শিউলি-কথা

চন্দন চক্রবর্তী

ভোরবেলায় বেরিয়ে পড়লাম। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। হিমকুয়াশা ঢাকা গাছপালা৷দূরের সবুজ-সোনালি রং ধরা ধানক্ষেত৷মণ্ডলদের ভিটায় নাকি এবারে শিউলি বসেছে৷শিউলি-জীবন বড় অদ্ভুত। সেই অদ্ভুতের সন্ধানে নন্দন পাত্রের সামনে হাজির হলাম। সবে বিভিন্ন গাছের থেকে রসের হাঁড়ি নামিয়ে এনেছে৷ ব্যস্ততা তুঙ্গে৷ একটা মোড়া এগিয়ে দিল নন্দন। দু’জন কারিগর তখন দু’টো লম্বাটে উনুনে খড় গুঁজে আগুন জ্বালিয়ে চলেছে৷ দু’টো নৌকো বা শালতি (রস ফোটাবার বড় চৌকা পাত্র) চাপিয়েছে৷ প্রথমটা ধোঁয়া বেরোচ্ছিল। পরে আগুনের তেজে বুচকুড়ি দিয়ে রস ফুটতে শুরু করল৷ পাশের হোগলা, খেজুর পাতা দিয়ে ছাউনি-ঘর৷ ঘোমটা দেওয়া বউটি তখন মুলো শাক কাটছে৷ সামনেই মাটিতে কয়েকটা বড় সাইজের মরা তেলাপিয়া মাছ৷ আজ দুপুরেরে মেন্যুতে মুলো শাক ভাজা৷ ছ্যারছেরে ডাল, আর মাছের ঝোল৷ ছাউনি ঘরটি ওদের ক’মাসের বাসস্থান৷ শীত তেমন আটকায় না তবুও ভেতরে গুড়ের ভাঁড়, দাঁড়িপালা, বাটখারা ছাড়াও ঘর গৃহস্থলীর জিনিস৷

আরও পড়ুন: বিশ্বাসঘাতক

কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টির ফোঁটা পড়া পুকুর জলের মতো রসে ফুট ধরল৷ রস-ফোটা ধোঁয়া বেরচ্ছে৷ বড় মিষ্টি গন্ধ তার৷ ততক্ষণে নন্দন পাত্র একটা হাসুয়া নিয়ে ধার দিতে ব্যস্ত৷ একটা ঘষা কাঠের ওপর সাদা মিহি বালি ছড়িয়ে হাসুয়াটি ঘষে চলেছে৷ মাঝেমাঝে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে তার ধার কতটা হল৷ হাত চলছে৷ রস ফোটার মতো তার মুখ দিয়ে কথা ফুট কাটতে থাকে—

‘‘আমাদের সাইডে মানে পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরির দিকে ইকে গুড়শাল বলে৷ আর আপনাদের দিকে বলে ‘শিউলি’ পাটি৷ এটা পৈতৃক ব্যবসা৷ আমাদের বাড়ি… খেজুরি থানার কাছে পশ্চিম পনিখা৷ আমরা তিনভাই, আমি মেজো৷ এই রজনীগঞ্জ বাজারের কাছে বসছি৷ আর মোর দুইভাই বসছে একজন ঢেকুয়া (কুঁকড়াহাটি)৷ আর এক ভাই হাওড়ার শ্যামপুরে৷ সত্তর বছরের বাবা বসছে সোনারপুরে৷ এখন আর গাছে উঠতে পারেনি৷ পাঁচ-ছয়জন কারিগর লিয়ে বসছে৷ আবার সেজোকাকা হাইরোডে, তার দুই ছেলে রেল গেটের ধারে৷ মানে বুঝা গেল এটি আমাদের বংশানুক্রমে ব্যবসা বা পেট চালাবার কারবার৷ মনে হল, একটা যৌথ পরিবারের গল্প! কত সহজে বলে চলে, সেজোকাকা বা ভাইদের কথা!”

আরও পড়ুন: বীরদের নগর আর উলার মেলা

‘‘কখন থেকে কাজ শুরু করো?”

‘‘পুজোর আগেই বিভিন্ন জায়গায় ভালো গাছের সন্ধান করি৷ কোথায় কাছাকাছি বহু খেজুর গাছ আছে? সঙ্গে লাগোয়া বাজার৷ মানে লোক বসতি কেমন? বাজার বা হাট কত দূরে তা খবর নিই৷ জা’গা ঠিক করার পর৷ কথাবার্তা পাকা করি৷ যার জা’গার উপর ব্যবসা করি, তাকে তিনমাসের জন্য ১২০০-১৫০০ টাকা দিতে হয়৷ প্রথমে গাছের মুড়া কাটা হয়৷ তা পূজার আগেই৷ কার্তিকের ২৫ তারিখে গাছ কাটা শুরু হয়৷ দু’দিন ছাড়া ছিলতে হয়৷ মাঝে দু’দিন বিশ্রাম দিতে হয়৷ এইভাবে ছিলা চলে। গাভীর বাঁটে দুধ আসার মতো যখন বুঝা যায় গাছে রস বারাবার জন্য তৈরি, তখন ‘বাড়িয়া’ বাঁশের টুকরা দিয়ে তৈয়ার করা চোঙা পুঁতে দিতে হয়৷ সেই চোঙা দিয়ে রস বারিয়ে হাঁড়ি ভর্তি হয়৷ এভাবে চলে ২৫ মাঘ পর্যন্ত৷ যদি ২০০টা গাছ নিবা হয়, তবে একশো একশো করে দু’ভাগ করে নিতে হয়৷ এবারে আমরা দু’শো গাছ লিছি৷ এককাট অর্থাৎ জিরান আর দু’কাটের পর বিশ্রাম দিতে হয়৷ তখন অন্য ১০০ গাছ ধরতে হয়৷ গাছেরও বিশ্রাম দরকার হয়…” এই বলে নন্দন পাত্র হাসে৷

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: উজ্জয়িনী

ওদিকে রস ফুটছে৷ বিজ বিজ করে অসংখ্য বুজকুড়ি৷ তার রং পালটায়, গেরুয়া থেকে গাঢ় গেরুয়া রং ধরে আর ভরপুর গন্ধ! সে গন্ধে এক মাদকতা আছে৷ অনেক ছোটবেলায় রস যখন গাঢ় হয়ে গুড়ের রং ধরত, তখন আমরা কলাপাতার টুকরোয় সেই পাতলা গরম গুড় খেতাম! ওফ্ কি সুন্দর তার স্বাদ আর গন্ধ! আজও লেগে আছে সে স্বাদ গন্ধ! জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘আমাদের ভিটেতে গাছ নিলে না কেন? ওখানেই তো প্রচুর গাছ পেয়ে যেতে?”

ও হেসে বলল, ‘‘বড়বাবু, দেয়নি, বলল, আরে গাছকে জিরান দিবিনি৷ শুধু জোঁকের মতো রক্ত চুষলেই চলবে! পরের বছর আসবি৷’’

জোঁকের মতো? জোঁক রক্ত চোষে খাদ্য হিসাবে! আর এরা রস গ্রহণ করে ওদের খাদ্যের জন্য! হিসাব ঠিকই আছে৷ বললাম, ‘‘ঠিকই আছে৷ এভাবে শোষ (শুকনো) কাগজের মতো গাছকে শুষে নেওয়া যায়? গাছ দুর্বল রুগ্ন হয়ে গেলে রস টানতে না পেরে তো মরে যাবে৷ তাই না?’’

আরও পড়ুন: আঁধার আমার ভালো লাগে

‘‘তা ঠিক বলছেন বটে, আমাদের কি ভালো লাগে৷ গাছ ছিলাই তো আমাদের কাজ৷ খেঁজুর রসের সময় চলে গেলে শুরু হয় তালরসের কারবার৷ অত উঁচা গাছ! কি খেঁজুর! কি তাল! কোমরে ঝুলান ঠুংরি (যার মধ্যে হাসুয়া রাখা হয়)৷ তার ভিতর হাসুয়া দড়ি নিয়ে গাছের ডগায় উঠে পড়া সম বৎসর৷ জ্বর জ্বালা হলেও থেমে থাকেনি৷’’

‘‘বুঝলাম! তা ব্যবসা কেমন চলছে?’’

‘‘তা যদি বলেন, একটা গাছে গড়ে একটা সিজিনে ৬ কেজি গুড় হয়৷ এবার ধরুন গে যদি ২০০ গাছ ধরি তার ২০০x৬ = ১২০০ কেজি গুড় হয়৷ খুচরা দর ১০০ টাকা আর পাইকারি দর ৮০ কেজি! মানে সিজিনে এক লাখ থেকে এক লাখ বিশ হাজার বিক্রি হয়৷ এবার জ্বালানি বলতে খড় লাগে রোজ এক কাহন৷ যার দাম এখন ৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা৷ এরপরে রোজ খরচা৷ চার পাঁচজনের খোরাকি আছে৷’’

বললাম, ‘‘আগে তো খড়ের নাড়া, শুকনো পাতা খড়কুটো জ্বালন হিসাবেও ব্যবহার করতে!”

ও হাসে, বলে, ‘‘তা জোগাড় করতে  একটা জন লাগাতে হবে৷ তারও খরচ আছে৷” একটা ছেলেমানুষের মতো প্রশ্ন করে বসলাম, ‘‘আচ্ছা এই গাছে চড়াও তো ছোটবেলায় শিখতে হয়! কাঠবিড়ালির মতো গাছ বেয়ে ওঠা তো চাট্টিখানি কথা নয়৷”

নন্দন পাত্র হাসে। ‘‘ডোমকে কি মড়া পুড়ানোর কাঠ সাজাইতে শিখাতে হয়? হয়নি, আমরাও শিখে যাইগো বাবু! আমার বড় ছেলা সাত বছর বয়সে বাপকে দেখে গাছে চড়া শিখেছে… হা হা৷”

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)

অন্য প্রসঙ্গে গেলাম৷ ‘‘এই যে পাটালি তালের বা খেঁজুর গুড়ের যাই হোক না কেন, ওগুলো কীভাবে বানাও?”

‘‘কেন মাটিতে গত্ত করে! মাটির চ্যাটকা জায়গা বানিয়ে দু-পাশে বাঁশের ঠ্যাকা দিতে হয়। এবারে নতুন ধুতি পেতে তার উবরে পাতলা রস-গুড় ঢালা হয়৷ এভাবেই গোল বা চৌকা পাটালি তৈয়ার হয়! সে আবার যে সে গুড় নয়। ফেনাওয়ালা গুড়কে কাঠের বড় খুন্তিদিয়ে ঘষে ঘষে মারতে হয়। মারতে মারতে ড্যানা ব্যথা হয়ে যায়৷ তবুও থামলে চলবেনি৷ তারপর যখন পেস্ট মতো হয়ে যাবে, তখন তা ঢালতে হয়৷ খাটনি আছে৷ দামও বেশি ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজি৷ চলে যায় বাবু! এভাবেই গুড়ের ব্যবসা চলে৷ বছরের পর বছর৷ ঘরের বউটি তখন বেশ লাল করে ঝাল দেওয়া তেলাপিয়ার ঝোলে খুন্তি নাড়ছে৷ বেশ গন্ধ তার৷ মোটা রেশনের চাল ভিজানো রেডি৷ ভাত বসাতে হবে যে! কেন জানি গন্ধ শুঁকে খুব লোভ হচ্ছিল৷ যদিও জানি ঝাল দেওয়া ঝোল বা মোটা চালের ভাত সহ্য হবে না।

ছবি: লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • DURGADAS MIDYA

    ভালো। জীবন লুকিয়ে আছে গল্পে। আছে সংগ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *