‘সঙ্গোপনে অলোকরঞ্জনা’

পূর্বা মুখোপাধ্যায়

মেধা, মনন, আবেগ, আভিজাত্য, মাত্রাবোধ, পরিশীলিত বাক্‌শক্তি, নির্মোহ অথচ ভালোবাসাময় অস্তিত্ব = আমার অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। শুধু কবিতায় নয়, জীবনে, শুদ্ধ সৌন্দর্যকে তিনি রেওয়াজ করেছেন। নিজস্ব রীতি করেছেন। আর তা করেছেন নিঃশব্দে। আলোড়ন তুলে নয়। কেন-না আলোড়ন তো সত্য নয়, সত্য শুধু পালটে নেওয়া। নিজ অবস্থান, পালটাতে হয়ই। কিন্তু কবি কেন চিৎকার করবেন? সত্য কি চিৎকৃত? সে গোপনে ঝিরিঝিরি হাওয়ায় ভেসে আসে। কানে কানে বলে, এসেছি। কবিও শব্দের ভুবনজোড়া আসনখানি টেনে এনে কবিতায় বিছিয়ে দেন। মৃদুবাক কবির সঙ্গে নিঃশব্দ সত্যের বিনিময় হয় প্রেম, আরও শুদ্ধতা। আমার অলোকরঞ্জন, সেই শুদ্ধতার কবি। সর্বাঙ্গে চন্দনগন্ধের কবি। আলোকিত আনন্দ। কখনও তাঁর কবিতার আয়নায় দুঃখের কাজল পরিনি। আলুথালু হইনি। বেদনাকে পরম মমতা ছুঁইয়ে তিনি এমন বড়ো করে দিয়েছেন যে, সেই প্রথম বয়সে, মনে করতে শিখেছি, বেদনাই যদি না থাকে তো কী নিয়ে বাঁচব!

তাঁকে দূর থেকে দর্শন করেছি, কখনও কাছে যাইনি, কেন-না তিনি, আমার শব্দে গড়া প্রভু। শব্দের প্রভু। তাঁকে আমি খুব ভেতর থেকে চিনব বলেই বাইরে থেকে দূরবর্তী হব, এই ছিল সংকল্প। আঠারো বছর বয়সে আমার সদ্য বৃষ্টিস্নাত মনে তাঁর পায়ের ছাপ ফুটে উঠল। কে না জানে, সে বয়স মুগ্ধতাকে প্রশ্ন করে না, আত্মসমর্পণ করে। “তবু কি আমার কথা বুঝেছিলে, বেনেবউ পাখি?/ যদি বুঝতে পারতে, নারী হতে।/ আমাকে বুঝতে পারা এতই সহজ?/ কারুকেই বোঝা যায় নাকি?” এই পঙ্‌ক্তিমালা, প্রথম আমার শ্রুতিপথে বেজে উঠল যখন, তখনও আমি নারী হওয়া কী, তা জানি না। কিন্তু বেনেবউ পাখি কেমন, তা জানি। ইচ্ছে হল, কবিকে বুঝতে পারার জন্যেই যেন আমি নারী হই। তখনও তাঁর কোনও ছবি দেখিনি। সামনাসামনি তো নয়ই। ব্যক্তি অবয়ববর্জিত কণ্ঠস্বর কবিতার অক্ষরে অক্ষরে ফুটে উঠে আমায় উন্মনা করে দিল। আমার যাত্রা শুরু হল, তাঁর দিকে।

কেমন সে যাত্রা? নিষিদ্ধ কোজাগরীর শুধুমাত্র দুঃখ কবিতাটির সঙ্গে ওই পরিচয়ের পর আমি তাঁর ‘যৌবন বাউল’ বইটা হাতে পেলাম। তখনও মন বোদ্ধা হওয়ার ভান জানে না। আমি হাঁ করে ওই যৌবন বাউল নামটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাদল বাউল বাজায় রে একতারা

জানি, কিন্তু যৌবন বাউল?

আমার মন যে সেই সময় তাঁর কাছে প্রথম গ্রন্থনামে বাক্‌প্রতিমার প্রয়োগকৌশল শিক্ষা করল, তা অনেক পরে টের পেয়েছি। আর কী শিখেছি তাঁর কাছে? শব্দকে তার অর্থের চূড়ান্ত সামর্থ্যে প্রয়োগের প্রয়াস করতে। একটি শব্দ যেন শুধুমাত্র অর্থ নয়, তার ধ্বনিগুণটুকুও নিঙড়ে দিতে পারে, তা লক্ষ করতে তিনি আমায় শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন ভাবকে কেন্দ্রে স্থির রেখে কবিতাকে কোলাহলশূন্য করতে। শব্দের নিরর্থক প্রয়োগ থেকে নিবৃত্ত হতে, যা না পারলে ভাব কেন্দ্রীভূত হয় না।

অলোকরঞ্জন যখন প্রথম আমার গোচরে আসেন, তার কিছু পরে আমি জীবনের প্রথম হোঁচটটি খাই এবং প্রচুর রক্তপাত হয়। সেইসব রক্তপাতের দিনে তিনি ছিলেন আমার গোপন শ্রুশ্রূষা। যৌবন বাউলের বিভাব কবিতা আমার মাথা থেকে গড়িয়ে নামত রক্তজালে। শব্দগুলি ঝংকার তুলতে তুলতে বলত, বাজো! আজ এত বছর পর, সেই আত্মত্রাণের আনন্দ আমায় এ লেখা লিখতে গিয়ে কাঁপাচ্ছে:

“পটভূমিকা অন্ধকার/ আপন স্বত্ব অধিকার/ রাখুক, আমি শরীর নোয়াব না,/ একটিমাত্র রাখাল যাক/এ মাঠ একলা পড়ে থাক/ নীরবে, আমি এ মাঠ ছাড়ব না।/ মরণমদমাতাল ডোম/ সবি করুক উপশম/ শ্মশানে, আমি জীবন ছাড়ব না…”

অলোকরঞ্জন এইজন্য আমার নিজের কবি, তিনি আমায় নিশ্চিত আত্মহত্যাস্পৃহা থেকে উদ্ধার করে জীবনের দিকে ছুড়ে দিয়েছেন। আমি প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম, ময়লা হয়ে এই কবির কাছে আসতে নেই। তাঁর অন্যান্য কাব্যের থেকে এই প্রথম কাব্যটিই যে আমার সর্বাধিক প্রিয়, এমন হওয়ার পিছনে প্রকৃত কারণটি এই-ই।

তাঁর কবিত্বশক্তি ভাষার ইন্দ্রজাল রচনা করে। শব্দের নিহিত আলো অন্ধকারকে তিনি একই আঙুলের টানে বাজান। যেন “দুঃখ নহে সুখ নহে গো গভীর শান্তি এ যে”!

একদিন সন্ধে ছ’টায় আমি অনার্স টিউশন নিতে গিয়েছিলাম। পড়া চৌপাট করে আমার প্রিয়সখা গুরুদেব বললেন, আজ পড়া নয়, আজ শুধুই কবিতা হবে। সেদিন তাঁর মুখে প্রথম শুনলাম “গাঁয়ের মহিম আর চড়কের মেলায় যাবে না…”। মনে আছে এই দেবযান কবিতাটি শুনে সেদিন চোখে আপনা থেকে জল উপচে গিয়েছিল। কান্না না লুকোবার আনন্দ যে কেমন, তাও টের পেয়েছিলাম। তারপর একে একে কল্যাণেশ্বরীর হাট, বুদ্ধপূর্ণিমার রাত্রে, বন্ধুরা বিদ্রূপ করে, একটি শবযাত্রা, দৃশ্য-কাব্য শুনলাম তাঁর মুখে। আমি বইখানা কেড়ে নিয়ে আরও দু’টো পড়লাম। শাদা মেঘ দাবি করে, আর একটি কথার মৃত্যুবার্ষিকীতে। সেইসব হারানো দিনগুলোর মতোন, যিনি তখন কবিতা পড়ছিলেন, যাঁর কবিতা পড়ছিলেন, কেউই আর ফিরে আসবেন না। অলৌকিক দোকানপসার এখন তাঁদেরও জন্যে বুঝি সেজে উঠেছে, দিগন্তে।

নিষিদ্ধ কোজাগরী আর রক্তাক্ত ঝরোখা তাঁর লেখা আমার অন্য দু’টি প্রিয় কাব্য। মনের খুব বেশি সংলগ্ন। পরবর্তী অলোকরঞ্জনকে আমার যে বিদগ্ধ, প্রণম্য ও আমাপেক্ষা দূরবর্তী মনে হয়, তা আমার পরাজয়। আমার অভ্যাসচর্চিত মনের সীমাবদ্ধতা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *