বিদ্যাসাগরের শকুন্তলা, এক অনুপম সাহিত্যরস

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হল বিদ্যাসাগর প্রণীত কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান-শকুন্তলম্’ নাট্য-কাহিনির বাংলা অনুবাদ ‘শকুন্তলা’। এটি সাহিত্যের কোন রূপভেদ, তা নিয়ে মতান্তর আছে। এটা কি উপন্যাস? এটা কি বড় গল্প না আখ্যান? নাটক তো এটা নয়, কারণ অনেক ন্যারেটিভ রয়েছে। অনুবাদ কর্মের ফলে সাহিত্য-রূপভেদের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এটি আসলে এক উৎকৃষ্ট গদ্য-সাহিত্য। যদি অঙ্গসংস্থানের বিতর্কে না যাই, কেবল রূপের কথাই ভাবি এবং বিদ্যাসাগরীয় যুগে বাংলা সাহিত্যের অপূর্ণতার কথা বিবেচনা করি, তবে এটিকেও বলতে পারি সাহিত্যে মাঝে ‘স্বর্গ ও মর্ত্যের মিলনস্থল’।

বিদ্যাসাগর কালিদাস সম্পর্কে এতটাই উচ্চভাব পোষণ করতেন যে, এই নাটক সম্পর্কে বলেছিলেন এক ‘অলৌকিক পদার্থ’; বলেছিলেন, ‘‘মনুষ্যের ক্ষমতায় ইহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট রচনা সম্ভবিতে পারে না।”

আরও পড়ুন: বধির দিবসে হই অঙ্গীকারবদ্ধ, শব্দদূষণকে করি জব্দ

কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান-শকুন্তলম্’ নাটকটি সাত অঙ্কে বিভক্ত; বিদ্যাসাগর মূল নাটকের আখ্যানভাগকে গদ্যরচনা হিসাবে রূপান্তরিত করেছিলেন সাতটি পরিচ্ছেদে। সংলাপকে বিবৃতির ধরনে রূপান্তরের জন্য নিজেই অনেকাংশে প্রযোজকের ভূমিকা গ্রহণ করলেন। চেষ্টা করলেন নাটকীয়তার সংবেগ, ভাবগাম্ভীর্য যতটা সম্ভব রক্ষা করা যায়। একটি সংস্কৃত নাটককে অনুবাদ করলেন একটি প্রাদেশিক ভাষায়, যা তখনও ঠিকমতো পরিণতি লাভ করেনি, যে প্রকাশ রীতিমতো দুঃসাহসিক কাজ। তিনি নিজেও সে ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন, ‘‘বস্তুতঃ, বাঙ্গালায় এই উপাখ্যানের সঙ্কলন করিয়া, আমি কালিদাসের ও অভিজ্ঞানশকুন্তলের অবমাননা করিয়াছি। পাঠকবর্গ! বিনীত বচনে আমার প্রার্থনা এই, আপনারা যেন, এই শকুন্তলা দেখিয়া, কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তলের উৎকর্ষপরীক্ষা না করেন।”

আরও পড়ুন: অভ্যাসবশত

উপরের বক্তব্য যে বিদ্যাসাগর মশাইয়ের একান্তই বিনয়বার্তা, সে সাহিত্য যাঁরা পাঠ করেছেন এবং কালিদাসের মূলগ্রন্থ পাঠের অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে, তাঁরা অবশ্যই বুঝে থাকবেন। আজ বিদ্যাসাগর প্রণীত ‘শকুন্তলা’ রচনার কিয়দংশ আলোচনা করব।

‘শকুন্তলা’র প্রথম পরিচ্ছেদ শুরু হচ্ছে এই ভাবে, ‘‘অতি পূর্ব কালে, ভারতবর্ষে দুষ্মন্ত নামে সম্রাট ছিলেন। তিনি একদা বহুতর সৈন্যসামন্ত সমভিব্যাহারে মৃগয়ায় গিয়াছিলেন। একদিন মৃগের অনুসন্ধানে বনমধ্যে ভ্রমণ করিতে, এক হরিণশিশুকে লক্ষ্য করিয়া,  রাজা শরাসনে শরসন্ধান করিলেন। হরিণশিশু তদীয় অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া প্রাণভয়ে দ্রুতবেগে পলাইতে আরম্ভ করিল। রাজা রথারোহণে ছিলেন, সারথিকে আজ্ঞা দিলেন, মৃগের পশ্চাৎ রথচালন কর। সারথি কশাঘাত করিবামাত্র অশ্বগণ বায়ুবেগে ধাবমান হইল। কিয়ৎ ক্ষণে রথ মৃগের সন্নিহিত হইলে, রাজা শরনিক্ষেপের উপক্রম করিতেছেন, এমন সময়ে দূর হইতে দুই তপস্বী উচ্চৈস্বরে কহিতে লাগিলেন, মহারাজ! এ আশ্রমমৃগ, বধ করিবেন না, বধ করিবেন না।… আপনকার বাণ অতি তীক্ষ্ণ ও বজ্রসম, ক্ষীণজীবী অল্পপ্রাণ মৃগশাবকের উপর নিক্ষিপ্ত হইবার যোগ্য নহে। শরাসনে যে শর সংহিত করিয়াছেন, আশু তাহার প্রতিসংহার করুন। আপনকার শস্ত্র আর্তের পরিত্রাণের নিমিত্ত, নিরপরাধের প্রহারের নিমিত্ত নহে।”

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২০)

এরপর দেখা যায় রাজা লজ্জিত হচ্ছেন, শর সংবরণ করছেন; তপস্বীরা হাত তুলে রাজাকে পুত্রলাভের আশীর্বাদ করছেন— সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধিপতি হবেন, এই মর্মে। রাজা ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ শিরোধার্য করলেন। তাপসেরাই রাজাকে দেখালেন মালিনী নদীর তীরে মহর্ষি কণ্বের আশ্রম, বললেন সেখানে অতিথি সৎকার স্বীকার করার। আশ্রমে তখন মহর্ষি নেই; তনয়া শকুন্তলার হাতে অতিথিসৎকারের ভার দিয়ে সোমতীর্থ প্রস্থান করেছেন তিনি। কিন্তু রাজা আশ্রমের উৎপীড়ন হতে পারে— এই চিন্তা করে রথ ও সারথিকে অপেক্ষা করতে বলে, নিজে রাজবেশ সারথিহস্তে সমর্পণ করে তপোবনে প্রবেশ করলেন। কিঞ্চিৎ গমন করলে স্ত্রীলোকের আলাপ শুনতে পেলেন তিনি, দেখতে পেলেন তিনটি অল্পবয়স্কা তপস্বী কন্যা। তার বিবরণ দিয়ে বিদ্যাসাগর লিখছেন, ‘‘তাঁহাদের রূপের মাধুরী দর্শনে চমৎকৃত হইয়া, কহিতে লাগিলেন, ইহারা আশ্রমবাসিনী; ইহারা যেরূপ, এরূপ রূপবতী রমণী আমার অন্তঃপুরে নাই। বুঝিলাম, আজ উদ্যানলতা সৌন্দর্যগুণে বনলতার নিকট পরাজিত হইল।… শকুন্তলা, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা নামে দুই সহচরীর সহিত, বৃক্ষবাটিকাতে উপস্থিত হইয়া আলবালে জলসেচন করিতে আরম্ভ করিলেন।… রাজা দেখিয়া শুনিয়া, প্রীত ও চমৎকৃত হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এই সেই কণ্বতনয়া শকুন্তলা। মহর্ষি অতি অবিবেচক; এমন শরীরে কেমন করিয়া বল্কল পরাইয়াছেন। অথবা যেমন প্রফুল্ল কমল শৈবলযোগেও বিলক্ষণ শোভা পায়; যেমন পূর্ণ শশধর কলঙ্কসম্পর্কেও সাতিশয় শোভমান হয়; সেইরূপ এই সর্বাঙ্গসুন্দরী বল্কল পরিধান করিয়াও যারপরনাই মনোহারিণী হইয়াছেন। যাহাদের আকার স্বভাবসিদ্ধ সৌন্দর্যে সুশোভিত তাহাদের কি না অলঙ্কার কার্য করে।”

আরও পড়ুন: রাঢ়ের আর্যায়ণ প্রক্রিয়া

বিদ্যাসাগর তাঁর ‘শকুন্তলা’ গদ্যে সখী অনসূয়ার মুখে জন্মের কাহিনি বর্ণনা করেছেন, ‘‘শুনিয়া থাকিবেন, বিশ্বামিত্র নামে এক অতি প্রভাবশালী রাজর্ষি আছেন। তিনি একদা গোমতী নদীর তীরে অতি কঠোর তপস্যা করিতে আরম্ভ করেন। দেবতারা সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া রাজর্ষির সমাধিভঙ্গের নিমিত্ত মেনকানাম্নী অপ্সরাকে পাঠাইয়া দেন। মেনকা তদীয় তপস্যাস্থানে উপস্থিত হইয়া মায়াজাল বিস্তৃত করিলে মহর্ষির সমাধিভঙ্গ হইল। বিশ্বামিত্র ও মেনকা আমাদের সখীর জনক ও জননী। নির্দয়া মেনকা, সদ্যঃপ্রসূতা তনয়াকে পরিত্যাগকরিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল। আমাদের সখী সেই বিজন বনে অনাথা পড়িয়া রহিলেন। এক শকুন্ত কোন অনির্বচনীয় কারণে স্নেহের বশবর্তী হইয়া পক্ষপুট দ্বারা আচ্ছাদনপূর্বক আমাদের সখীর রক্ষণাবেক্ষণ করিতে লাগিল। দৈবযোগে তাত কণ্ব পর্যটনক্রমে সেই সময়ে সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। সদ্যঃপ্রসূতা কন্যাকে তদবস্থ পতিত দেখিয়া তাঁহার অন্তঃকরণে কারুণ্যরসের আবির্ভাব হইল। তিনি তৎক্ষণাৎ আশ্রমে আনিয়া স্বীয় তনয়ার ন্যায় লালন পালন করিতে আরম্ভ করিলেন; এবং প্রথমে শকুন্ত লালন করিয়াছিল, এই নিমিত্ত নাম শকুন্তলা রাখিলেন।”

কাশীরাম দাসের মহাভারতে শকুন্তলার উপাখ্যানে (আদিপর্ব) কন্যা নিজেই তার জন্মবৃত্তান্ত উপস্থাপন করেছেন, কাব্যগুণে তা রমণীয় হয়ে উঠেছে—

‘‘বিশ্বামিত্র মুনি জান বিখ্যাত সংসারে।

চিরদিন তপস্যা করেন অনাহারে।।

তাঁর তপ দেখি কম্পমান পুরন্দর।

আমার ইন্দ্রত্ব লবে এই মুনিবর।।

সর্ব দেবগণ মিলি ভাবে নিরন্তর।

মেনকারে ডাকি বলে দেব পুরন্দর।।

রূপ গুণে তব তুল্য নাহি ত্রিভুবনে।

মম কার্য্য সিদ্ধ কর আপনার গুণে।।”

ইন্দ্রের অনুরোধে বিষণ্ণ হলেন অপ্সরী মেনকা; হাতজোড় করলেন তিনি; জানালেন, ক্রোধী তপস্বী বিশ্বামিত্র, ক্ষত্রিয় কূলে জন্ম নিয়েও তিনি ব্রাহ্মণ, যাঁর তপস্যাকে ভয় করছেন আপনি স্বয়ং, তাঁর তপ নষ্ট করে এমন সাহস কার আছে? ‘‘তাঁর তপ নষ্ট করে হেন কোন্ জন।/ কর্ম না হইবে, হৈবে আমার মরণ।।/ অগ্নি সূর্য সম তেজ লোচন যুগলে।/ তাঁহার তপস্যা ভঙ্গ করি কোন্ ছলে।।” কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্রও নাছোড়। অবশেষে হেমন্ত পর্বতে গেলেন মেনকা যেখানে বিশ্বামিত্র মুনি ধ্যানরত। মুনিকে দেখে যথারীতি ভয়ে কেঁপে উঠলেন তিনি। এবং অতিশয় সুবেশা বিদ্যাধরী হয়ে মুনির কাছে মায়ার খেলা খেললেন। ইন্দ্রের বরে মেনকা কামদেব আর পবনদেবের সহায়তা লাভ করেছেন। এইবেলা অতি খরতর বায়ুবেগে মেনকার অঙ্গবস্ত্র উড়িয়ে দিলেন পবনদেব; ব্যতিব্যস্ত হয়ে বস্ত্র ধরে আছেন মেনকা আর বিভিন্ন প্রকারে নিন্দামন্দ করছেন পবনকে। এদিকে মুনিবর যাবতীয় কৌতুক দেখছেন আর কামের দেবতা মদনের পঞ্চশরে ধীরেধীরে আহত হচ্ছেন। কাশীদাসী মহাভারতে আছে সে কথা, ‘‘মেনকা ধরিয়া মুনি গেল নিজ দেশ।/ কামে মত্ত নিত্য করে শৃঙ্গার বিশেষ।।/ হেনমতে বহুদিন গেল ক্রীড়ারসে।/ তপ জপ সকল ত্যজিল কামবশে।।” একদিন সন্ধ্যা-আহ্নিক করার জন্য মেনকার কাছে জল চাইলেন মুনি, কিন্তু মেনকার রসিকতায় প্রবল কুপিত হলেন। ‘‘শুনিয়া মেনকা হাসি বলিল বচন।/ এতদিনে ভাল সন্ধ্যা হইল স্মরণ।।/ এত শুনি মুনি হৈল কুপিত অন্তর।/ দেখিয়া মেনকা ভয়ে পলায় সত্বর।।”

আরও পড়ুন: সেই খেলা নেই, খেলার সাথিও নেই, লোকক্রীড়া হারিয়ে গেছে

পথে মুনির ঔরসজাত কন্যা প্রসব করলেন মেনকা অরণ্যের গভীরে, আর সেই নির্জন কাননেই তাকে ফেলে চলে গেলেন স্বস্থানে। এরপরেই কণ্বমুনি তাকে দেখতে পেলেন। দুষ্মন্তকে সেই কথা শকুন্তলা জানাচ্ছেন, ‘‘তপস্যা করিতে গেল কণ্ব সেই বনে।/ অনাথা দেখিয়া তাঁর দয়া হৈল মনে।।/ গৃহে আনি পালন করিল মুনিবর।/ তাই আমি তাঁর কন্যা, শুন দণ্ডধর।।”

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘শকুন্তলা’ কাহিনিতে লিখেছেন সেই কথা। ‘‘শকুন্তলা সেই তপোবনে, সেই বটের ছায়ায় পাতার কুটিরে মা-গৌতমীর কোলে-পিঠে মানুষ হতে লাগল। তারপর শকুন্তলার যখন বয়স হল তখন তাত-কণ্ব পৃথিবী খুঁজে শকুন্তলার বর আনতে চলে গেলেন। শকুন্তলার হাতে তপোবনের ভার দিয়ে গেলেন। শকুন্তলার আপনার মা-বাপ তাকে পর করলে, কিন্তু যারা পর ছিল তারা তার আপনার হল। তাত-কণ্ব তার আপনার, মা-গৌতমী তার আপনার, ঋষি বালকেরা তার আপনার ভাইয়ের মতো।” এমনকী আশ্রমের গাইবাছুর, বনের লতাপাতা, প্রিয়সখী অনসূয়া আর প্রিয়ংবদা তার আপনার হল; আপনার হল মা-হারা এক চঞ্চল হরিণ শিশু। তিন সখীতে মিলে সামলায় ঘরের কাজ, অতিথি-সেবার কাজ, আশ্রম-উদ্যানে সেচ দেবার কাজ, সহকারে মল্লিকালতার বিয়ে দেবার কাজ। মাধবীলতায় জল দেয় তারা, আর ভাবে লতা পুষ্পবতী হলেই শকুন্তলার বর আসবে। হ্যাঁ, সে বরই তো স্বয়ং বিবাহ করতে এলেন তপোবনে!

আরও পড়ুন: গণিত দিবসে রামানুজন ও তাঁর বন্ধুত্বের কথা

বিদ্যাসাগরের লেখায় পাচ্ছি, কণ্বতনয়া শকুন্তলা তপোবনে জলসেচন করছেন। রাজা দেখছেন; তিনি প্রীত, চমৎকৃত। রাজা দেখছেন শকুন্তলার অধরে নবপল্লবের শোভা, বাহুদ্বয়ে কোমল বিটপের বিভূষণ, যৌবনের কুসুমরাশি সর্বাঙ্গে ব্যাপ্ত। এই সৌন্দর্য নিয়ে তিনি নব কুসুমে সুশোভিতা নবমালিকা নিরীক্ষণ করছেন হয়তো খুঁজছেন আপন অনুরূপ বর। কেমন করে সে সহকারের সঙ্গে সমাগতা, সহকারও কেমন ফলভারে অবনত৷ দেখছেন আপন বিবাহের শুভসূচক মাধবীলতার মুকুল-নির্গম দৃশ্য। হঠাৎ কুসুম ভ্রমে এক মধুকর শকুন্তলার মুখকমল পরিভ্রমণ করে উপবিষ্ট হবার উপক্রম করল। পরিত্রাণ চাইছেন তিনি, সখীরা বলছেন, দুষ্মন্ত স্মরণ করতে।

এমনি সময় রাজা শকুন্তলা, অনুসূয়া ও প্রিয়ংবদার সম্মুখে উপস্থিত হবার সুবর্ণ সুযোগ পেলেন। তপস্বীকন্যারা অতিশয় সংকুচিত; শকুন্তলা লজ্জায় জড়ীভূতা, নম্রমুখী। তারা একত্রে সপ্তপর্ণবেদীতে উপবিষ্ট হলেন। তাপসকন্যাদের সৌহার্দ্য রাজার কাছে অতিশয় রমণীয় হল। সুহৃদের মতো মধুর আলাপে রাজা রত হলেন। রাজা ও শকুন্তলা পরস্পরকে দেখে অনবধানে চিত্ত চাঞ্চল্য প্রকাশ করে ফেললেন। রাজার কৌতূহলে এবং আগ্রহে সখী অনসূয়া প্রিয় সখীর জন্মবৃত্তান্ত বললেন। রাজা জন্মবৃত্তান্ত শুনে বুঝলেন এ জ্যোতির্ময় বিদ্যুৎ, এ রূপ-লাবণ্য অলৌকিক। আলাপচারিতায় বুঝলেন শকুন্তলা-লাভ নিতান্ত অসম্ভব নয়। আপন অঙ্গুরীয় সখীদের দিয়ে পল্বল থেকে জল আনায় ঋণমুক্তি করলেন শকুন্তলাকে। তার অন্তঃকরণে তখন অনুরাগসঞ্চার, রাজার নয়নে নয়ন সঙ্গতি হলে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন৷

আরও পড়ুন: খড়দহে শ্রীরামকৃষ্ণ পার্ষদ স্বামী অখণ্ডানন্দ

আলাপচারিতার মধ্যেই মহান কোলাহল উত্থিত হল। মৃগয়াবিহারী রাজার সমভিব্যাহার তপোবনেকে শঙ্কিত করে তুলল। অতঃপর রাজা সমস্ত সৈন্য সামন্ত বিদায় করে তপস্বী-কার্যের অনুরোধে তপোবনে অবস্থান করলেন। তিনি তখন শকুন্তলাচিন্তায় একান্ত মগ্ন, অন্য কোনও বিষয়ে মনের সুখ নেই। কোথায় গেলে শকুন্তলাকে দেখতে পান, কেবল এই চিন্তা। তপোবনবাসীদেরও আপন অভিসন্ধি বুঝতে দেন না। শকুন্তলাও রাজদর্শনদিবস অবধি বিরহবেদনায় সাতিশয় কাতর। রাজা নিরন্তর অন্তরতাপে তাপিত, শরীর বিবর্ণ। এমনি অবস্থায় শকুন্তলা সখী সামর্থ্যে পুষ্পের মধ্যে দিয়ে রাজার কাছে প্রণয়পত্রিকা প্রেরণের জন্য লতামণ্ডপে বসে পদ্মপত্রে লিখলেন৷ সখীদের কাছে পড়লেন সেই পত্রিকা— ‘‘হে নির্দয়! তোমার মন আমি জানি না, কিন্তু আমি, তোমাতে একান্ত অনুরাগিণী হইয়া নিরন্তর সন্তাপিত হইতেছি।” রাজা অন্তরাল থেকে শুনে সম্মুখে এলেন, বললেন, ‘‘তুমি সন্তাপিত হইতেছ, যথার্থ বটে; কিন্তু, বলিলে বিশ্বাস করিবে না, আমি এক বারে দগ্ধ হইতেছি।” এবার কর্মোপলক্ষে দুই সখী স্থানত্যাগ করলে রাজা শকুন্তলার হাত ধরলেন।…”

আরও পড়ুন: বাংলা সাহিত্যে ‘হাতি’

শকুন্তলাকে ইতস্তত করতে দেখে রাজা বললেন, ‘‘তুমি গুরুজনের ভয় করিতেছ কেন? ভগবান্ কণ্ব কখনই রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হইবেন না। শত শত রাজর্ষিকন্যারা, গুরুজনের অগোচরে, গান্ধর্ব বিধানে, অনরূপ পাত্রের হস্তগতা হইয়াছেন, এবং তাঁহাদের গুরুজনেরাও, পরিশেষে সবিশেষ অবগত হইয়া, সম্পূর্ণ অনুমোদন করিয়াছেন।” শকুন্তলা লতামণ্ডপে প্রবেশ করলে রাজা শিলাতলে বসে শকুন্তলার হাতে মৃণালবলয় পরিয়ে দিলেন, তার চিবুক ও মস্তকে হাত রেখে সুরভি মুখকমল উত্তোলন করলেন এবং মধুকরের মতো আঘ্রাণমাত্রে সন্তুষ্ট হলেন। চলতে লাগলো কৌতুক ও কথোপকথন। সহসা অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা দূর থেকে সঙ্কেত-সাবধান করলে, ‘‘চক্রবাকবধূ! রজনী উপস্থিত; এই সময়ে চক্রবাককে সম্ভাষণ করিয়া লও।” কারণ শকুন্তলার অসুস্থতার সংবাদ শুনে পিতৃষ্বসা আর্যা গৌতমী আসছেন, তাই রাজাকে সত্বর লতামণ্ডপ পরিত্যাগ করে অন্তর্হিত হতে হবে। রাজা লতাবিতানে ব্যবহিত হয়ে শকুন্তলাকে নিরীক্ষণ করে চলে গেলেন। কিছু পরে কমণ্ডলু হাতে প্রবেশ করলেন গৌতমী। শারীরিক কুশল সংবাদ নিলেন এবং শান্তিজল নিয়ে তার সর্বশরীরে সেচন করে দিলেন। তাকে কুটিরে নিয়ে এলেন তিনি। এইভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হল। শেষে গান্ধর্ব বিধানে শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করে আরও কিছুদিন ধর্মারণ্যে অতিবাহিত করে রাজা রাজধানীতে ফিরে গেলেন।

আরও পড়ুন: প্লাজমা-পোয়েম-প্রেয়ার একসূত্রে গেঁথেছে জগদীশ-রবি ঠাকুর-স্বামীজিকে

অতিথি পরিচর্যার ভার এখন শকুন্তলার উপর। তিনি কুটিরে উপবিষ্ট আছেন, একাকিনী, রাজার চিন্তায় মগ্ন, বাহ্যজ্ঞানশূন্য। ঋষি দুর্বাসা এসেছেন, শকুন্তলার কানে পৌঁছল না ঋষির কথা। অবজ্ঞাদর্শনে, অবমাননায় ক্রুদ্ধ হলেন ঋষি। অভিশাপ দিলেন, ‘‘তুই, যার চিন্তায় মগ্ন হইয়া, আমায় অবজ্ঞা করিলি— আমি অভিশাপ দিতেছি— স্মরণ করাইয়া দিলেও, সে তোরে স্মরণ করিবেক না।” শকুন্তলা তখনও স্পন্দহীনা, মুদ্রিতনয়না, চিত্রার্পিতাবৎ উপবিষ্টা; পতিচিন্তায় মগ্ন। প্রিয়ংবদা-অনসূয়া বুঝে গেছেন, কি সর্বনাশ ঘটে গেছে। শাপ দিয়ে অতিকুটিলহৃদয় ঋষি ফিরে যাচ্ছেন। ক্রোধভঙ্গ করতে দুই সখীর যাবতীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। পরিশেষে তিনি আশ্বাস দিলেন, ‘‘আমি যাহা কহিয়াছি, তাহা অন্যথা হইবার নহে; তবে যদি কোনও অভিজ্ঞান দর্শাইতে পারে, তাহার শাপমোচন হইবেক।”

কিছুদিন পর সোমতীর্থ থেকে মহর্ষি কণ্ব আশ্রমে ফিরেছেন। তিনি হোমকার্য সম্পাদন করছেন, সহসা দৈববাণী হল, ‘‘মহর্ষে! রাজা দুষ্মন্ত, মৃগয়া উপলক্ষে তোমার তপোবনে আসিয়া, শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করিয়া গিয়াছেন, এবং শকুন্তলাও তৎসহযোগে গর্ভবতী হইয়াছেন।” পরিণয়বৃত্তান্ত অবগত হলে তিনি অসন্তোষ প্রদর্শন করলেন না, বললেন, ‘‘তোমার পরিণয়বৃত্তান্ত অবগত হইয়া অনির্বচনীয় প্রীতি প্রাপ্ত হইয়াছি, এবং স্থির করিয়াছি, অবিলম্বে, দুই শিষ্য ও গৌতমীকে সমভিব্যাহারে দিয়া, তোমায় পতিসন্নিধানে পাঠাইয়া দিব।”

আরও পড়ুন: বিমানবন্দর না সবজি-মান্ডি?

প্রস্থানসময়ে শকুন্তলার সঙ্গে গমনে প্রস্তুত পিসি গৌতমী এবং কণ্বের দুই শিষ্য শার্ঙ্গরব ও শারদ্বত। বেশভূষার সমাধান করছেন দুই সখী অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা। কিন্তু স্নেহবশত সংসারীর মতোই কণ্বের বৈক্লব্য উপস্থিত, তিনি দুঃসহ ক্লেশ ভোগ করছেন; বুঝেছেন ‘‘স্নেহ অতি বিষম বস্তু।” বিদায়বেলা উপস্থিত, নানাভাবে অনর্থই কালহরণ ঘটছে। তপোবনের প্রকৃতি বিরহে কাতর— শকুন্তলা তরুগণকে জলসেচন না করে জলপান করেন না, স্নেহবশত তাদের পল্লবভঙ্গ করেন না, কুসুমপ্রসবকালে তার আনন্দের সীমা থাকে না। এসকল ছেড়ে যেতে হবে। হরিণেরা আহার-বিহারে পরাঙ্মুখ হয়েছে, ময়ূর-ময়ূরী নৃত্য পরিত্যাগ করে ঊর্ধ্বমুখ হয়ে রয়েছে, কোকিলেরা আমের মুকুলের রসাস্বাদে বিমুখ হয়েছে, মধুকর-মধুকরী মধুপানে বিরত। শকুন্তলার গতিভঙ্গ হচ্ছে বারবার। তিনি বনতোষিণীকে আলিঙ্গন করছেন, পূর্ণগর্ভা হরিণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করছেন, মাতৃহীন হরিণশিশুর গাত্রে হস্তপ্রদান করছেন। অশ্রুবেগ সম্বরণ করতে পারছেন না। মহর্ষি শকুন্তলাকে উপদেশ দিয়ে বলছেন, ‘‘তুমি পতিগৃহে গিয়া গুরুজনদিগের শ্রুশ্রূষা করিবে; সপত্নীদিগের সহিত প্রিয়সখীব্যবহার করিবে; পরিচারিণীদিগের প্রতি সম্পূর্ণ দয়া দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করিবে; সৌভাগ্যগর্বে গর্বিত হইবে না; স্বামী কার্কশ্যপ্রদর্শন করিলেও রোষবশা ও প্রতিকূলচারিণী হইবে না।” সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গৌতমী প্রভৃতি সমভিব্যাহারে শকুন্তলা দুষ্মন্তরাজধানী উদ্দেশে প্রস্থান করলেন।

রাজা কর্তৃক শিষ্টাচারপরম্পরা পরিসমাপ্ত হল। শার্ঙ্গরব গুরুদেবের সন্দেশ নিবেদন করলেন। কিন্তু দুর্বাসার শাপপ্রভাবে রাজা শকুন্তলাপরিণয়বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত বিস্মৃত হয়েছিলেন। তিনি বললেন, ‘‘কই, আমি ত ইঁহার পাণিগ্রহণ করি নাই।” বচনবিন্যাস শ্রবণ করে শকুন্তলা ভাবলেন, ‘‘রাজমহিষী হইয়া অশেষ সুখ-সম্ভোগে কালাহরণ করিব বলিয়া যত আশা করিয়াছিলাম, সমূদয় এককালে নির্মূল হইল।” রাজদত্ত অঙ্গুরীয় অনবধানে অঞ্চল থেকে খসে পড়ে যাওয়ায়, অভিজ্ঞান দর্শন করানোও সম্ভব হল না। রাজার ভাবদর্শনে ম্রিয়মাণ হয়ে তিনি অগত্যা পূর্ববৃত্তান্ত স্মরণ করাতে লাগলেন। কিন্তু রাজার স্মৃতিপথে তা উপস্থিত হল না। রাজা তাকে স্বেচ্ছাচারিণী প্রতিপন্ন করলেন। ‘‘ইনি তোমার পত্নী, ইচ্ছা হয় গ্রহণ কর, ইচ্ছা হয় ত্যাগ কর; পত্নীর উপর পরিণেতার সর্বতোমুখী প্রভুতা আছে।” এই বলে শকুন্তলাকে একাকী রেখে তিনজন প্রস্থান করলেন। সব শুনে রাজপুরোহিত বললেন, ঋষিতনয়া প্রসবকাল পর্যন্ত অবস্থিতি করুন। সন্তান চক্রবর্তীলক্ষণাক্রান্ত হলে গৃহীত হবে, এই উদ্দেশ্য তিনি শকুন্তলাকে আপন আলয়ে নিয়ে রাখতে চাইলেন। শকুন্তলা রোদন করতে করতে বলে উঠলেন, ‘‘পৃথিবী! বিদীর্ণ হও, আমি প্রবেশ করি; আর আমি এ প্রাণ রাখিব না।” পথে অপ্সরাতীর্থের নিকট আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। এক জ্যোতিঃপদার্থ স্ত্রীবেশে হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে শকুন্তলাকে নিয়ে অন্তর্হিত হল। মহারাজের কাছে খবর গেল। তিনি বললেন আর আলোচনার প্রয়োজন নেই।

আরও পড়ুন: জন্মদিনে রমেশচন্দ্র মজুমদার: দেবী ক্লিওর বরপুত্র

রাজদত্ত অঙ্গুরীয় শকুন্তলার অঞ্চলকোণ থেকে অনবধানে নদীতে পতিত হলে তা এক অতিবৃহৎ রোহিত মৎস্য গ্রাস করে নেয়। সেই মাছ কিছুদিন পর এক ধীবরের জালে পতিত হয়। ধীবর তার উদরমধ্য থেকে অঙ্গুরী আবিষ্কার করে। তা মণিকার, নগরপালের মাধ্যমে রাজভবনে পৌঁছল। তাতে আমিষগন্ধ তখনও নির্গত হচ্ছে। রাজা তখন সব বুঝতে পেরেছেন। চৌকিদারের প্রহার নয়, পরিবর্তে রাজা পাঠিয়েছেন মহামূল্য পুরস্কার। শকুন্তলাবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত রাজার স্মৃতিপথে আরূঢ় হয়েছে। তিনি বিলাপ ও পরিতাপ করতে লাগলেন। তার চিন্তায় একান্ত মগ্ন, ম্লান ও বিষণ্ণ। প্রিয় বয়স্য মাধব্য সর্বদা রাজার নিকট উপস্থিত থেকে সান্ত্বনাবাক্যে প্রবোধ দিচ্ছেন। স্বাদুশীতলনির্মলজলপূর্ণ নদীরূপ শকুন্তলাকে পরিত্যাগ করেছেন। রাজা চিত্তবিনোদনার্থে চিত্রফলকে স্বহস্তে তার প্রতিমূর্তি চিত্রিত করলেন। তাতে রূপ-লাবণ্যের মাধুরী, তার অসাধারণ অঙ্গসৌষ্ঠব, অমায়িক মুখারবিন্দে সলজ্জ ভাব প্রকাশিত হচ্ছে। রাজা আঁকলেন সেই তপোবন, সেই মালিনী নদী। তাতে মৃগগণ স্বচ্ছন্দে ভ্রমণ করে বেড়ায়, জলে কেলী করতে থাকে হংসগণ। শিরীষপুষ্পের আভরণ-চিত্রিত প্রিয়ার কর্ণও স্মরণ করে রাজা এঁকে ফেললেন।

এরই মধ্যে কালনেমির সন্তান দুর্জয় নামক দুর্দান্ত দানবেরা দেবতাদের বিষম শত্রু হয়ে উঠলে ইন্দ্রসারথি মাতলি দেবরথ নিয়ে রাজার কাছে উপস্থিত। রাজা সসজ্জ হয়ে যুদ্ধার্থে সেই রথে গমন করলেন। দানবজয়কার্য সম্পন্ন হল। জয়ী রাজাকে দেবতারা সৎকার করলেন, ইন্দ্র স্বহস্তে পরিয়ে দিলেন মন্দারমালা। দেবলোকে কিছু সময় অবস্থানও করলেন রাজা। এবার মর্তলোকে ফিরছেন৷ পথে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত পর্বত হেমকূট। তা কিন্নর ও অপ্সরাদের বাসভূমি। সেখানে ভগবান কাশ্যপের আশ্রম। আশ্রম অধিক দূরবর্তী নয়, তাই ভগবানকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করে যাবেন, এই অভিলাষে রাজা অবতীর্ণ হলেন। মাতলির রথ স্থির হল। রাজার দক্ষিণ বাহু স্পন্দিত হতে লাগল। কী তার অভীষ্টলাভের প্রত্যাশা!

বিদ্যাসাগর লিখছেন, ‘‘এইরূপ কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া রাজা শব্দানুসারে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া দেখিলেন, এক অতি অল্পবয়স্ক শিশু সিংহশিশুর কেশর আকর্ষণ করিয়া অতিশয় উৎপীড়ন করিতেছে, দুই তাপসী সমীপে দণ্ডায়মান আছেন। দেখিয়া চমৎকৃত হইয়া রাজা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, তপোবনের কি অনির্বচনীয় মহিমা!” সর্বাঙ্গসুন্দর শিশুকে দেখে রাজার অন্তঃকরণে স্নেহরসের আবির্ভাব হল। ক্রমে সেই স্নেহ গাঢ়তর হতে লাগল। তার মুখমধ্যে অর্ধ বিনির্গত কুন্দসীন্নভ দন্তরাজি। তার অর্ধোচ্চারিত মৃদুমধুর বচনপরম্পরা। রাজা বালকের হস্তগত থেকে সিংহশিশুকে মুক্তি দিলেন। তার অনুপম স্পর্শসুখ অনুভব করলেন। পরকীয় পুত্রের গাত্র স্পর্শ করে এমন সুখানুভূতি হয় না। বালক দুর্দান্ত হলেও এইবার শান্তস্বভাব হল। তাপসীরা রাজা ও শিশুপুত্রের আকারগত সৌসাদৃশ্য দর্শন করে বিস্মায়াবিষ্ট হলেন। রাজা জানলেন, এই শিশুর জননী শকুন্তলা। নামসাদৃশ্যে অবাক হলেন, মনে হল উত্তরোত্তর সকল কথাই তার বিষয়ে ঘটছে। সহসা বিরহকৃশা মলিনবেশা শকুন্তলা সেখানে উপস্থিত হলে রাজার বিস্ময়ের পরিসীমা রইল না। দু’জনেই বাক্‌শক্তিরহিত হয়ে দণ্ডায়মান রইলেন। দু’জনের নয়নযুগল বাষ্পবারিতে পরিপ্লুত হয়ে এলো। বালক বলে উঠল, ‘‘মা! ও কে, ওকে দেখে তুই কাঁদিস কেন?” রাজা উন্মূলিত তরুর মতো ভূতলে পতিত হলেন। শকুন্তলার শোকসাগর আরও উথলিয়ে উঠল৷

কথপোকথনের মাঝে মাতলি প্রফুল্ল বদনে উপস্থিত হলেন। ভগবান কাশ্যপও সব শুনে সাতিশয় প্রীত হলেন। সস্ত্রীক সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করে উভয়ে কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান রইলেন। উভয়ে দুর্বাসার শাপবৃত্তান্ত শ্রবণ করলেন। রাজাও সকলের কাছে সকল অপরাধ থেকে মুক্ত হলেন। কাশ্যপ রাজাকে বললেন, ‘‘বৎস! তোমার এই পুত্র সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধিপতি হইবেক, এবং সকল ভুবনের ভর্তা হইয়া উত্তর কালে ভরত নামে প্রসিদ্ধ হইবেক।”

এই ভরতের নামেই আমাদের দেশের নাম ভারতবর্ষ।

লেখক বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার ফ্যাকাল্টির বিশিষ্ট অধ্যাপক।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *