Latest News

Popular Posts

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ৩২)

সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ৩২)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

শিকারভূমি দখল আদিম যুদ্ধের ভ্রূণ…

মানুষের বেঁচে থাকা, বাঁচিয়ে রাখা— নারী-পুরুষের যৌথপ্রয়াস— কোথাও তো যুদ্ধ নেই। অথচ মেয়েদের বেঁচে থাকা এক যুদ্ধভূমিতে!

প্ল্যাটফর্মে নেমে আমি এই কথাগুলো লিখে সত্যব্রতকে লিখলাম, তোমার যুদ্ধ শুরুর গল্প বলার সময় এই ব্যাপারটা কিন্তু মনে রেখো!

সত্যব্রত যে উত্তর লিখেছিল, সেটা লিখছি তোমাকে:

তুমি নিশ্চয়ই জানো, আমাদের শিকারজীবন বিপজ্জনক আর কষ্টসাধ্য ছিল আর এর মধ্যেই ছিল আজকের ভাষায় আদিম যুদ্ধের ভ্রূণ। অন‍্যের এলাকায় ঢুকে পড়া। আক্রান্ত হওয়া। প্রতিরোধ করা। কখনও আক্রমণ করা। শিকারভূমি দখল করাই ছিল আমার প্রথম মাটি দখলের লড়াই। তারপর চারণভূমি-কৃষিজমি হাসিলের জন্যও যুদ্ধ করেছি। আর এই যুদ্ধের কারণে, মনে হয়, পুরুষের যৌনতা বদলে গেছে, নইলে যুদ্ধভূমিতে আমরা ধর্ষক হয়ে উঠলাম কেন? কেবল ধর্ষক নয়, নারীকে মাল হিসাবে লুঠও তো করেছি। আর অনুমান করা যায় ধর্ষিত হতে হতে, হাত বদল হতে হতে বদলে গেছে নারীর যৌনতাও। তোমাদের বেঁচে থাকা। এই রকম কোনও সময়ে যুদ্ধটা তোমার জন্যও ছিল। ভাবতে পারো!

বেঁচে থাকা মানে অনবরত খাদ্যান্বেষণ। খেয়ে বাঁচা। দেহে বাঁচা। আর-এক বাঁচা যৌনতায় সপ্তান-সন্ততির মাধ্যমে। বাঁচিয়ে রাখা মানে যৌনসঙ্গী ও সন্তান-সন্ততিকে খাদ্যের জোগান দেওয়া। খাদ্যের জন্ম দিয়েছে সূর্য আর ভূমি— এই গল্প সেদিন খুব সুন্দরভাবে তুমি আমাদের শুনিয়েছিলে। আরতুমি দিয়েছ সন্তানের জন্ম। তুমি মা। মাটিও মা। মাটির দুগ্ধগ্রন্থি নদী। এ সব আমরা পুরুষেরা আবিষ্কার করতে শিখেছি। আমরা উর্বরতা কামনা করেছি মাটির কাছে, নারীর কাছে― মাটি বলেছে, নদীকে বলো সে আমাকে প্লাবিত করুক তবেই আমি হয়ে উঠব শস্যসম্ভবা আর নারী ঠিক নারী নয়, নারীর দেহ সন্তান ফলাতে পারে এই তত্ত্ব থেকে তোমরা হয়ে উঠেছ দেবী, যোনি-স্তন হয়েছে জন্মশক্তির প্রতীক। এ বিষয়েও আমরা কথা বলেছি। এখানে সেই পুরনো প্রশ্নটা ফের তুমি তুলতে পারো, ‘তা হলে আজও আমরা আক্রান্ত কেন?’ তখনকার উত্তরটা মনে রেখে, আমি আর-একটা অনুমিত কারণ দেখাতে পারি— কালক্রমে ‘দেবীদেহ’ দখলের, জয় করবার বিষয় হয়ে উঠেছিল… ‘দেবী’ তেমন প্রতিরোধ শেখেনি কিন্তু যৌনতার ব্যবহার শিখে নিয়েছে ততদিনে, কোথায় যেন পড়েছিলাম, উপনিষদ-যুগে ওই ব্যবহার রুখতে বিবাহ একটা পদ্ধতি হয়ে ওঠে এবং তার পর এ সবের পাশাপাশি সেই ‘দেবীদেহ’ হয়ে উঠল বেচাকেনার জিনিস। যে পুরুষ দখল/জয় করতে অক্ষম, এমনকী কেনার ক্ষমতাও নেই, অথচ নারীদেহ-কর্ষণের ইচ্ছাটা আছে প্রবল, খেয়াল করো পুরুষের মধ্যেও বদল আসছে, সেই বদলে যাওয়া ‘অক্ষম’ পুরুষের দ্বারাই তোমরা আক্রান্ত হও। ভাবতে অবাক লাগে— পূজ্য যোনি হয়ে গেল পণ্য, লুঠের বিষয় খেয়াল করে দেখ, নারীর যৌনতার এ এক আশ্চর্য বদলে যাওয়া। বাঁক। নদীর মতো! বাঁকে বাঁকে নদী ভাঙে যেমন, নারীও ভেঙেছে। তবু নদী যেমন আজ বাঁক বদলের ক্ষমতা হারিয়েছে, আমাদের যমুনাকে দেখলে কী যে মনখারাপ হয়! তেমনই নারী বোধহয় তার অন্তিম বাঁকে এসে সে আর-এক খাত চাইছে। পুরুষ তাকে কোন খাতে বইয়ে দেবে, সে জানে না। সম্ভবত পুরুষও জানে না। আবার নারী যে কোনও খাত তৈরি করে নেবে, তারই বা উপায় কোথায়!

তোমাকে দেখে কেন যে মন খারাপ হয়।

আক্ষরিক অর্থেই নারীর খননযোগ্য ভূমি নেই, এ রকম মনে হয় আমার। তোমার আমার বেঁচে থাকায় কোথাও কি যৌথ প্রয়াস আছে? মনে তো হয় না। থাকা সম্ভব কি না, এটা ভাবা যেতে পারে। এবং ভাবনাটা কৃষিকে ভিত্তি করেই ভাবতে হবে। আরও স্পষ্ট করে বলা যায় ভূমি হবে ভাবনার বিষয়। শুভরাত্রি।

পড়ার পর ভাবলাম, গুডমর্নিং জানিয়ে উত্তর লিখি। পরক্ষণেই মনে হল, কালকের মতো মুখোমুখি কথা বলা দরকার। ভিডিয়ো কল করা যেতে পারে। কিন্তু আমি কিছুই করলাম না। কেবল লেখাটা আর-একবার পড়লাম। মনে পড়ল সোমা-ইছামতীর কথা, এমনকী সত্যব্রতর মায়ের কথাও মনে এলো… সবচেয়ে আশ্চর্যের যে ব্যাপারটা ঘটল, তুমি জানলে আমাকে কী ভাববে, জানি না, যাই ভাবো, আমাকে বলতে হবে, ঘটনাটা হল, ‘অক্ষম’ পুরুষের প্রতি আমার মধ্যে কেমন এক করুণা জেগে উঠল!

আচ্ছা, সত্যব্রতর লেখার মধ্যে এমন কী কোনও কথা আছে যা তোমার মধ্যে প্রশ্ন জাগিয়েছে? ধরো যে কথাটায় ‘যৌথ প্রয়াস’ কথাটা আছে— সত্যিই কি নারী-পুরুষের বেঁচে থাকায় যৌথপ্রয়াস ব্যাপারটা নেই? কেমন যেন ঝাপসা লাগছিল ব্যাপারটা। আমি সত্যব্রতকে ফোন করে ব্যাপারটা জানতে চাইলাম।

সত্যব্রত বলল, ‘আমার তো তা-ই মনে হয়।’

‘কিন্তু এই যে এত মানুষ সংসার করছে— এর মধ্যে কি যৌথতা নেই?’

‘হয়তো আছে— আক্ষরিক অর্থে ঘরসংসার কিন্তু তৈরি করেছে পুরুষ, নারী সেখানে একটা প্রয়োজনমাত্র— এই যে তোমার দাদা— একটা নতুন সংসার তৈরি করতে যাচ্ছেন, একটি মেয়ে বউ হয়ে আসবেন…’

শুনতে শুনতে আমার পরমাকাকিমার কথা ‘আমার বাড়ি কোথায়’ মনে পড়ল… আমি সায় দিলাম…

‘মানে তোমার দাদার ঘরসংসার সাজাতে-গোছাতে সন্তান দিতে মেয়েটি আসছে। বিবাহে এসব অফ দ্য রেকর্ড চুক্তি, বিনিময়ে মেয়েটি খাওয়া-পরা পাবে, তাই না?’ আমি অন্যমনস্কভাবে ‘হ্যাঁ।’ বলার পর শুনতে পেলাম, ‘তা হলে বিনতা, তুমি বলো, কোনও বিষয়ে একসঙ্গে ভাবা, যত্ন নেওয়ার সুযোগ কোথায় তোমার বউদির। আর তোমার দাদা তো প্রভু! যৌথপ্রয়াস কথাটায় সংশয় এই ভাবনা থেকেই এসেছে। তবে ব্যতিক্রম থাকতে পারে— ‘প্রেম’ শব্দটার নিরিখে এটা অন্তত বলতে হবে।’

আমার তখন কথা ফুরিয়ে ভাবনা এসেছে শুনলাম, ‘হ্যালো’ কোনও সাড়া দিলাম না। কয়েকবার হ্যালো হ্যালো করে সত্যব্রত লাইনটা কেটে দিল।

উপন্যাসের বাকি অংশ পড়তে ক্লিক করুন:

সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৭)
সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৩)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৪)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৫)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৬)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৭)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৮)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৯)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ৩০)
সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ৩১)

ক্রমশ…

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *