সেবকবাবু

পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘কাকাবাবু, প্রণাম। শরীর ঠিক আছে তো আপনার তো আবার সুগার, প্রেসার, শ্বাসকষ্টের ধাত সবই আছে। ওজন বেশি। বড় চিন্তা হয় এসব ভেবে। রাস্তাঘাটে বেশি বেরোবেন না। পৃথিবীর এখন যা অবস্থা, বোঝেনই তো! আপনারা সচেতন মানুষ, নতুন করে আর কী বলব? তবুও বলতে হবে আমাদের সরকার নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন পরিস্থিতি!’

‘ওই আছি বাবা একরকম। যেমনটি থাকে রিটায়ার করা একা অসুস্থ মানুষ! ছেলে জার্মানি থাকে। মেয়েও বিয়ে হয়ে দিল্লি প্রবাসী। খোঁজখবরটা রাখলেও কেউই আসতে পারে না বিপদে। বাগান সমেত আট কাঠার উপর দোতলা বাড়ি আমার। কে দেখবে, কে যে রক্ষা করবে আমার পর! চোখেও ছানি পড়েছে। কাটাব যে, তারও সময়টা হচ্ছে না। পেনশনের ব্যাপারটার সুরাহা হয়নি এখনও । তার তদ্বির করতে এই অশক্ত শরীর নিয়ে চারিদিকে ছোটাছুটির বিরাম নেই। তার উপর মাস দু’য়েক ধরে জুটেছে আর এক নতুন উৎপাত। অশান্তিতে, ভয়ে এবার বোধহয় রাতের ঘুমটাও গেল!’

‘সে কী কাকাবাবু? কী হয়েছে? কার এত সাহস যে আমি থাকতে, আমার পার্টি থাকতে আপনার মতো নিরীহ  ভদ্রলোককে উত্ত্যক্ত করছে? ভয় দেখাচ্ছে? দেশে কি আইন নেই?’

“তারা তো শুনি বাবা তোমার পার্টিরই আশ্রিত! সত্যি মিথ্যে জানি না। জানতে চাইও না। মাস দু’য়েক আগে, তখন রাত দশটা। সবে আমি খেয়েদেয়ে শুতে যাচ্ছি। হঠাৎ গোটা দশেক ষন্ডাগন্ডা মার্কা ছেলে এসে বলল, ‘মেসোমশাই! আমরা পার্টির ছেলে। এ বাড়ি আপনাকে জলদি খালি করে দিতে হবে। বহু লোকের থাকার জায়গা নেই। এখানে আমরা পাঁচ তলা ফ্ল্যাট তুলব। আপনার ভাগটা আপনি পেয়ে যাবেন। তিনটে ফ্ল্যাট আর পাঁচ লাখ টাকা ক্যাশ। ততদিনের ভাড়া বাড়ি আমরাই দেখে দিচ্ছি। আমরাই ভাড়া মেটাব সেখানে।আর না উঠতে চাইলে বুঝতে পারছেন তো! আপনি বয়স্ক একা অসুস্থ মানুষ। ঝুটামুটা কখন কি হয়ে যায়’!”

আরও পড়ুন: ছাঁকনি

বাবা, তুমিও জানো, এ আমার পৈতৃক বাড়ি। আমার স্ত্রীও দশ বছর আগে এই বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কত মায়া ও স্মৃতি এখানে। এ আমি কীভাবে ছাড়ব?’

‘ সে কী? এরকম দুঃসাহস আর অসভ্যতা? আমাকে ডেকে পাঠাননি কেন? দেখে নিতাম কে কত বড় বাপের ব্যাটা?’

‘তোমাকে বহুবার চেষ্টা করেছি বাবা। ফোনে পাওয়া যায়নি।’

“আর বলবেন না। ক’দিন থেকে ফোনের নেটওয়ার্ক এত জ্বালাচ্ছে যে, কেউই দরকারে ফোনে পাচ্ছে না আমাকে। সে যাকগে। আপনি এ নিয়ে একদম চাপ নেবেন না কাকাবাবু! পিন্টু, ম্যাটারটা সিরিয়াস। লিখে নে ডায়েরিতে। জেলা কমিটির মিটিংয়ে তুলে এর একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে। নিশ্চিত এ আমার বিরোধী গোষ্ঠীর কাজ! অসহায় বৃদ্ধ মানুষের এ কী দুরবস্থা? কেউ রেয়াত পাবে না। আইনের চোখে সবাই সমান।’

পিন্টু বলল, ‘হ্যাঁ স্যার !’

বৃদ্ধ রামরতনবাবুর বাড়ি থেকে সেবকবাবু বাইরে এসে দাঁড়ালেন সহকারী কাম হোল টাইম বর্ডিগার্ড পিন্টুকে সঙ্গে নিয়ে।

সেবকবাবু উত্তর চব্বিশ পরগনার এই চত্বরে নতুন হওয়া কর্পোরেশনের দাপুটে এক দাদা। তার দাপটে এখানে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়। প্রমোটিং ও বিল্ডিং মেটিরিয়ালের কারবারি তিনি সদ্য রাজনীতিতে এসেছেন। এসেই নমিনেশন পেয়ে গেছেন ভোটে দাঁড়ানোর।

আগের বারের বিজয়ী প্রার্থী এবার অসুস্থতার কারণে টিকিট পাননি। সেই আসন ধরে রাখতে হবে তাঁকে। গুরুদায়িত্ব। তাই দেরি না করে খবর পাওয়ার পরদিন থেকেই মহল্লায় মহল্লায় প্রচারে বেরিয়ে পড়েছেন তিনি তাঁর দুধ সাদা সাধের ইনোভাটা নিয়ে। সঙ্গে ছায়া সঙ্গী পিন্টু। সেবকের প্রমোটারির কারবারও এখন একা হাতে সামলায় সে। সেবকবাবুর পরনে পাজামা, ঘিয়ে দামি খদ্দরের হাঁটু পর্যন্ত পাঞ্জাবি। তার ভিতর থেকে উঁকি মারছে গর্ভবতী মহিলাদের মতো উঁচু পেট। গলায় ঝুলছে পার্টির উত্তরীয়। মোটা সোনার চেন। চকচকে দাড়ি কামানো গাল। বিশাল মুখে গোল্ডেন ফ্রেমের দামি চশমা টাইটভাবে এঁটে বসেছে। যেন আলতো ঠোনা দিনে রক্ত বেরোবে গাল ফেটে। গায়ে ভুর-ভুর করছে দামি পারফিউমের গন্ধ।

রামরতনবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি তল্লাটের পুব পারের রিকশাচালক বস্তিতে গেলেন। তাদের একজনের দাওয়ায় বসে চা খেলেন। অভাব-অভিযোগ শুনলেন। জানলেন কীভাবে তাদের ফুটো ছাদ দিয়ে বর্ষায় ঘরের ভিতর জল পড়ে। শীতে ভাঙা জানালা দিয়ে উত্তুরে হাওয়া বয়। কীভাবে রেশন থেকে তাদের পোকা ধরা চাল গম দেওয়া হয়। কীভাবে বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয় কেরোসিন। এসব শুনে, যেন খুব বিরক্ত হয়েছেন এ রকম ভাব করে তিনি কটমট করে তাকালেন পিন্টুর দিকে। ভাবখানা এমন, যেন সব দোষটাই তার। মাথা নিচু করে পিন্টু নোট নিল সব কিছুর। তারপর, সেবকবাবু তল্লাটের মজা অগভীর পুকুর দেখলেন, যেখানে এক কালে মাছ চাষ হত। বললেন, ‘সংস্কার হবে।’ ভাঙা রাস্তা দেখে বললেন, ‘সারানো হবে।’ নোংরা, মশার লার্ভা ও পোকা থিকথিকে  নর্দমা দেখলেন। বললেন, ‘নতুন করে বানিয়ে দেওয়া হবে।’ এসব করতে করতে বেলা একটা বাজল। সেবকবাবু দরদর করে ঘামছেন। খুব পরিশ্রম হয়েছে তাঁর। তিনি একদম ধকল নিতে পারেন না। বললেন,’ চল্ পিন্টু! এখন একটু লাঞ্চ সেরে বিশ্রাম করতে হবে। তারপর বিকেলে আবার বেরোব ফ্রেশ হয়ে। মানুষের বড় দুর্গতি। কান্না পাচ্ছে।’

পিন্টু  বলল, ‘হ্যাঁ স্যার!’

তারপর তাঁর দুধ সাদা ইনোভাতে সওয়ারি হয়ে সেবক বাবু পিন্টুকে নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন তাঁর প্রাসাদের দিকে। তাঁর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে ভক্ত হনুমানের মতো হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইল সেখানকার সাধারণ নাগরিকেরা।

যথাসময়ে ভোট এলো এবং চলে গেল। যথারীতি সেবকবাবু বিশাল ভোটের ব্যবধানে জিতলেন। আরেকটু হলেই ভোটার সংখ্যার থেকে ভোটের সংখ্যা বেশি হয়ে যাচ্ছিল। যথারীতি বিরোধীরা রিগিং হয়েছে বললেন। যথারীতি তাঁর দল বলল অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি জনগণকে অভিনন্দন জানালেন শান্তিপূর্ণ ভোটে তাঁকে জেতানোর জন্য। নিজেদের তৈরি উঁচু সভামঞ্চ থেকে দু’হাত তুলে বরাভয়ের ভঙ্গিতে মানুষকে আগামী পাঁচ বছর অক্লান্ত সেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। মানুষ গদগদভাবে হাত জোড় করে দাঁড়াল তাঁর ডায়াস থেকে নামার পথে।

এরপর বিজয় মিছিল হল। মানুষের বাড়ি বাড়ি মিষ্টির প্যাকেট গেল। সেবকবাবু ও তাঁর দলীয় প্রধানের কাটআউট পড়ল পাড়ার মোড়ে মোড়ে। সেই উৎসবও থিতিয়ে গেল একদিন। বেচারা সেবক বাবু পার্টির গুরুত্বহীন মিটিং, পুরনো কারবার ও নিজের বিলাস ব্যাসনে এমন বিশ্রীভাবে এরপর জড়িয়ে পড়লেন  যে, ‘তীব্র ইচ্ছে সত্ত্বেও’ তাঁকে জেতানো ভোটারদের মহল্লাতে তিনি আর যেতেই পারলেন না, প্ৰতিশ্রুতি পালন করা তো দুরস্থান। ভোটাররা অবশ্য ভালো মনের মানুষ। সংবেদনশীল। ভাবল, এত বড় মানুষেরও কি বারে বারে এদিক-ওদিক চরকিবাজি করা সম্ভব? সুতরাং তারাই দেখা করতে গেল সেবক বাবুর অফিসে। রামরতনবাবু গেলেন। বস্তির রিকশাওয়ালারা গেল। মজা পুকুর, বেহাল রাস্তা ও ভাঙা নর্দমার জন্য দরবার করতে উঠতি তরুণেরা গেল। সেবকবাবু ব্যস্ত। দেখাই করতে পারলেন না কারো সঙ্গে। বদলে পিন্টু ও তার সাগরেদরা সবার সামনে এসে বলল, স্যারের মনে আছে সব। তিনি ব্যাপারগুলো দেখছেন।

আরও পড়ুন: জেরুসালেম

ভক্ত, বিশ্বাসী শান্তিপ্রিয় মানুষ সন্তুষ্ট হয়ে আশ্বস্ত হয়ে যে যার বাড়ি ফিরল। কিন্তু কোনও সমস্যার সমাধান হল না। সেবকবাবুর বিলাস ব্যাসন ও অকর্মণ্যতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের দুর্গতিও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকল। প্রমোটার ও তোলাবাজের দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল মানুষজন। টেনশনে অসুস্থ হয়ে রাম রতনবাবু দু’বার হাসপাতালে ভর্তি হলেন। মশা মাছি বাড়ল, রোগব্যাধি বাড়ল।

এরকমই একটা সময়ে রাজনীতির পাশার চালে ও দলের নেতাদের চক্রান্তে, দল ছাড়ার হিড়িকে করপোরেশনের শাসক গোষ্ঠী হঠাৎ সংখ্যালঘু হয়ে অনাস্থার কারণে ভেঙে গেল করপোরেশনের শাসন ব্যবস্থা। আবার চলে এলো ভোট। সেবকবাবু আবার খুঁজে বের করলেন তাঁর পাজামা, পাঞ্জাবি, গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা। আবার বেরোতে হবে। মানুষের মাঝে প্রত্যাশার ফুলঝুরি ছুটিয়ে আবার জিততে হবে তাঁকে। আবার তিনি নমিনেশন পেয়েছেন যে!

‘কাকু। আপনি একদম ভয় পাবেন না। কারও হুমকিতে মাথা নিচু করবেন না। কারও প্রতিশ্রুতিতে গলবেন না। হারামজাদা আসুক আর একবার ভোট চাইতে!’ পাড়ার  ছেলেরা একদিন তাঁর বাড়িতে এসে বলল রামরতনবাবুকে।

‘আমার আবার কীসের ভয়! তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। ছেলে স্বাধীন। থিতু। দূরে থাকে। মেয়ে সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আমি এখন বেশি না ভুগে চলে যেতে পারলেই বাঁচি। এই বয়সে এসে আর কোনো হুমকিতে পরোয়া করি না।’ বললেন রামরতনবাবু।

তারপর পাড়ার ছেলেরা বস্তিতে গেল। আগামী কর্মপদ্ধতি নিয়ে বিশদে আলোচনা করল বস্তিবাসীদের সঙ্গে। প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে  সবার সঙ্গে কথা বলল। সবাইকে বুঝিয়ে বলল, ঠিক কী করতে হবে সেবকবাবু প্রচারে এলে। মজা পুকুর, বেহাল রাস্তা ও ভাঙা নর্দমা পাহারার দায়িত্ব দেওয়া হল উৎসাহী উঠতি তরুণ ব্রিগেডকে, যেন সেবক বাবু প্রচারে আসার আগে করপোরেশনের লোকেরা রাতের আঁধারে সেগুলির লোক দেখানো সংস্কার ও সারাই না করতে পারে। এলাকার মূল প্রবেশ দ্বারে সুদৃশ তোরণ বানানো হল সেবকবাবু ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের জন্য।

আরও পড়ুন: বিশ্বাসঘাতক

সব প্রস্তুতির শেষে এলাকার নাগরিকদের আমন্ত্রণে তিনি এলেন। তোরণদ্বার দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে আবেগে প্রায় কেঁদে ফেলে পিঠ চাপড়ে দিলেন পাশে পাশে হাঁটা পাড়ার ছেলেদের। তাদের ভূয়সী প্রশংসা করলেন সুদিন ও দুর্দিনে তাঁর পাশে থাকার জন্য। এরপর ঠিক আগের বারের মতো আবার তিনি গেলেন রামরতনবাবুর বাড়ি। আবার বস্তিতে গিয়ে তাদের দাওয়ায় বসে চা খেয়ে তাদের অভাব-অভিযোগ শুনলেন। পুকুর দেখলেন। রাস্তা দেখলেন। নর্দমা দেখলেন। প্রতিশ্রুতি দিলেন হাজারটা। পিন্টুকে বললেন, ‘হাতে সময় নেই। কাজ করে ফেলতে হবে দ্রুত। লিখে নে।’

পিন্টু লিখতে লিখতে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার!’

উঁচু ডায়াস থেকে আবারও দৃপ্ত ভঙ্গিতে ভাষণ দিলেন সেবকবাবু। চারিদিকে হাততালির ঝড় উঠল। এরপরে রামরতনবাবু পরিকল্পনামাফিক ধীর অশক্ত পায়ে ডায়াসে উঠে সেবকবাবুর গলায় পরিয়ে দিলেন একশো পুরনো জুতো দিয়ে সযত্নে তৈরি মালা। চারিদিক থেকে উড়ে আসতে লাগল ইটের টুকরো, পাথর। নীচে ডায়াস ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষজন। হঠাৎ করে কি জাদুমন্ত্রে সবার হাতে উঠে এসেছে বাঁশের লাঠি। অদূরে দাঁড়ানো ইনোভাতে আর পিন্টুর পিঠে সেগুলোর বাড়ি পড়ছে দমাদম দমাদম।

বেগতিক দেখে ডায়াসের পিছনের সামান্য ফাঁকা অংশ দিয়ে লাফ মেরে মাটিতে পড়ে সেবকবাবু কোনও মতে তাঁর পাজামা, পাঞ্জাবি ও চশমা শোভিত ভুঁড়িওয়ালা শরীরটা নিয়ে বাঁচাও বাঁচাও ভয়ার্ত আওয়াজ করতে করতে যে দিকে পারেন দৌড় মারলেন। পিছনে অসংখ্য জনতার তাড়া। সেবকবাবু পড়ছেন, আবার উঠে প্রাণ ভয়ে দৌড়োচ্ছেন। অনেক দূরে চৌরাস্তার মোড়ে তখন সবে মাত্র  এসে পৌঁছেছে পুলিশ ভ্যান। সেবকবাবুকে উদ্ধার করতে হবে তো! জননেতা বলে কথা! 

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *