শঙ্খ ঘোষ: ‘আমার চলা ছিল আমার নিজস্ব’

রাহুল দাশগুপ্ত

তুমি যশোধরার ছেলে? শঙ্খ ঘোষ জানতে চাইলেন।

বললাম, হ্যাঁ।

শঙ্খ ঘোষ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই প্রথম তাঁর বাড়িতে গেছি। রবিবারের সকাল। একটু একটু করে ভিড় জমছে। আমরা তখন ‘এবং সমুদ্র’ বলে একটা পত্রিকা করি। সেই পত্রিকার হয়ে লেখা চাইতেই তাঁর বাড়িতে গেছি।

আমার মা যশোধরা ছিলেন শঙ্খ ঘোষের প্রিয় ছাত্রী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। বিএ-তে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। এমএ পরীক্ষা দেওয়ার কিছুদিন আগে মারা যান। শঙ্খ ঘোষ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর সেই প্রিয় ছাত্রীকে ভুলতে পারেননি। সেই তাঁর বাড়িতে আমার যাওয়ার শুরু। সেটা ১৯৯৭ সাল। প্রথম থেকেই তিনি আমাকে স্নেহের চোখে দেখতে শুরু করলেন। আর কে না জানে, তাঁর মতো স্নেহপ্রবণ মানুষ কতটা বিরল!

সেই সময় আমি একটা গদ্য লিখছি। ফর্মটা নাটকের। কিন্তু সেটাকে আমি উপন্যাস বলেই দাবি করেছিলাম। প্রায় আড়াইশো পূষ্ঠার পাণ্ডুলিপি। নাম ‘দেবাঞ্জনা’। সেটা আমি তাঁকে পড়তে দিয়ে এলাম। একবারও ভাবলাম না, কতটা ব্যস্ত তিনি! আমার মতো এক অর্বাচীনকে দেওয়ার মতো অত সময় তাঁর হাতে কোথায়? আর কেনই বা দেবেন?

পাণ্ডুলিপিটা হাতে নিয়ে তিনি আমাকে বললেন, এটা তুমি আমাকে পড়তে দিচ্ছ কেন?

আর কাকে দিতাম? আমি তাঁকে অকপটে বললাম। কে এই লেখার সঠিক মূল্যায়ন করে আমাকে জানাবেন?

তিনি আর কিছু বললেন না। মুচকি হাসলেন। কিছুদিন পর তিনি আমাকে ডাকলেন। লেখাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেন। আর যা যা বললেন, তা আমার জীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে। শুধু এটুকু বুঝলাম, কতটা খুঁটিয়ে লেখাটি তিনি পড়েছেন।

আরও পড়ুন: প্রকৃত কবিতা থাকে শুভকামনার মতো জন্মে ও বিদায়ে

তিনি তখন ইকবাল অনুবাদ করছেন। একদিন আমরা গালিব আর খলিল জিব্রান নিয়ে আলোচনা করছি। হঠাৎ কথার মাঝখানে আমি ইকবালের প্রসঙ্গ তুললাম।

উনি একটু চুপ করে রইলেন। তারপর আস্তে আস্তে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন, আজ গালিব আর জিব্রান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তো, আজ ইকবাল থাক।

সেদিন তাঁর পরিমিতিবোধ দেখে আমি অবাক হয়ে গেছিলাম।

একদিন তাঁকে বললাম, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পড়ছি। আমার একটুও ভালো লাগছে না।

উনি চুপ করে রইলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, কোনটা পড়ছ?

চতুরঙ্গ।

তুমি আর একবার পড়ো।

শঙ্খ ঘোষ আর কিছু বললেন না। তিনি তো বেশি শব্দ ব্যবহার করেন না। কিন্তু যেভাবে বললেন, সেই ভঙ্গিটা আমার মনে গেঁথে গেল। আমি আবার রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পড়তে শুরু করলাম। আমার জীবন বদলে গেল। আমার জীবন বদলে দিলেন শঙ্খ ঘোষ। তাঁর কথাতেই আবার আমি রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পড়তে শুরু করলাম। আর আবিষ্কার করলাম এক মহান ঔপন্যাসিককে।

সেকথাও তাঁকে গিয়ে বললাম। রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলাভাষার নন, এই বিশ্বের মহত্তম ঔপন্যাসিকদের একজন। দস্তয়েভস্কি বা তলস্তয়ের পাশে তাঁর স্থান হওয়া উচিত।

শঙ্খ ঘোষ মুচকি হাসলেন। বললেন, বেশ তো। কিন্তু একথা কেউ মেনে নেবে কি?

কেন নেবে না? আমি লিখব। আমি দেখাব…

বেশ তো। লেখো না…

আরও পড়ুন: অনন্য মানুষ: অনন্য জীবন

সেই শুরু। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস নিয়ে আমি লিখতে শুরু করলাম।

কত বিষয় নিয়েই যে তাঁর সঙ্গে আলোচনা হত। যখন নতুন কিছু পড়তাম, তাঁকে ফোন করে বলতাম। নতুন কিছু লিখলে তাঁকে শোনাতাম। বাইরে তিনি এত গম্ভীর! কিন্তু ভেতরে ভেতরে এত আন্তরিক, মিশুকে মানুষই বা ক’জন আছেন? তাঁর কাছে গেলে ভরসা পাওয়া যায়। অবলম্বন পাওয়া যায়। সবসময় মনে হয়, শঙ্খ ঘোষ আছেন। যেকোনও সমস্যায় তাঁর কাছে গেলেই তো হল…

একবার তিনি আমাকে বললেন, জগদীশ গুপ্ত পড়েছে?

বললাম, অল্প।

পড়ে দেখো। খুব বড় লেখক।

আমি জগদীশ গুপ্ত পড়তে শুরু করলাম। আর আবিষ্কার করলাম আর এক আশ্চর্য লেখককে।

একদিন তিনি আমাকে ফোন করলেন। বললেন, সুধীর চক্রবর্তী একটা বই এডিট করছেন। ‘বুদ্ধিজীবীর নোটবই’। তুমি স্ট্রাকচারালিজম আর পোস্ট স্ট্রাকচারালিজমের ওপর লেখা দিতে পারবে?

বললাম, নিশ্চয়ই দেব।

কখনও তিনি ‘বারোমাস’ বা ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকার জন্য কবিতা চেয়েছেন। কখনও লিখতে বলেছেন দীর্ঘ প্রবন্ধ। সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘ধ্রুবপদ’ পত্রিকার জন্য একবার একটি প্রবন্ধ লিখতে বললেন। বিষয়, ‘এই সময়ের মেয়েদের লেখা কবিতা’।

আমি লেখা জমা দিলে উনি হাসতে হাসতে বললেন, তোমাকে একটা প্রবন্ধ লিখতে বললাম। আর তুমি একটা বই লিখে ফেললে।

আমাদের ‘এবং সমুদ্র’ পত্রিকায় একবার উনি একটা কবিতা লিখলেন। সেই কবিতা দিয়েই সেবার আমাদের কাগজটি শুরু হয়েছিল। কবিতাটি এইরকম ছিল,

‘কিছুটা সন্দেহ রেখো, এত নিশ্চয়তা ভালো নয়’

এই শেষ বাণী রেখে তুমি গেলে অনিশ্চয় দেশে।

সেই থেকে স্বভাবত এ–কথাতে সন্দেহের বশে

আমি কি আবারও আদি নিশ্চয়তা ফিরে পেতে পারি?

কতবার যে এই লাইনগুলি পড়েছিলাম! শঙ্খ ঘোষের কবিতার লাইনগুলি মন্ত্রের মতোই আমাদের মুখে মুখে ফিরত। তিনি কবিতায় বেশি কথা বলেন না। তাঁর শব্দের ব্যবহার অতি সংযত এবং পরিমিত। এবং সেটুকুই মনের মধ্যে একদম গেঁথে যায়। এরকমই একটি লাইন ছিল:

যদি বা নিজেরই ছায়া হঠাৎ জড়িয়ে ধরে বলে:

‘তুমি কি সুন্দর নও? বেঁচে আছ কেন পূথিবীতে?’

এই লাইনগুলি আমাদের এমন গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল! এরকম আরও দু’টি লাইন:

তবু সে এমনভাবে কোনও স্পর্ধা করে বলে যায়

‘আমার দুঃখের কাছে তোমাদের নত হতে হবে!’

তাঁর ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’ আমরা বারবার পড়তাম। একবার একটি কাগজের জন্য তাঁর কাছে ইকবালের অনুবাদের একটা অংশ চাইলাম। তাঁর ছোট্ট, বইয়ে ঠাসা, ভেতরের ঘরে ঢুকে দেখি, তিনি বিছানার ওপর ঝুঁকে এক মনে ইকবাল কপি করে যাচ্ছেন। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। তিনি কপি করা শেষ করে ঝকঝকে হাতের লেখায় কয়েকটি পৃষ্ঠা আমার হাতে তুলে দিলেন।

আরও পড়ুন: আবার জুলাইয়ের আট তারিখ দরজায় দাঁড়িয়ে…

তাঁর কিশোর উপন্যাস ‘সুপুরিবনের সারি’ ছিল আমার বিশেষ প্রিয়। একবার এক বন্ধুর অনুরোধে তাঁর পত্রিকার জন্য উপন্যাসটি পুনর্মুদ্রণের অনুমতি চাইলাম তাঁর কাছে। তিনিও সাগ্রহে অনুমতি দিলেন। ছাপা হওয়ার পর তাতে অজস্র ভুল দেখে আমি যারপরনাই লজ্জিত হলাম। তিনি কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তিরস্কারও করলেন না আমাকে। বরং কিছুদিন পর আমি একটি সংকলন সম্পাদনা করছিলাম। নাম, ‘সমকালের কালজয়ী উপন্যাস’। সেই সংকলনের জন্য ওঁর ওই উপন্যাসটা আবার চাইলাম। উনি আবারও সাগ্রহে আমাকে অনুমতি দিলেন। উপন্যাসটিও সেই সংকলনভুক্ত হয়েছিল।

শঙ্খ ঘোষ একবার আমার বাড়িতে এলেন। খেতে বসে নানারকম পদ দেখে তিনি একটু সংকোচ বোধ করলেন। তারপর খুব সামান্য একটু ভাত নিলেন।

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, আপনি কি কিছুই খাবেন না?

উনি ওঁর গম্ভীর, মার্জিত গলায় বললেন― না, আমি সবই খাব।

আর সত্যিই শেষপর্যন্ত তিনি সবই খেলেন। ওইটুকু ভাত দিয়েই খেলেন। প্রতিটা পদই চেখে দেখলেন। কিন্তু সবমিলিয়ে যা খেলেন, সব খাওয়ার পরও, তাকে যৎসামান্যই বলা যায়। সেদিন তাঁর খাওয়ার ব্যাপারেও সংযম দেখে আমি অবাকই হয়ে গেছিলাম। খুব মন দিয়ে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, সেদিন তিনি আমার লাইব্রেরি দেখেছিলেন। আর খুব খুশিও হয়েছিলেন। তাঁর নিজের বাড়িতেও তো শুধু বই আর বই। বইয়ের সমুদ্রেই তিনি ডুবে থাকতে ভালোবাসেন।

আমার বোনের বিয়েতে সস্ত্রীক এসেছেন। কিন্তু কিছুই খাননি। সবার সঙ্গে দেখা করেছেন। বর-কনেকে আশীর্বাদ করেছেন। তারপর কখন যেন সবার অজান্তে বেরিয়ে গেছেন। জানতে পেরে, আমি ছুটে গিয়ে তাঁকে ধরেছি। তিনি হেসে বলেছেন, তাতে কী হয়েছে? আজ তুমি কত ব্যস্ত…

তাঁকে বাসে তুলে দিয়ে তবে ফিরেছি।

আমার বিয়ের ঠিক আগে দেবস্মিতাকে নিয়ে একদিন তাঁর বাড়ি গিয়েছি। কত গল্প হয়েছে। শঙ্খ ঘোষের স্মৃতিশক্তি অতি প্রখর। আর তাঁর ‘সেন্স অফ হিউমার’ তুলনাহীন। তাঁর বাড়িতেই আলাপ হয়েছে তারাপদ আচার্যের সঙ্গে। ষাটের কবি। অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ মানুষ। আমরা তিনজন একসঙ্গে বসে কত গল্প করেছি। অবিরাম গান চলেছে। আর তখন হয়তো আমরা আলোচনা করছি সালভাদোর দালির ‘আ ডায়েরি অফ আ জিনিয়াস’ নিয়ে। আবার কখনও আলোচনা ঘুরে গেছে সিনেমার দিকে। বার্গম্যান, বুনুয়েল বা কুরোসাওয়া হয়েছে আলোচনার বিষয়।  

একদিন তো গোটা সন্ধ্যা দারুণ মজার গল্প হল শুধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং কৃত্তিবাসীদের জীবনের নানা মজার ঘটনা নিয়ে। আবার একদিন গল্প হলে দেবেশ রায় ও উত্তরবঙ্গের নানা স্মৃতি নিয়ে। শঙ্খ ঘোষ অকপটে কত কথাই না বলতেন। আর যা বলতেন, তার চেয়েও শুনতেন আরও বেশি। শ্রোতা হিসেবে তিনি তুলনাহীন। তাঁর ধৈর্যেরও কোনও শেষ নেই। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। কখনও তাঁর আন্তরিকতায় কোনও ত্রুটি দেখিনি।

অনেক সময় ফোন না করেই আচমকা তাঁর কাছে চলে গিয়েছি। একদিন দুপুরবেলা গিয়ে দেখি, তিনি গলদঘর্ম হয়ে বসে কী একটা কাজ করছেন। একটা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে আছেন। তাঁর চারপাশে ছড়ানো-ছিটানো অজস্র বই। কখনও যা হয় না, তাই হল। সংকোচ নিয়ে বললাম, আপনার কাজের অসুবিধে হল। অসময়ে এসে পড়েছি…

আরও পড়ুন: ‘বেহালা জনপদের ইতিহাস’ গড়ার কারিগর: প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য

উনি বললেন, তুমি আসবে তার আবার সময়-অসময় কী? যখন ইচ্ছা চলে আসবে।

একবার বললাম, গিনসবার্গের ‘হাউল’ নিয়ে সিনেমা হয়েছে। দেখেছেন নাকি?

বললেন, না তো।

আমি গিয়ে ওঁকে সিডিটা দিয়ে এলাম।

কখনও আমার কোনও আচরণ পছন্দ না হলে সরাসরি বলেছেন। নানা সংকটের সময় তাঁর কাছেই ছুটে গিয়েছি। তিনি আমাকে সঠিক ও উপযুক্ত পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছেন। একবার খুব অভিমান করে আমাকে বলেছিলেন, কোথা থেকে শুরু করেছিলে, কোনও আদর্শ নিয়ে, আর এখন কোথায় এসে পৌঁছেছ, একবার ভেবে দেখো…

কিছুদিন আগে গিয়ে দেখি, খুবই অসুস্থ। উনি আমাকে ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। কত কথাই না বললেন। এখন আর লিখতে পারেন না। মুখে মুখে বলে যান। ওঁর একটা বইতে সই করলেন। আমাকে বললেন, তুমি অন্যদিকে তাকাও। হয়তো খুব কষ্ট করেই সইটা করলেন। আমি বইটা খুলে দেখি, অতি ক্ষুদ্র আকারের সেই সই। আর সেটা করতেই দীর্ঘ সময় লেগে গেছে তাঁর।

তাঁর মতো একবার কবি ও ভাবুক, কিছু মনে এলে যদি সেটা তৎক্ষণাৎ লিখতে না পারেন, এর চেয়ে দুঃখের আর কী হতে পারে?

সেদিন তিনি আমাকে দীনেশচন্দ্র সেনের একটা বিরল বই দেখালেন। এই বইটা নিয়ে কাজ চলছে। তাঁরই বাড়িতে বসে কাজ করছেন গবেষকেরা।

আমার সম্পাদিত ‘চিন্তা’ পত্রিকা দিতে গিয়েছি, তখন রাত দশটা বাজে। আমি, আমার স্ত্রী দেবস্মিতা এবং আমার মেয়ে উপাসনা। উপাসনাকে দেখে উনি খুবই খুশি হলেন। তারপর দু’জনের গল্প শুরু হল। শঙ্খ ঘোষ খুবই আস্তে আস্তে কথা বলছিলেন। প্রায় ফিসফিসিয়ে। আট বছরের উপাসনাকে উনি নিজের একদম কাছে ডেকে নিলেন। উপাসনার কথা শুনে হাসছিলেন। একটু পরে প্লেট ভর্তি মিষ্টি এলো। ওঁর বাড়িতে গেলে এটা সবসময়ই বরাদ্দ থাকে। দিনের যে কোনও সময় গেলেই পাওয়া যায়।

আমরা উঠে পড়লাম। উনি সবসময়ই যা করেন, তাই করলেন। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন আমাদের। কিন্তু এখন আর সেই সাবলীল চলাফেরা নেই। হাতে লাঠি। দেখে আমাদেরই অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু উনি দরজা ছাড়িয়ে আরও এগিয়ে এলেন। উপাসনা সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। উনি সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ালেন। উপাসনা হাত নাড়ছে। উনি তাকিয়ে আছেন সেই ছোট্ট মেয়েটার চলে যাওয়ার দিকে।

এত বড় একজন মানুষ। আর কী বিরল সৌজন্যবোধের অধিকারী! দেবস্মিতার এই কথা শুনে চুপ করে রইলাম। আমার জীবনে সেই বনস্পতির মতো শিক্ষকের কথা ভেবে আমার ভেতরটা তখন হু-হু করছিল। শঙ্খ ঘোষের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যে নিঃসন্দেহে একটি যুগের অবসান হল। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। ব্যক্তিগতভাবে খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখার, তাঁর সঙ্গে মেশার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এত এত মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পাওয়া, এত দীর্ঘদিন ধরে, সহজ কথা নয়। তিনি ছিলেন বিরল মানুষ ও সাহিত্য-প্রতিভা। এরকম এক দুঃসময়ে তিনি আমাদের ছেড়ে গেলেন। তাঁর উপস্থিতিই বহু মানুষকে সাহস ও প্রেরণা জোগাত। তাঁর প্রস্থান যেন আবারও আমাদের বুঝিয়ে দিল, ভবিষ্যতে কত বড় আর গভীর সংকটের দিকে আমরা এগিয়ে চলেছি…

লেখক রাহুল দাশগুপ্ত ইউনিভার্সিটি গ্লান্টস কমিশনের স্কলারশিপ নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট। পড়িয়েছেন যাদবপুর ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলায় প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক। কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির সঙ্গেও। কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন ও গবেষণা কেন্দ্রের ‘তরুণ প্রাবন্ধিক সম্মাননা’র প্রথম প্রাপক। ২০১৭ সালে পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার। বাংলা উপন্যাসের প্রথম অভিধান ‘উপন্যাসকোশ’ গ্রন্থটির জন্য পান ‘দীপক মজুমদার সম্মাননা’। ২০১৮ সালে পেয়েছেন ‘কবিপত্র’ সম্মান, ‘মানুষ দাশগুপ্ত স্মৃতি সম্মাননা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় ভারতীয় কবি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মনিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন সাহিত্য অকাদেমির আমন্ত্রণে কবিতা অনুবাদের ওয়ার্কশপে। বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। বিভিন্ন দৈনিক পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। এক সময় সম্পাদনা করেছেন ‘এবং সমুদ্র’ পত্রিকা, এখন করেন ‘চিন্তা’ পত্রিকা। পোস্ট ডক্টরেট করেছেন গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের ইন্দোলজি বিভাগে। কর্মসূত্রে গার্ডেন হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত। ভালবাসেন বই পড়তে, সিনেমা দেখতে এবং মেয়ে উপাসনার সঙ্গে সময় কাটাতে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *