সত্যজিৎ ঘোষ: ফ্ল্যাশব্যাকে আশির দশকের কলকাতা ফুটবল দুনিয়া

শুভ্রাংশু রায়

মাত্র কয়েকদিন আগের কথা। সাতসকালে ফেসবুকে এক মোহনবাগান প্রাক্তনীর পোস্ট দেখে চমকে উঠলাম। তনুময় বসু। মোহনবাগানের আশির দশকের গোলকিপার। ফেসবুকে জানালেন দীর্ঘদিনের বন্ধু, মোহনবাগানে তাঁর সতীর্থ সত্যজিৎ ঘোষ আর নেই। সেদিন সকালেই এক ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে প্রাণ চলে গেছে মোহনবাগানে আশির দশকে বেশ কয়েক বছর দাপিয়ে খেলা যাওয়া সত্যজিৎ ঘোষের। ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুক্ষণ বিহ্বল হয়ে গেলেও কিছুক্ষণের মধ্যে মনে পড়ে গেল সেই সন্ধ্যার কথা। গলফ গ্রিনে বাবলুদার বাড়িতে বসে তাঁকেই প্রশ্নটা করে বসেছিলাম। এতদিন তো মোহনবাগানের জার্সিতে রক্ষণ সামলালেন। কার সঙ্গে আপনার রক্ষণে জুটি সবথেকে জমাট ছিল? প্রশ্নটি নিরীহ হলেও উত্তরকারীর নাম যখন সুব্রত ভট্টাচার্য, তখন আশপাশে উপস্থিত লোকজন হঠাৎ বেপরোয়া উত্তরের আশঙ্কায় নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। প্রায় পিন পড়ার নিস্তব্ধতায় বাবলুদার শান্ত গলায় উত্তর— সত্যজিৎ ঘোষ। কেন সত্যজিৎ ঘোষ— প্রশ্নটা করব কি করব না ভাবছি, বাবলুদা নিজেই বলতে শুরু করে দিলেন। ‘‘নির্ভুল ট্যাকেল, ঠান্ডা মাথার ছেলে ছিল সত্যজিৎ। যা বলতাম কখনও তার বাইরে যেত না। হয়তো গোল হচ্ছে না। আমি ওপরে উঠে গেলে নিশ্চিন্ত থাকতাম, ও নিজের জায়গা ছেড়ে নড়বে না। অনুমানক্ষমতা বেশ তুখোড় ছিল। অথচ কোনও দেখনদারি ছিল না। তাই সত্যজিৎই আমার সেরা পার্টনার।”

আরও পড়ুন: গোষ্ঠ পালের ইন্টারভিউ: স্মৃতিমেদুর রূপক সাহা

চিমার সঙ্গে সত্যজিৎ

আমাদের দেশে ফুটবলারদের বায়োগ্রাফি লেখার চল নেই। অবশ্য ফুটবলারদের কী বলব, ক্লাবগুলোই কতখানি নিজেদের ইতিহাসকে যথার্থ পদ্ধতি মেনে লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা করেছে! ইতিহাস জানতে চাইলে দিগ্‌বিজয়ী কর্মকর্তাদের মুখের যে চেহারা হয়, তা দেখে হয়তো ক্লাবের ইতিহাসের বিষয়ে এদের কাছে লোকজন আর লজ্জায় কিছু জানতে চান না। ভরসা করতে হয় পুরনো মানুষজনের স্মৃতি, পুরনো নিউজ পেপার, ম্যাগাজিন আর সত্তর-আশির দশকে ময়দানের সঙ্গে পরিচিত হওয়া কিছু ফুটবল পাগল মানুষজনের যাঁরা ম্যাগাজিন বা নিউজ পেপার কেটে শুধু নিজের খাতা ভরাট করেননি, সেগুলিকে আজও আগলে রেখেছেন প্রায় যখের ধন মনে করে। সেইরকমই একজন রূপকিশোর সেন।

সকালে যখন রূপকিশোরদাকে মোবাইলে ধরলাম, তখন বুঝলাম মনখারাপের রেশ মুঠোফোনের অন্য প্রান্তেও ছড়িয়েছে। কিছুটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রূপকিশোরদার মন্তব্য, ‘‘২০২০-তে আর কত মানুষের মৃত্যু দেখব।” তারপর ডুব দিলেন নিজের স্মৃতির অতলে। মোবাইলে কথা বলতে বলতেই বলে উঠলেন, ‘‘দাঁড়াও আমার স্ক্র্যাপ বুকটা বার করি।” স্ক্র্যাপ বুক মানে বাঁধানো সাদা খাতার মধ্যে খবরের কাগজের বা ম্যাগাজিনের বিভিন্ন কাটিং, ছবি সাঁটা। সত্যজিৎ ঘোষ যখন ব্যান্ডেল থেকে রেলওয়ে এফসি হয়ে মোহনবাগানে সই করলেন আশির দশকের শুরুতে (’৮২) তখন সময়টা কিছুটা এই রকমই ছিল। সাদা-কালো দুনিয়ায় মাঝেমধ্যে উঁকি মারত রঙিন ছবি। হাতের সামনে থাকত ‘খেলার আসর’, ‘খেলার কাগজ খেলা’, ‘স্পোর্টস স্টার’, ‘স্পোর্টস উইক’-এর মতো ম্যাগাজিন। আশির দশক কিন্তু ময়দানে অন্য রকম রং ছড়াতে শুরু করেছিল। ১৯৮০ সালের ১৬ আগস্ট কিছু মানুষকে চিরতরে মাঠ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। কিছু মানুষ দুর্ঘটনার ধাক্কা সামলে আবার মাঠে ফিরছিলেন।

আরও পড়ুন: অঞ্জন মিত্র: ধূসর হতে চলা পাতা ঝেড়ে-ঝুড়ে

আশির দশকের শুরুর বছরটি শুধুমাত্র ইডেনে সেই অভিশপ্ত ম্যাচের কারণেই বেশি চর্চিত হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই বছরে সৌদি আরবে বসবাসকারী এক চা ব্যবসায়ীর আর্থিক সৌজন্যে মহামেডান স্পোর্টিং বেশ বড় বাজেটের দল গড়তে সমর্থ হয়, যা কলকাতা ময়দানের ফুটবল জগতে বেশ আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। এই বছর বেশ কিছু প্লেয়ার একসঙ্গে ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে মহামেডান স্পোর্টিংয়ে যোগ দেয়, যা ময়দানে অন্য ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। তবে সাফল্য সে-বছর ময়দানের তৃতীয় প্রধানকে তেমনভাবে ধরা দেয়নি। ফেডারেশন কাপে তিন দিনের লড়াইয়ে শিবাজি ব্যানার্জির, থুড়ি মোহনবাগানের কাছে হার মানতে হয়েছিল মহামেডানকে। আর সে-বছর লিগও জিততে পারেনি মহামেডান স্পোর্টিং। অভিশপ্ত ১৬ আগস্টের কারণে লিগ সম্পূর্ণই হয়নি। কিন্তু ১৯৮১-তে মহামেডান ঘর ভেঙেছিল মোহনবাগানের। গোষ্ঠ পাল সরণির ক্লাবের তিন ঘরের ছেলে প্রসূন, বিদেশ ও মানস যোগ দিয়েছিলেন মহামেডান স্পোর্টিংয়ে। একই বছর অবসর নেন মোহনবাগানের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার প্রদীপ চৌধুরি।

এই ১৯৮১-তেই বিদ্রোহ করে পরের বছরের এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি শিবির থেকে অধিকাংশ ফুটবলার বেরিয়ে এসে ‘দেশদ্রোহী’র তকমা পেয়েছিলেন সত্য, তেমনি ক্লাব ফুটবল বনাম দেশ টানাপোড়েনের বিষয়টি স্পষ্টতর হয়ে উঠেছিল। আর ক্লাব কর্তাদের মনে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল যে, পরের মরশুম অর্থাৎ এশিয়ান গেমসের বছরে জাতীয় ক্যাম্পের প্লেয়ারদের অধিকাংশ ম্যাচে পাওয়া যাবে না। ফলে সে-বছর ময়দানের অন্য দুই বড় ক্লাবের মতো মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাবের কর্মকর্তারাও বেশ কিছু তরুণ খেলোয়াড়কে নিজেদের ক্লাবের অনুকূলে সই করান। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পরবর্তী সময়ে ভারতীয় ফুটবলে রীতিমতো তারকার মর্যাদা পান। নামগুলি? কৃশানু দে, বিকাশ পাঁজি, কৃষ্ণেন্দু রায়, অমিতাভ মুখার্জি। এঁদের সঙ্গেই সই করেছিলেন হুগলির ব্যান্ডেলের তরুণ স্টপার সত্যজিৎ ঘোষ। আগের দুই সিজন রেল দলের হয়ে ময়দানে নজরকাড়া সত্যজিৎ ঘোষ হয়তো আগের লাইনে উল্লেখ করা সহ খেলোয়াড়দের মতো ভবিষ্যতে ভারতীয় ফুটবলের বড় তারকা হতে পারেননি, তবে অনেকেই মনে করেন আশির দশকের দ্বিতীয় পর্বে আচমকা কলকাতা লিগের খেলায় চোট না পেলে ব্যান্ডেলের পিন্টু ওরফে সত্যজিৎ ঘোষের কেরিয়ার গ্রাফ আরও উজ্জ্বল হতেই পারত।

সত্যজিৎ ঘোষের মৃত্যুতে অর্ধনমিত মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাবের পতাকা

আজকের বর্ষীয়ান ক্লাব সদস্য দেবাংশু (বাপ্পা) রায়চৌধুরি, সেদিনের সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে মাঠে যাওয়া এক তরুণের চোখে ভাসে সে-বছরের মরশুম শুরুর দিনগুলি। কেমন প্লেয়ার ছিলেন সত্যজিৎ? বাপ্পা রায়চৌধুরি থেকে অশোক দে, অমিত কুমার সেন বা সূর্য নারায়ণ ভট্টাচার্যের মতো মোহন সদস্যদের মুখে সত্যজিৎ ঘোষের নাম বলতেই দু’টি কমন শব্দ উঠে এল। ‘অসম্ভব নির্ভরযোগ্য’। সেই ’৮২-র দলের সত্যজিৎ ঘোষের সতীর্থ বান্টুদা ওরফে কৃষ্ণেন্দু রায়ের স্মৃতির মানসপটে আজও উজ্জ্বল ময়দানের সেই দিনগুলি।

কেমন ছিল সেই বছরের অভিজ্ঞতা? বান্টুদা কিছুটা মোবাইলের অপরপ্রান্তে কিছুটা আবেগতাড়িত। ‘‘সে-বছর ডিফেন্স আমরা অনেকেই নতুন ছিলাম। কেবলমাত্র বটবৃক্ষের মতো রক্ষণ আগলে ছিল বাবলুদা (সুব্রত ভট্টাচার্য)। সে-বছর রক্ষণে সত্যজিৎ ঘোষকে একটু সামনের দিকে রেখে বাবলুদা একটু ডিপ থেকে লুজ বলে খেলে ডিফেন্সে নেতৃত্ব দিতে শুরু করে। নতুন খেলতে নামলেও সত্যজিৎ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল।’’

’৮২ মরশুমে মোহনবাগানের প্রথম টুর্নামেন্ট ছিল স্টাফোর্ড কাপ। সেটাই ছিল সত্যজিৎ ঘোষের মোহনবাগানের হয়ে অভিষেক টুর্নামেন্ট। ২৪ মার্চ মোহনবাগান স্টাফোর্ড কাপে প্রথম খেলতে নেমেছিল মাদ্রাজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ অ্যান্ড ইন্সটিটিউটের বিরুদ্ধে। সত্যজিৎ ঘোষদের প্রথম টুর্নামেন্ট অবশ্য জেতা হয়নি, কারণ সেই বছরের স্টাফোর্ড কাপের ফাইনালে (৪ এপ্রিল, ১৯৮২) ইরাক এয়ারফোর্সের কাছে ০-১ গোলে পরাজিত হয়ে রানার্স হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় শঙ্কর ব্যানার্জির ছেলেদের। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, সে বছর রোভার্স কাপের সেমিফাইনালে আর একটি ইরাকি দল সালাউদ্দিন ক্লাবের কাছে ০-৩ গোলে হার স্বীকার করতে হয়েছিল শ্যাম থাপার অধিনায়কত্বে মোহনবাগান দলকে (১৪ নভেম্বর, ’৮২)।

আরও পড়ুন: ‘পেনান্টি স্পেশালিস্ট শিবাজি ব্যানার্জি’ রূপকথা জন্মের চার দশক পেরিয়ে

ট্রফি জয়ের সেলিব্রেশন

সত্যজিৎ যে প্রথম বছর থেকেই মোহনবাগান রক্ষণে নির্ভরতা দিতে শুরু করেছিলেন, সে-বিষয়ে দুই প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক এবং পরিসখ্যানবিদ রূপক সাহা এবং হরিপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় একমত। প্রথম বছর অর্থাৎ ’৮২-তে শঙ্কর ব্যানার্জির প্রশিক্ষণে মোহনবাগান কলকাতা লিগ জিততে সমর্থ হয়নি। ভালো টিম সত্ত্বেও মহামেডান স্পোর্টিং লিগ খেতাব ধরে রাখতে পারেনি। এক বছর পরে আবার লিগ জিতে নিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। তবে সে-বছর মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব জিতেছিল তিনটি ট্রফি। আইএফএ শিল্ড, ফেডারেশন কাপ এবং ডুরান্ড কাপ।

এরমধ্যে বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় যে ২ মে, ১৯৮২-তে কোঝিকোড়ে ফাইনালে মফতলালকে সুরজিৎ সেনগুপ্তের করা একমাত্র গোলে পরাজিত করে প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে পর পর তিনবার ফেডারেশন কাপ জয় করে মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব। সেই টুর্নামেন্টে মোহনবাগান রক্ষণে সুব্রত ভট্টাচার্যের সঙ্গে ভরসা জুগিয়েছিলেন নবীন সত্যজিৎ ঘোষ। গোটা টুর্নামেন্টে ছ’টি ম্যাচে সুব্রত সত্যজিতের জুটি গোল খেয়েছিল মাত্র একটি। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় সুব্রত, সত্যজিৎ, গৌরাঙ্গ কৃষ্ণেন্দুরা রক্ষণে কতখানি সফল ছিলেন। আর সে-বছর আইএফএ শিল্ড খেতাব ছিল মোহনবাগানের এই ঐতিহ্যশালী টুর্নামেন্টটি টানা ছ’বার জয়ের ইতিহাস সৃষ্টির নজির।

তবে ১৯৮৩-তে কলকাতা লিগ জিততে সক্ষম হয় মোহনবাগান। ’৮৩-তে মোহনবাগান ক্লাবের গোটা মরশুমে সাফল্য বলতে ছিল এই কলকাতা লিগের খেতাব। কিন্তু তিন বছর পরে ময়দানে সবুজ মেরুন জার্সি-ওয়ালাদের সাফল্যের একটি বড় দিক ছিল একাধিক তরুণ ফুটবলারের ময়দানে প্রতিষ্ঠা পাওয়া।

আরও পড়ুন: ১৫ আগস্ট: মোহনবাগানের অন্য ধারার ‘ঘরের ছেলে’ পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি এবং শতবর্ষে বাঙালির প্রথম অলিম্পিকে অংশগ্রহণ

পেপার কাটিং সৌজন্য রূপকিশোর সেন

সে-বছর ২৫ মে লিগের প্রথম ম্যাচে অরুণ ঘোষের কোচিংয়ে মোহনবাগান ২-০ গোলে বড়িশা স্পোর্টিংকে পরাজিত করে। পরের দিন বাংলা ‘দৈনিক আজকাল’-এর ম্যাচ রিপোর্টে হেডিং হয় ‘কৃশানুর বাঁ পা যেন অনায়াস শিল্প’। আর ম্যাচ রিপোর্টের ভেতরে লেখা আর দু’টি লাইন, ‘‘মোহনবাগান রক্ষণভাগে আস্থাবান ছিলেন সত্যজিৎ ঘোষ। সুব্রতর কাজটা অনেকটাই কমে গিয়েছিল’’। সেইদিনের ম্যাচ রিপোর্টে আর এক তরুণ মোহনবাগান খেলোয়াড়, যিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত হন— তাঁর নাম কৃষ্ণেন্দু রায়।

মোহনবাগানের পরের ম্যাচ ছিল বাটার বিরুদ্ধে। ২৮ মে সেই ম্যাচে মোহনবাগান ৩-১ গোলে জিতলেও আজকাল পত্রিকার পরের দিনের রির্পোটে মোহনবাগানের খেলার বেশ কিছু নেতিবাচক দিকের কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সেই ম্যাচ রিপোর্টেই উল্লেখ করা হয়, ‘‘দ্বিতীয়ার্ধে যখন বাটার খেলোয়াড়রা নতুন উদ্যমে খেলা শুরু করেন তখন মোহনবাগান দুর্গের ফাঁকফোকরগুলি বেশ ভালো করেই চোখে পড়ে। এই সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একা লড়াই করলেন সত্যজিৎ ঘোষই।’’

আরও পড়ুন: পাগলা দাশু মারাদোনা

পেপার কাটিং সৌজন্য রূপকিশোর সেন

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, তিন বছর পরে কলকাতা লিগের খেতাব জয় করেছিল মোহনবাগান। সে-বছর ‘বড় ম্যাচ’ (তখন ডার্বি ম্যাচ কথাটির তেমন চল ছিল না) অবশ্য গোলশূন্য ছিল, কিন্তু গোটা লিগজুড়ে প্রাধান্য বজায় ছিল। লিগের সর্বসাকুল্যে ২৬টি ম্যাচে গোল খেয়েছিল মোট ৬টি। অন্যদিকে, গোল করেছিল ৫২টি। জিততে পারেনি কেবল দু’টি ম্যাচ। দ্বিতীয় মরশুমেই, যেমন আক্রমণভাগে কৃশানু দে, বিকাশ পাঁজি তেমনি রক্ষণে কৃষ্ণেন্দু রায় আর সত্যজিৎ ঘোষ ময়দানে বড় দলে নিজেদের আসন পাকা করে নিয়েছিলেন।

’৮৩-তে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মোহনবাগান কেবলমাত্র কলকাতা ফুটবল লিগ জয় করতে সমর্থ হয়েছিল। ফেডারেশন কাপ এবং ডুরান্ড কাপের ফাইনালে যথাক্রমে মহামেডান স্পোর্টিং ও জেসিটি মিলসের কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল।

আরও পড়ুন: সেই ফ্যালফ্যাল করে তাকানোটা রয়েই গেল

১৯৮৪ ডুরান্ড জয়ী মোহনবাগান টিম

’৮৪ মরশুমে মোহনবাগান ক্লাবের কোচ হিসেবে ফিরে আসেন পি কে ব্যানার্জি। সে-বছরই ’৭৯-এর পরে মোহনবাগান ক্লাবে সই করেন সমর ভট্টাচার্য। কয়েকটি ম্যাচে সুব্রত ভট্টাচার্যের সঙ্গে স্টপারে সমর ভট্টাচার্য খেললেও মরশুমে অধিকাংশ সময় সত্যজিৎ ঘোষকেই বাবলু ভট্টাচার্যের সঙ্গে জুটি বেঁধে খেলতে দেখা গিয়েছিল। ’৮৪-তে মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব ক্যালকাটা ফুটবল লিগ ছাড়াও বরদৌলি ট্রফি, সিকিম গোল্ড কাপ এবং ডুরান্ড কাপ জিততে সমর্থ হয়েছিল। পরের মরশুমে কলকাতা লিগের খেলায় রাজস্থানের বিরুদ্ধে সত্যজিৎ ঘোষের চোট লাগে হাঁটুতে। সেই দিন, বন্ধু কৃষ্ণ গোপাল চৌধুরির স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, চোট পেয়ে মাঠের বাইরে যাওয়ার পরে শৈলেন মান্না বারবার মাঠে নামতে বারণ করলেও সত্যজিৎ ঘোষ দলের স্বার্থে আবার মাঠে ব্যান্ডেজ জড়িয়ে নেমে পড়েন। চোট আরও বেড়ে যায়। বেশ কিছু দিনের জন্য সত্যজিৎ ঘোষকে মাঠের বাইরে চলে যেতে হয়। এই চোট সত্যজিৎ ঘোষের ফুটবল কেরিয়ারে অন্যতম বড় ক্ষতির কারণ হয়ে যায়। ’৮৫-তে মোহনবাগান সিকিম গোল্ড কাপ, রোভার্স এবং ডুরান্ড কাপ জয় করলেও ফেডারেশন কাপের ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে ০-২ গোলে হেরে যায়। ’৮৬-তে মোহনবাগানে মরশুমে শুরুর দিকে মোটামুটি প্রথম একাদশে জায়গা পেলেও মরশুম এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে অনিয়মিত হয়ে পড়েন সত্যজিৎ ঘোষ। পরের মরশুমে একটানা পাঁচ বছর খেলার পরে সবুজ মেরুন জার্সি ছাড়তে বাধ্য হন সত্যজিৎ। সে-বছর এরিয়ান্সের হয়ে কলকাতা লিগ, আইএফএ শিল্ড এবং অন্যান্য টুর্নামেন্ট খেলেন তিনি। কেমন ছিল সেই সময় তাঁর খেলোয়াড় জীবনের টানাপোড়েন? তিনি কি এরিয়ান খেলেই আবার ফিরেছিলেন মোহনবাগানে? বিষয়টি জানতে ফোন করেছিলাম বিশিষ্ট পরিসংখ্যানবিদ নারায়ণ দাশগুপ্তকে। কিছুটা কুণ্ঠা নিয়েই। বন্ধু এবং ফুটবল গবেষক প্রশান্তদা (গুপ্ত)-র পরামর্শে।

নারায়ণবাবু ফোনে তাৎক্ষণিক কিছু তথ্য জানালেন। কিছু বিষয়ের জন্য সময় নিলেন। পরের সকালে শুধু নিজেই ফোন করে সমস্ত পরিসংখ্যান জানালেন তাই নয়, বেশ কিছু পুরনো ম্যাচের নিজের সংগ্রহে থাকা নিউজ পেপার কাটিং থেকে পড়েও শোনালেন। লেখার শুরুতেই বলেছিলাম কিছু মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগের কথা। যাঁরা না থাকলে কলকাতা ফুটবলের ইতিহাস লিখতে হলে অনেকেরই কালঘাম ছুটে যেত। এই দীনতার দায় কিন্তু আমাদের সকলেরই। আমরা ক্লাব কর্তাদের কাছে ট্রফি জিততে না পারার জন্য কৈফয়ত তলব করেছি এবং অনেকক্ষেত্রে নিজের ক্লাব টেন্টও বেশ গর্বের সঙ্গে ভাঙচুরও চালিয়েছি। কিন্তু কোনওদিনই বড় ক্লাবগুলোর দশক ধরে বিস্তারিত ইতিহাস, স্মারক, ট্রফি, সংশ্লিষ্ট টুর্নামেন্ট জয়ের নিউজ পেপার কাটিং সংরক্ষণের দাবি জানাইনি। গড়ে ওঠেনি কোনও মিউজিয়াম। ফলে ট্রফি এসেছে, জয় শেষে ক্লাব তাঁবুতে পতাকা উঠেছে, মিষ্টি বিতরণ হয়েছে আর কিছুদিন পরে সেগুলি কালের নিয়মে বিস্মৃতির গ্রাসে চলে গেছে। যাই হোক, আবার মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক। সত্যজিৎ ঘোষ কিন্তু মোহনবাগানে ফিরে এসেছিলেন ’৮৮ সালে। সে-বছর মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব মরিশাস সফরে যায় নভেম্বর মাসে। মরিশাসের ক্যাডো ক্লাবের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মোহনবাগানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তিনটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলার জন্য। সেই সফরে সত্যজিৎ ঘোষ যেতে রাজি হননি। কারণ কি ছিল এই না যাওয়ার? সেই মরশুমে মোহনবাগানে সাড়া জাগানো স্টপার অচিন্ত্য বেলেলকে জানতে চাইলে কোল ইন্ডিয়ার কর্মী, হুগলির আর এক উল্লেখযোগ্য ফুটবলার অচিন্ত্যদা কোনও নির্দিষ্ট কারণ না বলতে পারলেও এই না যাওয়াটা সত্যজিৎ ঘোষের মোহনবাগানে ফুটবল কেরিয়ার আর দীর্ঘ না হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হয়ে যায় বলে উল্লেখ করেন। পরের বছর সত্যজিৎ ঘোষ সই করেন মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। সেটাই ছিল কলকাতা ময়দানে সত্যজিতের শেষ বড় ক্লাব। এরপর খেলা ছাড়ার পরে আর কোনও দিনই ফুটবল প্রশাসন বা কোচিংয়ে আসেননি তিনি। মন দিয়ে সাংসারিক দায়িত্ব পালন করেছেন আর অফিস করেছেন।

রোভার্স কাপ জয়ী সবুজ মেরুন ব্রিগেড

তাঁর নিজের জায়গা ব্যান্ডেল শহর থেকেই উঠে আসা বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক এবং ‘এক্সট্রা টাইমে’র কর্ণধার অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়। অনিলাভদাকে সত্যজিৎ ঘোষের কথা বলতেই মোবাইলে স্মৃতি মেদুরতায় আক্রান্ত হলেন। “আমার জীবনে মোহনবাগান মাঠে প্রথম খেলা দেখা পিন্টুদার বাবার সদস্য কার্ডে। সৌজন্যে আমার এক পাড়ার দাদা। সত্যজিৎ ঘোষের বাবা শৈলেন মান্নার সহকর্মী ছিলেন জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায়। দু’জনকে একসঙ্গে পাশাপাশি বসেও খেলা দেখতে দেখেছি। আমরা যখন ব্যান্ডেলে প্র্যাকটিস করতাম তখন সত্যজিৎদা আমাদের ওখানে রীতিমতো হিরো ছিল। মনে পড়ে একদিন প্র্যাকটিস শেষে আমি, অনীত আর অঞ্জন সোজা গিয়ে উপস্থিত হাজির হয়েছিলাম পিন্টুদার বাড়ি। টিপস চাইতে। না বলেকয়ে। একটুও বিরক্ত না হয়ে সেদিন সত্যজিৎদা টিপস দিয়েছিল। কথা বলেছিল প্রায় ঘণ্টা দু’য়েক। এমনকী জার্সি, বুট হোর্স উপহারও দিয়েছিল। পরে আমি ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। কিন্তু কোনওদিন কোনও দরকারে পিন্টুদার তরফে কোনও ফোন আমার কাছে আসেনি। সত্যজিৎ ঘোষ অবশ্যই ভালো খেলোয়াড় ছিলেন কিন্তু আমার কাছে পিন্টুদা অনেক বড় মনের মানুষ ছিল।” মনে পড়ে শেষ দেখা হয়েছিল বছর দুই বা একটু বেশি সময় আগে। হাওড়া স্টেশনে। বাবলুদা আপনাকেই তাঁর জীবনের সেরা জুটি বলেছেন, এটা জানানোর পরে সত্যজিৎ ঘোষের মুখে ছিল কেবলমাত্র একটু লাজুক হাসি। সত্যজিৎ ঘোষের ময়দানের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? অবসরের ময়দান ছেড়ে যাওয়াটা নিছক তাঁর স্বভাবজনিত নাকি তাঁর কোনও চাপা অভিমান লুকিয়েছিল নিজের মনের কোনায়? জানার কোনও উপায় নেই। কারণ তো প্রথমেই বলেছি, ফুটবল খেলোয়াডদের আত্মজীবনী লেখার চলটাই নেই। বিখ্যাত নক্ষত্র খেলোয়াড়দেরই নেই। দেড়শো বছরের বেশি তো ফুটবল খেলছি আমরা। কতজন খেলোয়াড়ের আত্মজীবনী বা জীবনী আছে বলুন তো হিসেব করে। জানি শৈলেন মান্না, চুনী গোস্বামী, পি কে ব্যানার্জি, শিবাজি ব্যানার্জি (যদিও শেষ তিনটি আউট অফ প্রিন্ট দীর্ঘদিন)-র নাম মনে আসছে। কিন্তু আর? গোষ্ঠ পাল, উমাপতি কুমার, আমেদ খান, সুব্রত ভট্টাচার্য আরও আরও কত নাম উঠে আসতে পারে এই ‘নেই’-এর তালিকায়।

আসলে সময়ের নিরিখে একজন ফুটবল খেলোয়াড়ের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দু’টি ভিত্তিকে আমরা সাধারণভাবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকি। খেলার মাঠে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়টির পারফরম্যান্স এবং অফ দ্য ফিল্ড বা মাঠের বাইরে সেই খেলোয়াড়ের আচরণ। এক্ষেত্রে আর একটি বিষয় আমাদের এই মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আলোচনায় রাখা উচিত, তা হল যে সময় সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়টি খেলেছেন, সেই সময়কে আলোচনার বৃত্তে রাখা। এ-কথা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, কলকাতা পৃথিবীর অন্যতম পুরনো ফুটবল খেলা শহর এবং স্বাভাবিকভাবে কলকাতা ময়দানে ফুটবলের ইতিহাস দেড় শতাব্দীর বেশি সময়ের। আর এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কলকাতার ফুটবল খেলার শৈলী এবং খেলার সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নানা ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। একজন খেলোয়াড়ের মূল্যায়নের জন্য বিশেষত কলকাতা ময়দানে এটি একটি আবশ্যক শর্ত হিসেবে আমাদের ধরতেই হয়।

সত্যজিৎ ঘোষের অটোগ্রাফ

সত্যজিৎ ঘোষ যে সময় কলকাতা ময়দানে একটি জেলা শহর থেকে খেলতে এসেছিলেন, তা আর্থ-সামাজিক দিক থেকে পশ্চিম বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সত্তরের অশান্ত আর্থ-সামাজিক এবং অবশ্যই রাজনৈতিক অস্থিরতা পেরিয়ে আশির দশক নতুন সময়ের সূচনা করেছিল, যেখানে একদিকে যেমন সামাজিক মূল্যবোধের ধারণার নতুন বিন্যাস হচ্ছিল, তেমনি আশির শুরুতে জেলা শহরগুলির মধ্যবিত্তের নতুন করে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তি হচ্ছে। মফঃস্বল মধ্যবিত্তের আর্থ-সামাজিক উত্থানের একটি বড় মাধ্যম ছিল সরকারি বা সরকার পোষিত চাকরি। ফুটবল খেলায় ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সরকারি চাকরির সুযোগ এবং সম্ভাবনা শুরু হয়েছিল। সত্তরের দশকে ব্যাঙ্ক ও বিমা ক্ষেত্রে প্রচুর সংখ্যায় ফুটবলার নিয়োগ শুরু হয়। বলাই বাহুল্য, আশির দশকের শুরুতেও সেই ধারা অক্ষুণ্ন ছিল। ফুটবলের ক্ষেত্রে পুরো আশির দশকে জুড়েই ক্রাউড পপুলারিটি বা জনপ্রিয়তার সিংহভাগ ছিল ফুটবলারদের দখলে। ফলে সরকারি চাকরি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রাপ্তির সম্ভাবনা মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্তের পরিবারের ছেলেদের বেশি করে ফুটবলমুখী করে তুলেছিল (এখানে ছোট করে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই আশির দশকে কলকাতায় মহিলা ফুটবল প্রসার হতে শুরু করলেও তার প্রসারের হার তুলনামূলকভাবে ভীষণই কম ছিল কারণ এক্ষেত্রে চাকরি ও সামাজিক মর্যাদা প্রাপ্তির বিষয়টি পুরুষ ফুটবলের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।)।

শুরুতেই আমরা উল্লেখ করেছি ’৮২-তে একঝাঁক নতুন মুখ মোহনবাগানে সই করেছিল এবং খেলার সুযোগও তাঁদের জুটে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁরা অনেকেই ভারতীয় ফুটবলের নক্ষত্রে পরিণত হয়েছিলেন। স্টপার হিসেবে সত্যজিৎ ঘোষ যাঁর জায়গায় খেলতে শুরু করেছিলেন, সেই প্রাক্তন আন্তর্জাতিক ফুটবলার প্রদীপ চৌধুরি পরবর্তী সময়ে মোহনবাগান রত্ন হয়েছেন। আর যার পাশে সত্যজিৎ ঘোষ মোহনবাগানের রক্ষণ সামলেছেন আশির দশকের অধিকাংশ সময়, মুখোমুখি হয়েছেন কলকাতা ময়দানের প্রবাদপ্রতিম দুই বিদেশি ফুটবলার মাজিদ ও চিমাকে সেই সুব্রত ভট্টাচার্যের কপালেও জুটেছে মোহনবাগান রত্নের স্বীকৃতি।

সুব্রত ভট্টাচার্যের সঙ্গে ছ’টি মরশুম মোহনবাগান রক্ষণ সামলানো সত্যজিৎ ঘোষ ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই মুখচোরা শান্ত এবং নিরীহ স্বভাবের মফঃস্বলের ভদ্রলোক। সুব্রত ভট্টাচার্যের একবারে বিপরীত স্বভাবের মানুষ। দিল্লি বা বম্বেতে (অধুনা মুম্বই) দল খেলতে গেলে প্রায় যিনি সত্যজিৎ ঘোষের রুমমেট থাকতেন, সেই কৃষ্ণগোপাল চৌধুরির মনে পড়ে সেইসব সন্ধের কথা, যে সন্ধেগুলোয় সেই সময়ের মোহনবাগান ফুটবল দলের ম্যানেজার পদ্মশ্রী শৈলেন মান্নার প্রিয় ফিঙ্গার চিপস, তেলেভাজা-মুড়ি সহযোগে তাঁদের আড্ডা জমে উঠত, রাত কাবার হয়ে যেত কৃষ্ণগোপালের গানে। ১৯৮৩-তে আরও কিছু সমসাময়িক ফুটবলারের সঙ্গে ইলাহাবাদ ব্যাঙ্কে প্লেয়ার্স কোটায় চাকরিতে ঢুকেছিলেন, নব্বইয়ের শুরুতে পাকাপাকিভাবে ফুটবল বুট তুলে রাখার পরে মন দিয়ে সেই চাকরিই করে গেছেন পিন্টুদা ওরফে সত্যজিৎ ঘোষ। ময়দানের প্রচারের আলোর সার্চ লাইট থেকে বহু যোজন দূরে। চুঁচড়া ইমামবাড়া হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই মোহনবাগানের হয়ে অভিষেকের আটত্রিশ বছরের মাথায় পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যান সত্যজিৎ ঘোষ। আর সেদিনই কেন তাঁর প্রয়াণে ক্লাবের ফেসবুক পেজে এখনও কিছু লেখা হল না, তা নিয়ে সোচ্চার হলেন বেশ কিছু মোহনবাগান সদস্য, সমর্থক। কয়েক ঘণ্টা পরে অবশ্য তাঁর সম্পর্কে ক্লাবের ফেসবুক পেজে পোস্ট দেওয়া হয়। ক্লাব তাঁবুতে অর্ধনমিত রাখাও হয় ক্লাবের সবুজ মেরুন পতাকা। বোঝা যায়, কলকাতা ময়দান বা অধিকাংশ সময় খেলে যাওয়া মোহনবাগান ক্লাবের সমর্থক বা কর্তৃপক্ষের অন্তত ভুলে যাওয়া সম্ভব নয় ‘ভদ্রলোক’ সত্যজিৎ ঘোষকে।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

5 comments

  • Debashis Majumder

    Soshroddho pronam Proyato Satyajit Ghosh ke. Khub I monograhi lekha.

  • Amrita Basu Roy Chowdhury

    Anek kichhu jante parlam. Krirapremider ek anobadyo upohar dilen lekhok.

  • Subhankar Biswas

    অসাধারণ লেখনী স‍্যার, সমৃদ্ধ হলাম…..
    জয় মোহনবাগান ♥️♥️♥️

  • সেই কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম ❤️❤️❤️❤️❤️

  • অসাধারণ লেখা স্যার ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *