সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)

সুরঞ্জন প্রামাণিক

ধর্ষণ… ও  পাচারের  গল্প: এ এক  আশ্চর্য  জীবনচক্র

তোমার নিশ্চয় শুনতে ইচ্ছে করছে, লেকচার কেমন হয়েছিল! এক কথায়, ‘ইনক্রেডেবল’। আমাকে প্রশংসা করার সময় সুব্রত শব্দটা ব্যবহার করেছিল, ‘জাস্ট ইনক্রেডেবল!’ শব্দটা যে আমার অচেনা, তা নয়। কিন্তু তা যে আমার ক্ষেত্রে ব্যবহার হতে পারে, আমার ধারণা ছিল না। কোনও কথা বলতে পারিনি। কেমন এক বিহ্বলতা কাজ করছিল। ওই সময়, সভা শেষে আমার পাশে সোমাও ছিল। সে বলেছিল, ‘দারুণ বলেছিস কিন্তু!’ তাকেও কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে পারিনি। আমি হয়তো তখনও সেই ঘোরটার মধ্যে ছিলাম। ওঃহো! ঘোরের কথা তো বলাই হয়নি তোমাকে!

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (ষষ্ঠ অংশ)

আমাদের অনুষ্ঠানের সময়— ঘোষণা রাখা হয়েছিল দুপুর দু’টো থেকে। সোমা আমাদের বাড়িতে আসবে, কথা ছিল। ওর আসতে একটু দেরি হওয়ায়, স্কুলে পৌঁছতে আমারও দেরি হয়েছে। তবে দু’টোর আগেই পৌঁছে গেছি। সুব্রতর সঙ্গে আর কথা বলার সুযোগ হয়নি। সুব্রত তখন মাইক্রোফোন হাতে কথা বলছে। তার মধ্যে আমাকে দেখে সে মাইকে ঘোষণা করল আমার নাম, আগমন এবং মঞ্চে আসন গ্রহণ করবার অনুরোধ জানাল। আমি সোমাকে কোথাও বসার কথা বলে মঞ্চে গিয়ে বসলাম। ঢাউস তিনটে ক্লাসঘরের পার্টিশন সরিয়ে একটা বড় হলঘরের শ্যেপ দেওয়া হয়েছে। ক্লাসের টিচার্স প্ল্যাটফর্মকেই ডায়াস হিসাবে সাজানো হয়েছে। আমি আর বর্ণনা রাখছি না। ডায়াসের দেওয়ালে একটা ফেস্টুন। তাতে যৌথ উদ্যোগে এই আলোচনাসভা জানানো হয়েছে। মঞ্চে স্কুলের হেড দিদিমণি, একজন লেডি পুলিশ আর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক এবং আমি।

আমার সামনে কতজন মেয়ে? আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম। শ’তিনেকের বেশি হতে পারে। আমি মেয়েগুলির মুখ দেখার চেষ্টা করছিলাম। এর মধ্যে পুলিশ আধিকারিক স্বাগতভাষণ শুরু করেছেন।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)

দ্য রেপ অফ পার্সফোন, অস্ট্রেলিয়ান শিল্পী রুপার্ট বানির আঁকা ছবি, ১৯১৩

তাঁর পাচারকথা শুনতে শুনতে আমার মনে হল, সামনে, যদি তিনশো জন বসে থাকে তা হলে তিনশোটি ‘যোনি’ বসে আছে— এরা ‘কারণ’ হয়ে উঠছে, আইনত নিষিদ্ধ ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য আমরা এখানে সমবেত হয়েছি… প্রত্যেকটি মেয়ের ‘যোনি’ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আর বীভৎস দৃশ্য সব… যা মনে ছিল না, তাও মনে পড়ল— আমাদের বাড়ির পাশে কামদুনির মেয়ে, দিল্লির নির্ভয়া, এমনকী মণিপুরে যোনিতে বুলেট পুরে দেওয়া… সেই যে এক মেয়ে, কী যেন নাম? যার যোনিতে পাথর পুরে দেওয়া হয়েছিল!… হেডদিদিমণি তাঁর কথা শুরু করেছিলেন সার্বিকভাবে মেয়েদের খারাপ থাকার প্রেক্ষিতে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য যখন বললেন, চমকে ওঠার মতো, আমি নোট করেছি— বিশ্বাস করতে ভয় হয়— (তোমাকে তথ্যটা জানাই— প্রতি ষোলো মিনিটে একটি ধর্ষণ, প্রতি ঘণ্টায় একটি মেয়ে পণের বলি, প্রতি চার মিনিটে একটি বধূ নির্যাতন, প্রতি তিরিশ ঘণ্টায় একটি মেয়ে গণধর্ষণের শিকার…) তাঁর কথা শুনতে শুনতে মনে পড়েছিল, অ্যাসিড আক্রান্ত মেয়েদের কথা, প্রেমিকের প্রতারণা… ওঃ! প্রেম! আমার ভেতর থেকে কেমন একটা কোঁকানি বেরিয়ে এসেছিল… তখনও তিনি বলছেন, ‘প্রতি চার ঘণ্টায় অন্তত একটি মেয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে—  আমাদের মূল আলোচনা এই পাচার বিষয়ে…’

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)

আমি কী বলেছিলাম— এখন আর তা মনে করে বলতে পারব না। তবে এক জনের হাতে ‘৬০০ নাবালিকার যৌন নিগ্রহ’র খবর ছিল আমার কাছে। এই খবরে ‘চকোলেট আর জামাকাপড়ের টোপ’ দেখানোর কথা ছিল। এই খবর উল্লেখ করে আমি টোপের সঙ্গে খিদে জুড়ে দিয়ে কথা বলেছিলাম, এটা মনে আছে। টিভির বিজ্ঞাপনে দেখা চকোলেট পাওয়ার ইচ্ছা থেকে বাচ্চা মেয়েরা এই টোপ গিলতেই পারে, কারণ তারা ওই বালিকা বয়সে যথেষ্ট ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে পারেনি, মানে বুঝতে শেখেনি— মনে পড়ছে এ রকম কিছু বলেছিলাম। তার পরই আলোচনার বিষয়ে ঢুকেছিলাম। মনে আছে, একটা ডেফিনিশন রেখে তার সঙ্গে আমি ডিম্যান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই জুড়ে কথা বলেছিলাম, মনে পড়ছে, গত সেন্‌সাস থেকে পাওয়া নারী-পুরুষের অনুপাত উল্লেখ করে বলেছি, ‘তোমরা অনেকেই, অন্তত ইলেভেন-টুয়েলভে আছ যারা, বুঝতে পারবে, যে হেতু মেয়ের সংখ্যা কম এবং তোমরা নিশ্চয় ‘বেশ্যা’ মানে জানো! কি জানো তো?’ মৃদু একটা হ্যাঁয়ের গুঞ্জন উঠেছিল। থেমে গেলে বলেছিলাম, ‘যৌনসুখ কেনাবেচার বাজার তৈরি হয়েছে— পাচার হল এই বাজারে ‘মাল’ সাপ্লাই! জাতীয় অর্থনীতিতে পাচারের ‘অবদান’ উল্লেখ করে বলেছিলাম, ‘আমরা মেয়েরা ‘মাল’ হব কি না এটা নির্ভর করছে আমাদের চেতনার উপর!’ এর পরেই কেন জানি না আমি  বলেছিলাম, ‘প্রেম এক মারাত্মক ফাঁদ!’ বলার পরেই মনে হল, আমি ঠিক বলিনি। তাকে শুধরে নিতে গিয়ে বললাম, ‘প্রেম শব্দটাকে কিন্তু কোট-আনকোটে রাখতে হবে।’

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)

তার পর প্রেম-প্রতারণার যে গল্প তোমাকে শুনিয়েছি, ওটার সঙ্গে আরও একটা খবরের গল্প— প্রেমে প্রতারিত, গর্ভপাতে অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টে গর্ভবতী— শোনাতে গিয়ে আমার মনে পড়ল, বাবার সেই বন্ধুর মেয়ের গল্প— এসব উদাহরণ রেখে, মনে আছে, আমি বলেছিলাম, ‘তোমাদের অনেকেরই দেহে এখন ‘পাশব’ পর্যায় চলছে, মানে প্রতি মাসে মা হওয়ার জন্য দেহ প্রস্তুত হয়, পুরুষের প্রতি একটা টান দেহে তৈরি হয় এই বয়সে— একেই আমরা প্রেম মনে করি আর ফেঁসে যাই…’ তখনই মনে হয়েছিল, কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, কোট-আনকোট বর্জিত প্রেম কাকে বলে— তা কি আমি জানি? না-জানার জন্যই হয়তো আমার ভাষণ সমাপ্তির দিকে অভিমুখ পেল— আমার আগের বক্তারা যেসব করণীয় ও না-করণীয় উল্লেখ করেছেন তার সঙ্গে আমি যোগ করলাম, ‘এ সব মনে রেখে বেঁচে থাকা প্র্যাকটিস করার সঙ্গে, এটাও মনে রাখতে হবে, ‘বিশ্বাস’ও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে! এমনকী তোমার কাছের মানুষের প্রতি যে বিশ্বাস সেই বিশ্বাস-পথে তোমার বিপদ আসতে পারে।’ তার পর একটা (অ)কল্পনীয় ঘটনা বলেছিলাম। সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় থেকে ঘটনাটা জানা ছিল— গল্পাংশটা তোমাকে পড়ে শোনাই, শোনো!

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)

উত্তরপ্রদেশে একটি ষোলো বৎসরের মেয়ে ধর্ষিত হইয়াছে। শিরোনামটিতে যথেষ্ট চমক নাই। ‘ধর্ষণ’ শব্দটির সঙ্গে এখন আমজনতার নিত্য ওঠাবসা। দেশের যত্রতত্র প্রতিনিয়ত মেয়েদের বিরুদ্ধে হিংস্রতার অগণিত খবর মিলিতেছে, তাহাদের একটি বড় অংশ যৌন নির্যাতন। এই জাতীয় খবর তাই নাগরিকদের আর নূতন করিয়া ভাবায় না। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের ঘটনাটির মধ্যে কিঞ্চিৎ নূতনত্ব আছে। সেখানে শুধুমাত্র একটি ধর্ষণ হয় নাই, পরিপাটিভাবে ধর্ষণের ক্ষেত্রটি প্রস্তুত করা হইয়াছে। এবং, যাহারা প্রস্তুত করিয়াছে তাহারা নিগৃহীতার ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’, দুই অ-প্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী। তাহারাই ধর্ষককে নিগৃহীতার বাড়ি পৌঁছাইয়া দিয়াছে, অকুস্থলে উপস্থিত থাকিয়া ভিডিয়ো তুলিয়াছে এবং অনলাইনে তাহা আপলোড করিয়াছে। পুলিশ জানাইয়াছে, যৌন উত্তেজনার স্বাদ লইবার দুর্দম ইচ্ছার তাড়নাতেই এই (অপ)কর্ম। কেবল অভিনব নহে, ঘটনাটি ভয়াবহ।

এই ঘটনার কথা বলার পর বলেছিলাম, ‘সবচেয়ে আশ্চর্য কী জানো, এই ঘটনায় যেমন নাইন্টি এইট পার্সেন্ট ধর্ষণের ঘটনায় তেমন যে মেয়েটি নির্যাতিত হয়েছে, অন্তত একজন তার পূর্ব পরিচিত!’ 

নাহ, ক্লান্ত লাগছে, শুয়ে পড়ব। শুভরাত্রি!

সুপ্রভাত! আজ সকালেই লিখতে বসেছি। বেলার দিকে কাজ আছে। না বসলেও চলত। কিন্তু স্বপ্নের কথাটা বলতে হবে। আর-একটা কথা বলা হয়নি, সেটা আগে বলি— লেকচার দিয়ে আমি কিন্তু সাম্মানিক পেয়েছি! আচ্ছা, এর আগে, আমার লেখায় কোন্‌ সময়ে লিখছি, এটা বোঝার মতো কোনও সময় চিহ্ন পেয়েছ? সম্ভবত না। যাই হোক, সেই যে বলেছিলাম না, পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে বসতে হবে, সে বসা তো আজও হয়নি, তবে কাল স্বপ্নে সেটা হয়েছে। কী হয়েছে— বলি, শোনো!

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

আমরা কোথাও মিট করেছি। পাঁচ জন অর্ধবৃত্তাকারে বসেছে আর অর্ধেক বৃত্তের মাঝখানে আমি। মানে পাঁচ জোড়া চোখের দৃষ্টি আমার মুখের উপর পড়ছে আর আমার অবস্থা ভাবো! আমার এক সময় মনে হল এই অর্ধবৃত্ত পূর্ণ হতে পারে— বৃত্ত ছোট হতে হতে… কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তখন আচমকা এক জন আবিষ্কার করল, আমাদের চার পাশে কোথাও ফুল-পাখি-প্রজাপতি নেই। সে কেমন আর্তনাদ করে উঠল।

আমি বলে উঠলাম, থাকবে না, এটাই তো স্বাভাবিক! চেয়ে দেখ, এটা কিন্তু মরুভূমি নয়! বিবর্ণ ঘাসগুলো দেখ!

এক জন অস্থির হয়ে বলল, কেন নেই?

সুব্রত বলল, এখানে জীবনচক্রটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

আমি বললাম, তা হলে আমরা এখানে একটা গাছ পুঁততে পারি!

তার পর সকলের মাথার মধ্যে যেন পাখির ডাক প্রজাপতির ওড়াউড়ি শুরু হয়ে গেল আর আমার ঘুম ভাঙল একটা ফুলঝুরি পাখির শিসে… আমি এই স্বপ্নের মানে খুঁজতে যাইনি! কিন্তু আমাদের বসাটা— একটা দারুণ ছবি হয়ে আছে!

আজ এ পর্যন্ত— আর সময় পাব না।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *