সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

মেয়েমানুষ এক আশ্চর্য সম্পদ— জমি ও যন্ত্র

আমাকে বোধহয় ঠিক বোঝা যাচ্ছে না! তাই না? হতে পারে আমার মধ্যে এখনও ‘মেয়েমানুষ’ ব্যাপারটা আছে, তোমরা পুরুষেরা (এই দেখ আমি তোমাকে পুরুষ ভেবেই লিখছি) আমাকে যে বুঝবে না— এটা স্বাভাবিক। দেবতারাও নাকি মেয়েমানুষ বুঝতে পারে না! কিন্তু আমি নিজেই কি নিজেকে যথার্থ বুঝতে পারছি— এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক— সাদা কথায় কি একে যৌনসম্পর্ক বলব? তার মানে আমি ট্র্যাডিশন ব্রেক করছি। এই যৌনতাকে সোমা ‘মানবিক’ বলেছিল। আবার, তাকে আমি গুরু মেনেছি! অথচ আমিই তার প্রণম্য। অন্যদিকে, যারা আমার প্রেম চেয়েছিল— মানে আমার যৌনতাই তো চেয়েছিল তারা! আমি সাড়া দিইনি। সেই চাওয়াটা তাদের মধ্যে কি সুপ্ত হয়ে নেই? অথচ তাদের সঙ্গে আমি সংযোগ রেখে চলেছি— এখনও কোনও উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়নি। সম্পর্ক? তাও অস্পষ্ট। বলছি বটে বন্ধু— বন্ধুত্ব কাকে বলে তাও জানি না। তবে আমি যে নতুন এক বাস্তব তৈরি করে ফেলেছি, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই! না, আমি না, আমরা সকলে মিলে তৈরি করছি। যদিও ওদের সঙ্গে এখনও ভাবনাটা শেয়ার করা হয়নি। বলতে হবে। ওদের ভাবনা কী, এটাও জানা দরকার। এ রকম ভাবনা থেকে আমি নতুন একটা ঘটনা ঘটাতে চাইলাম।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)

আমরা ছ’জন একত্রে কোথাও বসব। সম্ভবত ওই পাঁচ জন পরস্পরের অপরিচিত, দু’-এক জন চেনামুখের হতে পারে। সম্মিলনটা বেশ মজার হবে। কিন্তু তার আগে যৌনতা বিষয়ে সম্যক ধারণা গড়ে নেওয়া দরকার। মাস্টারমশাই যে বইগুলো দিয়েছিলেন, তা আজও দেখা হয়নি। অথচ বই দেওয়ার সময় তিনি জানিয়েছিলেন, বইগুলোর মধ্যে কোনও একটা বইতে ‘মানবিক যৌনতা’ নামেই একটা লেখা আছে, দেখেছি। জরুরি এই ব্যাপারটার কথা যে আজই ভাবছি, তা কিন্তু নয়। তবে ইন অ্যাকশন ভাবনাটা ডেভেলপ করেনি।

আমি যখন অ্যাকশন নেবার তোড়জোড় করছি সেই সময় বিস্ময়-বন্ধু ফোন করে জানাল, একটা কাজ, যেমন আমি চাই, হতে পারে। এ বিষয়ে সাক্ষাতে কথা বলা ভালো। সে জানতে চাইল, দেখা করা সম্ভব কি না। আমি জানালাম, অবশ্যই সম্ভব! এবং তাকেই জায়গা ঠিক করতে বললাম।

আলোচনার জায়গা হল আমাদের স্টেশন প্ল্যাটফর্ম। বিস্ময়-বন্ধুর মতে, এটাই ভালো জায়গা। কেন ভালো— জানতে ইচ্ছে হলেও আমি বলেছিলাম, ‘ঠিক আছে!’

আমরা বসেছিলাম দু’নম্বর প্ল্যাটফর্মের বুকস্টল সংলগ্ন শেডের নিচে। কথা শুরু হয়েছিল এভাবে (শুরু করেছিল বিস্ময়-বন্ধু):

‘হিউম্যান ট্রাফিকিং ব্যাপারটা তুমি নিশ্চয়ই জানো!’

‘হ্যাঁ। ব্যাপারটা তো ভীষণ বেড়ে গেছে!’

‘বিশেষ করে মেয়ে আর শিশু পাচার। তুমি বোধহয় জানো, পাচার বিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য থানা থেকে একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে— গার্লস স্কুলগুলোতে এ বিষয়ে কাজ করা হবে, সঙ্গে ক্লাব বা অন্য কোনও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থাকবে, এনজিও-ও থাকতে পারে।’

‘তো?’

‘আমি একটা ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত আছি।’

‘কোন্‌ ক্লাব?’

‘নেতাজি সংঘ। আমরা এই কাজে সহযোগী সংগঠন।’

‘তা আমাদের কাজ কী হবে?’

‘আমি তো অর্গানাইজার হয়েই আছি, তুমি যদি এই বিষয়টার ওপর আলোকপাত করতে পারো…’

‘মানে কথা বলতে হবে, কবে?’

‘আমাদের থানায় নেতাজি সংঘ চারটে স্কুলে কাজ করবে, তার প্রথমটা সামনে একুশ তারিখে— মানে হাতে দশ দিন!’

‘এ বিষয়ে আমি কথা বলতে পারব, তোমার মনে হল কেন?’

‘তোমার কথা তো আমি শুনেছি— এ বিষয়ে ডেটা পেলে তুমি গুছিয়ে বলতে পারবে, এটা মনে হয়েছে।’

‘ডেটা পাব কোথায়?’

‘কাজটা তো আমরা এক সঙ্গেই করব! মানে পেপারস্‌ আমি জোগাড় করে দেব। অবশ্য তুমিও ইন্টারনেট সার্চ করতে পারো!’

আমার মধ্যে একটা আবেগ তৈরি হচ্ছিল। তাকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে! ডেটা কীভাবে পাব?’

‘তোমার যদি আপত্তি না থাকে, বাড়িতেই দিয়ে আসব!’

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)

‘ফোন করে যেও!’ বাড়ি ফিরে আমি ‘হিউম্যান ট্রাফিকিং ইন ইন্ডিয়া’ সার্চ করলাম… ভারতীয় আইনে মানুষ পাচার যদিও বেআইনি, কিন্তু এটা নজর কাড়ার মতো সমস্যা। ভারত থেকে মেয়েরা মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয় ‘ফর দ্য পারপোজ অফ কমার্শিয়াল সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন’! বাণিজ্যিকভাবে যৌনতার ব্যবহার মানে বেশ্যাবৃত্তি… সেই কবে মাথার মধ্যে ঢুকে থাকা একটা শব্দ আচমকা বেরিয়ে এল, সেক্স ট্রেড। আমি ‘সেক্স ট্রেড’ টাইপ করলাম। সার্চ# নানান তথ্য… আমি কোনওটাই ওপেন করলাম না। না করেও যতটা টাইটেলে বলা হয়েছে তাতেই আমার মাথা হ্যাং হয়ে গেছে— What’s Wrong with India’s Efforts to Check Human Trafficking… Even as an anti-human trafficking bill remains pending in the Indian parliament… আমার ভিতর থেকে একটা আর্ত-চিৎকার যেন বেরিয়ে এল, হো-য়া-ই… মনে হল আমি হাঁ-মুখ হয়ে আছি! তথ্যের জগৎ থেকে আমি বেরিয়ে এলাম। আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল। সেক্স মানে যৌনতা— আমার মনে হল, পাচার আলোচনায় যৌনতার ব্যাপারটা মৌলিক বিষয়— মাস্টারমশাইয়ের দেওয়া বইগুলো টেবিল থেকে বিছানায় নামিয়ে রাখলাম।

যোনি নিরপেক্ষ তত্ত্বজ্ঞান ও যৌনতাবোধ

আচ্ছা, তুমিও কি যৌনতা মানে সেক্স ভাবো? তা যদি ভাবো, ভুল! আমিও ভুল ভাবতাম। সোমা আর সাম্প্রতিক পড়াশুনো আমার ভুল ভাঙিয়েছে। তোমার ভুলও ভাঙিয়ে দিই— যোনির ইংরাজি প্রতিশব্দ কী? ভ্যাজাইনা, এর মানে হল মেয়েদের জননেন্দ্রিয়; যেমন, শিশ্ন (শব্দটা নতুন জানলাম), প্রতিশব্দ পেনিস, মানে পুরুষের জননেন্দ্রিয়, তাই তো? তা হলে দেখ, যোনি, এটা বিশেষ্য পদ, যোনি শব্দের বিশেষণ হল যৌন; ফের যৌন > যৌনতা— বিশেষণ থেকে বিশেষ্য, এর অর্থ যোনি সম্বন্ধীয় বোধ বা ধারণা। কিন্তু মজা হল যৌনতার প্রতিশব্দ-কিন্তু ভ্যাজাইনা থেকে আসেনি, এসেছে সেক্স থেকে— সেক্সুয়ালিটি। লেখক বলেছেন, ‘এটি ভুল প্রয়োগ। সম্ভবত পুরুষতন্ত্রের নির্মাণ। না-ও হতে পারে, কিন্তু এটা যে অসচেতন প্রয়োগ— এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।’ তিনি ‘সেক্সুয়ালিটি’ শব্দটি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, সেক্স ইজ নট ইক্যুয়াল টু ভ্যাজাইনা!

তার মানে, আমার ভাবনা এলো, যোনি— এই শব্দের বাস্তব অস্তিত্ব বহন করছে এক-একটি মেয়ে বা সমগ্র মেয়েজাতি! তা হলে ‘যোনি সম্বন্ধীয় বোধ বা ধারণা’র বাহক কে? অবশ্যই পুরুষ বা পুরুষজাতি! এই ভাবনা যেন এক আবিষ্কার— আমি সশব্দে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলাম!

জানি না তুমি আমাদের সঙ্গে একমত হবে কি না। সুব্রত-কিন্তু হয়েছে। ওঃহো! বলা হয়নি, সুব্রত মানে আমার সেই বিস্ময়-বন্ধু— বিস্ময়-বন্ধুর নাম সুব্রত। ও এসেছিল, বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময়… ও-ই বলেছিল, ‘আমি সুব্রত!’ সুব্রত কাগজপত্র দিয়ে গেছে। যাই হোক, আবিষ্কারের আনন্দে আমি মশগুল ছিলাম আর এই প্রথম কোনও কাজের জন্য নিজেকে তৈরি করে নিচ্ছিলাম। আর এটা করতে গিয়ে ওই ভাবনাকে মোডিফাই করতে হয়েছে— মাস্টারমশাইয়ের বইপত্রের মধ্যে একটা পেপারকাটিং পেয়েছি, একটি সিনেমার আলোচনা— সিনেমার গল্পটা নিজের ভাষায় বলতে পারি, কিন্তু তা তত বিশ্বাসযোগ্য না-ও হতে পারে আবার আমার সম্পর্কে তুমি ভুল ধারণার খপ্পড়ে পড়তে পারো; বরং আলোচনাটা এখানে টুকে দিই, আর দু’একটা মন্তব্য অবশ্য আলোচনার মধ্যে ব্রাকেটে রেখে দিতে পারি। এমনও হতে পারে সিনেমাটা তুমি দেখেছ, তা হলে মিলিয়ে নিতে পারবে আর যদি না দেখে থাক, দেখার ইচ্ছে হতে পারে, যেমন আমার— দেখার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে আছে— ছবির নাম নিম্ফোম্যানিয়াক, ডেনিশ ফিল্ম। দেখেছ না কি? ‘ইউটিউব’ সার্চ করেছিলাম, ট্রেলার আছে… বুঝতে পারছ ইচ্ছেটা? তা হলে পড়ো!

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)

মার খেয়ে আধমরা হয়ে একটা বিচ্ছিরি নোংরা গলিতে পড়েছিল জো (একটি মেয়ের নাম, প্রধান চরিত্র)। সেই বরফঝরা রাতে, ভাঙা অ্যাসবেস্টস আর পুরনো ড্রামের পাশে, নোংরা জলে মাখামাখি মেয়েটাকে যত্ন করে নিজের বাড়িতে তুলে এনেছিলেন সেলিগম্যান। (এই) বৃদ্ধ পড়ুয়া মানুষটি সারাজীবন শুধু বইয়ের সঙ্গেই সহবাস করেছেন। কোনও নারীর শরীর ছুঁয়েই দেখেননি কোনও দিন। নিজেকে ‘যৌনতা-বিযুক্ত’ (মানে যোনিবোধ না থাকা!) বলতেই ভালোবাসেন তিনি। এমন এক পুরুষের কাছেই তার জীবনের ঝাঁপি উপুড় করে দেয় জো— নিজেকে যৌনতা-আসক্ত বা সেক্স-অ্যাডিক্ট না বলে ‘নিম্ফোম্যানিয়াক’ বলতেই সে বেশি পছন্দ করে! অনন্ত কামনাময়ী সে নারীর বাসনা-তাড়িত যৌন-সফরের ধারাভাষ্যই এই ছবি। পরিচালকের ‘নৈরাশ্য ট্রিলজি’র (‘নৈরাশ্য’ > মিচেল হেসম্যানকে মনে পড়েছে) তিন নম্বর সিনেমা। দু’টো পর্ব জুড়ে, আটটা অধ্যায়ে, দীর্ঘ এক স্বীকারোক্তির গড়নে ছড়িয়ে থাকে গোটা ছবিটা। সে এক আশ্চর্য সংলাপ। কেতাবের পাহাড়ে জ্ঞানের নুড়ি কুড়িয়ে বেড়ানো বৃদ্ধ যে কোনও প্রসঙ্গেই তাঁর বই-পড়া বিদ্যার নানা রেফারেন্স ঝাড়েন। আর কামনা-সাগরে নাও ভাসানো ওই মধ্যযৌবনা বাসনা-বিলাসিনী সে-সব তত্ত্বকথার সূত্র ধরেই (তার মানে ‘তত্ত্বকথা’র মধ্যে যৌনতা ছিল!) তার নতুন নতুন যৌন-অভিযানের (মিচেলের ‘দার্শনিক অভিযান’-এর সঙ্গে তুল্য!) বৃত্তান্তে ঢুকে পড়ে।

যেমন মেয়েটি কিশোরীবেলায় তার কৌমার্য-হরণের প্রসঙ্গে যখন বলে তার সেই তরুণ প্রেমিক তিনবার সোজাসুজি, পাঁচ বার উলটো করে তার শরীরে প্রবেশ করেছিল, ওই জ্ঞানবৃদ্ধের তক্ষুনি ‘ফিবোনাচি’ (ব্যাপারটা আমার জানা নেই) সংখ্যা-সিরিজের কথাই মনে হয়। আবার সেলিগম্যান যখন বাখ্‌-এর পলিফনি-র ব্যাখ্যা করেন, যেখানে একটা ‘বেসভয়েস’ থাকে আর পিয়ানোর দু’পাশ থেকে দু’টো স্বর এসে সিম্ফনিটাকে সম্পূর্ণ করে, জো-রও তখন তার তিন পুরনো প্রেমিকের কথা মনে হয়। তাদের এক জন ‘এফ’, কী কমনীয় যত্নে তার শরীর ছুঁত (সোমার মতো?)! জো’র শরীর যেভাবে আদর চাইছে, সেভাবেই তাকে আদর করত। মিলনের সময় জো’র সুখ, জো’র কামনা-তৃপ্তির কথাই সে খেয়াল রাখত। আর এক জন ‘জি’, সে যেন বিছানায় চিতাবাঘটি! বাঘ যেমন তার থাবার মধ্যে হরিণছানাটিকে নিয়ে খেলা করে, ‘জি’ তেমনই ছন্দ-ক্ষিপ্রতা-কৌতুক-আধিপত্য নিয়ে বিছানায় জো’র শরীরটাকে দখলে রাখে। কিন্তু ওর যৌন-অর্কেস্ট্রার তৃতীয় স্বর, ওর সেই প্রথম প্রেমিক জেরোম, যাকে সে বার বারই ফিরিয়ে দিয়েছে, আর বার বারই তার কাছে ফিরে যেতে চেয়েছে!

জেরোমের সঙ্গে থাকার সময় সে বুঝতে পারে, যৌনতার সবচেয়ে গোপন, রহস্যময়, উত্তেজক উপাদানটার নাম প্রেম (আমার সেই জন্মদিনের কথা মনে পড়ছিল, ‘প্রেম মানে’…)। কিন্তু জেরোমের সঙ্গে তৃতীয় বার দেখা হওয়ার পর সে যখন গহন সংরাগে তাকে বলে: আমার শরীরের সমস্ত গহ্বরগুলো তুমি পূর্ণ করে দাও, তার একটু পরেই মিলনের তুঙ্গ মুহূর্তে জো হঠাৎই বুঝতে পারে, তার আর কোনও অনুভূতি হচ্ছে না! মিলনের কোনও আনন্দ, উত্তেজনা তাকে ছুঁচ্ছে না! এবং এখান থেকেই ছবিটা কোনও নিম্ফোম্যানিয়াক নারীর যৌন অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি আর থাকে না।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)

পরিচালক অবশ্যই দর্শকদের শক(!) দেওয়ার ঢালাও বন্দোবস্ত রেখেছেন। কোনও অ্যানাস্থেসিয়া ছাড়া যোনির ভেতর তারের হুক ঢুকিয়ে জো’র গর্ভপাতের দৃশ্যে আপনার গা গুলোতে পারে। ‘কে’ নামের পেশাদার সেডিস্ট যুবকটি যে ক্লিনিকাল নির্লিপ্তি আর নিষ্ঠুরতার চাবুক মেরে জো’র শরীর ফালাফালা করে, আপনার সেটা সহ্য না-ও হতে পারে। ছবির ন্যারেটিভে আপনি সূক্ষ্ম জাতিবিদ্বেষের আভাসও পেতে পারেন।

কিন্তু ছবিটা শেষ অবধি অনেক পুরুষের গায়ের গন্ধ আর পুরুষাঙ্গের নানান আকারের ভিড়ে এক নারীর একলা, নির্জন হয়ে থাকার গল্প (এত যৌনতা, তবু একা-নির্জন! কেন?)। সেই মেয়ের মনখারাপ হলে এখনও ছোটবেলার পাতা জমানোর খাতাটা খুলে বসে। ‘কে’র হাতে রোজকার হিংস্র রুটিন-নির্যাতন সইতে যাওয়ার রাস্তায় সে আকাশভরা জ্যোৎস্নার সামনে থমকে দাঁড়ায়। এবং যৌনতার সব অনুভূতি হারিয়ে ফেলার পরেও, তার প্রথম ও একমাত্র প্রেমিকের বাহুবন্ধনে অন্য মেয়েকে দেখলে তার তীব্র ঈর্ষা (!) হয়, এখনও (কেন?)। জেরোমের বাড়ির দরজা থেকে ফিরে, টিলার ওপরে শীতের পাতাঝরা গাছটার সামনে নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ জো— এটাই ছবির শেষ দৃশ্য হতে পারত। কিন্তু অতটা রোমান্টিক দার্শনিকতায় তো ছবিটা শেষ করতে চাননি পরিচালক। তাই পিস্তল পকেটে জো-কে আবার ফিরে যেতে হবে জেরোমের কাছে। কিন্তু তার বন্দুক থেকে গুলি বেরোবে না। বরং জেরোমই তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে বাড়ির পেছনে ওই নোংরা গলিতে ফেলে যাবে। যেখান থেকে সেলিগম্যান তাকে কুড়িয়ে আনবেন (আর ‘যৌন-অভিযানের বৃত্তান্ত’ শুনবেন এবং শুনতে শুনতে…)। তা হলেই তো সম্পূর্ণ হবে নিম্ফোম্যানিয়াকের জীবনবৃত্ত বা বৃত্তান্ত!

আমার ভাবনা-বদলের ব্যাপারটা নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পেরেছ! আমি আর বলছি না। কিন্তু একটা কথা বলি, আমার খুব মনখারাপ হয়েছে জো’র জন্য। আবার, আমি তাকে বুঝতেও চেয়েছি, এম্প্যাথির স্পেস থেকেই— আমি বুঝতে পারিনি বাট আই ফিল এক্সাইটমেন্ট। কিন্তু সেলিগম্যান— অমন জ্ঞানী মানুষ হয়েও তিনি ‘যোনি’র খপ্পড়ে পড়লেন! কেন?

বুঝতেই পারছ, রিভিউ-তে ব্যাপারটা নেই। উইকিপিডিয়া থেকে জেনেছি, অনুমান করেছি কথা বলতে বলতে ক্লান্ত জো ঘুমিয়ে পড়েছিল আর শুনতে শুনতে সেলিগম্যানের মধ্যে জেগে উঠেছিল যৌনতা। ঘুমন্ত জো জেগেই দেখে উলঙ্গ সেলিগম্যান… সঙ্গমোদ্যত… জো প্রতিরোধে প্রস্তুত… সেলিগম্যান কিছু বোঝাতে চান কিন্তু জো গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়…

সেলিগম্যান আমাকে ভাবাচ্ছেন। সেলিগম্যান থেকে আমি অনায়াসে মিচেল হেসম্যানে ঢুকে পড়েছি, মিচেলের কি কোনও ‘যোনি-বোধ’ ছিল না? বা প্রেম? যদিও প্রেম সম্বন্ধে আমার ধারণা যথেষ্ট ঘোলাটে। সেটা আরও ক্লেদাক্ত হয়েছে সুব্রতর কাছ থেকে কাগজপত্র পাওয়ার পর, সেখানে একটা ঘটনা— খবর হয়েছিল, খবরের শিরোনাম ছিল, মহিষাদলের হোটেলে বিক্রি দেগঙ্গার কিশোরী— আর টুকতে ভালো লাগছে না, গল্পটা বলা যেতে পারে। গল্পটা এ রকম—

বছর চোদ্দোর এক কৃষক ঘরের মেয়ে। অভাবী ঘর। তবু স্কুলে যায়। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে এক যুবকের সঙ্গে তার আলাপ হয়। ‘প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে’ (কথাটা খবরে লিখেছে)। তার পর যুবক তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। অভাবের ঘর থেক নিস্তার চায় মেয়ে। তাকে নিয়ে ছেলেটি পালায়। এক হোটেলে গিয়ে ওঠে। তার পর কল্পনা করা যেতে পারে, মেয়েটি প্রেমিকের কাছে তার ‘যোনি’ খুলে দেয়।# পরের দিন, ঘুম ভাঙার পর, সে দেখে ছেলেটি নেই। ক্রমে জানতে পারে, তাকে বিক্রি করে দিয়ে তার ‘বর’ চলে গেছে।…

এ দিকে মেয়ে বাড়ি ফেরেনি… দেরিতে থানায় অভিযোগ দায়ের। তদন্ত… মেয়েটিকে দেহব্যবসায় নামানো হয়েছিল— মেয়েটির একটা কথা টুকে দিতে ইচ্ছে করছে, ‘দেহব্যবসার জন্য রাজি না হওয়ায় আমাকে প্রচণ্ড মারধরও করা হয়েছিল। খেতেও দিত না!’

এই গল্প কেন বললাম, বলো তো! একুশ তারিখে আমি যে আলোচনা করব, এটা তার একটা রিহার্সাল— এর সঙ্গে একটা ভাবনা, আদতে প্রশ্ন, শেয়ার করা যাক— বইয়ের জগতে সেলিগম্যানের জ্ঞান-অভিযান ‘যোনি’-বর্জিত ছিল বলেই কি তাঁর এই ট্র্যাজিক পরিণত?

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

শেষপর্যন্ত প্রশ্নটা আমার কাছেই থেকে গেল! এবং আমার মনে হল আমাদের সকলের, মানে মানুষের সব রকমের ট্র্যাজেডির মূলে অস্বাভাবিক যৌনতা বা যোনি-বিমুক্ত জ্ঞান! এক কথায় যোনি। অর্থাৎ যোনি-অনুষঙ্গটা থেকেই যাচ্ছে। মনে হল, আমি একটা তত্ত্ব আবিষ্কার করে ফেলেছি। মানে সত্য! সত্যই তো— যতগুলো ট্র্যাজিক ঘটনার মধ্য দিয়ে আমি এসেছি, কোনওটিই তো এর বাইরে নয়! এবং আমার কাছে যেসব কাগজপত্র আছে, তারাও সাক্ষ্য দেবে— প্রতিটি ঘটনাই ‘যোনি’-কেন্দ্রিক, প্রতিটি ঘটনা কারণ হয়ে আর-একটি করে ঘটনা ঘটিয়েছে… ঘটনাপ্রবাহ— আমি আর সুব্রত অপ্রত্যক্ষভাবে এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে রয়েছি— এই উপলব্ধির জন্য সুব্রতকে ধন্যবাদ দেওয়ার কথা ভাবনায় আসতেই ফোন তুলে নিলাম, কিন্তু পরক্ষণে মনে হল, এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে থাকা মানে তো ‘যোনি’-ছুঁয়ে থাকা! ফোন নামিয়ে রাখলাম। জো’র কথা মনে পড়ল। জো অনেক ভুল করেছে কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক ভুল, মনে হল, যৌন-অভিজ্ঞতা না থাকা এক পুরুষকে তার যৌন-অভিযানের গল্প শোনানো! যা পুরুষটির মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা যৌনতাকে জাগিয়ে দিয়েছিল।

এই ভুল আমি করতে পারি না!

কিন্তু কাকতালীয়ভাবে কিছু সময় পর সুব্রতর ফোন এল। এ ফোন নিতান্তই যাকে বলে ‘টাচে থাকা’। আগেও এসেছে। আমাকে উৎসাহ দেওয়া। নিজের উদ্বেগ জানানো। এই সব। আজ আমি ওকে নিশ্চিন্ত থাকতে বললাম। জানালাম যে, ব্যাপারটাকে আমি আয়ত্তে আনতে পেরেছি। এবং তাকে এও জানালাম যে, লেকচার দিচ্ছি এমন স্বপ্নও দেখেছি। তার জন্য তাকে ধন্যবাদও জানিয়ে দিলাম।

একটা কথা তোমাকে জানানো হয়নি— আমি স্কুলে লেকচার দেব, এটা জেনে মা-বাবা, দাদা সকলেই খুশি। সোমাকে জানিয়েছি, সেও খুশি— সম্ভবত সে শুনতে আসবে, একটু খোঁজখবর নিতে চেয়েছিল কীভাবে সুযোগটা এল আর-কী; আমি বলেছি, ‘সে অনেক কথা, আসছিস তো! তখন কথা হবে।’

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *