‘বাংলার শিবাজি’ শোভা সিংহের রঘুনাথ মন্দির, রাধানগর (ঘাটাল থানা, মেদিনীপুর)

চিন্ময় দাশ

চেতুয়া-বরদার রাজা ছিলেন শোভা সিংহ। ইতিহাস তাঁকে ‘বাংলার শিবাজি’ নামে অভিহিত করেছে। তিনি চন্দ্রকোণা রাজার থেকে কয়েকটি গ্রাম পেয়েছিলেন বিবাহের যৌতুক হিসাবে। একটি গ্রামে বাজার পত্তন করেছিলেন শোভা। গ্রামের নাম হয়েছিল― রানির বাজার। নিজের পত্নী রাধা-র নামে অন্য একটি গ্রামের নামকরণ করেছিলেন― রাধানগর।

ঘাটাল থানার একবারে পশ্চিমের এলাকায় রাধানগর গ্রাম। সেকালে ১৪টি ‘পটি’ বা পাড়া ছিল রাধানগরে। তারই শালিকা পটিতে বাস ছিল একটি চৌধুরী বংশের। তাঁরা ছিলেন তালুকদার জমিদার। রাধানগরে একটি হাট-এর পত্তন করেছিল চৌধুরীরা। সন্ধ্যার সময় বসত হাটটি। সেই হাটের নাম ছিল― ‘লাটের হাট’।

আরও পড়ুন: পার্বতীনাথ শিব মন্দির, উত্তর গোবিন্দনগর (থানা- দাসপুর, মেদিনীপুর)

রাধানগরের অদূরেই বীরসিংহ গ্রাম। জমিদারবাড়ির জনৈক উমাচরণ চৌধুরীর কথা জানা যায়। বিধবা বিবাহ প্রচলনর সময়, দৃঢ়ভাবে বিদ্যাসাগরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ইং ১৮৬৬ সালের দুর্ভিক্ষের সময় অন্নসত্র খুলেছিলেন বিদ্যাসাগর। সেসময়ও তাঁকে সাহায্য করেছিলেন উমাচরণ। কেউ কেউ বলেন, এই চৌধুরি বংশই রাধানগর গ্রামে তাঁদের গৃহদেবতা গোপীনাথজিউর জন্য একটি মন্দির স্থাপন করেছিলেন।

তবে মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা নিয়ে একটি ভিন্ন মতও আছে। কেউ কেউ বলেন, জমিদার চৌধুরীর নয়, এক ধনবান তন্তুবায় মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। আজও মন্দিরের অদূরে একটি উঁচু পরিত্যক্ত ভিটে দেখা যায়। বিশ শতকের গোড়ার দিকে সেটি ছিল জনৈক গোবর্ধন দাসের ভদ্রাসন। গোবর্ধন জাতিতে ছিলেন তন্তুবায়। রেশম বুননের কাজ করে প্রচুর সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষেরা। বলা হয়, গোবর্ধনের কোনও পূর্বপুরুষই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গোবর্ধন তাঁর জীবদ্দশায় প্রতি বৎসর জন্মাষ্টমী তিথিতে, উন্নত মসলিনের ছোট কাপড় বুনে, গোপীনাথজিউকে নিবেদন করতেন। এ থেকে বিশ্বাস করা যায় যে, মন্দিরটি তন্তুবায়দের ছিল।

আরও পড়ুন: রামজি মন্দির, রামবাগ (থানা- মহিষাদল, মেদিনীপুর)

যাইহোক, এই দু’টি অভিমতই লোকশ্রুতি। সঠিকভাবে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় জানা যায় না। তবে প্রতিষ্ঠার সময়কালটি সম্যকভাবে জানা যায়। সামনের দেওয়ালে একটি প্রতিষ্ঠালিপি আছে মন্দিরে। তা থেকে, দেবতার নাম গোপীনাথ এবং প্রতিষ্ঠার কাল ১৬৪০ শকাব্দ― এটি জানা যায়। অর্থাৎ ইং ১৭১৮ সালে গোপীনাথের মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু, প্রতিষ্ঠালিপিতে ‘গোপীনাথ’-এর নাম উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও পুরাবিদ ডেভিড ম্যাকাচ্চন সাহেব এটিকে ‘রঘুনাথ’ মন্দির কেন বলেছেন, বোঝা যায় না।

আঠারো শতকের গোড়ায় স্থাপিত হয়েছিল এই মন্দির। জমিদার কিংবা সম্পন্ন তন্তুবায়― যার হাতেই মন্দির নির্মিত হোক না, প্রতিষ্ঠাতার সম্পদের উৎস ছিল রেশমশিল্প। সেসময় চন্দ্রকোণা সহ ঘাটালের পশ্চিমের ছত্রগঞ্জ, কালিকাপুর, রাধানগর ইত্যাদি এলাকা রেশম বস্ত্রের বয়নে অত্যন্ত উন্নত ছিল। বিশেষত, রাধানগরের খ্যাতি এতটাই ছিল, দিল্লির মুঘল হারেমের জন্য প্রতিদিন ৫০০টি হিসাবে শৌখিন রেশমি রুমাল রপ্তানি হোত এখান থেকে।

আরও পড়ুন: শ্যামসুন্দর মন্দির, বালিপোতা (মেদিনীপুর কোতওয়ালি থানা)

রেশমশিল্পের সুবাদে এই এলাকায় বহু জমিদার পরিবারের উদ্ভব হয়েছিল সেসময়। বহু শিল্পী-কারিগর পরিবারও ধনবান হয়ে উঠেছিল। আর এই শিল্পের টানে আর্মেনীয়, ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজ বণিকরাও এসে ব্যবসায় শামিল হয়েছিল এখানে। সপ্তদশ শতকের গোড়ায় এই শিল্পের বিকাশ। শ’-আড়াই বছর পরে, ইউরোপ থেকে কলের কাপড় আমদানি শুরু হলে, উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি এই শিল্পের পতন ঘটে। এখনও ঘাটাল মহকুমার এখানে ওখানে পরিত্যক্ত রেশমকুঠিগুলি দেখা মেলে।

শিল্প-বাণিজ্য ছেড়ে, মন্দিরের কথায় ফেরা যাক। মন্দিরটি পাথরে নির্মিত। ঘাটাল থানায় পাথরে তৈরি একমাত্র মন্দির এটি। দক্ষিণমুখী, বর্গাকার, পঞ্চ-রত্ন রীতিতে নির্মিত। গর্ভগৃহকে বেষ্টন করে চারদিকেই অলিন্দ। উত্তরের অলিন্দটি আবৃত। অন্য তিনটিতে তিনটি করে খিলান-রীতির দ্বারপথ। স্তম্ভগুলি দরুণ শ্রেণির। দ্বিতলে উঠবার সিঁড়ি আছে।

আরও পড়ুন: মেদিনীপুরের গড় হরিপুরে শতায়ু পূর্ণ করা রামচন্দ্র মন্দির

পাঁচটি রত্নই কলিঙ্গশৈলীর ‘শিখর রীতি’র। প্রতিটিতেই বাঢ় এবং গণ্ডি অংশ জুডে় রথবিন্যাস করা। আর গণ্ডি অংশে পীঢ়-রীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। চারটি অলিন্দের সিলিং টানা-খিলান করে নির্মিত। প্রথম ও দ্বিতীয় দুই তলেরই গর্ভর্গৃহের সিলিং হয়েছে গম্বুজ রীতিতে। কয়েকটি ছোট কক্ষ আছে নিচের তলায় ভিতরে। সেগুলির এবং পাঁচটি রত্নের সিলিং হয়েছে ভল্ট রীতিতে।

পাথর খোদাই করে, তার উপর পঙ্খের প্রলেপ দিয়ে কত রমণীয় শিল্প করা যায়, তার কিছু নমুনা এখানে পাওয়া যাবে। সব শিল্পকাজই বা-রিলিফ রীতির। সামনের দেওয়ালে শ্রীকৃষ্ণকে বেষ্টন করা গোপিনীদের নিয়ে টানা গোপীমণ্ডল। গৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দের সংকীর্তন, অন্যান্য কীর্তনীয়া, টিয়াপাখি এবং ময়ূরের কাজগুলি চেয়ে দেখবার মতো। তবে বহুকাল দেবতা নেই মন্দিরে। পরিত্যক্ত সম্পূর্ণ মন্দিরটি জরাজীর্ণ। বড় বড় ফাটলে চৌচির। আয়ুষ্কাল বেশি নাই অনুপম সৌধটির।

আরও পড়ুন: একদা রাজার হাতে গড়ে ওঠা মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণার রঘুনাথ মন্দিরের চেহারা আজ বড়ই করুণ

পথ-নির্দেশ
পূর্বে কলকাতা কিংবা পশ্চিমে খড়গপুরের দিক থেকে ট্রেনে পাঁশকুড়া স্টেশন, কিংবা এন. এইচ. ৬ মুম্বই রোড ধরে মেচগ্রাম থেকে উত্তরমুখে ঘাটাল। ঘাটাল থেকে ১০ কিমি পশ্চিমে রাধানগর। আবার, মেদিনীপুর বা চন্দ্রকোণা রোড স্টেশন থেকে ঘাটালগামী পথের উপর রাধানগর। সবই প্রশস্ত রাজপথ।

ছবি লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *