সারফারোশি কি তামান্না: বিসমিল ও তাঁর সহযোগীদের আত্মত্যাগের কথা

ড. মাল্যবান চট্টোপাধ্যায়

১৯২৭ সালে ডিসেম্বর মাসে একজন ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “I wish the downfall of the British empire.” তিনি কাকোরির ঘটনার অন্যতম নায়ক শহিদ রামপ্রসাদ বিসমিল। রামপ্রসাদ বিসমিলের জন্ম ১১ জুন ১৮৯৭-এ সাবেক যুক্তপ্রদেশ তথা আজকের উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুর জেলায়। ১৯২৭ সালে ১৯ ডিসেম্বর তারিখে তাঁকে গোরক্ষপুর কারাগারে ফাঁসি দেয় ব্রিটিশরা।

ভারতের বিপ্লবী কার্যক্রমের যে ধারা শুরু হয়েছিল বিশ শতকের প্রথমার্ধে, তার অন্যতম দিক ছিল সহিংস পথে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের পথকে প্রশস্ত করা। এক্ষেত্রে যেমন মিলবে শহিদ ক্ষুদিরামের নাম, কনিষ্ঠ শহিদ হিসেবে, তেমনই নাম মিলবে রামপ্রসাদ বিসমিলের। তবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ফাঁসির কাঠগড়া এড়িয়ে তিনি ক্ষুদিরামের থেকে কিছুটা বেশিদিন বেঁচেছিলেন। তিরিশ বছর বয়সে তিনি দেশের জন্য প্রাণ দেন। রেখে যান একটি দেশাত্মবোধক গান, ‘সারফারোশি কি তামান্না…’

আসা যাক, এই মানুষটির জীবনকথায়। ছাত্রজীবনে তিনি একই সঙ্গে উর্দু আর হিন্দি শিখেছিলেন। এর সঙ্গেই তিনি পড়েছিলেন ইংরেজি স্কুলেও। কিন্তু এসব ছেড়ে দেশকে স্বাধীন করার জন্য তিনি হিন্দুস্তান রিপাবলিকান পার্টিতে যোগদান করেছিলেন। ১৯২৫ সালের ৯ আগস্ট, অন্যদের সঙ্গে কাকোরি নামক একটি রেল স্টেশনে ব্রিটিশ শাসনের শোষিত সম্পদভাণ্ডার লুট করতে যান তিনি ও তাঁর সহকারীরা। পরে তদন্ত শুরু করেন ব্রিটিশরা। তদন্ত মোতাবেক, রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাক উল্লাহ খান, রওশন সিং এবং রাজেন্দ্র লাহিড়িকে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। বিসমিলকে ফাঁসির দায়ে গোরক্ষপুর কারাগারে আনা হয়েছিল। যেখানে ১৯২৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর সকালে ৬টায় তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন: যদুনাথ সরকার: ইতিহাস চর্চার কলম্বাস

বাঁ-দিক থেকে রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাক উল্লাহ খান, রওশন সিং এবং রাজেন্দ্র লাহিড়ি

তিনি অভিযুক্ত ছিলেন কাকোরি মামলায়। শুধু তিনি একাই নন, আশফাক উল্লাহ খান, রাজেন্দ্র লাহিড়ি, রওশন সিংওকেও ব্রিটিশরা অভিযুক্ত করেছিল। তবে এর আগেও রয়েছে আর এক ইতিহাস। বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকেই তিনি দেশকে শৃঙ্খল মুক্ত করার কাজ করবার কথা ভেবছিলেন। তিনি মাতৃভেদি নামে একটি বিপ্লবী সংগঠন গঠন করেছিলেন এবং এক্ষেত্রে তিনি আড়াইয়ার বিদ্যালয়ের শিক্ষক গেন্দালাল দীক্ষিতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। দীক্ষিত মহাশয় রাজ্যের কয়েকজন ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের যোগযোগ ছিল যাঁদের দীক্ষিত ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ব্যবহার করতে উদ্যত হয়েছিলেন। বিসমিলের মতো দীক্ষিতও শিবাজি সমিতি নামে পরিচিত যুবকদের একটি সশস্ত্র সংগঠন গঠন করেছিলেন। এই দুই মানুষের জুটি তাঁদের সংগঠনগুলিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য যুক্তপ্রদেশের (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) ইটোয়া, মঈনপুরি, আগ্রা ও শাহজাহানপুর জেলা থেকে যুবকদের সংগঠিত করেছিলেন।

২৮ জানুয়ারি, ১৯১৮-এ বিসমিল ‘দেশবাসী কে নাম সন্দেশ’ (দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বার্তা) শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যা তিনি তাঁর মঈনপুরির প্রতিজ্ঞা বিষয়ক বই-সহ বিতরণ করেছিলেন। পুলিশ তাকে খুঁজেছিল, কিন্তু রামপ্রসাদ বিসমিল আত্মগোপন করেন, অ-বিকৃত বই সঙ্গে নিয়ে।

আরও পড়ুন: ব্রিস্টল শহরবাসীদের ধন্ধে ফেলেছিলেন ‘রহস্যময়ী রাজকুমারী’ মেরি বেকার

১৯১৯ সালের আগেই একটি সংঘর্ষ হয় তাঁর ব্রিটিশদের সঙ্গে। দিল্লি ও আগ্রার মধ্যবর্তী অঞ্চলে এই প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি একটা চেষ্টা করেছিলেন ব্রিটিশদের সম্পদ লুঠ করতে। কিন্তু পুলিশ তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের ধাওয়া করে। এক্ষেত্রে তিনি যমুনায় ঝাঁপ দিয়ে ডুবসাঁতার দিতে থাকেন। পুলিশ ভাবে যে, তিনি জলে ডুবে মারা গেছেন। এই ঘটনাকে বলা হয় মঈনপুরি ষড়যন্ত্র।

১৯১৯ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত বিসমিল আত্মগোপন করেছিলেন এবং সাবেক যুক্তপ্রদেশের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন। এ-সময়ে তিনি কয়েকটি বই প্রস্তুত করেছিলেন। এর মধ্যে ‘মন কি লাহার’ উল্লেখযোগ্য। এটি একটি কবিতার বই, এতে তাঁর এবং অন্যদের রচিত কবিতার একত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি বাংলা থেকে বলশেভিক বিপ্লব বিষয়ক বই ও এই সময়ে অনুবাদ আকারে প্রকাশ করেন হিন্দিতে। যোগ সাধনার প্রতিও তাঁর আকর্ষণ ছিল। তবে তিনি এভাবে দীর্ঘদিন অধরা থাকতে পারেনি। পরে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন ১৯২০-তে। ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন মঈনপুরি ষড়যন্ত্র মামলার সমস্ত বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তখন বিসমিল বাড়ি ফিরে শাহজাহানপুরে এসেছিলেন, যেখানে তিনি সরকারি কর্তাদের সঙ্গে সম্মত হন যে তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশ নেবেন না। রামপ্রসাদের এই বক্তব্যও আদালতের সামনে স্থানীয় ভাষায় রেকর্ড করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: শীতের সকালে ৩৬-এর বিভীষিকায় ‘৪২-এর গ্রীষ্ম’ মনে পড়ে গেল

১৯২১ সালে, শাহজাহানপুরের আহমদাবাদ কংগ্রেসে অংশ নেওয়া বহু লোকের মধ্যে বিসমিলও ছিলেন। বিসমিল মাওলানা হাসরাত মোহানির সঙ্গে কংগ্রেস সক্রিয়ভাবে সেবারের অধিবেশনে উঠে আসা পূর্ণ স্বরাজের প্রস্তাবটির পক্ষে মত দিয়েছিলেন। যুক্ত প্রদেশের জনগণকে তিনি প্রভাবিত করেছিলেন। বিসমিলের বক্তৃতায় এতটাই প্রভাবিত হয়েছিল জনগণ যে, তিনি পুনরায় ব্রিটিশরাজের নজরে পড়েন। সে-সময়ে চলছে সারা ভারতে আসহযোগ আন্দোলন। আর সেসময়েই সাবেক যুক্ত প্রদেশে ঘটে যায় একটি ঘটনা।

১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে চৌরিচৌরায় কয়েকজন আন্দোলনকারী কৃষককে পুলিশ হত্যা করে। চৌরিচৌরার থানাটি লোকজন আক্রমণ করেন এবং ২২ পুলিশ সদস্যকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হয়। গান্ধিজি এই ঘটনায় মর্মাহত হন। তিনি এর পরেই অসহযোগ আন্দোলন অবিলম্বে বন্ধ করার ঘোষণা করেন। বিসমিল এবং তাঁর অনুগামী যুবকরা গান্ধিজির এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনটিতে। গান্ধিজি তাঁর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানালে তৎকালীন কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট চিত্তরঞ্জন দাস পদত্যাগও করেন। তৈরি হয় স্বরাজ পার্টি। ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বিসমিল-ও। এবারে তিনি বিপ্লবী দল গঠনের পথে এগিয়ে যান।

হঠাৎ যুক্তপ্রদেশে আত্মপ্রকাশ করে একটি পত্রিকা। এর নাম THE REVOLUTIONARY। এই শিরোনামে একটি পত্রিকা ১৯২৫ সালের জানুয়ারির শুরুতে ভারতে যুক্তপ্রদেশে বিতরণ করা হয়েছিল। চার পৃষ্ঠার মুদ্রিত এই পত্রিকা ইউনাইটেড প্রদেশের এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে বেশিরভাগ পোস্টে এবং হাতে গোপনে প্রচারিত হয়েছিল। এই পত্রিকাটি মুদ্রণ প্রেসের কোনও নাম ছিল না। পত্রিকাটির শিরোনাম ছিল: ‘THE REVOLUTIONARY’ (ভারতের বিপ্লবী দলের একটি অঙ্গ)। এটি যে প্রথম সংখ্যাটা লেখা হয়েছিল আর এর প্রকাশের তারিখটি দেওয়া হয়েছিল ১ জানুয়ারি ১৯২৫। কিন্তু বাকি কিছু তথ্য ছিল না। অন্তরালে থেকেও এটাই ছিল বিসমিলের প্রকাশ ভাবনার। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা জরুরি Hindustan Socialist Republican Association-এর নাম। যাকে পরবর্তীকালে Hindustan Socialist Republican Army এই নামেও ডাকা হত। যাদের ভাবনের বহির্প্রকাশ ঘটেছিল THE REVOLUTIONARY-এর মাধ্যমে। গয়া কংগ্রেসের বিবাদের প্রেক্ষিতেই এর জন্ম। কাকোরি ষড়যন্ত্রের সঙ্গেও জুড়েছিল এই সংস্থা আর জুড়েছিলেন বিসমিল।

আরও পড়ুন: বঙ্গবন্ধুর সাহিত্য ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সাহিত্য

কাকোরি ঘটনা সম্পর্কিত 'দ্য স্টেটসম্যান'-এর সংবাদপত্রের প্রতিবেদন। ১১ আগস্ট, ১৯২৫। সৌজন্য নেহরু মেমোরিয়াল জাদুঘর এবং গ্রন্থাগার - গুগল আর্টস অ্যান্ড কালচার

এবার আসা যাক সেদিনের ঘটনায়। বিসমিল যুক্তপ্রদেশের লখনউয়ের নিকটে কাকোরিতে একটি ট্রেনে আভিযান চালান, যাতে সরকারি রাজস্ব নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ১৯২৫ সালের ৯ আগস্ট ঘটেছিল এবং এটিই কাকোরি ষড়যন্ত্র হিসাবে পরিচিত। লখনউ রেলওয়ে জংশনের ঠিক আগে স্টেশন কাকোরিতে দশজন বিপ্লবী সাহারানপুর-লখনউ রুটের যাত্রীবাহী ট্রেনটি থামিয়েছিল। এই কাজে জার্মানিতে প্রস্তুত আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল ব্যবহৃত হয়েছিল। রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে ছিলেন মন্মথনাথ গুপ্ত, যিনি পিস্তলটি ভ্রান্তিবশত চালিয়ে ফেলেন এবং দুর্ঘটনায় ট্রেনের ভারতীয় যাত্রী আহমেদ আলি মারা যান, তিনি ট্রেন থেকে কোনও কারণে নেমেছিলেন। এই ঘটনার পরে ৪০-এর বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ঘটনার সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্কিত না হওয়া ব্যক্তিদেরও ধরা হয়েছিল। তবে তাদের মধ্যে কিছু জনকে পরে অবশ্য ছেড়ে দেওয়াও হয়েছিল।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরে বিসমিল-সহ আশফাক উল্লাহ খান, রোশন সিং এবং রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়িকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ১৯২৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর বিসমিলকে গোরক্ষপুর কারাগারে, আশফাক উল্লাহ খানকে ফৈজাবাদ কারাগারে এবং রোশন সিংকে নয়ী এলাহাবাদ কারাগারে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়িকে দু’দিন আগে গন্ডা কারাগারে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন: জন্মদিনে রমেশচন্দ্র মজুমদার: দেবী ক্লিওর বরপুত্র

কারাগারে থেকেই শহিদ রামপ্রসাদ বিসমিল তাঁর আত্মজীবনী সহ ১১টি বই লিখেছিলেন। বিসমিলকে যখন লখনউ জেল থেকে গোরখপুরে আনা হয়েছিল, সেই সময় তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ১২১ এ, ১২০ বি, ৩৯৬ আইপিসির অধীনে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। বিসমিল এই কারাগারে চার মাস ১০ দিন অবস্থান করেছিলেন। বিসমিলের শেষ সফরে বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন। রাজঘাটে রাপ্তি নদীর তীরে তাঁর শেষকৃত্য করা হয়। এর আগে তাঁর দেহকে শেষ দর্শনের জন্য প্রকাশ্যেই রাখা হয়েছিল। তাঁর আত্মবলিদানের পরে তাঁর মা বলেছিলেন― “আমি ছেলের মা, ভারতের আত্মত্যাগের জন্য কাঁদব না। আমি তার জন্য গর্বিত।” বলা জরুরি, ফাঁসির একদিন আগে তাঁর বাবা-মার সঙ্গে দেখা হয়েছিল বিসমিলের। দেশ তাঁকে ও তাঁর সহকারীদের ভোলেনি। তাঁকে ও আশফাক উল্লাহ খানকে স্মরণ করে ১৯৯৭ সালে ভারত সরকার প্রকাশ করেছিল দুই টাকা মূল্যের ডাকটিকিট। তাঁকে ও সহকারীদের আজ দেশ মনে রেখেছে। বর্তমানে ১৯ ডিসেম্বর তারিখে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন স্থানে স্মরণ করা হয় তাঁকে। তাঁর লেখা গানের মতোই তাঁর জীবনকে আমাদের মনে রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র

১) ড. বিশ্বামিত্র উপাধ্যায় সম্পাদিত, রাম প্রসাদ বিসমিল কী আত্মকথা (হিন্দি ভাষায় লিখিত), এনসিইআরটি, নয়াদিল্লি, ১৯৯৪।

২) Hasan, Mushirul , Roads to Freedom: Prisoners in Colonial India, Oxford University Press, 2016.

লেখক আসানসোল গার্লস কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Debashis Majumder

    Wonderful article full with historical facts and informations. Thanks to the author for narrating the historic struggle of two unsung heroes of Indian armed freedom struggle Ramprasad Bismil and Asfaqullah at the same time about the important event of Kakori conspiracy case.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *