শিক্ষা দিয়ে গেল ভিন্ন ঘরানার ছবি ‘শেরনি’

sherni

অরিন্দম পাত্র

সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যখন এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন, তখন শুধুমাত্র মানবজাতির রচনাই করেননি, পাশাপাশি জীব-জন্তু-পশু-পাখি সবকিছুই দিয়েছিলেন তার সঙ্গে। তিনি আশা করেছিলেন, সবচেয়ে উন্নত হবার সুবাদে মানুষ সবকিছুরই খেয়াল রাখবে, প্রকৃতিকে রক্ষা করবে ঈশ্বরের দূত হয়ে! কিন্তু হায় ঈশ্বর, স্বার্থপর, লোভাতুর মানব প্রজাতি দিনের পর দিন স্বেচ্ছাচারিতায় মত্ত থেকেছে, যথেচ্ছ হারে বন-অরণ্য ধ্বংস করেছে, তার ধ্বংসলীলার হাত থেকে অবলা পশুপাখীও রেহাই পায়নি। বন্যেরা তাই আজ বনে বিপন্ন। আজ থেকে বছর তিনেক আগে মহারাষ্ট্রের জঙ্গলে এইরকমই ধ্বংসাত্মক কিছু মানুষের হাতে মারা যায় ‘অবনী’ (T1) নামে কুখ্যাত একটি বাঘিনী, যার থাবায় ইতিপূর্বে বেশ কিছু গ্রামবাসী মারা গিয়েছিলেন। সেই ঘটনার পরে দেশজুড়ে পরিবেশমনস্ক মানুষ, বিশেষজ্ঞ ও প্রকৃতিপ্রেমী সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন। সেই ‘অবনী’-কাণ্ডের ছায়ায় পরিচালক অমিত মাসুরকর তৈরি করেছেন এই ছবি ‘শেরনি’।

যে ঘটনার উল্লেখ করলাম তার পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, গল্পের অভিমুখ ঠিক কোন দিকে। তবু একটু কাহিনি সূত্র ধরিয়ে দিই। এখানে T1 হয়েছে T12 আর মুখ্য ভূমিকায় পরিচালক এনেছেন একজন সৎ ও নির্ভীক মহিলা ফরেস্ট অফিসারকে। যিনি প্রাণপণে চেষ্টা করেন ‘শেরনি’কে তার সঠিক রাস্তা দেখিয়ে বাচ্চাসমেত জঙ্গলে ফেরত নিয়ে যাওয়ার। তাঁর সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়, সেটাই এই ফিল্মের মূল উপজীব্য।

অনেকদিন বাদে মূলধারার বলিউডের একটি ছবি দেখলাম, যা পুরো পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে দেখা যায় এবং পাশাপাশি যা অত্যন্ত শিক্ষনীয়ও বটে! অবনী-কাণ্ডের ছায়ায় নির্মিত হলেও মাসুরকর অনেক নিজস্ব ইনপুটস রেখেছেন। এছাড়া গল্প ও চিত্রনাট্যের বাঁধুনি একদম ঠিকঠাক থাকায় পুরো ছবিটিই অত্যন্ত জমাটি ও উপভোগ্য হয়েছে। একটু এদিক-ওদিক হলেই ব্যাঘ্র সংরক্ষণের উপর কোনও তথ্যচিত্রসুলভ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু সে সুযোগ দেননি মাসুরকর সাহেব। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি অনেকগুলো ছোট-বড় ইস্যু তুলে এনেছেন তিনি—

১. জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল প্রান্তিক মানুষের দুরবস্থা।

২. সরকারি দপ্তরের রাজনীতি ও যোগ্য জুনিয়র অফিসারকে পদে পদে হেনস্থা।

৩. রাজনৈতিক দলের পদলেহন করে ল্যাদখোর সিনিয়র অফিসারের প্রমোশন।

৪. মিডিয়ার দ্বিচারিতা ও জনগণকে উসকানিমূলক প্রচার করা।

৫. সরকারি আধিকারিকদের শারীরিকভাবে হেনস্থা করা।

এই সবকিছুই অতি স্বল্প পরিসরে চিত্রনাট্যের অংশ করে তুলেছেন ডিরেক্টর। ফলত সবমিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিটোল গল্প রূপে সাফল্যের সঙ্গে ছবিটিকে দাঁড় করাতে পেরেছেন তিনি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কুশলী পরিচালনা, যার স্বাক্ষর তাঁর পূর্বতন ছবি ‘নিউটন’ এই আমরা দেখেছি।

অভিনয় এই ছবির বিরাট বড় সম্পদ। মুখ্য চরিত্রে বলিউডের একসময়কার লেডি সুপারস্টার বিদ্যা বালান রয়েছেন ফরেস্ট অফিসার বিদ্যা ভিনসেন্টের রোলে। একসময়কার বললাম, তার কারণ ইদানীং মিডিয়ার ফোকাসটা ঝাঁসির রানি আর তাপসির দিকে ঘুরে গেছে তাই। কিন্তু বিদ্যা ম্যাডাম ইজ বিদ্যা ম্যাডাম। গোটা ছবিতে নিয়ন্ত্রিত আন্ডার অ্যাক্টিং করে গেলেন তিনি আর ঠিক সময়ে ছবির শেষ প্রান্তে এসে ঝলসে উঠলেন ঠিক ‘শেরনি’র মতোই। তাই প্রশ্ন রয়েই যায় এই ছবির আসল শেরনি কে? T12 না বিদ্যা ভিনসেন্ট যিনি মুখের উপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দু-কথা শুনিয়ে দিতে পারেন অসদুপায় অবলম্বনের জন্য, যিনি লিখে ফেলা পদত্যাগপত্র ছিঁড়ে ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে যেতে পারেন শেরনির বাচ্চাদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে। শকুন্তলা দেবী দেখা হয়নি কিন্তু ‘শেরনি’তে বিদ্যার অভিনয় খুব ভালো লাগল। বিদ্যার পরেই নাম করব প্রফেসর নুরানীর চরিত্রে বিজয় রাজের। আদ্যন্ত প্রকৃতিপ্রেমিক ও নিঃস্বার্থ একজন মানুষ, যিনি নিজের নামডাকের তোয়াক্কা করেন না, ছুটে যান অবলীলাক্রমে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একডাকে। T12-কে জঙ্গলে ফেরানোর জন্য তাঁর আকুল প্রচেষ্টা দৃষ্টি এড়ায় না আমাদের। অপদার্থ ও ক্ষমতাবানের পদলেহনকারী বনসলের ভূমিকায় বিজেন্দ্র কালরা অথবা প্রতিহিংসাপরায়ণ সিনিয়র অফিসার নাঙ্গিয়ার রোলে নীরজ কবি স্বল্প উপস্থিতিতেও উজ্জ্বল। তবে সবচেয়ে ঘৃণা উৎপাদন করেন শরদ সাক্সেনা প্রাইভেট সিভিলিয়ান শিকারি পিন্টু ভাইয়ার চরিত্রে। রক্তপিপাসু ও নামের কাঙাল এক শিকারি যিনি নিজের সুখ্যাতির জন্য যেকোনও সীমা পর্যন্ত যেতে পারেন।

এই ছবির সম্ভবত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় এর সিনেমাটোগ্রাফি। অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। অতিমারির কারণে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি মানুষের চোখে আরাম এনে দিয়েছেন ডিওপি সুচারুরূপে সবুজে সবুজ জঙ্গলকে তুলে এনে। ড্রোন শটগুলি, পাতা ও ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে নেমে আসা নরম সূর্যের আলোর বিচ্ছুরণ, জঙ্গলের সূর্যাস্ত, বিভিন্ন ক্লোজ আপ ম্যাক্রো শটস গুলো সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ঠিকঠাক। আর বাঘকে ধরার জন্য ক্যামেরা ট্র্যািপ সেট করা ও অন্যান্য খুঁটিনাটিগুলিও তারিফযোগ্য।

সবশেষে এই ছবি প্রকৃতি, জঙ্গল ও মানুষের সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়। পশুপাখিদের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। কিন্তু যে দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাজনীতি ঢুকে গেছে, যে দেশে মানুষের অস্তিত্বই আজ বিপন্ন, সেই দেশে পশুরাও কি ভালো থাকতে পারবে শেষমেশ?

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *