কবিতার, সাম্যের, মস্করার শিব্রাম

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

আমি গুরুবাদে বিশ্বাসী নই, আমার কেউ শিষ্যত্ব নেবে না আর। তবু তো কিছু বিষয় থাকে, অন্যের পালন থেকে যা আমাকে উদ্দীপিত করেছে আমার জীবন সংগঠনের পর্বে! সেদিক থেকে শিব্রাম চকরবরতি আমার দ্রোণগুরু— সাম্যবাদী চেতনার, বোহেমিয়ানিজমের, পানিংয়ের, নিজেকে নিয়ে পরিহাস প্রিয়তার, / আর রাবড়ির নেশার। যখন অধিকাংশ শিশু মজে থাকত মজায়, তখন আমার বাবা সাপ্লাই দিতেন জ্ঞানবিচিত্রার বইরাশি, ফলে হর্ষবর্দ্ধন-গোবর্দ্ধন পড়ে দেখতে পারলাম না (পড়লাম মধ্যযৌবনে ‘মনের মত বৌ’ পাওয়ার তাড়নায়)!

যৌবনে যখন অ-পাঠ্য পড়ার একটু সময় গুছিয়ে নিচ্ছিলাম, তখন আমার এক মাস্টার হাতে ধরিয়ে দিলেন ‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’। মজে গেলাম শিব্রামীয় মস্কো নিয়ে মস্করা এবং পণ্ডিচেরী নিয়ে পণ্ডিতি (এটাই ছিল বইটার সাবটাইটেল)-তে।
বাঙালি যুবক প্রেমে না পড়লেও নাকি কবিতা লেখে? আমিও কবিতার নেশায় মত্ত। কষে পড়ছি গোবিন্দ চক্রবর্তী, মজনু মোস্তফা, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মণিভূষণ ভট্টাচার্য প্রমুখের কবিতা। কে যেন একজন (এখন নাম মনে পড়ছে না) আমাকে সন্ধান দিলেন এক স্বেচ্ছা-নির্বাসিত কবির দু’টি কাব্যগ্রন্থের। তাঁর কাছে থাকা ছেঁড়াখোঁড়া একটা বই “মানুষ” পড়তে দিলেন। কবির নাম দেখি শিবরাম চক্রবর্তী!

মুগ্ধবোধ থেকে মুখস্থ করে ফেলেছিলাম কবিতাটা। জানি না এখনও সবটুকু যথাযথভাবে স্মৃতিধৃত আছে কি না! তবু শুধুমাত্র চেষ্টা করছি কবিতাটি পুনরুদ্ধার করতে, ভুলচুক হলে পাঠকের মার্জনা আগাম চেয়ে রাখছি।

    "কখনো শুনেছ কারো মুখে

বাঘেরে খেয়েছে বাঘ, ভালুক ভালুকে?
কে পারে করিতে অস্বীকার?
নাহিক বিকার
মানুষে মানুষ খায়, খেয়ে বেঁচে থাকে প্রতিদিন
রক্ত খায়, মাংস খায়, মেদ-মজ্জা খেয়ে করে ক্ষীণ
খায় মন, আত্মা তার, জীবনের অর্ধেক নিঃশ্বাস
অচিরে নিঃশেষ করে, অবশেষে ভুক্তাবশেষ
জীবন্ত কঙ্কাল তার
ফেলে দেয়— করো কি বিশ্বাস!

না যদি প্রত্যয় হয়, চোখ খুলে যাও গ্রামে গ্রামে
স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করো মনুষ্যত্ব বেড়েছে নীলামে।

মানুষের মানুষ শিকারী
নারীরে করেছে বেশ্যা
পুরুষেরে করেছে ভিখারী।”

শিবরামের অন্য কাব্যগ্রন্থটি ছিল ‘চুম্বন’। চিরকুমার এই মানুষটি ছিলেন আদ্যন্ত রোমান্টিক এবং গভীরভাবে প্রেমিক। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো তরল-মাধ্যমেও খুঁজে যখন বিফল হচ্ছি, তখনই চোখে পড়ে গেল www.milansagar.com পেজটা। সেখানে পেলাম ‘অরণ্যরোদন’ কবিতাটি, যার এই চারটি লাইন আমার বেশ আকর্ষণীয় লেগেছে:

“জনারণ্যের মতন বল না এমন কী আর নির্জন?
কার চোখ আর টানবো?
কানে-কানে কথা বলার ছলায় করো যদি ভুলে চুম্বন,
তুমি আর আমি জানবো”

মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের তক্তারামে শুয়ে যিনি রাবড়ির নেশার মৌতাতে বিভোর থাকতেন, সেই তিনিই পণ্ডিচেরীর আশ্রমিকদের উদ্দেশে সম্ভবত এরকমই মন্তব্যের বান ছুঁড়েছিলেন: এদের খাটানো যায় না, বলতে হয় খাট আনো!

সেই যে বাড়ি থেকে পালালেন তিনি আর ফিরলেন না বোহেমীয় জীবনযাপন ছেড়ে। নিজেরই স্মৃতিকথন এর ভঙ্গিতে লিখে ফেলেন এক চিরস্মরণীয় কিশোর-উপন্যাস: ‘বাড়ী থেকে পালিয়ে’। নিজে পড়লাম বহুবার, ততোধিক বার দেখে ফেলেছি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। কিন্তু সন্তানসমদের হাতে বইটা তুলে দিতে গিয়ে যে ভীত হয়ে পড়ি পাছে তারা অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় পালিয়ে বেড়ায়! আর কি আশ্চর্য, এই কাহিনি নজরে পড়ে গেল আরেক জীবন রসিক ঋত্বিক ঘটকেরই! তিনি ১৯৫৮ সালে বানিয়ে ফেললেন এক রসোত্তীর্ণ ফিল্ম যা শৈশবের, তারুণ্যের থেকে বার্ধক্যের সব বয়সি দর্শককেই মোহিত করে রাখে।

এখানে একথা বলা খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, এই ছবিতেই প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল বুলবুল ভাজার। সলিল চৌধুরীর সুরে হেমন্ত গেয়েছিলেন:

“কুড়মুড় কুড়মুড় কুড়মুড় তাজা
আমার এই হরিদাসের বুলবুল ভাজা
আমার এই বুলবুল বুলবুল বুলবুল ভাজা”।

”এই লতুন লতুল গাছে / কত ফুল ফুটিছে”— গান কতটা কে জানে, তবু তো বিহারী দারোয়ান জহর রায় গেয়ে ফেলতেই পারেন এই ছবিতে!

শিব্রাম বলতে সেই থেকে আমি সবাইকে চেনাতে চাই ব্যতিক্রমী শিবরাম চক্রবর্তীকে। খুঁজে নিন তাঁকে…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *