সে রাতে

দেবব্রত হাজরা

মাসটা শ্রাবণ। ক’দিন ধরে সূর্যদেব মেঘের আড়ালে। বৃষ্টি কখনও ঝমঝমিয়ে, কখনও ঝিমঝিম, আবার কখনও ইলশেগুঁড়ি হয়ে সারাদিন-রাত পড়েই চলেছে। সকালে বীরেনদাদের সঙ্গে বেলতলায় চা-দোকানে আজ আর আড্ডাটা হল না। আড্ডায় যেতেই পারলাম না। রাস্তায় থকথকে কাদা। কোথাও পিছল। কোথাও কাদায় গোছাড় (গোড়ালি) ডুবে যায়। বারো বিঘের রাস্তা পেরিয়ে বাস রাস্তায় উঠে তবেই বেলতলা। বর্ষায় বারো বিঘের রাস্তা পেরোনো একটা ভয়াবহ ব্যাপার। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি। তার ওপর মানুষের সঙ্গে হালের গরু, গাই, বাছুর, ছাগল ইত্যাদি ইত্যাদি রাস্তায় যাওয়া-আসা করে রাস্তাটা নরক করে তুলেছে। আমি হলপ করে বলতে পারি, কোনও শহুরে ভদ্রলোক গ্রাম্য নিভৃত সৌন্দর্য উপভোগে এখানে এসে যদি বারো বিঘের রাস্তা পেরোন, তবে তিনি আর কখনোই এ-মুখো হবেন না, অন্তত বর্ষাকালে তো নয়ই। তবু প্রাত্যহিক কাজে এখানকার মানুষদের বেরোতে হয়, ফিরতে হয়। আজকে আমার আর দক্ (কাদা) ঘাটতে ইচ্ছে হল না। সারাদিন পড়ার বই আর পড়ার বাইরের বই নেড়েচেড়ে কেটে গেল। মন লাগাতেও পারলুম না। সন্ধে হলে বৃষ্টির গতি একটু কমল। সকালে আড্ডাটা না হলেও আমাদের ক’জনের দিনান্তে আড্ডা দেওয়ার আর রাত কাটানোর একটা জায়গা আছে। সেটি হল লাইব্রেরি। ঝড় হোক, জল হোক, যেকোনও দুর্যোগে আমরা ছ’জন ওখানে পৌঁছবই। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ বীরেনদা পূর্ণ সময়ের বেকার। নরেন, রমেশ, নিবারণ আর বরুণ সারাদিন পরিশ্রম করে রাতের খাবার খেয়ে এখানে এসে ওঠে। এদের মধ্যে আমি তখনও ছাত্র। তবে আড্ডায় আমরা সবাই রাজা।

রাত্রি আটটা নাগাদ খেয়ে মাকে বলে লাইব্রেরির উদ্দেশ্যে পথের কাদায় নামলাম। পদ্মপুকুরে ধার ধরে বাঁ-দিকে নরেনদের গোয়ালঘর আর প্রামাণিকদের বাড়ির পাকা দেওয়ালের পাশ দিয়ে আরও একটু এগিয়ে বাঁ-দিকে বাঁশবন আর ডানদিকে বিপজ্জনক ‘টে’ বনের পাশ দিয়ে ব্যাং আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে শুনতে খেলার মাঠের ওপর দিয়ে যখন লাইব্রেরিতে পৌঁছলুম। দেখি লাইব্রেরির বারান্দায় বরুণ একা বসে আছে।

লাইব্রেরির দরজা খুললুম। দু’জনে ঘরের কোন থেকে অন্ধকার হাতড়ে হ্যারিকেন, কেরোসিনের বোতল আর দেশলাই টেবিলের ওপর নিয়ে এলুম। হ্যারিকেন লাইব্রেরির, তেল আর দেশলাই আমাদের। জ্বালালুম। আড্ডার মৌতাতে হ্যারিকেনের চিমনি নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়ে ওঠে না। কালিপড়া হ্যারিকেনের আবছা আলোতে আলমারি থেকে স্বপন কুমারের চটি একখানা রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের বই বের করে পড়তে বসলুম। টেবিলের অন্যদিকে বসে বরুণ ওই দিনের বাসি খবরের কাগজে চোখ বোলাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের গ্রুপ লিডার বীরেনদা, রমেশ আর নিবারণ কেউ মাথায় ছাতা, কেউ মাথায় গামছা চাপা দিয়ে টিপটিপে বৃষ্টির মধ্যে এসে উপস্থিত হল। এসেই আমার উপর চড়াও হল, রমেশ বলল, ”পড়ছ পড়ো কিন্তু আলো আমাদেরও চাই, আমরা টুয়েন্টি নাইন (তাস) খেলব, বরুণ কাগজ রাখ।” শেষপর্যন্ত একটা রফা হল। আলো টেবিলের মাঝখানে থাকবে। আমি একদিকে পড়ব। আর একদিকে ওরা চারজন তাস খেলবে। তবে খেলার আগে বীরেনদা ছাড়া বাকি তিনজন বিড়ি ফুঁকতে বারান্দায় গেল। সারাদিন ওদের বড্ড খাটনি গেছে।

রাত বাড়ছে। পাশে চার তাসুড়ের হইচই বাড়ছে, খেলায় ডাকাডাকি চলছে… ১৬… আছি… ১৭… আছি… আঠারো… পাস… ডবল… রি-ডবল… গোলাম… পেয়ার… তুরুপ ইত্যাদি ইত্যাদি। রাত বাড়ছে গোয়েন্দা দীপকের অভিযান বেশ জমজমাট হয়ে উঠছে। একসময় তাসের হইচইয়ের মধ্যে বইটা টেবিলে উলটিয়ে বারান্দায় গেলুম। হাত বাড়িয়ে বুঝলুম গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। ঘরে ঢুকে ওদের জিজ্ঞেস করলুম, “হ্যাঁ রে ক’টা বাজে?” কেউ একজন বলল, “সাড়ে দশটা এগারোটা হবে।” বললাম, “নরেন তো এখনও এল না রে।” তাস খেলা থামিয়ে বীরেনদা বলল, “বোধহয় ভাঁটার মালিক ওকে আজ ছাড়তে দেরি করছে।” নরেন একটা ইটভাঁটায় কাজ করে। দিনরাতের কাজ। নরেন বেশ সাহসী। ডাকাবুকো। কাজ সেরে ফিরতে প্রায়ই বেশ রাত হয়ে যায়। যাইহোক, আমরা আবার যে যার কাজে মত্ত হয়ে গেলুম। এর প্রায় আধঘণ্টা বাদে নরেন এসে হাজির। বগলে বালিশ কাঁথা। বৃষ্টি থেকে মাথা আর বালিশ কাঁথা বাঁচাতে একটা গামছা মুড়ি দিয়ে এসেছে। কোরাসে বলে উঠলাম, “তোর এত দেরি?” নরেন নিজের বুকের উপর হাত রেখে বলল, “দেখ! আমার বুকটা এখনও কেমন ঢিপঢিপ করছে।” আমরা বুঝলুম গুরুতর কিছু ঘটেছে। এবার ব্যাপারটা নরেনের জবানিতেই শোনা যাক।

নরেন শুরু করল, “আমাকে ভাঁটার মালিক ছাড়ল তো বেশ রাত্তিরে, বাড়ি এসে খেয়েদেয়ে বালিশ-ক্যাঁতা বগলে করে তো বেরিয়ে পল্লুম। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি দেখে একটা শুকনো গামছা মাথার থেকে বালিশ-ক্যাঁতা সুদ্ধু মুড়ে একেনে আসতিছি, তো পদ্মপুকুরের পরে আমাদের গোল (গোয়াল) ঘর পেরিয়ে যখন পরামানদের (প্রামাণিকদের) ইটের দেলের কাছ বরাবর হইচি কী, অন্ধকারে দেকি কি না দেলের ওপর থেকে একটা সাদা কাপড় দুলে দুলে দেয়াল বেয়ে ভেসে ভেসে নেবে এসতেছে। রাস্তার ওপর নেবে সেটা আবার আমার দিকেই এসতেছে। আমি আর এগোতে পাল্‌লুমনি। ভয়ে আমার কোমর থেকে ঘাড় অবধি  শিরদাঁড়া শিরশির করে উঠল। কান দু’টো গরম হয়ে ভোঁ-ভোঁ করতে লাগল। চাদ্দিক অন্ধকার। একটাও মনিষ্যি জেগে আছে কি না সন্দেহ। সাদা কাপড় এগোতে লাগল। আর আমি পেছোতে লাগলুম। দেকি কি সাদা কাপড়ের মধ্যে থেকে একটা হাত আমার গলার কাছ বরাবর নাড়তে নাড়তে এগিয়ে এসতেছে। আমার চ্যাঁচানিরও ক্ষ্যামতা নেই। পেছোতে পেছোতে গোল ঘরের দেলে সেঁটে গেনু। আর পেছনোর জ্যাগা নেই। এর মধ্যে ফিসফিসিয়ে আবছা কটা কতা নাকি সুরে কানে এল— বঁলিঁ-সঁ-নিঁ-বাঁ-বাঁ বঁলিঁ-সঁ-নিঁ-বাঁ-বাঁ। আমি ঢোঁক গিলে ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় জিজ্ঞেস কল্লুম— ‘হ্যাঁগা তু-মি-কে?’ সাদা কাপড় ফিসফিস করে কানের কাছে বললে, ‘আমি ম্যানোর মা’। একটু ধাতস্থ হয়ে জিজ্ঞেস কল্লুম— ‘তা এত রাতে একেনে কী কচ্ছিস?’ বলল— ‘দেলের উপর দিক থিনে শুকনো ঘুঁটে পাড়ছিনু।’ বললুম, ‘এখন এত রাতে ঘুটে কী করবি?’ আমার মুখের উপর হাতটা চেপে বললে, ‘আস্তে বল বাবা, ক’দিনের টানা বোর্ষাতে জালন বলতে কিছু শুকনো নেই উনুনে দেবার মতো। ছেলেটা সোন্দেবেলা হাট থেকে আটা এনেছে। রুটি করব বলে সেই সন্ধে থিনে বসেছিনু। পারামান (প্রামাণিক)-দের বাড়ির লোকজন চুপ হতে শুকনো ঘুঁটে কিছু দেল থেকেন ছাড়াতে এয়েছিনু, বাপ, তুই তো আবার সামনে পড়ে গেলি।’ জিজ্ঞেস কল্লুম, ‘তা তুই অত উপরে উঠেছিলিস কী করে?’ ম্যানোর মা ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ওই কোনের দিকে মই ঠেকানো আছে, এখন কি হবে বাপ, আমি যে আটা মেখে এইচি, দাবায় লম্পরটা জ্বলচে।’ বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে দেখনু লম্পরটা জ্বলচে। তখনও আমার বুকের কাঁপুনি যায়নে। বল্লুম, ‘দাঁড়া, কোঁচড় পাত, কিছু ঘুঁটে তোকে ছাড়িয়ে দিই।’ বলে মই বেয়ে উঠনু, দেলের উপর দিক থেকে কিছু শুকনো ঘুঁটে ছাড়িয়ে কোঁচড়ে দিনু। আর বল্লুম, ‘এবার মই নিয়ে সরে পড়।’ এই এত পব্ব করে একেনে পৌঁছানু।” ঘটনার আদ্যোপান্ত শুনে সবাই হেসে ফেললুম। আমাদের মধ্যে নিবারণ মুরুব্বিপনা করে নরেনকে বলল, “তুই আবার চোরকে হেল্প করলি?” নরেন একটা গালাগাল দিতে যাচ্ছিল, মাতুল সম্পর্ক বলে সামলে নিল, বলল, “তুই শুধু হেল্পটাই দেখলি, ভূত ভেবে ভয়ে আমার বুকের ভেতরে যা হচ্ছিল তুই কি বুঝবি! রাত হয়েছে, হ্যারকিনের তেল কমতেছে। বিসনে (বিছানা) করে নে। যা একটা দিন গেল, দাঁড়া একটা বিড়ি খাই।” এই বলে নরেন বারান্দার দিকে পা বাড়াল।

অলংকরণ: জয়িতা ভৌমিক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *