শম্ভু মিত্র: বাঙালির অহংকার

প্রবুদ্ধ মিত্র 

১৯৯৭ সালের এই দিনটিতে (১৯ মে) আমি শিলিগুড়িতে চাকরিরত ছিলাম। তাঁর মৃত্যুসংবাদে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিলাম। চাইলেই তো ছুটে কলকাতা পৌঁছনো সম্ভব নয়। অতএব, তাঁর শেষযাত্রাতে পা মেলানো থেকে বঞ্চিত হতে হবে। কিন্তু, না। কোনো শেষযাত্রায় ওঁর সায় ছিল না। এমনই ইচ্ছাপত্রে উনি স্বাক্ষর করে রেখেছিলেন। সকলের অলক্ষ্যে নীরবে উনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন। মহৎ ব্যতিক্রমী তাঁর শেষ ইচ্ছা। বাংলার নাট্যমোদীদের মনে যাই থাক, তাঁর মহতী ইচ্ছাকে যথাযথ সম্মান জানিয়েছিলেন তাঁর সুযোগ্য কন্যা অনন্য নাট্যব্যক্তিত্ব শাঁওলি মিত্র।

শম্ভু মিত্রর মতো কিংবদন্তী নাট্যব্যক্তিত্ব বাংলা নাট্যমঞ্চকে বেশ খানিকটা শূন্য করে দিয়ে গেলেন সেদিন। যা কখনোই পূরণ হবার নয়। এটা সম্যক বুঝতে কোনো অসুবিধে হয়নি আমার বা আমার মতো অগণিত নাট্যকর্মীদের যাঁরা কোনো না কোনো ভাবে বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের সঙ্গে কিছুটা যুক্ত থেকেছেন জীবনের একটা অংশে। আরো পরিষ্কার করে বলা যায়— শুধু নাট্যকর্মী নয়, বাংলা নাটকের অসংখ্য দর্শকরাও একটা অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হলেন।

আরও পড়ুন: বাঁক বদলকারী সাহিত্যস্রষ্টা মানিক

বাংলা নাটকের একটা বাঁকবদল হয় তাঁরই সৃষ্ট ‘নবান্ন’ নাটকে। গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ-র ব্যানারে যে প্রযোজনা আজ ইতিহাস। শম্ভু মিত্র এরপর ‘বহুরূপী’ নাট্যগোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানে একের পর এক রবীন্দ্রনাথ, তুলসী লাহিড়ি, ইবসেন, সফোক্লেসের বহু নাটক মঞ্চস্থ করেন। ছেঁড়াতার, অয়দিপাউস, রাজা, রক্তকরবী, চার অধ্যায় ও পুতুল খেলা ইত্যাদি বাঙালি নাট্য দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে আছে।

নাট্য শিক্ষক হিসেবেও তিনি অতুলনীয় ছিলেন। এ প্রসঙ্গে একটা ছোট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একদিন ‘শূদ্রক’ নাট্যদলের মহলাকক্ষে এসেছিলেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ওই দিন ওনার একজন সামান্য ছাত্র হিসেবে ওখানে হাজির থাকার। 

একটি চার শব্দের বাক্য কীভাবে বিভিন্নভাবে বলা যায় তা ওইদিন তিনি বুঝিয়ে ছিলেন। যেমন, ‘আমি কাল বাড়ি যাব না।’ এই বাক্যটিকে চার ভাবে বলা যায়। প্রথমে ‘আমি’ শব্দের ওপর জোর দিয়ে। যার অর্থ ‘আমি’ ছাড়া অন্য কেউ যাবেনা। এভাবে ‘কাল’, ‘বাড়ি’ এবং ‘যাব না’ শব্দের ওপর জোর দিয়ে বাক্যটি চার ভাবে বললে চার রকম অর্থ বেরিয়ে আসে। এটি অভিনেতাদের একটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শিক্ষা। 

এভাবে  সাধারণ গল্প কখন হঠাৎ নাটক হয়ে ওঠে, তারও ব্যাখ্যা দেন। শম্ভু মিত্র এমনই একজন ব্যক্তিত্ব, মঞ্চে যাঁর উপস্থিতি বা তাঁর অভিনয় মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। তাঁর বাচনভঙ্গি পরবর্তী প্রজন্মের বহু অভিনেতাকে প্রভাবিত করেছে। তাঁর অভিনয়ভঙ্গি একটা আলাদা জঁর।

আরও পড়ুন: উনিশে মে, রক্তস্নাত মাতৃভাষা

‘বহুরূপী’র জন্ম ১ মে। সত্তর দশকের শেষ অবধি এই জন্মদিনকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর একটা নাট্য উৎসব আয়োজিত হত। অ্যাকাডেমি চত্বরে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে নাট্যদর্শকদের উদ্দীপনা থাকতো তুঙ্গে। এক একটা প্রযোজনার টিকিট পেতে রাত জেগে লাইন পড়ত। যাঁরা হাতে টিকিট পেতেন তাঁরা হাতে চাঁদ পেয়েছেন বলে মনে করতেন। এই উদ্দীপনা যা বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ভেসে যেত প্রতিটি প্রযোজনার সন্ধ্যা। এই উন্মাদনার কারণ সন্দেহাতীত ভাবে ছিলেন মঞ্চে বা মঞ্চের পেছনে শম্ভু মিত্রের উপস্থিতি। 

এক প্রজন্ম তাঁকে সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করে ভাগ্যবান হন। আর পরবর্তী প্রজন্ম তাঁর কথা শোনেন বা তাঁর সম্পর্কে জানেন ইতিহাসের পাতা থেকে। এভাবেই তিনি থেকে যান বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে। বাংলা থিয়েটারে শম্ভু মিত্র মিথ হয়ে আছেন এজন্যই। 

আশির দশকের শুরুতে আর একটা উল্লেখযোগ্য প্রযোজনায় উনি আবার মঞ্চে অবতীর্ণ হন। ব্রেটোর্ল্ড ব্রেশটের নাটক অবলম্বনে তৈরি হয় ‘গ্যালিলিওর জীবন’। নাম ভূমিকায় ছিলেন শম্ভু মিত্র। প্রযোজনায় ক্যালকাটা রিপারটোরি থিয়েটার। যা বহু নাট্যদলের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল। এই প্রযোজনা যদিও খুব বেশিদিন মঞ্চস্থ হয়নি। কিন্তু অভাবনীয় উৎসাহ ও উদ্দীপনায় জমে উঠেছিল বাংলা থিয়েটারের আবহ। এরও মুখ্য কারণ শম্ভু মিত্র। তিনি বাংলা থিয়েটারে যে অবদান রেখে গেছেন তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে থেকে যাবে সোনালি অ্যালবামে।

আরও পড়ুন: দেবেশ রায়ের ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’

নাটক ছাড়া উনি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। ‘জাগতে রহো’ ও ‘ধরতি কে লাল’ ছবিতে উনি অভিনয় করেন। পরিচালনা করেন ‘একদিন রাত্রে’র মতো উল্লেখযোগ্য বাংলা ছবি। ১৯৭৬  সালে উনি ম্যাগসেসাই পুরস্কারে ভূষিত হন। এই কিংবদন্তি শিল্পী আন্তর্জাতিক আঙিনায় বাঙালিকে যাঁরা গর্বিত করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বাঙালির অহঙ্কার বললে অত্যুক্তি হয় না।

প্রবুদ্ধ মিত্রের জন্ম ১৯৫৬ সালের মে মাসে। খাস উত্তর কলকাতার বাগবাজারেই তাঁর আজন্ম ঠিকানা। রসায়নে স্নাতকোত্তর। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। সাহিত্যচর্চা নয়, চর্যায় বিশ্বাস রেখে লেখালেখির শুরু। কলেজ জীবনে, সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে কবিতা লেখা দিয়ে শুরু করলেও তাঁর আদত বিচরণ গদ্যের বাইলেন থেকে সরণিতে। ‘অভিযান’, ‘পুনর্বসু’, ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘কীর্তিনাশা’ প্রভৃতি লিটল ম্যাগাজিনের যৌথ সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন শেষ শতাব্দী আট নয়ের দর্শক এবং একুশ শতকের শূন্য দশক পর্যন্ত। আর সেই সব পত্রিকার সূত্রেই বাংলা গল্প সাহিত্যের চরাচরে পথ চলা শুরু। আত্মীয়তার সূত্রে সান্নিধ্য পান সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, তাঁর গুড্ডু ভাবনার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন। গল্প-উপন্যাসের অন্যতর ধারার প্রতি আগ্রহ থেকে তাঁর লেখায় একটা নিজস্ব বাচনভঙ্গি গড়ে ওঠে। যা টের পাওয়া যায় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘হলফনামা’য়। প্রকাশিত হয় লেখা শুরু করার অনেক পরে ২০০৬ সালে, ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকার আলোচনায় যা সমাদৃত হয়। এরপর ২০১০ সালে ‘উর্বী’র পুরাতন প্রকাশক প্রদীপ ভট্টাচার্যের একান্ত আগ্রহ প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস ‘হে মাধবীলতা’। পাঠকমহলে আলোড়ন তুলে বর্তমানে যার প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত। লেখালিখি ছাড়াও নাটক ও চলচ্চিত্রে তাঁর প্রবল অনুরাগ। একটা সময় ‘শূদ্রক’ নাট্য সংস্থায় অভিনয় করতেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *