সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

জীবন এক আনন্দময় অচিন পাখির ডাক 

মিচেল হেসম্যানকে আমি ডিসকার্ড করতে চাইছি। যদি ধরে নিই ‘জীবন এক অর্থহীন বিষয়’— তা হলে জীবন এক অর্থসম্পন্ন বিষয়, মানতে হবে, তো জীবনকে অর্থময় করা যেতে পারে! যেমন ‘জীবন এক দুঃখময় অস্তিত্ব’— এটা স্বীকার করেই তো বুদ্ধদেব জীবনকে আনন্দ-অভিমুখী করতে চেয়েছেন! কিন্তু কেন আমি হেসম্যানকে ভাবছি? কেনই-বা বুদ্ধদেব— আমি তো জানি, বুদ্ধমতও পথ হারিয়েছে, তা যদি না হবে, মানুষ কেন এত অমানবিক! বা মৃত্যু এত গতিময় কেন?

বন্ধু! আপনি যদি বিরক্ত হয়ে থাকেন, এখানে আপনি পাঠ থামিয়ে দিতে পারেন! কী করব বলুন— ‘মানুষ কেন বাঁচে?’ এই প্রশ্ন থেকেই তো এত কথা! প্রশ্নটা মাস্টারমশাইকে করার কথা ভেবেছিলাম, কথায় কথায় ভুলে গেছি— এর পর একদিন  দোকানে বসেই বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম। বাবা অনেকক্ষণ ধরে ভাবলেন। শেষে বললেন, ‘গোছাতে পারছি না—’ তারপর তার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি তিনি একটা পাখির খুঁটে খাওয়া দেখছেন। সেখান থেকে দৃষ্টি গুটিয়ে এনে বললেন, ‘একটা ধানগাছের বেঁচে থাকা নজর করলে, বোধহয় উত্তরটা পাওয়া যাবে!’ তাঁকে অচেনা মনে হল। এক প্রাচীন মুখ যেন! মুখখানা যেন আমার বাবার নয়— কোথাও দেখিনি এর আগে! আমার মনে হল ধানগাছ-চিন্তা বাবার মুখের ওপর কৃষক-জীবনের প্রাচীন আলো ফেলে তাঁকে এমন ভাস্কর্যতুল্য মহিমা দিয়েছে।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

তারপর, যদি এমন হত, আমি ধানগাছের কাছে গেলাম। রূপকথায় যেমন হয় আর-কি! কিন্তু তা না হয়ে মনে পড়ল, সোমা বলেছিল বুদ্ধ ছিলেন চাষিরাজার ছেলে, তার দেওয়া বইতেও আমি তেমন পড়েছি।

আমি বইখানা টেনে নিলাম।

‘বুদ্ধের বাল্য ও গার্হস্থ জীবন’— এটা বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়, পড়া শেষ করে, পড়ার সময় যে সমাজবাস্তব ও সিদ্ধার্থের অস্বভাবিক চিন্তার সম্মুখীন হয়েছিলাম তা ফিরে দেখলাম— পাঠক! আপনি হয়তো জানেন, তবু মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য সমাজবাস্তবের গল্পটা লেখকের ভাষাতেই এখানে লিখছি।

কপিলবাস্তু নগরে প্রতিবৎসর হলকর্ষণোৎসব হইত। এই দিন রাজা, আমত্যপরিষদ ও পৌরজনসহ মহাসমারোহে হলচালনা করিতেন। একবার কিশোর সিদ্ধার্থ এই উৎসবে যোগদান করেনউৎসবমত্ত পুরবাসীদের কলকোলাহলের মধ্যে তিনি একটি জম্বুবৃক্ষের মূলে আসন গ্রহণ করিলেন। তাঁহার গভীর দৃষ্টির সম্মুখে নিষ্ঠুরতার ও হিংসার বীভৎসভাব প্রকাশিত হইয়া পড়িল। তিনি দেখিলেন উদারান্নসংগ্রহের জন্য প্রখর সূর্যকিরণে কৃষকগণ ঘর্মাক্ত কলেবরে কি কঠোর সংগ্রাম করিতেছে! ক্লিষ্ট বলীবর্দদের সুকোমল অঙ্গে মুহুরমুহুঃ কি নির্মম আঘাত পড়িতেছে! ইহাদের পদতলে পড়িয়া কত অসংখ্য ছোট ছোট প্রাণী নিহত হইতেছে! এই সকল মৃতদেহ লইয়া পক্ষীদের মধ্যে কি ভীষণ কাড়াকাড়ি পড়িয়া গিয়াছে!

এবং তিনি ধ্যানস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

উৎসবান্তে গৃহে ফিরিবার সময় কুমারের খোঁজ পড়িল। কিয়ৎকাল অনুসন্ধানের পরে পৌরজনেরা দেখিল তিনি নিস্পন্দদেহে নিমীলিতনেত্রে জম্বুতরুতলে ধ্যানমগ্ন হইয়া আছেন। বিশ্বপ্লাবনী করুণায় উদ্ভাসিত কুমারের দিব্য মুখকান্তি দেখিয়া শুদ্ধোদনের বিস্ময়ের সীমা রহিল না। বহুক্ষণ পরে ধ্যান ভাঙ্গিলে পিতাকে প্রণাম করিয়া তিনি করুণকণ্ঠে কহিলেনপিতঃ, কৃষিকার্যে অসংখ্য জীবের প্রাণবিনাশ হয়, এই কার্য হইতে আপনি বিরত হউন!

আমার মনে হল, সিদ্ধার্থ যদি ধানগাছ দেখতেন তা হলে তাঁর জীবন-দেখাটা অন্য রকম হতে পারত! নীহারিকার মতো আরও কী সব ভাবনা…

এর পর যা হয়, সোমার শরণ নিলাম। বইটা সঙ্গে নিয়ে আমি ওর বাড়িতে গেলাম। সোমাকে দেখে আমার মন বিষণ্ণ হল। ওকে কেমন মলিন দেখাচ্ছে। যেন কোনও অসুখ করেছে। আমার যাওয়া তাকে আর আগের মতো উচ্ছ্বসিত করেনি। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করায় সোমা ম্লান হেসেছে। কিছু-না মুদ্রায় মাথাটা নড়তে দেখেছি মৃদু। আমার মনখারাপ ঘন হয়েছে।

বললাম, ‘আমি কি চলে যাব?’

‘কেন?’

‘মনে হচ্ছে তোর মুড অফ্‌!’

‘নিজেকে নিয়ে বেশ বিব্রত আছি। হয়তো এ কারণে… বল্‌! ফোন না করেই চলে এলি যে!’

আমি ব্যাগ থেকে বইটা বের করে তক্তপোশের উপরেই ওর সামনে রাখলাম। আমি বসেছি তক্তপোশ ঘেঁষে রাখা একটা চেয়ারে। সোমা বইটা এক পলক দেখলমাত্র। আমি, বললাম, ‘ফেরত দিতে আসিনি-কিন্তু!’ তার পর আমার ধারণা শুনিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিশেষ করে বাবাকে চাষের কাজ থেকে বিরত হতে বলাটা বাস্তবসম্মত হয়নি— আমার এই মনে হওয়াটা কি ঠিক?’

সোমা বইটা তুলে নিল। পেজ-মার্কার ছিল। মেলে ধরল। পড়ল। তার পর বলল, ‘কনটেক্সট অনুসারে এটা ঠিক মনে হতেই পারে। এবং তা যদি কার্যকারণসম্মত হয়, তা হলেও ইগনোর করতে হবে, না হলে, পরবর্তী ভাবনার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে!’ ‘তার মানে গল্প বানানোর সময় লেখক কার্যকারণ খেয়াল রাখেননি!’

‘আমারও তা-ই মনে হয়— একজন মানুষের মহামানব হয়ে ওঠার লক্ষণ তাঁর শৈশবেই দেখা দেয়— এ রকম বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা দেওয়াই অনুগামীদের লক্ষ্য হতে পারে— এ ক্ষেত্রে তা-ই ঘটেছে বলে ভাবতে হবে!’

‘কিন্তু এটা যে ঠিক নয় তার ক্লাসিক্যাল উদাহরণ হল রত্নাকরের বাল্মীকি হওয়ার গল্প!’

সোমা সায় দিয়ে বলল, ‘নেক্সট?’

‘তার পর— আমি আবিষ্কার করলাম সিদ্ধার্থ-যুগের গণতন্ত্রে শাক্যরাজ্যে চাষির যে অবস্থা ছিল তার চেয়েও ভয়ংকর অবস্থা আজকের কৃষিজীবী মানুষের বেঁচে থাকায়, সমস্ত দেশে— চাষিরা আত্মহত্যা করছেন… সিদ্ধার্থের মনে লেখক যদি এ রকম কোনও চিন্তার উদ্রেক ঘটাতে পারতেন যাতে তিনি পিতাকে কৃষকের যন্ত্রণামুক্তির কথা ভাবতে বলছেন!’ সোমা না-ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, ‘না, তা সম্ভব ছিল না। সিদ্ধার্থ জরা-ব্যাধি-মৃত্যু থেকে মানুষকে মুক্ত করার জ্ঞান-অন্বেষণে বের হবেন— লেখকের মগজে এটা ছিল পূর্ব নির্ধারিত।’

‘মানে মহামতি বুদ্ধকে মনে রেখে সিদ্ধার্থকে আঁকা হয়েছে— সিদ্ধার্থ মহামতি বুদ্ধ হবেন!’

‘ঠিক তাই! কিন্তু এসব ভাবছিস কেন? তুই কি কৃষক সমস্যার সমাধান বুদ্ধে খুঁজতে চাইছিস?’

‘না, ঠিক তা নয়— একটা কৃষকরাজ্যে কৃষকের বেঁচে থাকাটাও দুঃখময়! এটা আমাকে ভাবাচ্ছে— আচ্ছা, মানুষ কেন বাঁচে?’ আমার অন্যমনস্ক কথা বলার ধরন থেকে বেরিয়ে এসে সোমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললাম, ‘এই প্রশ্নটা আমি বাবাকে করেছিলাম, তিনি বললেন, এর উত্তর ধানগাছের কাছে পাওয়া যেতে পারে!’

সোমা কথাটাকে নতুন করে বলল, ‘অর্থাৎ মানুষ কেন বাঁচে এর উত্তর রয়েছে ধানগাছের কাছে— এ তো রীতিমতো ধাঁধাঁ!’

‘তোর কী মনে হয়?’

সোমা কথা শুনতে শুনতে চোখ বন্ধ করেছিল, যেন ধ্যানস্থ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে সে বলল, ‘যতটুক বুঝেছি, মনে হয়, এক কথায় এর উত্তর হয় না বা একটাই  উত্তর হতে পারে, মানুষ বাঁচে কেবল সুখী হওয়ার লক্ষ্যে কেন-না জীবন দুঃখময়!’ শেষের কথাটা আমার মনে ধরল। একই সঙ্গে কেন জানি না মনে পড়ল নীহারিকার মুখ। আমার মন আর কোনও প্রশ্ন তৈরি করতে পারল না। কিন্তু সোমা বলল, ‘দুঃখের কারণ-কিন্তু জন্ম, বুদ্ধ এমনই বলেছেন।’

‘তার মানে’ বললাম আমি, ‘আমার জন্ম হয়েছে বলেই—’

সোমা আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, তোমাকে দুঃখ ভোগ করতে হবে অথবা সুখের সন্ধানে যেতে হবে!’

এই অনিবার্যতাকে রুখতেই যেন আমি বললাম, ‘কিন্তু আমার জন্মের কারণ তো আমি নই!’

সোমা বলল, ‘ঠিক! আমাদের জন্মের কারণ নিহিত রয়েছে যৌনতার মধ্যে। এটা একটা চক্র— এই চক্র থেকে তুই বেরিয়ে যেতে চাইছিস, কারও জন্মের কারণ হতে চাইছিস না, মানে জন্ম নেই, জন্ম দিয়ে তুই দুঃখ পেতে চাইছিস না!’

মানে জন্ম দেওয়ায় দুঃখ, জন্ম পাওয়ায় দুঃখ— অবিরল দুঃখস্রোত, চক্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মানে তবে স্রোতকে আটকে দেওয়া!

আমি বললাম, ‘ভালো বললি তো! কিন্তু এই চক্র থেকে বেরিয়ে আমি যাব কোথায়? মানে লক্ষ্য কী?’

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)

সোমার জোড়হাতের আঙুলগুলো পরস্পরের ফাঁকে ঢুকে গিয়ে শঙ্খমুদ্রা তৈরি করেছে। শঙ্খের মুখে ফুঁ দেওয়ার ভঙ্গিতে বসে থেকে সে কী যেন ভাবছিল, কিছু মনে পড়তেই ভেঙে গেল তার ভঙ্গি, বইটা তুলে নিল। পাতা উল্টেপাল্টে থিতু হয়ে সোমা বলল, ‘শোন! পড়ছি।

সিদ্ধার্থ পিতার সমীপে উপস্থিত হইয়া যুক্তকরে নিবেদন করিলেন, জরা,  ব্যাধি ও মৃত্যুর আক্রমণে জীবের জীবন দুঃখময় হইয়া আছে, এই মহাদুঃখ হইতে মুক্তির উপায় নির্ধারণ করিবার জন্য আমি সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করিব স্থির করিয়াছি; আপনি অনুগ্রহপূর্বক আমাকে অনুমতি প্রদান করুন!

সিদ্ধার্থ চক্র থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, তার লক্ষ্য এখানে স্পষ্ট— তোর লক্ষ্যও এ রকম কিছু হবে!’

একটু উত্তেজিত হয়েই আমি সোমাকে জড়িয়ে ধরলাম। ও কেমন ভয় পেয়ে গেল। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দরজার দিকে, খোলা জানলার দিকে সে ভয়ার্ত তাকাল। তার পর নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘সিদ্ধার্থকে অনুসরণ কর, লক্ষ্য পেয়ে যাবি!’

আমি সেই দিন ফিরে আসিনি। বাড়িতে জানিয়ে দিয়েছিলাম। ওদের বাড়িটা এমন জায়গায় অন্ধকার রাতেও জোছনার বিভ্রম জাগে। পাশেই পরিত্যক্ত র‍্যাডারক্ষেত্র, সেখানকার রাস্তার আলোগুলো এখনও জ্বলে। সে কারণে হতে পারে ঘুম আসছিল না। কিছু সময় মোবাইল ঘেটেছি। একসঙ্গে। সোমা পাশ ফিরে শুয়েছে। প্রথমে মনে হয়েছিল ঘুমিয়েছে। কিন্তু আমারই মতো সে জেগে আছে। আমার কী হল কে জানে, সেই জন্মদিনের স্মৃতি ফিরে এলো আর খেয়াল করলাম আমাকে সোমার প্রণাম করার দৃশ্য আমাদের দু’জনের মাঝখানে শুয়ে আছে! শরীরময় এক ধরনের অস্বস্তি, হাই, দীর্ঘশ্বাস এ সবথেকে বেরিয়ে আমি সোমার দিকে পাশ ফিরলাম। আমার ডান হাত তাকে আমার দিকে ফেরাল। সে ফিরবে বলেই যেন ডাকের অপেক্ষায় ছিল। তার পর কী বলব— ভীষণ অ্যাগ্রেসিভভাবে সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। অদ্ভুত অনুভূতি, মনে হল, আমার খাঁচার ভেতর সে ঢুকে যেতে চাইছে— কীভাবে আমি খাঁচা খুলে দিতে পারি!

যাই হোক, বন্ধু! জানি না একইসঙ্গে পাঁচটা ইন্দ্রিয়ের সুখী হওয়ার অভিজ্ঞতা আপনার আছে কি না, থাকলে আমার অভিজ্ঞতা বুঝবেন। যতক্ষণ জেগেছিলাম, আমরা কোনও কথা বলিনি, সেই যে কী একটা কথা আছে যেন, হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব না কী যেন! ঘুম ভাঙার পর দেখি সোমা মুগ্ধ চেয়ে আছে আমার মুখের দিকে। সকালের আলো তার সমস্ত মালিন্য যেন ধুয়ে দিয়েছে। আমি উঠে বসলাম। ভোরবেলা ডেকে ওঠে এমন কোনও পাখি ডাকছে, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী পাখি ডাকছে রে!’ সোমা কোনো ডাক শুনতে পেল না। তা হলে কি ভুল শুনলাম। কিন্তু আবারও তো শুনতে পেলাম! সে কথা বলতেই সোমা বলল, ‘তা হলে তোর বুকের ভিতর ডাকছে। গানের সেই অচিন পাখি!’ আমি কান পেতে থাকার ভাণে রাতের অনুভব-কথা মনে করে বললাম, ‘তা-ই হবে, তুই যখন শুনতে পাচ্ছিস না!’ আসলে আমি তখন আর-রাতে ফিরতে চাইছিলাম না।

বুদ্ধং  শরণাং  গচ্ছামি

সিদ্ধার্থকে অনুসরণ করবার জন্য সোমা আমাকে আরও দু-একটা বই দিয়েছিল। আমি সেই সব বই মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছি। সোমা বলেছিল, ‘অনুসরণ করার পথে এই বইগুলিই কিন্তু তোর এক-এক জন ‘গুরু’— প্রত্যেক বই-ই তাই।’ আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কেন বল্‌ তো!’  সে বলল, ‘কারণ, বই আমাদের মধ্যে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। দেখেছিস তো— সিদ্ধার্থ প্রশ্নর উত্তর না পেয়ে এক গুরু থেকে অন্য গুরুর শরণ নিয়েছেন বার কয়েক!’

সোমার কথাগুলো আমার যথার্থ মনে হয়েছে। এবং আমি আবিষ্কার করেছি, সোমা আমার গুরু!

এ সব কেন শোনাচ্ছি তোমাকে? এ রকম ভাবছ তো? আসলে তুমিও আমার গুরু হতে পারো কিন্তু সে সম্ভাবনা আপাতত নেই! তবু প্রশ্নটা রাখি! আগের পড়া ঘটনা ফের পড়তে পড়তে একটা প্রশ্ন জেগেছে— আগে পড়ার বিষয়টা বলতে হবে— সিদ্ধার্থকে সংসারে আটকে রাখার গল্পটা নিশ্চয়ই মনে আছে তোমার! না থাকলেও ক্ষতি নেই। বলছি শোনো!

সুন্দরী নর্তকী ও পরিচারিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। শুদ্ধোধনের অনুরোধ-মতো প্রধানমন্ত্রী উদয়ন সেই সব নারীদের রাজকুমারের মন কীভাবে জয় করতে হবে তার পথ বলে দিলেন।

এবং তাদের উদ্দেশ্যে প্রশস্তি জ্ঞাপক যে কথাগুলো তিনি বলেছেন, সেখান থেকেই প্রশ্নটা উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীর কথাগুলো তোমাকে শোনাচ্ছি নিজের ভাষায়—

তোমরা মুনিদের আকাঙ্ক্ষিত পথ থেকে বিপথে চালিত করতে সক্ষম, এমনকি স্বর্গের দেবতাদেরকেও তোমরা মায়ার দ্বারা মোহিত করতে পারদর্শিনী। ছলা-কলায় দেহগঠন সৌন্দর্যকে আকর্ষণীয় করে তোমরা অনেক নারীকেও মোহিত করতে পারো সুতরাং পুরুষ কোন ছাড়!

এর সঙ্গে অবশ্য পুরোহিতের কথাও তোমার মনে পড়তে পারে, রেডিরেফারেন্স হিসাবে তাঁর কথাও বলতে হবে—

তোমরা ছলা-কলায় পারদর্শিনী; মানুষের দুর্বলতা ধরতে পারদর্শিনী, তোমরা যৌবনবতী মনোমোহিনী এবং নিজেদের সেইভাবেই তৈরি করতে ওস্তাদ! (দু’-একটা কথা বাদ দিয়ে) সে যত বড়ই শক্তিশালী হোক না কেন এবং যত বড়ই গুণবান হোক— নারীজাতির কাছে নগণ্য। এটাই যেন তোমাদের মনে থাকে! প্রাচীনকালে কাশীতে একজন সুন্দরী বেশ্যা একজন ভবিষ্যৎদ্রষ্টাকে তার পায়ের তলায় রেখেছিল যাকে দেবতারাও বশে আনতে পারেনি!

এ রকম আরও দু’-একটা কথা আছে। আর বলতে ভালো লাগছে না। বলো তো প্রশ্নটা কী! এই এক বিভ্রম, মনে হচ্ছে তুমি আমার সামনেই রয়েছ! যাই হোক, প্রথম যে প্রশ্নটা আমার মাথায় এসেছিল, তা হল, নারীজাতি যদি এতই শক্তিশালী হবে তা হলে তাকে দেহ, রূপ, ছলা-কলা বিক্রি করে বেঁচে থাকতে হয় কেন? এর থেকে পরের প্রশ্ন, নারীশক্তির উৎস কী? আর তৃতীয় প্রশ্ন, পুরুষের দুর্বলতা ঠিক কোথায়?

এবং তার পর— কোনও ছলা-কলায় সিদ্ধার্থ যখন বশীভূত হলেন না তখন তাঁর ‘আনন্দময় সত্তা’ যা নাকি ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ সত্তা, তাকে জাগ্রত করবার জন্য উদয়ন আরও যেসব কথা দৃষ্টান্ত সহ বলেছিলেন, সেখান থেকেও এই প্রশ্নগুলি উঠবে, এমন মনে হয়েছে আমার। এর সঙ্গে এও তোমাকে বলছি, ‘আনন্দময় সত্তা’ কী— আমি জানি না। তবে যেসব উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে, তা থেকে মনে হতে পারে, ‘আনন্দময় সত্তা’ জাগলে পরপুরুষের ‘ভালোবাসা’র আধার হয় পরস্ত্রী!

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)

এই বইয়ের মলাটে একটা কথা আছে, অজ্ঞতাই দুঃখের মূল কারণ। আমার মনে প্রশ্নও উঠল, অজ্ঞতার কারণ কী? উত্তর পেলাম, ভেরি সিম্পল— না জানা। পরের প্রশ্ন, আমি যে জানি না এটা জানলাম কীভাবে?

বেশ মজা লাগল। কিন্তু আমার চিন্তা সব এলোমেলো হয়ে গেল। তখন মনে পড়ল, কোথাও পড়েছিলাম, কেউ বলছেন, ‘আমার চিন্তা ও স্বপ্নগুলো সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে!’ কে বলেছিলেন, সেটা আমার কাছে খুব একটা গুরুত্ব না পেলেও, এই প্রথম মনে হল, আমার কোনও স্বপ্ন নেই! এবং এ রকমও ভাবলাম, ভাগ্যিস ছিল না! এবং পরক্ষণেই ভাবনাটাকে বাতিল করতে হল— আমার যে স্বপ্ন নেই, এটা জানলাম কী করে?

চোখ বন্ধ করে নির্জনে, মানে আমার ঘরের মধ্যে এ বিষয়ে ভাবতে গিয়ে দেখলাম, স্বপ্ন একটা ছিল, সেই রান্না-বাড়ি-পুতুল খেলা একটা স্বপ্ন তৈরি করে দিয়েছিল— বউ না হতে চাওয়ায় সেই স্বপ্নটা আর নেই। তুমি যদি সত্যিই আমার সামনে থাকতে নির্ঘাৎ এই প্রশ্নের মুখে আমাকে পড়তে হত যে, স্বপ্ন যদি না-ই থাকবে, তবে আমি তোমাকে খুঁজছিলাম কেন? তখন আমি তোমাকে একটা গল্প শোনাতাম, আমার স্কুলের এক বন্ধু, সে বিশ্বাস করত, কোনও এক পুরুষের হাড় থেকে ঈশ্বর তাকে সৃষ্টি করেছেন আর তার মনে হত, সেই পুরুষ খুঁজছে তাকে— তাকে না পেলে পুরুষ যে সম্পূর্ণ হতে পারছে না! তখন আমরা ক্লাস নাইন-কি টেনে পড়ি, মানুষ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, আবছা জেনেছি তবু সেই বন্ধু তার দিদিমার কাছ থেকে শোনা গল্প নিজের জীবনে নিয়ে নিয়েছে! এই গল্প শুনিয়েই বলতাম, আমি তোমাকে খুঁজিনি, তুমিই খুঁজেছ মোকে! আমি তোমাকে দেখা দিতে চেয়েছি মাত্র।

বুঝলে তো এ রকম সব ভাবনা, পরিপাটি না… মানে সাজিয়ে-গুছিয়ে ভাবতে পারছি না, এ রকম কথা আমি অনেককেই বলেছি, তাদের একজন, কে যেন… হ্যাঁ, মনে পড়েছে, আমার সেই পাঁচ বন্ধুর বিস্ময়-জন, তাকে ফোন করার কথা ছিল, তাকে ফোন করতেই সে জানাল, সে এখনও কিছু ভাবতে পারেনি কিন্তু তার পরেও তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল আর আমি আমার ভাবনার মধ্যে পারিপাট্য না থাকার কথাটা বলেছিলাম। তখন সে খুব যত্ন করে বলেছিল, ‘ভাবনার সঙ্গে কিছু কাজ করে দেখাও না!’ কথাটা ভালো লাগল। বললাম, ‘ভালো বললে তো!’

সে সোৎসাহে বলল, ‘তা হলে দেখবে, ওই কাজ অনুসারে ভাবনাটার মধ্যে পরিবর্তন আসছে!’

কেন জানি না আমার মনে হল এই বিস্ময়-জনকে বুদ্ধ সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞেস করা যায়। বললাম, ‘আচ্ছা বন্ধু, বল তো, স্বপ্ন কী?’

সে বলল, ‘একটা তো— অবদমিত কামনা-বাসনার নৈশ্য প্রকাশ (‘নৈশ্য প্রকাশ’ কথাটা ভালো লেগেছিল), আর একটা হল, এমন কিছুর ভাবনা যা বাস্তবে নেই কিন্তু তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব, যেমন ধরো গাড়ির স্বপ্ন, বাড়ির স্বপ্ন কিংবা বাস্তবে আছে কিন্তু হস্তগত নয় তাকে নিজের করার কল্পনাকেও আমার স্বপ্ন মনে হয়!’

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)

‘আচ্ছা, সিদ্ধার্থ, মানে সেই আড়াই হাজার বছর আগেকার কপিলাবাস্তুর রাজকুমার সিদ্ধার্থ, তিনি কোন্‌ স্বপ্ন দেখে, বা ধরো পাঁচশো বছর আগে নবদ্বীপের নিমাই কোন্‌ স্বপ্নে ঘর ছেড়েছিলেন?’

‘স্যরি! আমি বলতে পারব না।’

‘তোমার কি মনে হয় তাঁরা স্বপ্নের জন্যই ঘর ছেড়েছিলেন?’

‘আমি তো এঁদের ঠিকভাবে জানি না…’

‘আচ্ছা বন্ধু, তোমার কি এমন কোনও স্বপ্ন আছে যা আমাকে বলা যায়?’

‘ইনফ্যাক্ট, ঘুম-স্বপ্ন ছাড়া আমার কোনো স্বপ্ন নেই!’

‘সে কী! শুনেছি, স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে না!’

‘এই তো দিব্যি বেঁচে আছি!’

‘তাই! কেন বেঁচে আছ?’

‘তা তো জানি না!’

‘বেঁচে থাকার নিয়মেই বেঁচে আছ— তাই না?’

‘তা বলতে পারো!’

‘আর ওই নিয়মেই তুমি আমাকে অ্যাপ্রোচ করেছিলে— না?’

‘হ্যাঁ, তা-ই বলতে হবে!’

‘কেন?’

একটু ভেবে সে বলল, ‘এক সঙ্গে বাঁচব বলে!’

একটু থমকে গিয়ে বলেছিলাম, ‘ফাইন! তার মানে— একটা স্বপ্ন ছিল! স্যরি!’

‘ইটস্‌ ওকে!’

‘আচ্ছা বন্ধু, তুমি বলছিলে না কোনও কাজ করতে— এমনকী কোনও কাজ আছে যা আমরা দু’জনে মিলে করতে পারি অথবা, আমরা যুক্ত হতে পারি একই কাজে? অন্তত দু-এক দিনের জন্য হলেও!’

এবারও সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘হয়তো পাওয়া যাবে— একটু ভাবি!’

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • Keshab Chandra Datta

    মাননীয় সম্পাদক মহাশয়কে অনুরোধ করছি নোবেল নভেল-এর নতুন অংশ শুরুর আগে, পুরনো অংশের একটা BRIEF দিন। না হলে RELATEকরতে সমস্যা হচ্ছে।
    ধন্যবাদান্তে
    কেশব চন্দ্র দত্ত।

  • এ কিস্তিতে একটি বাক্য আমার বিশেষ করে মনে ধরেছে। শেটা হলঃ
    “মনে হল ধানগাছ-চিন্তা বাবার মুখের ওপর কৃষক-জীবনের প্রাচীন আলো ফেলে তাঁকে এমন ভাস্কর্যতুল্য মহিমা দিয়েছে।”

    এক জায়গায় লেখা আছেঃ “পুরুষ কোন ছাড়!”। আমার মনে হয় ওটা ‘ছার’ হবে। লেখক বা প্রকাশক ভেবে দেখতে পারেন।
    — পলাশকান্তি বিশ্বাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *