গামছার গান

চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়

গামছা এখন ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। গামছাশাড়ি, ব্লাউজ, টপ, শার্ট সবই খুব চলছে। বিছানার চাদর, বালিশ আর কুশনের ঢাকাতেও গামছার ব্যবহার। গৃহসজ্জা, মঞ্চসজ্জাতেও থাকছে গামছা। লোকগানের গাইয়ে হলে তো কথাই নেই, গামছা একটা থাকলে, তার রঙের জৌলুসে ধুলো না লাগা চেহারাতেও বেশ একটা এথনিক ভাব এনে ফেলা সহজ হয়। আমাদের ব্যবহারের এই নিত্যসঙ্গীটি আজ যে জাতে উঠেছে, তাতে আমাদের খুশি হবারই কথা কারণ অবশেষে সে তার প্রাপ্য সম্মান কিছুটা হলেও পেয়েছে, তোয়ালের খবরদারিতে কোণঠাসা অবস্থাটা কিছুটা হলেও হয়তো কমছে।

যখন থেকে স্নান, তখন থেকেই জলমোছার ব্যবস্থা তো কিছু না কিছু ছিলই, কিন্তু গামছা কখন এখনকার নাম ও রূপ পেয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। দুই বাংলা ছাড়াও অসম, মণিপুর, ওড়িশা সহ বিভিন্ন জায়গার গামছার বেশ খ্যাতি আছে; আর আছে গামছার বিভিন্ন ব্যবহার। পথচলতি ক্লান্ত মানুষটি তাঁর নিত্যসঙ্গী গামছাটি পেতেই গাছের ছায়ায় শুয়ে একটু বিশ্রাম করে নেন। রোদ থেকে বাঁচতেও মাথায় গামছা বেঁধে নেওয়া। ‘গামছা বান্ধা দই’ দইয়ের উৎকর্ষ বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও, ছানার জল ঝরানো থেকে জিনিসপত্র বা খাদ্যসামগ্রী বেঁধে নিয়ে যাওয়া, বিঁড়ে আর পাগড়ির মতো গামছাকে কাজে লাগানো এখনও চলে সমাজের বিভিন্নস্তরে। বিবাহ অনুষ্ঠান বা দেবতার পুজো, গামছা লাগে সর্বত্র।

আরও পড়ুন: চূর্ণী নদীর তীরে…

‘গঙ্গা’ ছবির গান “ইচ্ছা করে, পরাণডারে গামছা দিয়া বান্দি” বা কবি জসীমউদ্দিনের লেখা গানে “ঘারের গামছা থুইয়া যাও রে…”-তে গামছা মনবাঁধার কাজটিও করে। দুই বাংলার মেয়েদের গানে গামছার পৌনঃপুনিক উচ্চারণ বুঝিয়ে দেয় দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে গামছার অত্যাবশকতা।

প্রাত্যহিকতায় জড়িত বিষয়গুলি মেয়েদের গানে বারবার উঠে আসে। তাই গামছার মতো প্রয়োজনীয় জিনিসের উল্লেখ সেখানে কিছুটা প্রত্যাশিত। মুর্শিদাবাদের রাসিনা বেওয়া শোনাচ্ছিলেন বিয়ের গান—

“একই গেরস্তের মেয়্যারে তুমি
গামছা নাই তোমার ঘাড়োতে
তাঁতের গামছা বুনিয়ারে, দ্যাও মেয়্যার ঘাড়োতে”

একই রকমভাবে ঢাকা থেকে চলে আসা আলোয় পাল শোনান জলভরার গান—

“চলো সখি জলে যাই
কেহর হাতে ঘটিবাটি, কেহর হাতে গামছা গো…”

স্নানের জন্য যেমন, তেমনই চাষি যখন মাঠে যান, তাঁর ঘাড়ে গামছা থাকাটাও আবশ্যিক নানা কারণে। মুর্শিদাবাদ, মালদহ অঞ্চলের বসনবুড়ি পুজোর গানে শোনা যায়—

“সবার ঘাড়ে দেখি গামছা
বেজোর ঘাড়ে নাইও রে
বেজো আমার হাল বাহিতে যায়…”

বোঝাই যাচ্ছে নরনারী নির্বিশেষে গামছা সবারই দরকার নানা কারণে।

“আমার নিহরে ভিজিল শাড়ি
একটা গামছা দ্যাও না পরি…”

গামছা তাহলে শাড়িরও বিকল্প হয়ে ওঠে কোনও কোনও সময়। গোয়ালপাড়ার গানে পাই—

“মইষ দোয়ান মোর মইষাল বন্ধু
গামছা মাতায় দিয়া…”

রোদ আড়াল করতে মাঠের কৃষকের মতো বাথানের মইষালেরও নিত্যসঙ্গী গামছা; কখনও কখনও তার প্রতিরূপও যেন সেটা। তাই আসন্ন বিচ্ছেদের কথা মনে পড়লে বিরহিণী বলেন—

“তোমরা যাইবেন মইষ বাতানে রে
আমার পোড়ে হিয়া
তোমার ঘারোর ফুল গামোচা
আমাকে যান দিয়া, মইষাল রে…”

আরও পড়ুন: বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

শুনুন, গামছার গান…

গাজনের গানে, কানাইয়ের বাপ নাচেন গামছা মাতায় দিয়ে; আর বিহুনাচেও গামছার বিশেষ ভূমিকা থাকে। ফরিদপুর, পাবনার ইটেকুমুর পুজোর গানে যখন গামছা মুড়ি দিয়ে নাতিন জামাইয়ের আসার কথা বলা হয়, তখন গামছা বোধহয় শীত প্রতিরোধক হিসেবেই কাজ করে। শুধু তাই নয়, গামছা গৃহস্থের আর্থিক অবস্থা বা রুচিরও পরিচয় বহন করে। তাই সটান বলে দেওয়া হয়—

“এ গামছা ভালো না/ নাতিন বিয়ে দেবো না।”

লোলিতা কীর্তনিয়া শুনিয়েছিলেন, বিয়ের জলভরার গান—

“দ্যাও গো তাঁতিয়া গামছা বুইনে
যমুনার জল ছাঁকতে…”(ফরিদপুর)

খালেবিলে নেমে হুটোপুটি করতে করতে মেয়ের দল কুড়িয়ে জড়ো করেছে কিছু গুগলি; তাই গান ধরেছে—

“দাদা গামছাখান দে রে গগলি তুইল্যাছি,
গগলির শবদে উড়ে শাঁখচিল…”

বর্ষাকালে বৃষ্টির জল জমে আছে, আখের ক্ষেতে। বাদলা বাতাসে উচাটন মন দেখা পেতে চায় বন্ধুর। তাই বেরিয়ে পড়া—

“ইপি ঝিপি বাতাসে বেরালাম ভাই বন্ধুর তাল্লাসে
আখের ভুঁইয়ের সরুয়া বালি
গামছা কইরে কতয় মাছ ধরি…” (মুর্শিদাবাদ)

এহেন উপকারী গামছা তো নিত্যসঙ্গী যেমন তেমনই নিত্য হারানোর ঘটনাও ঘটে—

“কোন ঘাটে সান করলি রে কানাইয়া
গামছা কোথায় হারালি?
হাঁটুজলে হারালি গামছা, কমরজলে তোকালি”
চট্টগ্রামের নিকটবর্তী সীতাকুণ্ড এলাকার গান। আবার স্বামী নেশার ঘোরে গামছা হারিয়ে এলে গৃহশান্তি বিঘ্নিত হয় গামছারই কারণে—

“মদ খালি যাঁহা তাঁহা, গামছা হারালি কাঁহা
যাই আগে ঘরকে
লেথাই ভাঙ্গিব মদের ভাঁড়কে” ( সুন্দরবন)

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি—

“গামচা পাঁয়েছি নালাতে
মদ খাওয়া ছাড়াব তিন ঝাঁটাতে…” ( নদিয়া)।

গামছা দীর্ঘজীবী হোক।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Goutam Chattopadhyay

    চন্দ্রাদি, আপনি যখন ফ্যাশন স্টেটমেন্টের কথা তুললেন তখন বলাই যায় যে
    বহু বছর আগে থেকেই প্রখ্যাত শিল্পী প্রকাশ কর্মকার গামছা দিয়ে তার পরিধেয় বানাতেন!
    আর ওপার বাংলার বিবি রাসেল তো আন্তর্জাতিক স্তরে গামছাকে প্রজেক্ট করেছেন!
    তবে এ সমস্তই গামছা সংস্কৃতির বাইরের কথা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *