বীণাপাণির হিরণকিরণ ছবিখানি…

তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়

দুপুরবেলার আহার শেষ করে সর্বজয়া যখন মহাভারত নিয়ে বসতেন, আর অপুর অনুরোধে ঘুঁটে কুড়ানোর গল্প বলতে গিয়ে অন্নদামঙ্গল থেকে হরিহোড়ের কাহিনি প্রসঙ্গে―

‘‘রাজা বলে শুন শুন মুনির নন্দন

কহিব অপূর্ব কথা না যায় বর্ণন।।

সোমদত্ত নামে রাজা সিন্ধুদেশে ঘর।

দেবদ্বিজে হিংসা সদা অতি―”

ইত্যাদি অংশ সুর করে পড়তে শুরু করতেন তখন নিশ্চয়ই গৃহলক্ষ্মীর সঙ্গে সঙ্গে একটি সরস্বতী মূর্তি সর্বজয়াকে জাঁকিয়ে বসত! নইলে কেমন করে তিনি সংসারের সমস্ত কাজ সামলে মহাভারত, অন্নদামঙ্গলে মনোনিবেশ করার স্পর্ধা দেখাতেন!

আরও পড়ুন: বঙ্কিমের ‘চন্দ্রশেখর’ যতখানি আমার

মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে শ্বেতবসনা শিক্ষা, সংগীতের দেবী সরস্বতীর বন্দনায় মেতে উঠি আমরা। বীণা, বই জ্বলজ্বল করে মাটির মূর্তির হাতে। অথচ, এই ভারতবর্ষেই আঠারো বছর বয়স হওয়ার আগেই কত মেয়েকে বিদ্যালয় ছেড়ে দিতে হয়।

এই ভারতবর্ষেই বছরে গড়ে কুড়ি হাজার নারীকে ধর্ষিতা হতে হয়। এই ভারতবর্ষেই কন্যাভ্রূণ হত্যা নিয়মিত ঘটনায় রূপান্তরিত হয়। এ অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ গঠন হতে শুরু করার পর থেকেই নারীরা অবহেলিত। বারবার প্রমাণের চেষ্টা চলেছে নারীরা দুর্বল, পুরুষের থেকে অনেক নিচে তার অবস্থান। কিন্তু কী আশ্চর্য, ইতিহাসের প্রাচীনযুগের কথা লিখতে গিয়ে গার্গী, লোপামুদ্রা, অপালা, বিশ্ববারা প্রমুখজনের নাম লিখতেই হয়।

পুরাণকে স্বীকার করতে হয় জ্ঞান অর্জন করা দেবী সরস্বতীর দয়া ছাড়া সম্ভব নয়। পুরাণ ও ইতিহাস মিলে মিশে যায় সিন্ধুসভ্যতায় দেবীর উপস্থিতি ঘোষণা করতে গিয়ে। ভারতের পরম আদরের রামায়ণের স্রষ্টা বাল্মীকিও জ্যোর্তিময়ী সরস্বতীর করুণাধন্য হয়ে রচনা করেছিলেন শ্লোক। দেবীর ছোঁয়ায় কবির শোক বদলে গিয়েছিল কাব্যে। আকাশ শুনেছিল― “মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ…”

আরও পড়ুন: রথ, লোকারণ্য; ইতি আনন্দ

দশম শতাব্দীর বেলাপাথরের সরস্বতী

আচ্ছা, এতক্ষণ পড়তে পড়তে নিশ্চয়ই ভাবছেন, সেই এক নারীবাদী কচকচানি! না না, শুধু এসব নয়― ভেবে দেখুন, দেবী সরস্বতীর কাছে এসে কেমন সমস্ত জাতপাত মুছে যায়। সরস্বতী পুজোর দিন সকালে বিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে কেমন মন ভালো হয়ে যায়! রহিম ঢাক বাজানোর বায়না করতে গেছে, আরতি গাঁদা ফুল এগিয়ে দিচ্ছে শামিমার হাতে। পুরোহিতের হাতে হাতে পুজোর দ্রব্যাদি এগিয়ে দিচ্ছেন রফিকুল স্যার, শর্বরী ম্যাডাম। শ্যাম আর রফিক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পুজোর প্রসাদ কীভাবে বিলি করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা করছে! এইসব দৃশ্য আরও বেশি করে মাথার ভিতর কেন ফুটে উঠছে জানেন, কারণ, কোভিড পরিস্থিতিতে যখন একে অন্যের থেকে সরে গিয়েছিলাম দূরে, বিদ্যালয় ফেরত ছেলেমেয়ের কোলাহল ভুলে যেতে বসেছিল কান তখনই খানিক স্বস্তি দিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজ্যের সমস্ত বিদ্যালয় খুলে গেছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি সরস্বতী পুজো৷ ইতিমধ্যেই কোভিডের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে। অন্ধকার দিনের পর্দা ভেদ করে আশার ইঙ্গিত এগিয়ে আসছে একটু একটু করে। যদিও শারীরিক দূরত্ব এখনও বজায় রাখতে হচ্ছে, অদৃশ্য মুখোশ সম্বল মানুষকে পরে থাকতে হচ্ছে দৃশ্যমান মুখোশ। তবুও বলাই যায়, শিক্ষার্থীর সবচেয়ে প্রিয় উৎসবের আগে এই আংশিক মুক্তি যেন ছাত্রছাত্রীদের ডানার ক্ষত সারিয়ে তুলছে।

আরও পড়ুন: কবিতার বনফুল

যে রাস্তার মনকেমন করে উঠত, যে বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণের ধুলো প্রায় দশ মাস জল পায়নি তারা আবার সমস্ত আবরণ খুলে উন্মুখ হয়ে উঠেছে লাল-হলুদ শাড়িতে, পাঞ্জাবিতে সেজে ছাত্রছাত্রীরা কেমন হইহই করে, তা চেখে দেখার জন্য। বাঙালি মানেই উৎসব তার চাই-ই চাই। সরস্বতী পুজোও তাই কেবলমাত্র শিক্ষার্থী বা শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকেনি। সরস্বতী পুজোর পরদিন এপার বাংলার বেশিরভাগ মানুষ শীতলাষষ্ঠীর পুজো করেন। এই পুজো সন্তানের মঙ্গল কামনার পুজো। আসলে এও একরকম অরন্ধন উৎসব। সরস্বতী পুজোর দিন-ই মায়েরা বিভিন্নরকম পদ রান্না করে রাখেন। তারপর বাটনা বাটার শিলনোড়াটিকে পরিষ্কার করে ধুয়ে, নতুন গামছা মুড়ে মা ষষ্ঠী রূপে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সামনে রাখেন ভাত ও অন্যান্য পদ। পদের মধ্যে অন্যতম হল কলাই সিদ্ধ। পাঁচ রকমের কলাই, বেগুন দিয়ে বানানো হয় এই পদ৷

মা ষষ্ঠীর কোলে রাখা হয় বাঁশপাতা, জোড়া কুল, জোড়া কলা, জোড়া শিম ইত্যাদি উপকরণ। মা শীতলাষষ্ঠীর পুজোর বিশেষত্ব হল এই পুজোর জন্য পুরুষ পুরোহিতের প্রয়োজন হয় না। মায়েরাই স্নান সেরে, নতুন শাড়ি পরে পুজো করেন। ভারী সংস্কৃত মন্ত্র নয়, মায়েদের স্নেহ, মায়া, আদর, প্রার্থনাই এই পুজোর মন্ত্র হয়ে ওঠে। পুজো শেষে শীতের রোদ পিঠে দিয়ে মা তার সন্তানদের নিয়ে প্রসাদ খেতে বসেন। ষষ্ঠীর গল্প শোনান। লাল কালি দিয়ে সন্তানেরা বইয়ের পাতায় লেখে― ‘ওঁ সরস্বতৈ নমঃ’! তারা বিশ্বাস করে এই শ্লোক তাদের লেখাপড়ার পথ সুগম করবে।

আরও পড়ুন: হয়ে উঠুন আপন প্রাণের লক্ষ্মীর পূজারি

তবে এইসব গল্প, বিশ্বাস ছাপিয়ে, রাস্তার ধারে, ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া বাড়িতে, টিমটিমে আলোয় যে মেয়েটি― যার ধর্ম নেই, বর্ণ নেই― এক হাতে সদ্য হাঁটতে শেখা দামাল ভাইটিকে সামলাতে সামলাতে অন্য হাতে অঙ্ক কষে, সে-ই আমার মনে মাটির সরস্বতী মূর্তিটিকে ক্রমশ ঝাপসা করে দেয়। শ্বেতবসনা মূর্তিটি মিলিয়ে যেতে যেতে, মেয়েটির মুখই একমাত্র জেগে থাকে। মনে হয়, এই তো সে, বিদ্যার জন্য যাকে যুগে যুগে আরাধনা করেছে মানুষ। নত হয়ে বলেছে―

“সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।

বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোঽস্তুতে।।

জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।

বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।”

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *