শূর্পণখা: রাক্ষসী নয়, নারী

স্বর্ণালী দত্ত

শূর্পণখাকে আমরা সবাই চিনি। ছোট থেকে বড় সকলেই সেই রাক্ষসীকে চেনে, যে কিনা রাবণের বোন। রামায়ণের এই বিশেষ চরিত্রটি রাম-রাবণের যুদ্ধের মূল কারণ। বাল্মীকি রামায়ণ হোক বা ছোটদের রামায়ণ, শূর্পণখা একজন ভয়ানক রাক্ষসী। বড় নাক, বড় বড় দাঁত, বড় বড় নখ, বীভৎসময়ী শূর্পণখা লক্ষ্মণকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু, লক্ষ্মণ তো রাজি নয়! অগত্যা শূর্পণখা সাধাসাধি করতে আরম্ভ করে। তাতেও কোনও ফল হয় না। লক্ষ্মণকে ভয় দেখিয়ে এইবার রাজি করানোর চেষ্টা করে সে। কিন্তু, বৃথা সে চেষ্টা! উপরন্তু, লক্ষ্মণ দিল তার নাকটা কেটে! সে কি ভয়ানক অবস্থা শূর্পণখার! ছোটরা এই গল্প শোনা মাত্র হো-হো করে হেসে উঠল। বড়রাও ছোটদের দেখাল একজন রাক্ষসীকে কীভাবে একজন রাজপুত্র জব্দ করল। একটা বেশ মজার ব্যাপার ঘটে গেল। কিন্তু সত্যিই কি মজার ছিল ব্যাপারটা? একটু অন্যভাবে দেখা যাক।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ এবং চার বাঙালি যুগপুরুষ

আচ্ছা, যদি শূর্পণখাকে একটি বারের জন্য রাক্ষসী না ভেবে একজন নারী হিসেবে ভাবি? ভাবা যায়? মাইকেল মধুসূদন তো ভাবতে পেরেছিলেন। তিনি তাঁর ‘বীরাঙ্গনাকাব্য’-তে ‘লক্ষ্মণের প্রতি সূর্পণখা’ পত্রে শূর্পণখাকে নারীরূপেই কল্পনা করেছিলেন। তার মানসলোকে প্রবেশ করে উন্মোচন করেছিলেন একটি নারী-মনকে। আর একটা বিষয় লক্ষণীয়, তিনি শূর্পণখার নামের বানান করেছেন ‘সূর্পণখা’। পত্রটির সূচনা অংশেই তাঁর ঘোষণা, “কবিগুরু বাল্মীকি রাজেন্দ্র রাবণের পরিবারবর্গকে প্রায়ই বীভৎস রস দিয়া বর্ণন করিয়া গিয়াছেন; কিন্তু এ স্থলে সে রসের লেশ মাত্রও নাই। অতএব পাঠকবর্গ সেই বাল্মীকিবর্ণিতা বিকটা সূর্পণখাকে স্মরণপথ হইতে দূরীকৃতা করিবেন”। এই পত্রে তিনি দেখিয়েছেন লক্ষ্মণের প্রেমে পড়ে শূর্পণখা বিরহ-বেদনা সহ্য করে চলেছে। সে নিজেই পত্রের মাধ্যমে নিজের ভালোবাসা ব্যক্ত করতে চায়। লক্ষ্মণকে বোঝাতে চায় তার প্রেমের গভীরতা। শূর্পণখা জানিয়েছে, লক্ষ্মণের তপস্বীরূপ দেখে সে চিন্তিত হয়েছে যে কোনও রাজপুত্র কী কারণে এই সন্ন্যাসবেশ নিতে পারে। তার ‘বিভূতি-ভূষিত’ অঙ্গ এবং ভূতলে শয্যা দেখে শূর্পণখার হৃদয় কষ্টে ভরে উঠেছে, ফলে সেও নিজের স্বর্ণশয্যা ত্যাগ করেছে, আহার করেছে ফলমূলাদি। শূর্পণখা স্বাধীনচেতা নারী। সে নিজেই পারে নিজের সমস্যার সমাধান করতে। এমনকী তার কাছে আছে লক্ষ্মণের সমস্ত সমস্যার সমাধান। সেকারণেই লক্ষ্মণের থেকে সে সাজতে চায়—

“কোন্‌ দুঃখে ভব-সুখে বিমুখ হইলা

এ নব যৌবনে তুমি? কোন্‌ অভিমানে

রাজবেশ ত্যাজিলা হে উদাসীর বেশে?

…   …  … 

     তোমার মনের কথা কহ আসি মোরে।—

যদি পারভূত তুমি রিপুর বিক্রমে,

কহ শীঘ্র; দিব সেনা ভব-বিজয়িনী,

রথ, গজ, অশ্ব, রথী— অতুল জগতে!

বৈজয়ন্ত-ধামে নিত্য শচীকান্ত বলী

ত্রস্ত অস্ত্র-ভয় যার, হেন ভীম রথী

যুঝিবে তোমার হেতু— আমি আদেশিলে!”

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: ইন্দোর

এইখানেই শূর্পণখার তেজস্বিতা। সে প্রেমিকের দুঃখ-মোচনের সহায়ক হতে চেয়েছে। প্রয়োজনে কুলদেবতা চামুণ্ডাকে লক্ষ্মণের শত্রুর বিপরীতে যুদ্ধক্ষেত্রে আহ্বান করতে পারে সে। লক্ষ্মণের প্রয়োজন হলে সমুদ্র শুষে বিবিধ রত্ন তুলে আনতে পারে, দাদা রাবণকে বলে নতুন রাজ্য তৈরি করে দিতে পারে, তার সেবায় সমস্ত রাক্ষসকুলকে সে নিয়োগ করতে পারে— এমনই প্রেমের জোর তার। লক্ষ্মণ যাতে ভালো থাকে, তার সবরকম প্রচেষ্টা করতে চায় শূর্পণখা। লক্ষ্মণের এই সন্ন্যাসরূপ সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। সেই জন্য কান্তের প্রতি নিজেকে সমর্পণ করতে চেয়ে শূর্পণখাও ত্যাগ করেছে রাজবেশ, অলংকার, রাজভোগ। এর পরিবর্তে সে পরিধান করছে ছাল-বাকল, ভস্ম, ফুলের অলংকার। সে শুধুই প্রেম মন্ত্রে নিজেকে দীক্ষিত করতে চায়। দাসী হয়ে নিজেকে লক্ষ্মণের সেবায় নিযুক্ত করতে চায়। নিজ মনের নানান অবস্থার কথা বলে সে লক্ষ্মণকে জানাতে চায়, তার অলক্ষে একটি নারী দিনরাত তার কথা চিন্তা করে, তার স্বপ্ন দেখে অতিবাহিত করছে। যদিও শূর্পণখা নিজের মনের ভার লক্ষ্মণের ওপর জোর করে দিতে অনিচ্ছুক। সে চায় লক্ষ্মণের পূর্ণ সম্মতিতে তারা একত্রে বসে স্বপ্ন দেখবে আগামী দিনের। সে প্রতীক্ষা করেছে লক্ষ্মণের উত্তরের, লক্ষ্মণের আগমনের।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কংক্রিট নদীবাঁধ নাকি প্রাকৃতিক বাঁধ, জোর চর্চা

মধুসূদন তাঁর কল্পনায় শূর্পণখাকে করে তুলেছিলেন রক্ত-মাংসের একজন নারী। বিশেষ করে উনবিংশ শতকের একজন নারী। তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজেকে হারিয়ে যেতে দেওয়া নারী নয়। মধুসূদন যে স্বাধীন নারীর কামনা করতেন, স্বপ্ন দেখতেন, অনেকটা সেইমতো এঁকেছিলেন শূর্পণখাকে। এই শূর্পণখা একদিকে কাঙ্ক্ষিতের কাছে প্রেম নিবেদনে নির্ভীক ও সক্ষম, অন্যদিকে প্রেমিকের ভালো থাকার জন্য স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল এক করে দেওয়ার ক্ষমতাধারী। সাধারণ মানুষের মনে আঁকা শূর্পণখার ছবিটি সম্পূর্ণ বদলে দিলেন মধুসূদন। মানবী শূর্পণখার প্রেম আর্তিতে আমাদের মনও ব্যাকুল হয়ে ওঠে তাঁর জন্য। কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত শূর্পণখার যে ছবিটি আমাদের দেখালেন সে শুধু নারী নয়, অপমানিত, অত্যাচারিত একজন অসহায় নারী। অনার্যদের ওপর আর্যদের অত্যাচাদের সাক্ষী এই ঘটনা। শুধুমাত্র প্রেম নিবেদন করার কারণে এইরকম আঘাত অকল্পনীয়। সীতার বর্ণনায় উঠে আসে সেই অত্যাচার দৃশ্য: “ওই কালো কৃপাণের আকস্মিক আঘাতে একটি রক্তাপ্লুত নারী নাক চেপে ধরে বসে পড়ে। তার চোখে নিঃসীম আতঙ্ক… যাকে সে প্রেম নিবেদন করেছিল সেই শ্বেত যুবকের চোখ ক্রোধে অগ্নিবর্ণ, এই অনার্যার প্রেম যেন এক অপমান প্রস্তাব… (রামচন্দ্র) এতক্ষণ নির্লিপ্ত বসে মৃদুহাস্য সহ শূর্পণখাকে নির্যাতনের দৃশ্য উপভোগ করছিলেন” (সীতায়ন, ১৯৯৪)। মধুসূদনের রচনার একশো বছরেরও বেশি সময় পর মল্লিকা আঁকলেন শূর্পণখার ছবি। কিন্তু এ ছবি মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। দুই কবিরই উদ্দেশ্য এক— নারীচেতনার জাগরণ। তবে ভিন্ন মাত্রা থেকে আমরা শূর্পণখাকে পেলাম। এই পাওয়া কোথায় যেন এক হয়ে যায়, যখন ঘটনা দু’টিকে পরস্পর সাজাই। প্রেমপত্রের পরেই কি এই প্রেমাঘাত? শুধু আঘাত তো বলা যায় না, এ তো নৃশংসতায় ভরা। কেউ কি সত্যিই কখনও ভেবেছি এই রক্তপাতের পর, অপমানের পর শূর্পণখার মনের অবস্থা কী হয়েছিল? প্রেমের প্রতি তার বিশ্বাস, আস্থা কি একটুও বেঁচে ছিল? যে আঘাত তার শরীরে লেগেছিল, তার দাগ পড়েছিল শূর্পণখার মনে। ভিতরে ভিতরে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল সে। আত্মবিশ্বাসটুকুও হারাতে বসেছিল। নারী শূর্পণখা সেদিন আঁচল দিয়ে ঢেকেছিল তার মুখ। যুগ যুগ ধরে মেয়েরা এইভাবেই মুখ ঢাকে।  

স্বর্ণালী দত্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনার শিরাকোল কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। গবেষণা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

    নারীকে জব্দ করার একটি অন্যতম উপায় তাকে কুৎসিত করে দেওয়া। লক্ষ্মণ ঠিক সেটাই করেছিলেন। কারণ এখনও পর্যন্ত সমাজে মেয়েদের গুণের নয়, রূপেরই কদর করা হয়। ঠিক সেই কারণেই এখনো মেয়েদের ওপর অ্যাসিড হামলা হয়।

    • স্বর্ণালী দত্ত

      একদমই তাই। নারীকে জব্দ করার জন্য পুরুষ সবসময় প্রস্তুত। অ্যাসিড অ্যাটাক এর কথা আমারও মনে হয়েছিল পড়তে গিয়ে। এটাও ভেবেছি, কিভাবে আমাদের পুরাণ, মহাকাব্যগুলো এই নৃশংসতার পথ দেখায় নৃশংসদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *