১৯৬২-র ৪ সেপ্টেম্বর: এশিয়ান গেমস ফুটবলে সোনা জয়ের রূপকথা পা দিল হীরক জয়ন্তীতে

শুভ্রাংশু রায়

রূপকথার মতো? ঠিক তা-ই। ভারত এশিয়া-সেরা হচ্ছে ফুটবলে, আজকের প্রজন্ম এমন স্বপ্ন দেখতেও ভয় পায়! কিন্তু আজ থেকে ঠিক ৫৯ বছর আগে তা ছিল কঠোর বাস্তব। জাকার্তার সেনাইয়ান স্টেডিয়ামে দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-১ হারিয়ে, তৃতীয় এশিয়াডে ফুটবলে সোনা জিতে নিয়েছিল চুনী গোস্বামীর ভারত। এশিয়াড ফুটবলে ভারতের দ্বিতীয় সোনা। প্রথম সোনা এসেছিল প্রথম এশিয়াডে, দিল্লিতে, ১৯৫১ সালে। সেবার অধিনায়ক ছিলেন আর এক বাঙালি শৈলেন মান্না। আর, তার ১১ বছর পর, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় আবারও এশিয়ায় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা। দলের কোচ ছিলেন হায়দরাবাদের রহিম সাহেব। প্রচণ্ড কড়াধাতের মানুষ ছিলেন। কিন্তু বাষট্টি এশিয়ান গেমসে দায়িত্ব নিয়েছিলেন বেশ অসুস্থ অবস্থায়। ক্যানসার হয়েছিল গলায়। কথা বলতে ভীষণ কষ্ট।

আরও পড়ুন: মান্নাদা ৯৭: এক ফুটবল আত্মার জন্মদিনে কিছু স্মৃতিচারণ

১৯৬২-র এশিয়ান গেমস চ্যাম্পিয়ন ১৬ সদস্যের ভারতীয় দল। ছবি: insidethegames.biz

শোনা গিয়েছে, ফাইনালের আগের দিন চুনী-পিকে-বলরাম-জার্নেলদের কাছে কাতর স্বরে চেয়েছিলেন  ‘গোল্ড মেডেল’। বাড়তি চিন্তার অনেকগুলি কারণের একটি ছিল, গ্রুপ লিগে ওই দক্ষিণ কোরিয়ার কাছেই ভারতের হার, ০-২ ব্যবধানে। প্রতিযোগিতায় ওই একটিই ম্যাচ হেরেছিলেন ভারতীয়রা। গ্রুপ বি-তে বাকি দু’টি ম্যাচে থাইল্যান্ড ও জাপানকে যথাক্রমে ৪-১ ও ২-০ হারিয়ে সেমিফাইনালে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে ৩-২ হারিয়ে ফাইনালে। আবার দক্ষিণ কোরিয়ার মুখোমুখি।

আরও পড়ুন: কলকাতায় প্রায় বিস্মৃত একটি খেলা এবং কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন

রাজনৈতিক কারণে সেদিন গোটা স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকের সমর্থন ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে। কিন্তু ৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে পি কে ব্যানার্জি ও জার্নেল সিংয়ের গোলে সোনা ভারতের, ২-১ জিতে, প্রথম ম্যাচে হারের বদলা নিয়ে। জার্নেল সিং চোট পেয়েছিলেন সেমিফাইনালে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে খেলায়। কিন্তু ফাইনালে তিনি থাকবেন না, ভাবতে পারেননি রহিম সাহেব। খেলিয়েছিলেন ফরোয়ার্ডে। আর সেই জার্নেলই, হেড করে, এনে দিয়েছিলেন জয়সূচক গোল! রক্ষণে জার্নেলের জায়গায় দুর্ভেদ্য অরুণ ঘোষ। গোলরক্ষক প্রদ্যোৎ বর্মণ প্রতিটি ম্যাচেই দুর্দান্ত খেলেছিলেন, ফাইনালের আগে। কিন্তু, পিটার থঙ্গরাজকে ফাইনালে খেলানো হয়েছিল নাকি ইন্দিরা গান্ধি চেয়েছিলেন বলে এবং থঙ্গরাজ নিরাশ করেননি। সোনা জিতে কোচ রহিম সাহেবকে গুরুদক্ষিণা দিতে পেরে, কোচকে ঘিরে ধরে সবাই কেঁদে ফেলেছিলেন সেনাইয়ান স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়েই।

আরও পড়ুন: ১৯৭১-এর ২৪ আগস্ট: পঞ্চাশ বছর পরে ফিরে দেখা ভারতের এক অলৌকিক জয়

এশিয়ান গেমসের ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়াকে পরাস্ত করে ভারতীয় ফুটবল দলের আনন্দ উদ্‌যাপন। ছবি দ্য হিন্দু আর্কাইভস

আর, সোনা জিতে আসার পর পুরস্কার? তেমন কিছুই জোটেনি ভারতের সেই সোনার ফুটবলারদের! আজকের দিনে এটাও অবিশ্বাস্যই! চুনী-পি কে অর্জুন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন, পরে, আরও কয়েকজন। তুলসীদাস বলরাম, যাঁর পাস থেকেই এসেছিল ফাইনালের দু’টি গোল, এখনও বঞ্চিতই থেকে গিয়েছেন। এমনকী, যখন ২০১২-তে  সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থা বাষট্টির সোনাজয়ী ফুটবলারদের সংবর্ধনা দিতে ডেকেছিল, বলরাম যাননি প্রতিবাদে। দেশে ফেরার পরও, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ডাকেননি। রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের বাড়িতে ‘টি পার্টি’-তে আমন্ত্রিত ছিলেন ফুটবলাররা, স্বীকৃতি বলতে এতটুকুই! কী করেই বা এই প্রজন্ম ভাবতে পারবে ফুটবলে এশিয়ায় শ্রেষ্ঠ হওয়ার কথা? সেই জন্যই হয়তো, আরও ধূমধাম করেই পালন করা উচিত, ভারতীয় ফুটবলে সেই রূপকথার হীরক জয়ন্তী! কিছুদিনের মধ্যেই মুক্তি পাবে রহিম সাহেবের বায়োপিক ‘ময়দান’। সেদিনের সেই ফাইনালের উত্তেজনাময় মুহূর্ত নিশ্চয় কিছুদিনের মধ্যেই আমরা পর্দায় দেখতে পাব। অল্পদিন আগেই সেই ফাইনালের দুই নায়ক চুনী গোস্বামী এবং প্রদীপ ব্যানার্জি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। চলে গেছেন আরও অনেকেই। অসুস্থ অবস্থায় উত্তরপাড়া ফ্ল্যাটে কার্যত গৃহবন্দি তুলসীদাস বলরাম। সেদিনের সেই জীবন্ত নায়করা আমাদের থেকে হারিয়ে গেলে ইতিহাসের পাতাই আমাদের ফুটবল ইতিহাসের সবথেকে গৌরবময় মুহূর্তকে ফিরে দেখার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়াবে। ইতিহাসের পাতা সামনে ফেলে এই প্রজন্মকে বিশ্বাস করাতে হবে একদিন সত্যিই ভারত এশিয়ায় ফুটবলে শ্রেষ্ঠ ছিল। বাষট্টির জাকার্তার সোনাজয় ষাট বছরের পা দিয়ে আজ এক রূপকথা যে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

5 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *