Latest News

Popular Posts

নিউজিল্যান্ডের কিছু সাহিত্য সাময়িকী ও লিটল ম্যাগাজিন

নিউজিল্যান্ডের কিছু সাহিত্য সাময়িকী ও লিটল ম্যাগাজিন

সুশোভন রায়চৌধুরী

নিউজিল্যান্ডের সাহিত্য বলতে লিখিত ও মৌখিক দু’টো ফর্মকেই বোঝায়। যার বিষয় হয়ে ওঠে নিউজিল্যান্ড-কেন্দ্রিক। আরও নির্দিষ্ট করে বললে নিউজিল্যান্ডের মানুষ, প্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে। নিউজিল্যান্ডের সাহিত্য লেখা হয় ইংরেজি অথবা এখানকার আদিবাসী মাওরি সম্প্রদায়ের ভাষা মাওরিতে। গ্রিসের উপকূলে অবস্থিত পলিনেশিয়ানরা সেই তেরো-চোদ্দ শতক থেকেই নিউজিল্যান্ডে আসা-যাওয়া শুরু করেছে এবং এঁরাই হলেন নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী সম্প্রদায় ‘মাওরি’। ইউরোপীয়রা নিউজিল্যান্ডে আসা শুরু করে উনিশ শতকে। যার আগে পর্যন্ত এই দেশের একমাত্র ভাষা হিসেবে প্রচলিত ছিল ‘মাওরি’ই। ‘নিউজিল্যান্ড সাহিত্যের’ শুরু বিশ শতকে, যখন এক ইউরোপীয় উপনিবেশ হিসেবে পাকেহা-রা এই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি নিয়ে লিখতে শুরু করেন ইংরেজিতে। মাওরিরা ইউরোপীয় বংশদ্ভূতদের ‘পাকেহা’ সম্বোধন করে থাকেন, যে শব্দের প্রয়োগ আঠারো শতকের মাওরি সাহিত্যে পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়ার সমসাময়িক সাহিত্যপত্র

নিউজিল্যান্ডে ছাপাখানার শুরু ১৮৩৪ সালে যখন পাদ্রি উইলিয়াম ইয়েট, মাওরি ভাষায় প্রচারিত খ্রিস্ট ধর্মীয় নির্দেশাবলি ‘কো তে কাতিকিহামা’ ইংরেজিতে অনুবাদ করে ছাপান। সেই সময়ে যে সমস্ত বই নিউজিল্যান্ডে ছাপা হত তার বেশিরভাগই ছিল হয় ‘পাকেহা’দের লেখা ভ্রমণ কাহিনি কিংবা বিজ্ঞান অথবা ইতিহাস নিয়ে। বইপত্র অথবা সংবাদ সাময়িকীর প্রকাশ ১৮৩০-এর দশকে শুরু হয়ে গেলেও সাহিত্য সাময়িকী বা পত্রিকা বলতে আমরা যা বুঝি, তার আত্মপ্রকাশ হতে লেগেছে প্রায় পাঁচ দশক সময়। একেবারে প্রথম দিককার সাময়িকপত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নাম হতে পারে চার্লস নালডার বেয়ার্টেজ সম্পাদিত, ১৮৮৩-১৯২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত ‘ট্রায়াড’, জানুয়ারি, ১৮৯৮-তে প্রকাশিত ‘হোম সার্কেল’, ‘নিউজিল্যান্ড ইলাসট্রেটেড ম্যাগাজিন’ (চার্লস অ্যালান মরিস প্রতিষ্ঠিত, ১৯২৮-১৯৪৬ পর্যন্ত প্রকাশিত), ১৯৩২ সালে অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ক্ষণস্থায়ী পত্রিকা ‘ফিনিক্স’, ১৯৩৪-এ কেন্নাওয়ে হেন্ডারসন সম্পাদিত ও প্রতিষ্ঠিত পাক্ষিক ‘টুমরো’, যা সেই সময়ে  নিউজিল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী সাহিত্য ও সাহিত্য সমালোচনার ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। এছাড়াও রয়েছে ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত প্রকাশিত হেলেন ল্যাঙ্গফোর্ড সম্পাদিত কবিতা পত্রিকা ‘নিউজিল্যান্ড মারকুরি’, ১৯৩৩-এ ক্যান্টারবেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে প্রকাশিত দু’টি পত্রিকা— ‘অরিফ্লেম’ ও ‘সিরোকো’। আবার ১৯৪৭ সালে ক্যাক্সটন প্রেস থেকে প্রকাশ পেতে শুরু করে চার্লস ব্র‍্যাস সম্পাদিত ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘ল্যান্ডফল’। পত্রিকাটি এখনও প্রকাশিত হচ্ছে ষাণ্মাসিক হিসেবে। এই ‘ল্যান্ডফল’ গোষ্ঠী থেকেই ১৯৭২-এ বেরিয়ে এসে লেখক রবিন ডাডিং প্রতিষ্ঠা করেন পত্রিকা ‘আইল্যান্ড’-এর। নিউজিল্যান্ডের আরও কিছু সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে বলা যেতে পারে ১৯৮৮-তে ফার্গুসন বারোম্যান প্রতিষ্ঠিত ‘স্পোর্ট’, ক্রাইস্টচার্চ থেকে ১৯৮৯-তে প্রকাশিত গল্প, কবিতা ও শিল্প বিষয়ক পত্রিকা ‘তাহাকে’ কিংবা ১৯৯৩-তে প্রকাশিত ‘পোয়েট্রি নিউজিল্যান্ড’-এর নাম। নিউজিল্যান্ড সরকারও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেছেন কিছু সাময়িকী, যার মধ্যে ১৯২৬-এ প্রকাশিত ‘নিউজিল্যান্ড রেলওয়ে ম্যাগাজিন’ অথবা বেতার ও দূরদর্শন সম্পর্কিত ১৯৩৯-এ প্রকাশিত ‘নিউজিল্যান্ড লিসেনার’-কে উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে সরকারি প্রকাশনাগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘তে আও হোউ’ যেটি ১৯৫২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত মাওরি উন্নয়ন দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিল।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৫)

প্রথমেই এমন একটা পত্রিকা সম্পর্কে আমরা জানব, যার অস্তিত্বের কথা নিউজিল্যান্ডের সাময়িকপত্র গবেষকেরা জানতে পেরেছেন ২০১৭ সালে এসে। পত্রিকাটি ওয়ামারু জেলা থেকে ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত ‘হোম সার্কেল: অ্যান ইনস্ট্রাক্টিভ অ্যান্ড এন্টারটেইনিং ম্যাগাজিন ফর দ্য ফ্যামিলি অ্যান্ড ফায়ারসাইড’। ১ জানুয়ারি, ১৮৯৮-তে পাক্ষিক হিসেবে প্রকাশিত এই পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল পারিবারিক জীবনকে আরও উন্নত করে তোলা। ছাপা হয়েছে সামাজিক প্রশ্নোত্তর বিষয়ক বিভাগ, মেয়েদের বিভাগ ও শিশু বিভাগ। এছাড়া চোখে পড়বে ছোটগল্প, আঞ্চলিক খবর ও পাঠকের আগ্রহের বিষয় নিয়ে সম্পাদকীয় টিপ্পনী। প্রথম তিন মাস এই পত্রিকা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছিল এই আশায় যে, প্রকৃত আগ্রহী পাঠকেরা নিজে থেকেই গ্রাহক হবেন। কত সংখ্যক পাঠক তাঁরা পেয়েছিলেন, জানা না গেলেও বর্ষ ২ সংখ্যা ৮ অর্থাৎ ২৭ এপ্রিল ১৮৯৯ পর্যন্ত পত্রিকার প্রকাশ প্রকারন্তরে বুঝিয়ে দেয় যে, তাঁদের পাঠক সংখ্যা সম্ভবত আশানুরূপ হয়নি। ‘হোম সার্কেল’-এর মেয়েদের বিভাগে দেখা যায় না না বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়, যেমন বাচ্চাদের খেলাধুলোর জন্য বাড়ির বাইরে কীভাবে পাঠাতে হবে কিংবা অগোছালো ঘরদোর পরিবারের মনে কীভাবে প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে ইত্যাদি বিষয়।  আবার কখনও উঠে এসেছে মেয়েদের কোন কোন বিষয় পুরুষদের পছন্দ! পত্রিকার শেষ পাতায় ছাপা হত ‘বিটস অফ হিউমার’ নামের বিভাগ। বিভাগের নাম থেকেই পরিষ্কার, যত রাজ্যের হাসির কথা ও টিকাটিপ্পনী চর্চাই ছিল এই বিভাগের একমাত্র কাজ। পত্রিকাটিতে দেখা যায় নিউজিল্যান্ডের আঞ্চলিক দোকানের বিজ্ঞাপনও।

আরও পড়ুন: বাঙালি মননে সংগীতশিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়: একটি আলোকপাত

ইউরোপের মতোই নিউজিল্যান্ডে মডার্নিজম এসেছে বিশ শতকের শুরুতেই। আর এই সময়ে নিউজিল্যান্ড সাহিত্যে আধুনিকতা আনবার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় দেখা যায় বামপন্থী মনোভাবাপন্ন, কেন্নাওয়ে হেনভারসন সম্পাদিত ‘টুমরো’ পত্রিকাটিকে। মাত্র ছ’বছর চললেও এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই ‘টুমরো’ ছেপেছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ গল্পকার ও কবিদের লেখা। যেমন কথাসাহিত্যিক ফ্রাঙ্ক সারগেসনের তিরিশটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার পাতায়। প্রকাশিত হয়েছে মেসন, রেক্স ফেয়ারবার্ন, অ্যালেন কর্নাও কিংবা ডেনিস গ্লোভারের মতো কবির বেশ কিছু কবিতা। সেই সময়ে পড়শি দেশ অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম খ্যাতনামা সাহিত্য সমালোচক নেচি পামার ধারাবাহিকভাবে ‘অ্যান অস্ট্রেলিয়ান নোটবুক’ নামের একটা গদ্য লিখেছিলেন ‘টুমরো’-তে। থাকত সম্পাদক হেন্ডারসন চিত্রিত কিছু কার্টুনও।

আরও পড়ুন: ধর্ম বিশ্বাস

তখন চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। নিউজিল্যান্ডের অন্যতম খ্যাতনামা কবি ও ক্যাক্সটন প্রেসের প্রকাশক ডেনিস গ্লোভার তাঁর নৌবাহিনীর চাকরি ছেড়ে সাময়িক ছুটি নিয়ে গেলেন লন্ডন, কবি চার্লস ব্র‍্যাসের সঙ্গে দেখা করতে। সেই সময়েই তাঁদের মধ্যে কথা হয় একটা নতুন সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে। যদিও প্রকাশক হিসেবে গ্লোভার তখন নিউজিল্যান্ডে ছেপে চলেছেন অ্যান্টন ভট সম্পাদিত ‘বুক’ পত্রিকা। যেকোনও কারণেই হোক ‘বুক’ ছিল আয়তনে ছোট, প্রকাশ পেত অনিয়মিতভাবে। এদিকে গ্লোভারের ইচ্ছে এমন একটা পত্রিকা প্রকাশের, যা তাক লাগিয়ে দেবে নিউজিল্যান্ডের মানুষকে, পাবে স্থায়িত্ব। ১৯৪৭-এ আত্মপ্রকাশ করল ‘ল্যান্ডফল’। জানা যায়, এই নামকরণ এসেছে গ্লোভারের বন্ধু ডগলাস লিলবার্নের সুরে ও কবি অ্যালেন কাবনাও এর লেখা কবিতা ‘ল্যান্ডফল ইন আননোন সিজ’ গান থেকে। কবিতাটি বহু চর্চিত ও পঠিত, নিউজিল্যান্ডে ইউরোপীয়দের আগমন প্রসঙ্গে লেখা। প্রথম দু’দশক সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব সামলান চার্লস ব্র‍্যাসই। পত্রিকার ডিজাইনার, টাইপোগ্রাফার ও প্রিন্টার হিসেবে ছাপা হত গ্লোভার ও লিও বেনসম্যানের নাম। ত্রৈমাসিক হিসেবে প্রকাশিত ‘ল্যান্ডফল’-এর প্রথম ৪৬ বছরে, মোট ১৭৪টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে, প্রতিটি সংখ্যা কম বেশি ৭৬ পৃষ্ঠার। খয়েরি মলাটে, বাইকালারে ছাপা, যদিও ১৯৭৯ থেকে প্রচ্ছদে ফোর কালার প্রিন্টের ব্যবহার দেখা যায়। মজার বিষয়, তৎকালীন বেতার সম্পর্কিত ও সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ‘নিউজিল্যান্ড লিসেনার’ পত্রিকায় অলিভার ডাফ লিখিত ‘ল্যান্ডফল’-এর একটি সমালোচনায় লেখা হয়েছিল— পত্রিকাটি ভালো হলেও এর আয়ু একবছরের বেশি হবে না! ‘ল্যান্ডফল’ কিন্তু এখনও এই ২০২১ সালে দাঁড়িয়ে ষাণ্মাসিক রূপে প্রকাশিত হয়ে চলেছে। পত্রিকায় ছোটগল্প, কবিতা, বই আলোচনার পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে চিত্রকলা, ফোটোগ্রাফি। থাকে পারফর্মিং আর্টস যেমন নাটক, সংগীত ও শিল্পের সমালোচনাও। চার্লস ব্রাসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে সেই সময়ে নিউজিল্যান্ডের প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখকের লেখা।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি: স্বাধীনতা পূর্ব

১৯৩৩ সালে সম্পাদক চার্লস ব্র‍্যাস ছেড়ে দেন ‘ল্যান্ডফল’-এর সম্পাদনা। সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্যাক্সটন প্রেস গোষ্ঠীর অপর এক লেখক রবিন ডাডিংয়ের ওপর। সম্পাদক হিসেবে রবিনের কৃতিত্ব বলতে গেলে বলতে হবে, পত্রিকার প্রতিটি লেখার সঙ্গে অলংকরণের সংযোজন অথবা পত্রিকার ১০০তম সংখ্যার সম্পাদনা। এই শততম সংখ্যাতে প্রকাশিত হয়েছিল প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক চার্লস ব্র্যাসের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। তবে ১৯৭২ সালে সঠিক সময়ের মধ্যে সংখ্যা প্রস্তুত করতে না পারবার কারণে রবিন ডাডিংকে ক্যাক্সটন প্রেস বরখাস্ত করে। আর ডাডিংও সময় নষ্ট না করে প্রকাশ করেন ‘আইল্যান্ড’ পত্রিকা, তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগেই। এই ‘আইল্যান্ড’ প্রকাশ পেতেই দেখা যায় ‘ল্যান্ডফল’-এর পুরনো সতীর্থেরা যেমন ব্র‍্যাস, কারনাও কিংবা স্টিড যোগ দিয়েছেন ডাডিংয়ের সঙ্গে। গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের চলে যাওয়ার কারণে, ‘ল্যান্ডফল’-এর স্ট্যান্ডার্ড ক্রমশ পড়তে থাকে। ১৯৪৭ থেকেই ডিজাইনার হিসেবে যুক্ত বেনসেম্যান ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সম্পাদনার দায়িত্বে এসে অলংকরণ ও চিত্রকলায় অপেক্ষাকৃত উন্নতি ঘটালেও সাহিত্য বিভাগ হয়ে পড়ে রীতিমতো দুর্বল। যে দুর্বলতা কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন ১৯৮০ সালে সম্পাদক পদে নিযুক্ত হওয়া ডেভিড ডাউলিং। ১৯৯২ থেকে ‘ল্যান্ডফল’ প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করে নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, যার অধীনে ১৭৫তম সংখ্যা থেকে সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন ক্রিস প্রাইস। ত্রৈমাসিক থেকে বর্তমানে এটি ষাণ্মাসিক হিসেবে প্রকাশিত।

আরও পড়ুন: হানাবাড়ির কথা

নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন শহর থেকে ১৯৮৮-তে ফারগাস ব্যারোম্যান, এলিজাবেথ নক্স, ডেমিয়েন উইলকিনসন ও নিজেল কক্সের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়, সাহিত্যপত্র ‘স্পোর্ট’। সম্পাদনা সহযোগী বিল ম্যানহায়ার, অ্যালান প্রেস্টন ও অ্যান্ড্রিউ মাসোনিন। সাহিত্য পত্রিকার নাম কেউ ‘স্পোর্ট’ রেখেছেন এরকম দৃষ্টান্ত বোধ হয় বেশি নেই! এই নামকরণের ফলে দেশ-বিদেশ থেকে মাঝেমধ্যেই খেলাধুলো সম্পর্কিত নানান লেখা এসে পৌঁছয় পত্রিকা দপ্তরে, যা নিয়ে সম্পাদক ব্যারোম্যানের বক্তব্য, এখন আর লেখা পাঠানোর আগে কী বিষয়ক পত্রিকা, পত্রিকাটা আদৌ ভালো কিনা সে বিষয়ে কাউকেই খুব বেশি খোঁজখবর নিতে দেখি না! অনেক সংখ্যাতেই দেখা গিয়েছে আমন্ত্রিত সম্পাদকের উপস্থিতি। এই পত্রিকাতে আত্মপ্রকাশ হয়েছে নিউজিল্যান্ডের বহু প্রতিষ্ঠিত লেখকের, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নাম এমিলি পার্কিন্স, ক্যাথারিন চিউগে, কেট ফ্ল্যানারি, অ্যানামারি জাগোস প্রমুখ। নভেম্বর ২০০৩ পর্যন্ত ষাণ্মাসিক হিসেবে প্রকাশিত হলেও বর্তমানে ‘স্পোর্ট’ বার্ষিকী হিসেবেই প্রকাশিত।

আরও পড়ুন: ‘হাড়িকাঠের কান্না’য় যখন চোখ মেলি

‘তে আও হোউ’-এর আত্মপ্রকাশ ১৯৫২-তে। ১৯২৬-এ প্রকাশিত ‘নিউজিল্যান্ড রেলওয়ে ম্যাগাজিন’ বা ১৯৩৯-এ প্রকাশিত ‘নিউজিল্যান্ড লিসেনার’ ব্যতীত এইটি হল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত দেশের অন্যতম সেরা সাহিত্যপত্র। ‘মাওরি অ্যাফেয়ারস ডেভেলপমেন্ট’ কর্তৃক প্রকাশিত এই পত্রিকাটি ছাপা হত পেগসাস প্রেস থেকে। নিউজিল্যান্ডের আদিবাদি ‘মাওরি’ জনজাতির জন্য প্রকাশিত ‘তে আও হোউ’-এর ইংরেজি তর্জমা করলে দাঁড়ায় ‘The New World’. যার আত্মপ্রকাশ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, “to provide interesting and informative reading for Maori homes… where all questions of interest to the Maori can be discussed”. প্রাথমিক পর্যায়ে এই পত্রিকাটি প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল সরকারের যাবতীয় প্রকল্পের প্রচার, যে-কারণে সরকারি পদাধিকারী ও পত্রিকা পরিচালন দপ্তরের মধ্যে তৈরি হয় এক অযাচিত টানাপোড়েন। তবে শেষমেশ পত্রিকার আত্মপ্রকাশ সংখ্যা থেকেই এটি মাওরি সাহিত্য-শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক হয়েই দাঁড়িয়েছে। ‘তে আও হোউ’-তে প্রকাশিত হয়েছে রাজনীতি, কৃষি, কাঠখোদাই ও ক্ষুদ্র শিল্প, স্মৃতিচারণা, মাওরি জনজাতির ইতিহাস, মাওরি ভাষার কবিতা ও ছোটদের জন্যে লেখা। পত্রিকাটি ছিল দ্বিভাষিক। ইংরেজি ও মাওরি দুই ভাষাতেই প্রায় সমান সংখ্যক লেখা প্রকাশ পেতে দেখা যায়। ১৯৫২ থেকে জুন ১৯৭৫ পর্যন্ত প্রকাশিত হলেও এই পত্রিকার কোনও সম্পাদকই মাওরি জনগোষ্ঠীর ছিলেন না। তবে তাঁরা প্রতিনিয়ত মাওরি লেখকদের উজ্জীবিত করে গিয়েছেন, প্রকাশ করেছেন তাঁদের অমূল্য সৃষ্টি।

আরও পড়ুন: রানাঘাটের শরীরচর্চার ইতিহাস

বেতার ও দূরদর্শন-কেন্দ্রিক পত্রিকা ‘নিউজিল্যান্ড লিসেনার’-এর আত্মপ্রকাশ জুন ১৯৩৯ সালে। রেডিয়ো ও টিভির অনুষ্ঠানের সাপ্তাহিক সূচি হিসেবে প্রকাশিত আত্মপ্রকাশ সংখ্যাটি সেই সময়ে দেশের ৩ লক্ষ ৮০ হাজার পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। প্রথম দশ বছর পত্রিকা সম্পাদক হিসেবে দেখা যায় অলিভার ডাভ-কে। যার পরবর্তীতে সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন এম এইচ হলোক্রফট। প্রথম দিকে শুধুমাত্র রেডিয়ো ও টিভি সম্প্রচারের সূচি প্রকাশিত হলেও কিছুদিনের মাথায় সাম্প্রতিক খবর, রাজনীতি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, শিল্প, খাদ্য, সংস্কৃতির মতো বিষয় প্রকাশ পেতে শুরু করে। ‘নিউজিল্যান্ড লিসেনার’-এর বেসরকারীকরণ হয় ১৯৯০-তে। কোভিডের প্রকোপে, বাণিজ্যে ভাটা পড়ার অজুহাতে প্রকাশনা সংস্থা বয়ার মিডিয়া গ্রুপ এপ্রিল ২০২০-তে বন্ধ করে দেয় পত্রিকাটির প্রকাশ।

আরও পড়ুন: পিকাসোর আলো, পিকাসোর অন্ধকার

১০

এ তো গেল নিউজিল্যান্ডের সাময়িকপত্রের কথা। ঔপনিবেশিক পরিবেশে ইউরোপের আভাঁ গার্দের প্রভাব যে কিউয়িদের জীবনে পড়বে, তা আর আশ্চর্যের কী! ফলে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী, এক্সপেরিমেন্টাল সাহিত্যের চর্চা নিউজিল্যান্ডেও হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে বহু লিটল ম্যাগাজিন। এই লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে শামিল কিছু গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার নাম বলতে গেলে বলা যেতে পারে, ‘পোয়েট্রি নিউজিল্যান্ড’, ‘কা মাতে কা ওরা’,  ‘নিউজিল্যান্ড রিভিউ অফ বুকস’ ‘তাকাহে’, ‘ব্রিফ’ ইত্যাদির কথা। ১৯৪৭-এ প্রকাশিত ‘ল্যান্ডফল’ তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে যেমন ঐতিহ্যবাহী, একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠান-বিরোধীও। ফলে ‘ল্যান্ডফল’-কে আমরা লিটল ম্যাগাজিনও বলতে পারি।

আরও পড়ুন: ৭৮ বছর পরেও আলোচনার বৃত্তে নেই রানি অফ ঝাঁসি ব্রিগেড

১১

লিটল ম্যাগাজিন ‘পোয়েট্রি নিউজিল্যান্ড’-এর আত্মপ্রকাশ ১৯৫১-তে লুই জনসনের সম্পাদনায়। ওয়েলিংটনের কবি লুই সম্পাদনার কাজে নিযুক্ত ছিলেন ১৯৫১ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত, তবে তাঁর সময়ে এই পত্রিকার নাম ছিল ‘নিউজিল্যান্ড পোয়েট্রি ইয়ারবুক’, অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে পুরনো কবিতা পত্রিকার আত্মপ্রকাশ বার্ষিকী রূপে। ১৯৭১, ফ্রানফক ম্যাকের সম্পাদনাকালে বার্ষিকী থেকে পত্রিকা হয়ে দাঁড়ায় ষাণ্মাসিক, যা বহাল থাকে ১৯৮৪ পর্যন্ত। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯০ পত্রিকাটির প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। ১৯৯০-তে ডেভিড ড্রামন্ড, নিউজিল্যান্ডের ব্রিক রো পাবলিশিংয়ের কর্ণধার ওজ ক্রাউসের সহযোগিতায় নবপর্যায়ে প্রকাশ করেন ‘পোয়েট্রি নিউজিল্যান্ড’ ষাণ্মাসিক রূপেই। ২০১৪ সালে পত্রিকাটি প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করে মাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ইংলিশ অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজের জ্যাক রস, যিনি পত্রিকার নাম পরিবর্তন করে ফিরে যান জন্মলগ্নে— ‘নিউজিল্যান্ড পোয়েট্রি ইয়ারবুক’ নামকরণের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে এটির সম্পাদনায় নিযুক্ত রয়েছেন ওয়াইকাতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেসি স্লটার।

১২

‘পোয়েট্রি নিউজিল্যান্ড’-এর প্রকাশকালে পাওয়া যাবে বর্তমানে দেশের বহু প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের। যাঁদের মধ্যে একিজাবেথ কাফিন, গ্র‍্যান্ট ডানকান, রেইমকে এন্সিং, বার্নাড গাড, লিওনার্ড ল্যাম্বার্ট, হ্যারি বিকেটস, এলিজাবেথ স্মিথার কিংবা ব্রায়ান টার্নার উল্লেখযোগ্য। পত্রিকার মুখ্য উদ্দেশ্যই হল নিউজিল্যান্ড ও সমগ্র বিশ্বের কবিদেরকে তুলে ধরা, যে কারণে ১৯৯৪ থেকে প্রকাশিত প্রায় প্রতিটি সংখ্যাতেই কোনও উদীয়মান কবিতা লিখিয়ের কবিতা চর্চার জন্য বিভাগ রাখা হয়েছে। কবিতা ছাড়াও কবিতা-বিষয়ক গদ্য, প্রবন্ধ, বই আলোচনা ও কবিতার সমালোচনা ছাপা হয়ে থাকে। বর্তমানে মুদ্রিত সংখ্যা প্রকাশের পাশাপাশি, ডিজিটাল দুনিয়ায় ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাঁদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। আর একটি কবিতা প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নাম উঠে আসে লিটল ম্যাগাজিন ‘কা মাতে কা ওরা’র। অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মারে এডমান্ড সম্পাদিত এই পত্রিকার আত্মপ্রকাশ ২০০৫ সালে।

১৩

লিটল ম্যাগাজিন ‘তাকাহে’র আত্মপ্রকাশ ১৯৮৯ সালে। প্রকাশিত হয় ছোটগল্প, কবিতা, চিত্রকলা, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও গ্রন্থ সমালোচনা। আত্মপ্রকাশ ত্রৈমাসিক হিসেবে হলেও কিছুদিন পর তা চতুর্মাসিক হয়ে দাঁড়ায়। তবে আগস্ট ২০১৬ থেকে বছরে এপ্রিল ও ডিসেম্বর সংখ্যা মুদ্রিত হলেও একটি সংখ্যা অর্থাৎ আগস্ট সংখ্যা প্রকাশিত হয় ওয়েবজিন আকারে।

আরও পড়ুন: বনলতা সেন: ক্লান্ত ও বিষণ্ণ প্রেমিকের শোকগাথা

১৪

বর্তমানে নিউজিল্যান্ডের লিটল ম্যাগাজিন পরিসরে, যে পত্রিকাটি দ্রুততার সঙ্গে উঠে এসেছে সেটি নিঃসন্দেহে ‘ব্রিফ’। পত্রিকার পাতায় দেখা যায় কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা, মাঝেমধ্যে চিত্রকলাও। প্রতিটি সংখ্যাই হয় নবীন ও প্রবীণের মিশেলে এক চমৎকার উপস্থাপন। পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রকাশিত হয়ে চলেছে ‘ব্রিফ’। ১৯৯৫ সালে অ্যালেন লুনির সম্পাদনায় যখন আত্মপ্রকাশ হয়, তখন পত্রিকার নাম ছিল ‘আ ব্রিফ ডেস্ক্রিপশন অফ দ্য হোল ওয়ার্ল্ড;। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ‘ব্রিফ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক লুনিই প্রথম ব্যবহার করেন সাহিত্যে ‘other tradition’ শব্দটি যেটিকে  অনেকে সমান্তরাল বা প্যারালাল সাহিত্য বলে থাকেন।

১৫

প্রথম দিকে এক অদ্ভূত পদ্ধতিতে পাঠকের কাছে পৌঁছত এই পত্রিকা। এ৪ সাইজের কাগজে, লেখকের লেখাটিকে হুবহু হাতে লিখে কপি করে, সঙ্গে প্রতি লেখকের জীবনীমূলক সম্পাদকীয় টীকা যুক্ত করে, প্রচ্ছদ এঁকে স্টেপ্ল করে তৈরি হত মাস্টার কপি। এই মাস্টার কপির ফোটো কপি বিক্রি অথবা বিলি করা হত পাঠকের কাছে। তবে বর্তমানে ‘ব্রিফ’ প্রকাশিত হয় এ৫ মাপের কাগজে ছেপে পারফেক্ট বাঁধাই, জীবনীমূলক সম্পাদকীয় টিকা ও প্রচ্ছদ সহকারে। তবে ব্যতিক্রম একটাই। লেখকের পাঠানো পাণ্ডুলিপিটাই স্ক্যান করে ছাপানো হয় এই পত্রিকায়, যার একমাত্র উদ্দেশ্য পাঠককে পত্রিকার ডিজাইন ও লে আউটের প্রতি আকৃষ্ট করা।

১৬

এখন যে-সমস্ত পত্রপত্রিকা নিউজিল্যান্ডে প্রকাশিত হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই সোশ্যাল মিডিয়া অথবা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ডিজিটাল স্পেসে তাঁদের উপস্থিতি জানান দেন। এর সুফল, যেমন দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারছেন একইসঙ্গে বাড়ছে আগ্রহী পাঠক সংখ্যাও। নিউজিল্যান্ডের সাহিত্য-শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন যে ক্রমশ বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে, তা নিশ্চয়ই আমাদের কাছে খুব সহজেই অনুমেয়।

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *