সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

সমাজ  তোমাকে  লালন  করেধ্বংসও  করে  দিতে  পারে

কোনও সংশয় নেই যে, আমার মাথাটা আবারও জ্যামজটে পড়েছে। তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ, কোনও অ্যাভেনিউ পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় আমি বাড়ির কাজ মন দিয়ে করে যাচ্ছি। মেজাজ ভালো রাখতে পারছি। সম্ভবত আমার মধ্যে কোনও পরিবর্তন আসছে— বাড়ির সকলে তেমনই ভাবছে। মা একদিন কী এক কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘তোর মাথাটা ঠান্ডা হয়েছে, এই ঢের!’ উত্তরে মুচকি হাসি ছাড়া আর কোনও শব্দ বের হল না। একদিন বাবা কথায় কথায় জানতে চাইলেন, ‘টিভিতে এখন মানুষকে দেশহীন করে দেবার খবর— চাষিদের খবর চাপা পড়ে গেছে! খবর কিছু জানিস— মানে খবরের কাগজে লিখছে কিছু?’ আমি বললাম, ‘না।’ বাবা খরিদ্দার সামলে বললেন, ‘মরছে, মরছে… চাষিদের আর জোটবাঁধা হল না…’ তখন দোকানে আর খরিদ্দার ছিল না, কী যেন মনে করার চেষ্টা করে বললেন, ‘এক বার ভারি সুন্দর একটা কথা শুনেছিলাম— চাষিরা রাজা হবে! শুনেছিস? কৃষকরাজ?’ আমি মাথা নাড়লাম। বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে কী সব সাতপাঁচ ভেবে জানতে চাইলেন, ‘নকশাল কথাটা শুনেছিস?’ আমি হ্যাঁ বলতেই আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইলেন, ‘জানিস কিছু?’ আমি না বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কেমন নিভে গেলেন! বললেন, ‘নকশালরা কৃষকরাজের কথা বলেছিল…’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার পর মনে করে করে অনেক কথাই বলেছিলেন। এলোমেলো কথাগুলো সাজিয়ে বললে গল্পটা হবে এ রকম— কেন যে আমার ঠাকুরদা কৃষকজীবন ছেড়ে দিলেন আর বেনে হলেন, এটা বুঝতে বাবার অনেক সময় লেগেছে। ঠাকুরদার ধারণা ছিল, বেনেরাই রাজা হয়, রাজা তৈরি করে— টাকাপয়সা থাকলেই মানুষ রাজার মতো বাঁচতে পারে। চাষার কখনও টাকা হবে না। গরিব থাকাই তার কপাল। ‘কিন্তু চাষা রাজা হতে পারে’ কী এক গভীর বিশ্বাসে তিনি কথাটা বলেছিলেন, ‘জানিস তো মা, কৃষকের কোনও জাত নেই! হিন্দু-মুসলমান নেই। তবু কেন যে জোট বাঁধতে পারে না!’ তিনি তখন চেয়ারের ওপর দ-হয়ে থাকা পায়ের পাতায় হাত বোলাচ্ছিলেন। হয়তো মনে পড়ছিল, লং মার্চ! আর আমার মনে পড়ল, বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু ছাত্রদের নকশালপন্থী বলা হত। তার মধ্যে আমার সেই প্রেমিক যাকে আমি সবচেয়ে সুন্দর হাসি উপহার দিয়েছিলাম, সে ছিল— কী যেন নাম ছিল তার! আহা যদি যোগাযোগ থাকত তা হলে জিজ্ঞেস করা যেত, তুমি কি বিশ্বাস কর কৃষক রাজা হতে পারে? নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন তার ফোন নম্বর নিইনি? জানি না। সেও তো নেয়নি! তার পর কেউ যেন বলল, কেন তুমি পূর্বাশ্রমে ঘোরাফেরা করছ বিনু? আমি বললাম, আমি তো সংসারেই আছি! এই তো একটু আগে বাবার সঙ্গে কথা বলেছি! আজ দাদার সঙ্গে আমার অনেক কাজের কথা আছে— এ রকমই জানিয়ে সে মার্কেটে গেছে। সম্ভবত, তার বিয়ের ব্যাপারে সে কথা বলতে চায়। আমার মত পরিবর্তনের জন্যও কথা হতে পারে।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দাদা শুরু করল এইভাবে, ‘আমি একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি বিনু, এই সমাজ তোকে তার ধাঁচা থেকে বের করে দিতে চাইছে এবং তুইও চাইছিস বেরিয়ে যেতে…’ আমি সবিস্ময়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে শুনছি, ‘এটা একটা অভিনন্দন জানানোর মতো ব্যাপার!’ আমি কথার অভিমুখ ঠিক বুঝতে না পেরেও তাকে ধন্যবাদ জানালাম। তার পর জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ব্যাপারটা তুই কীভাবে বুঝতে পারলি, বল্‌ তো!’

‘ভেরি সিম্পল— আমরা  তো তোকে একটা প্রব্‌লেম হিসাবেই দেখছিলাম…’ নিজের মনেই তারিফ করলাম, দারুণ উপলব্ধি! বললামও। দাদা বলল, ‘সমস্যা যখন, তাকে বুঝতে হবে— কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলেছি— আমার-আর জ্ঞান কোথায় বল্‌! ব্যবসাদার মানুষ! বলতে পারিস ধার করা উপলব্ধি।’

আমি বললাম, ‘জানিস তো বেনেরাই দেশ চালাচ্ছে? আর সবই চলছে ধারের ওপর! তো এমন সুন্দর ধারটা তোকে দিলেন কে, জানতে পারি?’

‘কে আর? আমাদের স্যার!’

দাদা-আমি একই স্কুলে পড়েছি, কো-এড, আমাদের স্যার বলতে আমরা হেড স্যারকেই বুঝি তবু জিজ্ঞেস করলাম, ‘মানে হেড স্যার?’

ওর মাথার হ্যাঁ-নড়া দেখে আমার ভাবনা এলো। মনে পড়ল ‘মানবিক যৌনতা’— কথাটা মাস্টারমশাই বলেছিলেন। ভাবনাটাকে ঘেঁটে দিয়ে বললাম, ‘তা হলে তুই আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিস, বল!’

‘অবশ্যই! কিন্তু একটা আশঙ্কাও আছে— মাস্টারমশাই বলছিলেন…’

‘কী রকম?’

‘সমাজ-কিন্তু তোকে ধ্বংসও করে দিতে পারে!’

‘মানে— কোনও উদাহরণ দিয়েছেন?’

‘না তবে বলেছেন যে, বিনু যা-ই করুক না কেন, তা যেন আন্তরিক হয়, উইথ বেস্ট অফ হার নলেজ এবং অবশ্যই কাজটি প্রপীপল হতে হবে— তার পরই কী ভেবে বলেছিলেন, নইলে ব্যাপারটা আত্মধ্বংসী হয়ে যেতে পারে।’

‘আর?’

‘জিজ্ঞেস করলেন, গবেষণার বিষয় কী?’

‘কী বললি?’

‘বললাম, আমি স্যার জানি না।’

আমি ভাবনায় পড়লাম। জীবের সমস্ত কর্মই তো বেঁচে থাকার পক্ষে— এমন  কী কর্ম থাকতে পারে যা তার বিপরীতটা ঘটাতে পারে? বেঁচে থাকার মানে কী— কে যেন বলেছিল, বেঁচে থাকা মানে অবিরত খাবার খুঁজে ফেরা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা— পাখি-বেড়াল-কুকুরকে দেখে তো তা-ই মনে হয়, কথাটা কেউ কি বলেছিল? যা-ই হোক, মানুষ এর বাইরে নয়— আমি আচমকা জানতে চাইলাম, ‘মানুষ বাঁচে কেন রে দাদা?’

দাদা বলল, ‘জানিনে। দর্শনের ছাত্র হিসাব তোর তো জানার কথা!’ আমি ঠোঁট উলটে হতাশ ভঙ্গি করায় সে বলল, ‘তবে আমার মনে হয়, বেঁচে থাকার একটা নিজস্ব গতি আছে, দেখেছিস তো ঘাড়ে দগদগে ঘা নিয়ে কুকুরের বেঁচে থাকা— সেই গতিতেই মানুষও বাঁচে!’

‘গতি কি লক্ষ্য অনুসারী?’

দাদা আমার মুখের দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, না-ভঙ্গিতে তার মাথাটা নড়া দেখে আমারও যেন সম্বিৎ ফিরল, ফেরামাত্রই স্মৃতি মেলে ধরল, ‘উদ্দেশ্য সফল হোক!’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে— আমি স্যারের সঙ্গে দেখা করে নেব।’

আমার ঘরে যেতে যেতে আমি অন্য ভাবনায় ঢুকে পড়লাম। ভাবনা অনুসারে ‘উদ্দেশ্য সফল হোক’ বলে যে উইশ করছিল, তাকে ফোন করলাম। কথোপকথন এ রকম—

‘হ্যাঁ দিদিমণি, বলো!’

‘একটা কথা জানার আছে—’

‘বলো!’

‘আমার মেসেজের উত্তরে তুমি আমার উদ্দেশ্য সফল হওয়ার কথা লিখেছিলে! মনে পড়ছে?’

‘হুঁ-উ!’

‘আমার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তুমি কি তখন কোনও আন্দাজ করতে পেরেছিলে?’

‘না।’

‘একটু ভেবে দেখো তো— কোন্‌ উদ্দেশ্য থাকতে পারে আমার বিয়ে না করার পেছনে!’

‘মানে আমার মনে হওয়া তো?’

‘এক্সাক্টলি! আমি কনফিউজড— বুঝতে পারছি না, তাই— তোমাকে পরে ফোন করব। বাই!’

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)

তারপর ফোন দিলাম সেই বন্ধুকে যে আমার ঘোষণাকে মনে করেছিল সাত-সাতটি আশ্চর্যের সমন্বয়। তার কাছেও বিস্ময়ের কারণ জানতে চাইলাম। আর কী উদ্দেশ্য নিয়েই-বা আমি অমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তার কী মনে হয়, যেন সে ভাবে, কয়েক দিন পর ফোন করে জেনে নেব, বললাম।

তৃতীয় জনের সঙ্গে ফোনে কথা শুরু এভাবে—

‘গুড মর্নিং!’

‘মর্নিং!’

‘বলো বন্ধু, এত রাতে স্মরণ কী কারণে?’

‘দন্ত স না, তালব্য স, আর মূর্ধন্য, শরণ— মনে আছে তোমার, আমার বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা তোমার কাছে একইসঙ্গে বিস্ময় ও বিরাট এক জিজ্ঞাসা ছিল?’

‘হ্যাঁ-!’

‘এখন বিষয়টাতে কেমন এক সংশয় জাগছে যেন—’

‘কী রকম?’

‘কোন্‌ উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এ রকম ভেবেছিলাম, বুঝতে পারছি না। বন্ধু! আমার হয়ে তুমি কি ব্যাপারটা একটু ভাবতে পারো?’

‘চেষ্টা করব!’

‘ওকে! ভালো থেকো, ভালো রেখো!’

আমার ‘জীবন নিশ্চয় সুন্দর হবে’— এমন আশার কথা লিখেছিল আমার যে বন্ধু তাকেও ওই একই অনুরোধ করলাম। তার শেষ কথাটা এখানে বলা যেতে পারে, ‘তার মানে বন্ধুর জন্য একটা গল্প খুঁজতে হবে— আশা করছি পেয়ে যাব!’

আর শুভ কামনায় যে ‘বন্ধু হাত বাড়িয়ে আছে’ তাকে ফোনে বললাম, ‘হ্যালো! বলো তো কে আমি?’ সে বলল, ‘আমার গার্গীবন্ধু!’ একটু চমক লাগল। থমকে গেলাম। সে বলল, ‘ডোন্ট টেক ইট আদারওয়াইজ— আমার কাছে যখন কেউ তোমার নাম জিজ্ঞাসা করেছে, আমি তোমাকে গার্গী নামেই চিনিয়েছি— গার্গী, দ্য ওয়ার‍্যিঅর অফ ওয়ার্ডস! তুমি আমাকে এত প্রশ্ন করেছ! বলো! আমি তোমার কোন সেবায় লাগতে পারি!’ শুনতে শুনতে আমার দীর্ঘশ্বাসের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, সন্তর্পণে দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘বিয়ে না করার যে সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি, কী উদ্দেশ্যে যে তা নিয়েছিলাম— এটা এখন বুঝতে পারছি না— এজন্যই ফোন…’ সে বলল, ‘তুমি চাইছ আমার অনুমান, তাই তো?’

‘হ্যাঁ, বিয়ের উদ্দেশ্যটা— স্পষ্ট অনুমান করা যায়, এক কথায় উদ্দেশ্য সংসার-পত্তন। কিন্তু বিয়ে না করার উদ্দেশ্য কী হতে পারে? আমি না কোনও উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না।’

‘ঠিক আছে। ভাবি। জানাব!’

আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এক ধরনের অস্থিরতায় ভুগছি আমি। এই অস্থিরতা কেমন বলুন তো! একেবারে জ্যামে আটকে পড়ার মতো… সেদিন শোয়ার পর ‘আত্মধ্বংস’ শব্দটা মাথার মধ্যে জেগে উঠল। মনে পড়ল মাস্টারমশাইয়ের মুখ। এবং অবশ্যই ‘মানবিক যৌনতা’র কথা। তা হলে আমি কি যৌনতাকে ভয় পেয়ে অমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম? যৌনতা অনুষঙ্গে সোমার কথা, আমার কথা… ফের মানবিক যৌনতা… কিন্তু সোমাকে কেন আমি ফোন করিনি? বুঝতে পারলাম না। বোঝার  চেষ্টাও আর করতে দিল না ‘আত্মধ্বংস’।…

এর পরের গল্প—

আমি মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করলাম। কোনও ভূমিকা না করেই তাঁকে বললাম, ‘দাদার কাছে তো সবই শুনেছেন, আর দাদার কাছে আপনাদের কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, আমার সিদ্ধান্তে আপনার সায় আছে কিন্তু আপনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন… আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে স্যার—  ‘আত্মধ্বংস’— ব্যাপারটা ঠিক কী?’

মাস্টারমশাই কী সব ভেবে বললেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই জেনেছ, মানুষের মধ্যে নানা রকম সম্ভাবনা থাকে, যে কোনও সিদ্ধান্তই আল্টিমেটলি  হয়ে ওঠার পক্ষে, তুমি বিয়ে করতে চাওনি, মানে বউ হতে চাও না, বউ হওয়া একটা সম্ভাবনা— এই সম্ভাবনাকে তুমি বাতিল করেছ, তাই না?’ আমি ‘হ্যাঁ’ বললে তিনি বললেন, ‘তার মানে বিয়ের পর যে যে সত্তার জন্মসম্ভাবনা তোমার মধ্যে ছিল, তারা আর জন্মাবে না। এই অর্থে তুমি ‘আত্মধ্বংস’ বুঝতে পারো।’

‘কিন্তু— এটা বোধহয় আশঙ্কার বিষয় নয়!’

‘ঠিকই বলেছ!’ বললেন আমার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে, ‘তা হলে আশঙ্কা কোথায়?’ আমার জিজ্ঞাসার আরও গাঢ় হওয়া লক্ষ করে বললেন, ‘যে সিদ্ধান্ত তুমি নিয়েছ নিশ্চয়ই কোনও কিছু হওয়ার পক্ষে— সেটা কী— আমি জানতে চাইছি না— সে সম্বন্ধে তোমার যদি সম্যক ধারণা না থাকে, তা হলে সত্তাটিকে তো ঠিক মতো গড়ে তুলতে পারবে না, মা! এটাও এক ধরনের ‘আত্মধ্বংস’— হয়ে উঠতে না পারা তোমাকে অবসাদ দিতে পারে।’

কথাগুলো একটু যেন ঝাপসা লাগছিল। কিন্তু এও তো ঠিক— কী হওয়ার পক্ষে আমার সিদ্ধান্ত, জানি না। উদাহরণ পেলে ভালো হত! আমার এই ভাবনাটা স্যার যেন পড়তে পারলেন, বললেন, ‘যেমন ধরো— মনে আছে তোর দিব্যেন্দুর কথা?’

সেই মুহূর্তে কোনও দিব্যেন্দুর কথা আমার মনে পড়ল না, বললাম, ‘না স্যার!’

‘তোদের দুই ক্লাস উপরে পড়ত— সেই যে জয়গাছির ছেলেটা, ডাক্তারি পড়তে পড়তে সুইসাইড করেছিল…’

‘হ্যাঁ স্যার, মনে পড়েছে— ছেলেটা সাহিত্য নিয়ে পড়তে চেয়েছিল, মা-বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক— এ রকম একটা গল্প তখন ছড়িয়েছিল!’

‘হ্যাঁ— এটাকে আমরা অ্যাবস্যলুট আত্মধ্বংসের ঘটনা হিসাবে দেখতে পারি।’

উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলাম, ‘বুঝেছি স্যার!’

মাস্টারমশাইয়ের সমস্ত মুখাবয়বে কৃতার্থয়ের মুদ্রা ফুটে উঠল। তার পর আমি বললাম, ‘আর-একটা কথা স্যার!’

‘বল্‌!’

‘সেবার আমার জন্মদিনে আপনি নতুন একটা কথা বলেছিলেন— ‘মানবিক যৌনতা’— এই ব্যাপারটা আমি জানতে চাই!’

‘দেখ্‌ মা, যৌনতা— একটা জৈবিক ব্যাপার আবার ব্যাপারটা বোধেরও— আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। বরং দু-একটা বই নিয়ে যা, পড়!’ তার পর তিনি এই বোধ গড়ে ওঠার গল্প শোনালেন।

একবার খবরের কাগজে তিনি একটা নিবন্ধ পড়েন। নিবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘যৌনতার কাছে ভগবানও হেরে ভূত’— এ রকম কিছু। স্যারের কাছে ঈশ্বর বা ভগবান— একটি মঙ্গল ধারণা। তিনি ওই ক্যাপশনের মানে করলেন ‘সমস্ত মঙ্গলময় ব্যাপার-স্যাপারকে ভূতগ্রস্ত করে দিতে পারে যৌনতা’— এটা তাঁর কাছে বড় বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আর পড়াশোনা শুরু করেন। যৌনতাকে বিষয় করে বানানো সিনেমাও দেখেছেন কিছু (দু-একটা সিনেমার গল্পও তিনি বলেছেন)। সবমিলিয়ে ওই ‘মানবিক যৌনতা’র ধারণায় তিনি স্থিত হয়েছেন।

গল্প শেষ করে কী ভেবে তিনি জানতে চাইলেন, ‘তোর গবেষণার বিষয় কী?’ কোনও কিছু না ভেবেই আমি বললাম, ‘কৃষক ও নারী।’ তিনি কোনও মন্তব্য করলেন না। আর-কিছু বললেনও না। কিন্তু তিনি ভাবছিলেন, এটা বোঝা যাচ্ছিল। হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পড়ল, বললেন, ‘ওই আত্মধ্বংসের ব্যাপারে একটা গল্প বলব ভেবেছিলাম, ভুলে গেছি— এটা ঠিক গল্প না, একটা ঘটনা— এখন আবার মনে পড়ল…’

আগ্রহভরে আমি শুনতে চাইলাম, ‘বলুন, স্যার!’

কেমন বিমর্ষ হয়ে মাস্টারমশাই বললেন, ‘কতভাবেই না মানুষ জীবনকে গ্রহণ করে, উপভোগ করে! মৃত্যুকেও যে উপভোগ করা যায়— ঘটনাটা কেমন গল্পের মতো, গল্পটা যার, তিনি জীবনকে গ্রহণ করেছিলেন এক ‘দার্শনিক অভিযান’ হিসাবে!— এ রকমই লিখেছিল খবরের কাগজ।’

আমি বলে উঠলাম, ‘বাঃ! দারুণ তো!’

‘হ্যাঁ, দারুণই বটে! অভিযাত্রী যত পথ হাঁটেন ততই তিনি এক নৈরাজ্যের মধ্যে প্রবেশ করতে থাকেন।’ এই কথায় আমার চোখের সামনে ছবিতে দেখা এক পর্বত-অভিযাত্রার অস্পষ্ট তুষার-ধবল ছবি ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল; আমি শুনতে থাকি, ‘তাঁর মনে হয়, এই অভিযান এক নৈরাজ্যের নিরীক্ষামাত্র!’

আবারও দৃশ্য— ধু-ধু বরফভূমি। আমি শুনতে পাচ্ছি, ‘এই মনে হওয়াকেই তিনি দার্শনিক তত্ত্ব হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন।’ স্যার একটু থামলেন। যেন বড় করে শ্বাস নিলেন। তাঁর বিমর্ষভাব আরও গাঢ় হল, বললেন, ‘অভিযাত্রী পড়লেন নৈরাশ্যের কবলে। আর কে না জানে নৈরাশ্যের আত্মঘাতী প্রবণতা আছে!’

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)

‘তাঁর মানে তিনি আত্মহত্যা করেছেন?’

‘হ্যাঁ, ভীষণ সুন্দর আত্মহনন!’

‘কী বলছেন! আত্মহত্যা কখনও সুন্দর হয়?’

‘তিনি-কিন্তু হঠাৎ আত্মহত্যা করেননি! আমার মনে হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি তাকে কার্যকর করার জন্য ভীষণভাবে মগজ খুঁড়েছেন আর একটু একটু করে লিখেছেন, পাঁচ বছর ধরে! ১৯০৫ পৃষ্ঠা! জাস্ট ভাবা যায় না।’

‘মানে ব্যাপারটা জাস্টিফাই করার জন্য?’

‘তাই তো মনে হয়, তা ছাড়া আর কী হতে পারে? এই লেখাটাকেই তিনি মৃত্যুকালীন জবানবন্দি হিসাবে ই-মেল করেছেন বন্ধুদের, আত্মীয়দের; তাঁদের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়, কমবেশি চারশো!’

‘তার পর?’

‘তার পর, একদিন তখন সেপ্টেম্বর মাস, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। এর বোধহয় কোনও প্রতীকী তাৎপর্য আছে! কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে পিস্তল বের করলেন। তার পর মাথায় ঠেকল নল…’

সিনেমায় দেখা এ রকম এক দৃশ্য আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠল, দেখতে পেলাম রক্ত ছিটকে পড়া, যেন শব্দটাও শুনলাম…

আমাকে ওয়েট করতে বলে মাস্টারমশাই পাশের ঘরে গেলেন। আমি ব্যাপারটাকে ঠিক মেনে নিতে পারছিলাম না। নৈরাজ্য, নৈরাশ্য— এসব তত্ত্ব হিসাবে ধরলে তো বিপরীত তত্ত্বটাকেও মানতে হবে, এ রকমই তো পড়েছি, স্যারেদের লেকচারে শুনেছি! একটা ডায়েরি হাতে মাস্টারমশাই এসে বসলেন। পাতা ওল্টানো দেখে মনে হল, পেপারকাটিং সাঁটানো আছে পাতায় পাতায়। তিনি কিছু খুঁজছেন। পাওয়ার পর বললেন, ‘সন্দেহ নেই এই অভিযানে তিনি অবসাদগ্রস্ত হয়েছিলেন… এটা তার অনিবার্য পরিণতি, মাত্র পঁয়ত্রিশে!’

তারপর স্যার ‘হেসম্যান লিখেছেন— ছেলেটির নাম মিচেল হেসম্যান।’ বলে খবরের শেষ অংশ পড়ে শোনালেন, ওই অংশ আমি টুকে এনেছিলাম। এখানে টুকে দিচ্ছি।

আমাদের সব শব্দ, সব চিন্তা, সব আবেগ শেষপর্যন্ত একটি কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে যায় যে, জীবন এক অর্থহীন বিষয়। নৈরাজ্যবাদ আমাদের সমস্ত বিভ্রম, সমস্ত বিশ্বাসের মূলে আঘাত করে। এই অর্থহীনতা আমাদের যদি মৃত্যুর কাছেও নিয়ে যায়, তা হলে তা-ই শেষ কথা। তার চেয়ে বড় আর কিছু নয়কেননা, আমরা যদি একবার বুঝে ফেলি, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অর্থহীন, তা হলে মুছে যায় জীবন-মৃত্যুর তফাততখন জীবনের চেয়ে মৃত্যুই আমাদের কাছে বেশি অভিপ্রেত মনে হয়।

হয় না কি? বন্ধু! তোমারও কি এ রকম মনে হয়? জীবন সত্যিই কি এক অর্থহীন বিষয়? এই যে আমি এত শব্দ লিখলাম, প্রতিটি শব্দ আবেগ-যুক্তি ধারণ করে আছে— এ সব কোন্‌ যুক্তিতে অর্থহীন হতে পারে?

এই রকম এক প্রশ্ন কিন্তু আমি স্যারকে করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘ঠিক এ রকম নয়, কখনও যে জীবনকে অর্থহীন মনে হয়নি— এমনও বলা যাবে না— আসলে জীবন ছুটছে।’

‘কেন ছুটছে স্যার ?’

‘তার একটাই উদ্দেশ্য মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া—’

কথাটা আমার ভালো লেগেছিল আর আমি বলেছিলাম, ‘তা হলে স্যার, মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে জীবন কোন লক্ষ্যে পৌঁছতে চায়?’ একটু ভেবে তিনি না-ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলেছিলেন, ‘এ রকম তো ভাবিনি কখনও— ভাবব! তুইও ভাবিস— মৃত্যুর হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার কী মানে থাকতে পারে?’

বুঝতে পারছ বন্ধু, কী সমস্যায় না আমি জড়িয়েছি! যদি তুমি জীবন-মৃত্যুর সম্পর্ক সম্বন্ধে এই যুক্তি মানো তা হলে প্রশ্নটাকে তুমিও নিতে পারো!

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *