে রকম ব্যবহার করে, মনুষ্যজাতিও স্ব-স্ব বর্ণে সে-রকম আচরণ করিয়া থাকে। মানুষের যৌন আচরণের কী অসাধারণ তুলনা দেখলি— এই গল্পে তুই ভোগ-দখলের নীতি গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট নিশ্চয়ই পেয়ে যাবি।’ আমারও তা-ই মনে হল। অন্য এক ভাবনায় আমি পৃষ্ঠাটার ছবি তুলে নিলাম।

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৩)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৪)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৫)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৬)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৭)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৯)

ছবি ইন্টারনেট

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *