‘বাংলার শিবাজি’ শোভা সিংহের শীতলা মন্দির, রানির বাজার (ঘাটাল থানা, মেদিনীপুর জেলা)

চিন্ময় দাশ

রানির বাজার— একটি গ্রামের নাম। কিন্তু নামটাই কেমন মন উদাস করা। নামটার ভিতর যেন হাজারো প্রশ্নও ভরা আছে। কোন রানি? কার রানি? রাজাই বা কোথাকার, কবেকার!

মেদিনীপুর জেলার একেবারে পূর্বপ্রান্তে রূপনারায়ণের জলরেখা। তারই পশ্চিমে চেতুয়া-বরদা দুই পরগনার রাজা ছিলেন শোভা সিংহ। এই শোভা সিংহ নিজের পত্নীর নামে একটি বাজার বসিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে একটি জনপদ গড়ে উঠেছিল বাজারটিকে ঘিরে। পরে, সেই গ্রামের নাম হয়েছিল— রানির বাজার।

শোভার প্রসঙ্গে একটু ইতিহাসে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যেতে পারে। পশ্চিমের রাজপুতানা ছেড়ে, বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে পুবের বাংলায় চলে এসেছিলেন জনৈক রঘুনাথ সিংহ। সরকার মান্দারণ-এর চেতুয়া এলাকায় কাজ শুরু করেন তিনি। রঘুনাথের পুত্র কানাই সিংহ পুরো চেতুয়া পরগনা কিনে নিয়ে একটি জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজধানীর নাম হয় রাজনগর। কানাইয়ের পুত্র ছিলেন শোভা সিংহ।

শোভা ছিলেন অমিতবিক্রম, দুঃসাহসী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সুদক্ষ সেনাবাহিনী নিয়ে, পার্শ্ববর্তী বরদা পরগনার জমিদার কীর্তি সিংহকে হটিয়ে বরদা অধিকার করে নেন। রাজনগর থেকে তুলে, বরদায় এসে, নতুন রাজধানী স্থাপন করেন শোভা। তিন পরিখার বেষ্টনী দিয়ে গড়া রাজধানী। রাজধানী সেজেছিল বিশাল প্রাসাদ, সেনানিবাস, কাছারিবাড়ি, হাতিশাল, ঘোড়াশাল, বড় বড় দিঘি, কুলদেবী বিশালাক্ষীর মন্দির ইত্যাদি নিয়ে।

দিল্লির মসনদে তখন সম্রাট আওরঙ্গজেব। জিজিয়া কর প্রবর্তন, রাজা-জমিদারদের ‘নজর-পেশকাস’ পাঠানো বন্ধ ইত্যাদি কারণে বাংলা জুড়ে অসন্তোষ, বারো ভুঁইয়াদের বিদ্রোহ— এই আবহে শোভার উত্থান। দক্ষিণবঙ্গে তখন সম্রাটের জায়গীরদার বর্ধমানের রাজা। সহোদর ভাই হম্মত সিংহ, চন্দ্রকোনার অধিপতি রঘুনাথ সিংহ এবং এক পাঠান সেনাপতির যৌথ বাহিনী নিয়ে শোভা বর্ধমান আক্রমণ করলে রাজা কৃষ্ণরাম নিহত হন। বর্ধমানের সঙ্গে মান্দারণও অধিকার করে নেন শোভা সিংহ। নিজেকে ‘রাজা’ ঘোষণা করেন।

বলা হয়, বর্ধমান অধিকারের দিনই শোভাও মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু শোভার বাহিনীর অগ্রগতি রুদ্ধ হয়নি। হুগলি, সপ্তগ্রাম সহ গঙ্গার পশ্চিমে বিশাল এলাকা মুঘল শাসন মুক্ত করেছিল বাহিনী। ইতিহাস ‘বাংলার শিবাজি’ আখ্যা  দিয়েছিল শোভা সিংহকে।

তবে কেবল যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন না শোভা। পানীয়জলের জন্য পুষ্করিণী খনন, সেচ, নিকাশি ও পরিবহণের জন্য নদী-খালের সংস্কার, পথ-ঘাট নির্মাণ ইত্যাদি বহু কাজ করেছিলেন তিনি। শোভার গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল গ্রামীণ হস্তশিল্পের উন্নয়ন।

হস্তশিল্পের পণ্য বিপণনের জন্য কয়েকটি হাট-বাজারের পত্তন করেছিলেন শোভা। তেমনই বড় আকারের একটি বাজার বসিয়েছিলেন রাজধানী বরদার কাছে। নাম করেছিলেন— রানির বাজার। কাঁসার বাসন, সুতি ও পাট বস্ত্র, বিশেষ করে রেশমসামগ্রীর বিপুল বেচা-কেনা হত বাজারে। দ্রুত লোকবসতি গড়ে উঠেছিল বাজারকে কেন্দ্র করে। অনেকগুলি ধনী পরিবারও বসত গড়েছিল সেখানে। বিশেষ উল্লেখ্য হল, দেবালয় গড়েছিল তারা প্রায় সকলেই। ধনী পরিবারগুলির মধ্যে একটি ছিল চৌধুরি পরিবার। বসতবাড়ির পাশেই, শীতলা দেবীর জন্য একটি মন্দির গড়েছিলেন তাঁরা।

রানির বাজার যখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একবারে শিখরে, একবার ভয়াবহ ডাকাতি হয় চৌধুরিদের বাড়িতে। সেই আঘাতে, রানির বাজার ছেড়ে, চিরকালের মতো ভদ্রাসন তুলে নিয়ে চলে যান চৌধুরিরা। গ্রামবাসীরা মন্দির থেকে দেবীর বিগ্রহ নিয়ে গিয়ে অন্যত্র সেবাপূজার প্রচলন করেছিলেন। মন্দিরটি পরিত্যক্ত হয়ে যায় তখন থেকে।

চৌধুরিরা মন্দিরটি গড়েছিলেন পঞ্চ-রত্ন রীতিতে। কিন্তু দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত, দেবতার বিগ্রহও নেই, এমন মন্দিরের কতটুকুই বা আদর থাকে মানুষের কাছে! মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, অনাদরে অবহেলায় আয়ুক্ষয় হয়েছে মন্দির সৌধটির। জীর্ণ হতে হতে এখন টিকে আছে কঙ্কালটুকু মাত্র। গর্ভগৃহের দেওয়ালটুকুই দাঁড়িয়ে আছে কোনও রকমে। অন্য দেওয়ালগুলি, তাদের পঙ্খের পলেস্তারা নাই। নাই পাঁচটি রত্নের একটিও। তাদের রথপগ-বিন্যাস বা গণ্ডি অংশের পীঢ়-ভাগ অবশিষ্ট নাই। সামনের তিন-খিলানের দ্বারপথ, কারুকাজ করা ইমারতি থাম, দরুণ-রীতির খিলান নাই। টেরাকোটার ফলক, ভিনিশীয় রীতির দরজায় দ্বারবর্তিনী মূর্তি, পঙ্খের নকশা— কিছু নাই আজ, কিছুই। সবই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। থাকবার মধ্যে আছে কেবল হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস। আর কিছু না।

সাক্ষাৎকার: সর্বশ্রী শান্তিরঞ্জন মণ্ডল, অসিত পাত্র, দেবদাস ভট্টাচার্য— রানির বাজার।

পথ-নির্দেশ: মেদিনীপুর শহর কিংবা চন্দ্রকোনা রোড স্টেশন থেকে ঘাটালগামী পথের উপর রানির বাজার। হাওড়ার দিক থেকে এলে পাঁশকুড়া এসে, ঘাটাল হয়ে রানির বাজার পৌঁছনো যাবে।

ছবি: লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *