Latest News

Popular Posts

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ৩১)

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ৩১)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

মানুষেরও পশু হওয়ারও ইতিহাস আছে

শ্বেতকেতুর গল্পটা কি তুমি জানো? না জানলে তোমার নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু গল্পটা আমি এখন বলব না। ছবি দেখে গল্প লিখতে ইচ্ছে করছে না। আমি নিজের ভাষায় বলতে চাই। সুজনদা বলছিলেন উদ্দালক-শ্বেতকেতু এঁরা উপনিষদের ঋষিচরিত্র। মানে সেখানে গল্প আছে। সেই গল্প জানতে হবে, তার পর গল্পটা বলব।

এখন একটা সমস্যার কথা বলি। সুজনদার কথাটা— ‘পুরুষের যৌনতা আর নারীর কৃষিভাবনা— মানুষের মাথায় যে কী ঘটিয়েছিল! এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি কার সঙ্গে যে কথা বলব, একবার ভাবছি সায়নকে বলি, পরক্ষণেই সত্যব্রত ভাবনায় আসছে; এমনকী, সঞ্জয়কাকুও ভাবনায় এসেছেন। কথাটার গুরুত্ব তখন বুঝতে পারলে সুজনদার সঙ্গেই আলোচনা সেরে নেওয়া যেত।

আরও পড়ুন: ৮৩: রুপোলি পর্দায় সোনালি স্মৃতি

ছবি ইন্টারনেট

তুমি নিশ্চয় সমস্যাটা বুঝতে পারছ না। আসলে সমস্যাটা মনের। সত্যব্রতর সঙ্গে তার ধারণা না জেনেই আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এ-বিষয়ে সায়নের পড়াশোনো আছে। মানে সে-ই যোগ্য। যোগ্যকে পাশ কাটিয়ে অনিশ্চিতের দিকে যাওয়া কি ঠিক হবে? বলতে পারো এটাই সমস্যা। আশ্চর্য! এই কথাটা লেখার পরই আমার মন বলে উঠল, না, এটা কোনও সমস্যা নয়, তোমার স্বভাব। স্বভাববশত আমি সত্যব্রতকে ফোন করলাম।

‘হ‍্যাঁ বলো!’

‘কী করছ?’

‘কিছুই না। এইমাত্র টিউশনি থেকে ফিরলাম। বলো!’

‘কৃষি মেয়েদের আবিষ্কার— এটা শুনেছি। এই বিষয়ে একটু জানতে চাই।’

‘চাকরির পড়া পড়তে গিয়ে যৎসামান্য জেনেছি, সেটা বলতে পারি।’

‘তা হলে কখন দেখা হবে?’

‘কোথায়?’

‘স্টেশনে— আমি তোমার স্টেশনে যেতে পারি, তুমিও আসতে পারো আমাদের স্টেশনে।’

‘তুমি এসো। সাতটার পর।’

‘ঠিক আছে। সাতটা পাঁচ ধরছি।’

সত্যব্রতর মুখখানা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমাদের কথা শুরু হওয়ার মুহূর্ত। অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে সত্যব্রত বলছে, ‘তোমার কৃষকজন্মের আগের জন্ম দেখে এলাম, আমিও ছিলাম সেখান আমারও তখন জেলে জন্ম হয়নি।’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী দেখলে?’

‘আমরা খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছি। ফল বীজ। পোকামাকড়। তুমি একটা ফল পেয়েছ। কিছুটা খেয়ে আমাকে দিলে।’

‘তারপর?’

‘তার পর সেই খুঁটে খাওয়ার জীবন থেকে আমরা হয়ে উঠলাম শিকারজীবী— আমাদের মগজ আবিষ্কার করেছে তির-ধনুক। আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি, বীজ থেকে গাছ হওয়া। এর মধ্যে আমরা দাবানলে ঝলসানো মাংসের স্বাদ পেয়ে গেছি। আগুন আবিষ্কার হয়েছে। আমরা বড় বড় পশু শিকার করতে শিখেছি। আবিষ্কার করেছি বল্লম। কুকুর আমাদের শিকার অভিযানের সঙ্গী হয়েছে। কিন্তু শিকার বিপজ্জনক কাজ বলে তোমাকে রাখা হয়েছে দূরে।’

আরও পড়ুন: প্রেমের ২৭

চিত্রঋণ ভ্যান গগ

‘তার পর?’

‘এক দিন তুমি দেখালে তোমারই পোঁতা বীজের গাছ ফুলে-ফলে নুয়ে পড়েছে— তোমার আনন্দ আর আমার বিস্ময়— এর পর আমি আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না।’

‘মানে কল্পনা করতে পারছ না বা পারলেও প্রকাশ করতে দ্বিধা— আমি বলছি, আনন্দ-বিস্ময়ে আমরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলাম আর আরও ফলের আশায় সেই ফলন্ত গাছের নিচে― ফসলের ক্ষেতে যে সঙ্গম তার সূচনা করেছিলাম আমরা। এর পর তুমি বলো!’

‘এ-ই তো কৃষি আবিষ্কারের গল্প— বইতে পড়েছি, বল্লম আবিষ্কারের ফলে শিকারের কাজ হয়ে গেল পুরুষের আর ঘরগেরস্থালির পাশাপাশি বাগান-খেতির কাজ মেয়েদের।’

‘মানে বেঁচে থাকার রসদ দু’দিক থেকে পাওয়া যাচ্ছিল— বাইরে থেকে নিয়ে আনছিলে তোমরা আর বসতির আশপাশ থেকে সংগ্রহ করছিলাম আমরা মেয়েরা― সেই নিয়মটা এখনও আছে, তাই না?’

‘তা আছে তবে বদলও এসেছে যেমন, শিকার পশুপালনে রূপ পেয়েছে— এখানে একটা গল্প আছে। কল্পনা করো, একবার মৃত এক পশুর সঙ্গে তার একটা শাবক আমরা নিয়ে এলাম, তাকে দেখে তোমার মনে কী এক ভাবের জন্ম হল। বললে, এটাকে মেরো না। শিকার করা পশুটাকে দেখিয়ে বললে, একে আমরা ওর মতো বড় করব। তুমি তাকে কোলে তুলে নিলে। তোমারই হাতে শুরু হল পশুপালন তুমি যাকে পালন করলে আমিই হত্যা করলাম তাকে। তোমার কান্না মনখারাপ আমাকে বিচলিত করল।’ আমার মনে পড়ল আমাদের পাশের বাড়ি— পাখিকাকিমা একটা ছাগল পুষেছিল, ছেলেপুলের মতো বাচ্চা অবস্থা থেকে সে কাকিমার পিছু পিছু, এত ন্যাওটা— আমাদের বাড়িতেও আসত, ঢুকে পড়ত ঘরে। তাকে যখন কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হল, কী কান্না কাকিমার, কতদিন মনখারাপ ছিল। আমাকে চুপ থাকতে দেখে সত্যব্রত বলল, ‘কী ভাবছ?’

আরও পড়ুন: প্রতিমার শেষ মাস

ছবি ইন্টারনেট

‘কী জানি! তার পর, বলতে ভুলে গেছি। বলো!’

‘পুরুষ মানুষের বাইরে কাটানোর সময় গেল কমে। মেয়েরা অনেক বেশি গর্ভবর্তী হতে লাগল। ফলে কৃষি ও পশুপালনে পুরুষদের জড়িয়ে পড়তে হল। আর মেয়েদের অনেক বেশি ঘরে থাকতে হল সন্তান জন্ম দেওয়া ও সন্তান পালনের জন্য। তার সঙ্গে ছিল রান্নার দায়িত্ব।’

‘তার মানে’, বললাম আমি, ‘কৃষি-পশুপালন নারী আবিষ্কার করলেও তার প্রকৃতিগত কারণে সে সর্বক্ষণের কর্মী হতে পারেনি !’

‘কিন্তু এটা তার ডিসক্রেডিট নয় বলেই মনে হয় আমার। সে-কিন্তু কৃষিতে পার্টটাইমার হয়েই ছিল। আজও আছে। পুরুষ নারীকে পরাজিত করেছিল― এই তত্ত্বটাতে কোথাও ভুল আছে বলে মনে হয়। এই আর কী?’

‘নারী পরাজিত হয়নি— এর পক্ষে তোমার যুক্তি কী?’

‘যুক্তি নেই, প্রশ্ন আছে— নারীর কাছে এমন কী আছে যা তাকে পরাজিত করে পুরুষকে দখল করতে হবে? এক। প্রশ্ন দুই, মানুষের বেঁচে থাকা বাঁচিয়ে রাখা— দুই-ই নারী-পুরুষের যৌথ প্রয়াস, তা হলে বৈরিতা কোথায়? আর তিন নম্বর প্রশ্ন হল, আদিম মূর্তিগুলি কেন কেবল নারীর? উলঙ্গ, অর্ধনগ্ন আসন্নপ্রসবা-মাতৃমূর্তির প্রাক্‌-রূপ, দেখেছ তো! বসুমাতার রূপ― একটি মূর্তির ছবি দেখেছি পা উপর দিকে ছড়ানো মাথা নিচের দিকে, ঊরুসন্ধি থেকে বৃক্ষলতা প্রকাশিত— তা হলে কি পুরুষ সৃষ্টিবিরোধী?’ সত্যব্রত কয়েক মুহূর্ত আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘জানি না। তবে মনে হয়, এটা নারীকে জয় করবার যে ভুল ধারণা পুরুষের মধ্যে জন্মেছে তার-ই আত্মঘাতী প্রকাশ।’

‘সত্যদা, তুমি কি এ-রকম ভেবেছ কখনও জমি আর যোনির জন্য পুরুষ যুদ্ধ করতে শিখেছে?’

‘এই ভাষায় ভাবিনি— আমার মনে হয়েছে, জমি আর নারী দলের জন্য যুদ্ধটা মূলত পুরুষে-পুরুষে। আর পুরুষ-অর্থে মানুষের বন্দিত্ব ঠিক এইখানে। সম্ভবত পুরুষ তা জানে না। মুক্তি খোঁজার ইতিহাস তাই কেবলমাত্র পুরুষের।’

‘তার মানে তুমি বলছ, নারীর কোনও বন্দিত্ব নেই।’

‘না, আমি তা বলছি না আমি বলছি, পুরুষ-সৃষ্ট যুদ্ধবাস্তবের ভিক্টিম নারী। স্যরি বিনতা, কৃষি থেকে এ কোথায় নিয়ে এলাম তোমাকে।’

আরও পড়ুন: শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের কবিতাভুবন: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

চিত্রঋণ সুরেশ কে নায়ার

‘থ্যাঙ্কস! নিয়ে এসে ভালোই করেছ। ভাবনার একটা নতুন স্পেস পাওয়া গেল। তবে এর পরেও কিন্তু কথা আছে সত্যদা, মানে তুমি বলো, কবে মাটির জন্য তুমি যুদ্ধ শুরু করলে বা আমার জন্য।’

সত্যব্রত কথা এড়িয়ে বলল, ‘বাড়ি ফিরবে না? কটা বাজে খেয়াল আছে?’

আমার বলতে ইচ্ছে করল, না, ভাবছি আজ তোমার বাড়িতে থেকে যাব। কিন্তু বললাম, ‘ওহ তাই তো!’ আমি উঠে দাঁড়ালাম, ‘এবার ফোনে কথা হতে পারে। সত্যব্রত বলল, ‘অ্যাপে কথা হবে।’

আচ্ছা, তোমার কী মনে হয়, সত্যব্রত কি নতুনভাবে তার অনুরাগ জ্ঞাপন করল, আমিও কি তাতে সাড়াই দিলাম? ওর কথা, কথা বলার ভঙ্গি, কন্ঠস্বর— আমার মধ্যে কোনও বিরোধ তৈরি করল না তো!

ক্রমশ…

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৩)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৪)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৫)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৬)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৭)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ৩০)

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *