সতীপীঠ দেবী বর্গভীমা

সুগত পাইন

“টিমটিম করে শুধু আলো দুটি বন্দরের বাতি।
সমুদ্রের দুঃসাহসী জাহাজ ভেড়ে না সেথা;
তাম্রলিপ্ত সুকরুণ স্মৃতি।”

প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর ‘ভৌগলিক’ কবিতায় এভাবেই ধরেছেন আজকের তমলুককে। প্রাচীন তাম্রলিপ্তের সকরুণ স্মৃতি বহন করা ব্যতীত বর্তমান তমলুকের পূর্ব গরিমার আর বিশেষ কিছুই অবশিষ্ট নেই। চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন চম্পা থেকে ৫০ যোজন দূরের তাম্রলিপ্তে ৪০০-৪১১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে দু’বছর অবস্থান করেছিলেন। তাঁর সেই অতিবাহিত সময়কালের অভিজ্ঞতা ও বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে তাঁর আত্মজীবনীতে। সে-সময়ে এখানে তিনি ২৪টি বৌদ্ধবিহার দেখেছিলেন। পরবর্তীতে ৬৩‌৯-৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে এসেছিলেন আর এক চিনদেশাগত পরিভ্রমনকারী হিউয়েন সাঙ। তখন তিনি এখানে ১০টি বৌদ্ধবিহার ও ৫০টির মতো হিন্দু মন্দির ও ২০০ ফুট উচ্চতার একটি অশোকস্তম্ভের উপস্থিতি লক্ষ করেছিলেন। অধুনা তমলুকের বুকে যেক’টি প্রাচীন ইমারত রয়েছে তন্মধ্যে দেবী বর্গভীমার সপ্তরথ দেউল মন্দিরটিই প্রাচীনতম। প্রত্নবিদ টি এন রামচন্দ্রন মনে করেন বর্গভীমার দেউল হিউয়েন সাঙ বর্ণিত বৌদ্ধস্তম্ভের ধ্বংসস্তূপের উপর দ্বাদশ‌ শতাব্দীতে নির্মিত হয়ে থাকবে। বর্তমান মন্দিরটির মূল নির্মাণকার্য ওই সময়ে হয়ে থাকলেও বারে বারে সংস্কৃত হয়ে বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছে। মন্দিরের বেকি অংশ যেভাবে বর্তুলাকার এবং মন্দিরের তুলনায় আমলক অংশের ক্ষুদ্রতা মন্দরটির বারবার সংস্কারের পাথুরে প্রমাণ। মন্দিরটি পাথরের তৈরি। তার উপর চুন সুরকির পলেস্তারা, যা অনেক পরবর্তীকালের। ভুমিভাগ থেকে ২১টি সোপান বা ৩০ ফুট উচ্চ বেদির উপর প্রতিষ্ঠিত মূল মন্দিরের উচ্চতা ৬০ ফুট। যাই হোক, প্রত্নতত্ত্ব বা ইতিহাস আমাদের আলোচ্য নয়, আমরা বর্তমান নিবন্ধে সতীপীঠ বর্গভীমার আলোচনা করব।

আরও পড়ুন: খড়দহে নিত্যানন্দ, জাহ্নবাদেবী ও বীরভদ্রের কথা

‘পীঠনির্ণয়’ তন্ত্রগ্রন্থ অনুসারে সপ্তত্রিংশৎ সতীপীঠ হল বিভাস। বিষ্ণুচক্রে খণ্ডিত সতীর বামপদের গোড়ালি এখানে পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম ভীমারূপা এবং ভৈরব হলেন সর্বানন্দ— “কপালিণী ভীমারূপা বামগুলফো বিভাসকে/ ভৈরবশ্চ মহাদেব সর্বানন্দ শুভপ্রদঃ।।” বিভাস হিন্দুদের প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র। ভৌগলিকভাবে বিভাস পেশোয়ারের কাছে। কিন্তু সেখানে না আছে কোনও ভীমারূপা দেবী আর না সাক্ষাৎ মিলবে সর্বানন্দ ভৈরবের। অষ্টাদশী শতাব্দীর কবি ভারতচন্দ্র পীঠস্থান হিসেবে বিভাসের কথাই বলেছেন— “বিভাসে বামগু্লফ্ ফেলিলা কেশব/ ভীমারূপা দেবী তাহে কপালী ভৈরব।।”

এখন প্রশ্ন, তাম্রলিপ্তের বহুনাম থাকলেও বিভাস নাম কোথাও দৃষ্ট হয় না। তবে দেবী ও ভৈরব তমলুকে বর্তমান থাকায় তমলুককেই পীঠনির্ণয়ের বিভাস হিসেবে ধরে নিতে হবে। অবশ্য প্রাচীন ‘তাম্রলিপ্ত মাহাত্ম্যে’ দেবী বর্গভীমাকে তমলুক প্রদেশবাসী হিসাবে দেখানো হয়েছে— “কপালমোচনং স্নাত্বা মুখং দৃষ্টা জগৎপতে/ বর্গভীমাং সমালোক্য পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।।” অর্বাচীন ‘ভবিষ্যপুরাণে’র ব্রহ্মখণ্ডেও তমলুকের কথা আছে— “তাম্রলিপ্ত প্রদেশে চ বর্গভীমা বিরাজতে/ গোবিন্দপুর প্রান্তে চ কালী সুরধুনীতটে।।”

মধ্যযুগের বাংলা মঙ্গলকাব্যগুলিতেও তমলুকের বর্গভীমা দেবীর কথা উক্ত হয়েছে। কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গলের’ দিগ্‌বন্দনা অংশে তমলুকের বর্গভীমার প্রতি প্রণতি, নিবেদিত হয়েছে—
“গোকুলে গোমতীনামা/ তমলুকে বর্গভীমা/ উত্তরে বিদিত বিশ্বকায়া।।” মাণিকরাম গাঙ্গুলি ও রূপরাম চক্রবর্তীর ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্যেও দেবীর বন্দনাগীতি রয়েছে—

১. “বন্দিব বেলার চণ্ডী ছাতনার বাসুলী/ তমলুকের বর্গভীমা রায়খার কালী।।”
২. “তমলুকে বন্দিয়া গাহিব বর্গভীমা/ মাঘ মাসে মকরে আনন্দে নাহি সীমা।।”

আরও পড়ুন: প্রাচীনতমের বিচারে কাঁথি মহকুমায় তৃতীয় ও পটাশপুর থানায় সর্বপ্রাচীন কিশোররায় মন্দির

এভাবেই বিভিন্ন গ্রন্থে দেবী বর্গভীমার নাম উক্ত হয়েছে। যাই হোক, বর্গভীমা নামে ভারতবর্ষের আর কোনও স্থানে দেবীকে পূজা পেতে দেখা যায় না। যদিও ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’এ দেবীকে হিমাচলে ভীমারূপে আবির্ভূত হওয়ার সংবাদ রয়েছে— “পুনশ্চাহং যদা ভীমারূপং কৃত্তি হিমাচলে/ রক্ষাংসি ক্ষয়য়িষ্যামি মুনীনাং ত্রাণংকারণৎ।।” মনে করা হয়, ভীমা দেবীর উপাসনায় সাধক ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ এই চতুবর্গ লাভ করে বলেই তমলুকের পীঠদেবীকে বর্গভীমা রূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে ধ্যানমন্ত্রে দেবীর নাম ভীমাই—

“কৃষ্ণবর্ণা চতুর্ভূজাং মুণ্ডমালা বিভূষিতাং
দক্ষিণে খড়্গশূলঞ্চ তীক্ষ্ণধারা দূরাসদম্।।
বামে খর্পর মুণ্ডঞ্চ লোলজিহ্বা ত্রিলোচনা
ব্যাঘ্রচর্ম পরিধানাং ভীমাদেবী শবাসনা।।”

দেবী বর্গভীমা ডানদিকের দু’টি হাতে যথাক্রমে খড়্গ ও ত্রিশূল এবং বামদিকের দু’টি হাতে পানপাত্র এবং দৈত্যের মুণ্ড ধারিণী বলে মন্ত্রে আছে। বর্তমানে দেবীর বিগ্রহ বস্ত্রালংকার আচ্ছাদিত হওয়ায় দেবীর মূল প্রস্তর মূর্তি দেখা যায় না। তবে হান্টার সাহেবের বিবরণে দেবী বিগ্রহের যে বর্ণনা আছে, তার সঙ্গে ধ্যান মন্ত্রের বৈসাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি লিখেছেন— মূর্তিটি একটি অখণ্ড কৃষ্ণপ্রস্তরে খোদিত। চতুর্ভুজা দেবীর ডানদিকের উপরের হাতে রয়েছে ত্রিশূল, নীচের হাতে তরবারি। বামদিকের ঊর্ধ্বহস্তে তরবারি ও নিম্নহস্তে অসুরের মুণ্ড। মূর্তির আবরণ দেবতা রূপে অনেকগুলি বিষ্ণুমূর্তি ও খোদিত আছে। দেবীর পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্রে আবার দেবীকে কালিকা রূপে সম্বোধন আছে— “এষ সচন্দন পুষ্প বিল্বপত্রাঞ্জলি/ বর্গভীমা কালিকায়ৈ চরণে নমো নমঃ।।”

আরও পড়ুন: খড়গপুরের চমকায় ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে অনিন্দ্য সুন্দর শ্রীধর মন্দির

এখন প্রশ্ন বর্গভীমা কি তাহলে দেবী কালিকার রূপভেদ? তত্ত্বত বর্গভীমা কালী নন, তিনি তারা। কালী শিববক্ষে দক্ষিণপদ স্থাপন করে, থাকেন অর্থাৎ ‘আলীড়পদা’। পক্ষান্তরে তারাদেবী শবরূপ শিবের হৃদয়ে বামপদ বিস্তার করে দণ্ডায়মান অর্থাৎ ‘প্রত্যালীঢ়পদা’। তাই অনেকে তারাকে বামাকালী বলেন,  সেই সূত্রে বর্গভীমা কালিকা। না হলে তিনি তারা, আরও স্পষ্ট করে বললে ‘উগ্রতারা’। তিনি ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা ও প্রত্যালীঢ় পদে শবোপরি দণ্ডায়মানা, চতুর্ভুজা ও ভয়ংকরী। ভয়ংকরী অর্থেই দেবীর নাম ভীমা।

দেবী বর্গভীমার প্রতিষ্ঠা বিষয়ে একাধিক কিংবদন্তি ও জনশ্রুতি রয়েছে। প্রথমটি তমলুকের ময়ূরবংশীয় রাজা গড়ুরধ্বজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বৈদ্যের পরামর্শ অনুসারে রাজা প্রত্যহ শোলমাছ খেতেন। কিন্তু ধীবর প্রত্যহ শোলমাছ পায় কোথায়? মাছ জোগান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রাজা তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। জেলে কোনওক্রমে পলায়ন করে জঙ্গলাকীর্ণ এক কূপের পাশে পরিশ্রান্ত হয়ে  ঘুমিয়ে পড়েন এবং দেবীর কৃপালাভ করেন। দেবী নির্দেশ দেন সারাবছরের শোলমাছ শুকিয়ে সংগ্রহ করে রাখতে এবং এই কুণ্ডের জল সিঞ্চন করে তা জ্যান্ত করে রাজাকে জোগান দিতে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু একদা রাজার মনে সন্দেহ হওয়ায় তিনি জেলেকে ধরেন এবং শোল মাছের রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়। সেদিন রাজার হাতিশালায় একটি হাতি মারা গিয়েছিল। রাজা সত্যাসত্য পরীক্ষার জন্য ওই কূপের কাছে ছুটে যান। কিন্তু গিয়ে দেখেন কূপের স্থলে এক দেবীমূর্তি। তখন তিনিই আলোচ্য দেবীমন্দির নির্মাণ করে দেন।

আরও পড়ুন: প্লাজমা-পোয়েম-প্রেয়ার একসূত্রে গেঁথেছে জগদীশ-রবি ঠাকুর-স্বামীজিকে

দ্বিতীয় কাহিনিটি চণ্ডীমঙ্গলের নায়ক ধনপতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ধনপতি রূপনারায়ণ ধরে সিংহলে বাণিজ্যযাত্রাকালে তমলুকে নোঙর করেন। সে-সময় তিনি একজনকে সোনার কলস হাতে যেতে দেখেন। কৌতূহলবশত তিনি মানুষটিকে জেরা করে জানতে পারেন যে, অদূরে একটি অলৌকিক কূপ রয়েছে যাতে লোহার জিনিস ডোবালে সোনার হয়ে যায়। তখন তিনি তার বাণিজ্যতরীর পিতলের দ্রব্যসকল ওই কূপের জলে নিমজ্জিত করে, তা স্বর্ণপাত্রে পরিণত করে সিংহল যাত্রা করেন এবং প্রভূত ধনলাভ করে গৃহে প্রত্যাবর্তন কালে দেবীর প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত মন্দির নির্মাণ করে দেন।

তৃতীয় কাহিনিটি আফগান নরপতি সুলেমান কররাণীর সেনাপতি কালাপাহাড়কে ঘিরে। কালাপাহাড় প্রবল হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন। আদিতে ইনি ব্রাহ্মণ সন্তান হলেও পরে পাকচক্রে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি পুরীর জগন্নাথ মন্দির ধ্বংস করবার জন্য ১২ হাজার সৈন্যসহ যাত্রা করে পথিমধ্যে যেসমস্ত দেব-দেউল পড়েছিল, তা ভাঙতে ভাঙতে চলেছিলেন। সে-সময় তিনি তমলুকে উপস্থিত হয়ে বর্গভীমা মন্দির ধ্বংস করবার মানসে উপস্থিত হন, কিন্তু দেবীর বিগ্রহ দর্শনে তিনি স্তব্ধ হয়ে যান এবং দেবীর উদ্দেশ্যে ষোড়শোপচারে পূজা নিবেদন করে একটি বাদশাহী পাঞ্জা প্রদান করে দেবী যে যথার্থই জাগ্রত, তা স্বীকার করেন।

গর্ভগৃহের বেদিতে দেবী বর্গভীমার প্রস্তর খোদিত বিগ্রহ স্বর্ণ ও রোপ্য নির্মিত অঙ্গ ও আয়ূধ ও অলংকার শোভিত। দেবীর বেদীতে মহিষ বাহিনী চতুর্ভুজা নিয়তি, দশভুজা মহিষমর্দিনী, দ্বিভুজা আনন্দেশ্বর ভৈরবের বিগ্রহ ও সর্বানন্দ ভৈরব নামিত লিঙ্গমূর্তি প্রতিষ্ঠিত। কোগ্রামের সতীপীঠ মঙ্গলচণ্ডীর মন্দিরেও যুগ্ম ভৈরবের অবস্থান আছে। বর্গভীমা মন্দিরের নীচে রামকোট নিবাসী রামানন্দ মুগলুরিয়া চৌধুরি ১২৬০ বঙ্গাব্দে ভূতনাথ ভৈরবের একটি মন্দির নির্মাণ করেন। অনেকে ভ্রমবশত একেই বর্গভীমার ভৈরব ভাবেন। তা কিন্তু একেবারেই নয়। দেবীর ভৈরব দেবীর বেদিতে লিঙ্গরূপে বিরাজিত। মন্দিরের উত্তরদিকে একটি কুণ্ড আছে। যা মায়ের কুণ্ড পুকুর নামে পরিচিত। এখানে বন্ধ্যানারীরা স্নান করে একডুবে যা পান, তা তুলে মন্দির চত্বরে স্থিত গুলঞ্চগাছে নতুন ঘুমসিতে বেঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে যান সন্তান কামনায়। প্রত্যহ দেবীর অন্নভোগে আমশোল নিবেদন এখানকার বিশেষত্ব। নৈমিত্তিক পূজার পাশাপাশি বাংলা নববর্ষ, বিপত্তারিণী,  শারদীয়া দুর্গাপূজা, পৌষ সংক্রান্তিতে দেবীর বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অগ্রহায়ণ মাসের কৃষ্ণাচতুর্দশী তিথিতে দেবীর বার্ষিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূর্বের দিন হয় দেবীর অভিষেক। সন্ধ্যায় ঘটস্থাপন ও অধিবাস। পরদিন দশমহাবিদ্যার বিশেষ পূজা, চণ্ডীপাঠ, সপ্তশতী যজ্ঞ, নরনারায়ণসেবা, হরির লুট অনুষ্ঠিত হয়।

‘তৈত্তরীয় আরণ্যকে’র ‘যাজ্ঞিকা উপনিষদে’ সর্বপ্রথম দেবী কাত্যায়নীর নামটি দৃষ্ট হয়। দেবী দুর্গার গায়ত্রী মন্ত্রে বলা হয়েছে— “কাত্যায়নায় বিদ্মহে কন্যাকুমারীং ধীমহি তন্নো দুর্গিঃ প্রচোদয়াৎ”। ‘কাত্যায়নীতন্ত্র’ অনুসারে দেবী কাত্যায়নী হলেন— “চন্দ্রহাসোজ্জ্বলকরা শার্দুলবরবাহনা/ কাত্যায়নী শুভং দদ্যাদ্দেবী দানবঘাতিনী।।” অর্থাৎ স্বর্ণবর্ণ দেবী কাত্যায়নী বামদিকের ঊর্ধ্বহস্তে তরোয়াল ও অধোহস্তে পদ্ম, দক্ষিণের ঊর্ধ্বহস্তে অভয় এবং নিম্নের হস্তে বরদ মুদ্রা প্রদর্শন করে থাকেন। এই দেবী কাত্যায়নী ব্রজমণ্ডলের প্রসিদ্ধ দেবী। আবার তন্ত্রশাস্ত্রের মতানুযায়ী বৃন্দাবন দেবীর একান্ন সতীপীঠের ও অন্যতম। ‘প্রাণতোষণী’ তন্ত্রে বলা হয়েছে এখানে দেবীর কেশগুচ্ছ পতিত হয়েছিল, দেবীর নাম কাত্যায়নী এবং ভৈরব স্বয়ং কৃষ্ণ— “বৃন্দাবনে কেশজালে কৃষ্ণনাথস্তু ভৈরব/ কাত্যায়নী তত্র দেবী সর্বসিদ্ধিপ্রদায়িনী।।”

শুধু তাই নয়, ভক্ত বৈষ্ণবের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘শ্রীমদ্ভাগবতে’র দশম স্কন্দের দ্বাবিংশ অধ্যায়ে ব্রজ গোপিনীদের কাত্যায়নীব্রত পালনের উল্লেখ রয়েছে। বৃন্দাবনের গোপবালাগণ কৃষ্ণকে পতিরূপে লাভ করবার বাসনায় সমগ্র কার্তিক মাস ব্যাপী যমুনাতটে দেবী কাত্যায়নীর বালুকা নির্মিত মূর্তি নির্মাণ করে হবিষ্যান্ন গ্রহণ পূর্বক ভগবতী কাত্যায়নীর অর্চনা করেছিলেন। প্রত্যহ কুমারীগণ সূর্যোদয়ের পূর্বে কালিন্দীতে অবগাহন করে ধূপ, দীপ, গন্ধমাল্য, তণ্ডুল, পুষ্প, বস্ত্র প্রভৃতি দ্বারা দেবীকে তুষ্ট করে বাঞ্ছিত ফল কামনা করে বলেছিলেন—

“কাত্যায়নী মহামায়ে মহাযোগিন্যধীশ্বরি
নন্দগোপ সুতাং দেবি পতি মে কুরু তে নমঃ
ইতিমন্ত্রং জপন্তস্ত্যাঃ পূজাং চক্রুঃ কুমারিকা
এবং মাসং ব্রতং চেরুঃ কুমার্য কৃষ্ণচেতসেঃ
ভদ্রকালীং সমানর্চুর্ভূয়ান্নন্দসুতঃ পতিঃ।।”

গোপাঙ্গনাদের অর্চনায় তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁদের আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, আগামী পূর্ণিমা তিথিতে তাদের মনোভীষ্ট পূরণ হবে। সেই তিথিকে আমরা ‘রাস পূর্ণিমা’ হিসেবে জানি। সেদিন ব্রজেশ্বর কৃষ্ণ প্রত্যেক ব্রজবালার মনস্কামনা সিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু এই বিবরণের সঙ্গে বর্তমান কাত্যায়নী ব্রতের সময়কাল মেলে না। ‘হরিভক্তিবিলাস’ অনুসারে চান্দ্র রাসপূর্ণিমার পরদিন অর্থাৎ কৃষ্ণা প্রতিপদ থেকে শুরু করে সৌর অগ্রহায়ণের সংক্রান্তি পর্যন্ত এই ব্রত উদযাপিত হয়। সেই অনুসারে সৌর অগ্রহায়ণ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিটি কাত্যায়নী চতুর্দশী নামে প্রসিদ্ধ। দেবী বর্গভীমা শাক্তদেবী। বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবী ‘উগ্রতারার’ সঙ্গে তার তাত্ত্বিক ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। আবার বৈষ্ণবের পালনীয় কাত্যায়নী চতুর্দশী তিথিতে তাঁর বার্ষিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে সংযোগসূত্র কোথায়? তমলুক-তাম্রলিপ্তের প্রাচীন নাম ‘বিষ্ণুগৃহ’।

চিন্তামণি করের ‘অভিধান চিন্তামণিতে’-এর উল্লেখ আছে। ‘জৈমিনি মহাভারতে’ কৃষ্ণার্জুনের তমলুকে পদার্পণের কাহিনি দৃষ্ট হয়। দেবীমূর্তিতে পরিকর দেবতারূপে একাধিক বিষ্ণুর মূর্তি খোদিত আছে। স্বভাবতই বৃন্দাবনের প্রভাব বিষ্ণুগৃহে পড়া অস্বাভাবিক নয়। পরবর্তীকালে বৌদ্ধযুগে বৌদ্ধদের অন্যতম শক্তঘাঁটি ছিল এই তমলুক। তন্ত্রমতে ব্রহ্মার মানসপুত্র ঋষি বশিষ্ট মহাচীনে গিয়ে বুদ্ধরূপী জনার্দ্দনের কাছ থেকে তারা সাধনার রহস্য ভারতবর্ষে এনেছিলেন।

তারার সঙ্গে বর্গভীমার সাদৃশ্যের কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। কাত্যায়নী ও বর্গভীমা উভয়েই চতুর্ভূজা এবং উভয়েই তরবারি ধারণ করে আছেন। কাত্যায়নী ব্রতপালনে সাধক চতুবর্গ লাভ করেন। বর্গভীমা ও চতুবর্গ প্রদান করে থাকেন। সদাশিবের উত্তরমুখ থেকে যে-সমস্ত দেবীগণের আবির্ভাব ঘটেছিল, তার মধ্যে কাত্যায়নী ও তারা উভয়েই আছেন। দেবীর পূজাপদ্ধতি ‘নীলতন্ত্র’ অনুসারে হয়ে থাকে। অর্থাৎ বৈষ্ণব, স্মার্ত ও তান্ত্রিক এই তিন ধারার সমন্বয়ে দেবীর পূজা পদ্ধতি রচিত ও বিকশিত হয়েছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *