শতায়ু-তরুণ সাম্যময় ভানু

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

বিপ্লবী অনন্ত সিংহকে জানেন আপনারা? হ্যাঁ, সেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, ‘মাস্টারদা’র সহযোগী বিপ্লবী অনন্ত সিংহ— যাঁর নামে একাধিক ব্যাঙ্ক ডাকাতিরও অভিযোগ ছিল! সেই তিনিই একাধিক বাংলা চলচ্চিত্রের প্রযোজনা করেছিলেন, আর বিশেষত ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ প্রযোজনার জন্য অবশ্যই তাঁকে স্মরণ করতেই হয়। ১৯৫৮ সালে গৌর শী রচিত কাহিনি নিয়ে এই ছবিটির পরিচালনা করেছিলেন প্রফুল্ল চক্রবর্তী।

আরও পড়ুন: মা টেরেসা ও তাঁর সন্তানেরা (প্রথম পর্ব)

সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম কতজন জানেন? না জানুন ক্ষতি নেই, তিনি ভিন্ন নামেই সমধিক স্মৃতিধার্য। কোনও চলচ্চিত্রে যেকোনও অভিনেতার কৃতিত্ব তো একমাত্র কোনও চরিত্রকে যথাযথ ফুটিয়ে তুলতে পারলেন কিনা সেই বিচারেই সীমিত থাকে! চলচ্চিত্রের দর্শন নির্ভর করে শুধু মাত্র গল্পকার / চিত্রনাট্যকার ও পরিচালকের অন্বিষ্টসন্ধান ও সমাজ চেতনা প্রস্ফুটনের ওপর— সেখানে নায়ক বা অভিনেতা কতটুকু গুরুত্ব পেতে পারে! কিন্তু সাম্যময় নামের মর্যাদা রেখেছিলেন এক শিল্পী, যখন দেখি হাস্যরসের কাঠামো ভেঙে প্রস্ফূটিত হয়েছে সমাজ চিন্তন। সাড়ে চুয়াত্তর, ৮০তে আসিও না, নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে, ভানু পেল লটারি, স্বর্গ হতে বিদায়, অথবা যমালয়ে জীবন্ত মানুষ ফিল্মগুলিতে তখন কেমন যেন সাম্যময় নামের মাহাত্ম্যও নির্ধারিত হয়ে যায়!

আসুন, দেখতে থাকি কীভাবে সিধু (সিদ্ধেশ্বর) যমালয়ে ঢুকে একে একে উদঘাটন করতে থাকে আমাদের অতি পরিচিত ভূলোকের আলোয় তৈরি স্বর্গলোকের অনাচার, দুরাচার অথবা আনন্দ, প্রকৃতি, প্রেম, সংস্কৃতি। যমালয়ে যখন সে গেছেই তখন সে হেস্তনেস্ত করবেই তো যমের সেক্রেটারি বিচিত্রগুপ্ত’র সঙ্গে।

আরও পড়ুন: আলিয়া, জাহ্নবীর পর এবার অনন্যার ছবির টিজারে ডিসলাইকের ঝড়

সিধুর সংগত প্রশ্নবাণে জর্জর বিচিত্রগুপ্ত স্বীকার করে ফেলেন, “এখানে দেবতারা যত না খাচ্ছেন, ততটাই ছড়াচ্ছেন” (অর্থাৎ দেশনায়কদের অপচয়)! কুপোকাত বিচিত্রগুপ্তকে সিধু জোরালো নির্দেশ দেন: “লেখো, লেখো যে একশত বৎসরের পূর্বে কোনো মানুষের মৃত্যু হইবে না” অর্থাৎ মানুষের গড় আয়ু বাড়ানোর নিদান এটা। পরিচালক আমাদের অতি পরিচিত কমেডিয়ানকে দিয়ে কোনও ভাঁড়ামি করাননি, বরং সিরিয়াস সব বিষয়ের অবতারণা করেছেন। আমরাও অভিনয়ের নৈপুণ্যে প্রাণ খুলে হেসেছি, চোখ বেয়ে জল গড়িয়েছে আর বুকের গভীরে নিরাময়হীন ক্ষত জমিয়েছি।

মৃত্যুর পরে আমাদের সিদ্ধেশ্বর যখন দেবলোকে গিয়ে বিষ্ণুর সাক্ষাৎ পায়, তখন সে তার আরাধ্যের কাছে মানুষের পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া অমানুষতার কাহিনিগুলো উজাড় করে দিতে থাকে। বিষ্ণুর কাছে সে অভিযোগ জানায়:
— “এই যে হাইড্রোজেন বোমা, অ্যাটম বোমা এসব যে বানাচ্ছে— সব যখন নাগাড়ে ফাটবে, তখন থাকবে কিছু পৃথিবীর? হ্যাঁ!!!

এই সংলাপের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসেও এক অসামান্য যুদ্ধ-বিরোধী চলচ্চিত্রের খণ্ডচিত্র রচিত হয়ে যায় যার সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় আদ্যন্ত হাসির মোড়কে ঢাকা চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’।

সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায় আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে অর্থাৎ ২৬ অগস্ট, ১৯২০ সালে জন্মেছিলেন ঢাকার বিক্রমপুরে, যিনি পরে কলকাতায় এসে ‘দ্বিজ’ হয়েছিলেন “ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়” নামে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *