শ্রীচৈতন্যদেব ও বাংলার জগন্নাথ সংস্কৃতি

সোমা মুখোপাধ্যায়

অনেকদিন আগের কথা। খড়দহ থেকে কোনও পারিবারিক কারণে উত্তর কলকাতার সিমুলিয়ায় এসে বসতি স্থাপন করেন এক মা গোসাঁই। গঙ্গায় ভাসিয়ে নিয়ে আসেন বীরচাঁদ প্রভুর প্রতিষ্ঠা করা মহাপ্রভু আর নিত্যানন্দ প্রভুর বিগ্রহ। শুরু হয় কলকাতায় গোস্বামী পরিবারের যাত্রা। পরবর্তীতে আর একজোড়া বিগ্ৰহের আগমন হয় এই বাড়িতে। সম্ভবত নিমতলা অঞ্চলের কোনও সন্ন্যাসিনীর আরাধ্য দেবতা। বড় ও ছোট মহাপ্রভু নামে দু’জনেই এই গোসাঁইবাড়িতে সেবা পেয়ে আসছেন।

আরও পড়ুন: গড়িয়ার রথবাড়ি

জগন্নাথ ও বলরাম সংকীর্তনের ভঙ্গিতে। গৌরীপুর, বাংলাদেশ। ছবি: ইন্টারনেট

এই গোস্বামী পরিবার আমার মামারবাড়ি হবার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই বৈষ্ণব ধারার পরিমণ্ডলে আমি বড় হয়েছি। বছরভর মহাপ্রভুর নানা উৎসবকে দেখার সুযোগ হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হল রথ। আমার মায়ের ঠাকুরদা প্রভুপাদ বলাইচাঁদ গোস্বামী ছিলেন তৎকালীন সময়ে এক পণ্ডিত ব্যক্তি। ওনাকে বৈষ্ণব চূড়ামণি হিসেবে অভিহিত করা হত। ঠাকুরের অস্থিকলস নিয়ে যে পদযাত্রা হয়, সেখানে সর্বাগ্রে কীর্তনের দলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। যোগদ্যানের ইতিহাস থেকে তা জানা যায়। এছাড়াও তিনি নানা বৈষ্ণব গ্রন্থ সম্পাদনা সহ প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। আমার দাদু প্রভুপাদ বীরেশ্বর গোস্বামীও তাঁর বাবার মতো ভাগবৎ পাঠ করতেন। এছাড়া উনি ছিলেন দীক্ষা গুরু।

আরও পড়ুন: সূর্যাস্তের দেশে

বৃন্দাবন চন্দ্রের মন্দির, গুপ্তিপাড়া। ছবি লেখক

মধ্যযুগে শ্রীচৈতন্যদেবের কারণে বাংলায় এক সাংস্কৃতিক জাগরণের সূচনা হয়। সাহিত্য, সংগীত, শিল্প থেকে বেশভূষা, খাদ্যাভাস সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়ে। বদলে যায় মানুষের যাপিত জীবনের নানা দিক। বাংলায় এক নতুন সাংস্কৃতিক ঘরানার আবির্ভাব হয়। ধর্ম যে নিছক আচার সর্বস্ব নয়, তার এক নতুন বার্তা প্রচার করেন চৈতন্যদেব কৃষ্ণনাম প্রচারের মাধ্যমে। এর প্রেক্ষিতেই বাংলার জগন্নাথ সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করব। সন্ন্যাস নিয়ে নীলাচলে জগন্নাথ দর্শন করে শ্রীচৈতন্য দেবের অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্ৰন্থে। জীবনের বাকি সময়টা তিনি এখানেই অতিবাহিত করেন। জগন্নাথের মাঝে তিনি কৃষ্ণ দর্শন করেন। আর সেই ধারায় প্লাবিত হয় বাংলা।

পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে জগন্নাথদেবের আবির্ভাবের কাহিনি আমাদের সকলের জানা। নীলমাধব থেকে ইন্দ্রদ্যুম্নের আরাধ্য দেবতা জগন্নাথদেবকে নিয়ে আছে নানা কিংবদন্তির সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস। ওড়িশার এই জগন্নাথদেবের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, গঙ্গরাজ তৃতীয় অনঙ্গভীম দেবের সময় থেকেই জগন্নাথদেব বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পুরুষোত্তম থেকে তিনি পরিচিত হন জগন্নাথ নামে। তাঁর একশো বছর ব্যাপী নির্মীয়মাণ মন্দিরটিও এই সময়ে শেষ হয়। রাজা তৃতীয় অনঙ্গভীম দেব নিজেকে জগন্নাথ দেবের রাউত বা প্রতিনিধি রূপে পরিচয় দেন। যার ধারাবাহিকতা আজও চলছে। ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্যদেবের এই শ্রীক্ষেত্রে বসবাস এক নতুন তাৎপর্য বহন করে।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)

জগন্নাথ, চুনীমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ি। ছবি লেখক

ইতিপূর্বে এই অঞ্চলটি তীর্থক্ষেত্র হিসেবে বাঙালির কাছে পরিচিত ছিল। বাংলার অন্যতম প্রাচীন জগন্নাথ বিগ্ৰহ প্রতিষ্ঠিত হয় হুগলির মাহেশে। আর শ্রীচৈতন্যের নির্দেশে জগদীশ পণ্ডিত জগন্নাথ দর্শনে গিয়ে কেলি বৈকুণ্ঠ থেকে জগন্নাথের বিগ্ৰহ নিয়ে আসেন এবং চাকদহের যশড়াতে প্রতিষ্ঠা করেন। এই দুই স্থান শ্রীচৈতন্যের স্মৃতিবিজড়িত। এছাড়া গ্ৰাম-বাংলার অন্যত্র হয়তো তিনি ছিলেন। ভবিষ্যৎ গবেষণা হয়তো তাতে আলোকপাত করব। অর্থাৎ এভাবে বাংলায় জগন্নাথদেব পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাঁকে জনপ্রিয় করে আপামর বাঙালির কাছে পৌঁছে দিলেন চৈতন্যদেবের ভাবধারা। বৈষ্ণবদের আরাধ্য হয়ে উঠলেন জগন্নাথ।

বাংলার দারুবিগ্ৰহ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছিলাম নিমকাঠে যে বিগ্ৰহ হয়, তার অন্যতম কারণ জগন্নাথ এই নিমকাঠে তৈরি বলে। এমনটাই বলেন গবেষকেরা। জগন্নাথদেবকে দারুব্রহ্ম বলা হয়। এর আগে বাংলায় বেলকাঠ, আম কাঠ বা কাঁঠাল কাঠের এই বিগ্ৰহ হত। জগন্নাথদেবের বিগ্ৰহ নির্মাণ হতে থাকলে অন্যান্য বিগ্ৰহও এই নিমকাঠেই নির্মিত হতে শুরু করে। যার অন্যতম উদাহরণ বিষ্ণুপ্রিয়াদেবী সেবিত নবদ্বীপের ধামেশ্বর মহাপ্রভুর বিগ্ৰহ।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনের উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রবিন্যাসের প্রাথমিক ধারণা এবং ম্যানগ্রোভস রিস্টোর

মাটির জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রা, জয়নগর মজিলপুর। ছবি শম্ভুনাথ দাস

আলোচ্য সময়কালে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার বিগ্ৰহের পাশাপাশি একক জগন্নাথ দেবের বিগ্ৰহ বাংলায় পূজিত হতে থাকেন। এই একক জগন্নাথদেবকে বলা হয় দধিবামন। এমনিতেই দধিবামন নামে দুই চক্র বিশিষ্ট এক সূক্ষ্ম শিলার সন্ধান মেলে। যা অনেক পরিবারের কুলদেবতা। রথের সময় অনেক বাড়িতে জগন্নাথদেবের বামন অবতারের বেশ হয়। গবেষকদের মতে, এই বামন অবতার দধি খুব ভালোবাসতেন, তাই তাঁকে দধিবামন বলা হয়। বৈষ্ণব পরিবারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই দধিবামন নামে একক জগন্নাথদেব পূজিত হন। আমাদের পরিবার ছাড়াও সিমুলিয়ার বাঘওয়ালা গোসাঁই বাড়ি, বউবাজারের চুনীমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ি, নীলমণি দে-র ঠাকুরবাড়ি, ধর পরিবারের ঠাকুরবাড়ি সহ একাধিক ঠাকুরবাড়িতে এই একক জগন্নাথদেব আরাধ্য দেবতা। তবে এইসব জগন্নাথ দেবের বিগ্ৰহ একেবারেই পুরীর বিগ্ৰহের অনুরূপ।

তুর্কি আক্রমণের সময় থেকে বাংলার মূর্তি পুজোয় ভাটার টান আসে। পূর্বের মতো রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় পাথর বা ধাতুর দেবদেবী নির্মাণ বন্ধ হয়ে আসে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় রাজা, জমিদার বা গ্ৰামের মানুষের যৌথ উদ্যোগে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কাঠের বিগ্ৰহ তৈরি হতে শুরু করে। পূর্বেকার ভাস্করদের বদলে স্থানীয় লোকশিল্পীরাই তার নির্মাণ করতেন। এই কাঠের বা দারুবিগ্ৰহ রূপায়ণে তাই সেই আঞ্চলিক ভাবধারার সুস্পষ্ট ছাপ লক্ষ করা যায়। সর্বভারতীয় বিগ্ৰহ নির্মাণের শিল্পশাস্ত্রের ধারা অনুসরণ না করে একেবারে নিজেদের মতো করেই তা নির্মাণ করতে থাকেন শিল্পীরা। চৈতন্যদেবের আগমনে এই দারুবিগ্ৰহ হয়ে ওঠে শিল্পসুষমা মণ্ডিত‌। বিগ্ৰহে এক সুডৌল গড়নের পাশাপাশি তাঁদের পানপাতার মতো মুখমণ্ডল বা পটলচেরা চোখ আর অলংকরণে তা বাংলার এক নিজস্ব ঘরানার সৃষ্টি করে।

শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর ভাবনায় ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে এক যোগসূত্র রচনা করতে চেয়েছিলেন। ভক্তিই ছিল তাঁর ধর্মের মূল মন্ত্র। তাই এই দারুবিগ্ৰহ যেন সেই ভাবনাকেই রূপ দিতে এগিয়ে এলো। জীবাত্মা একাধারে পরমাত্মার যেমন গুণগত অংশ তেমন আবার পরিমাণ গতভাবে পৃথক‌। এই সারবত্তাই তিনি নীলাচলে অনুধাবন করিয়েছিলেন বাসুদেব সার্বভৌমকে তাঁর ষড়ভুজ মূর্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে। নিরাকার ঈশ্বর ভক্তের জন্য সাকার হন। বিগ্ৰহ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থও তাই বলে— বি (বিশেষরূপ) গ্ৰহ্ (to tie, fasten) অচ্ কতৃবাচ্যে নিষ্পন্ন। বিদেহ বিশেষরূপে অর্থাৎ স্বগুন হয়ে নিজেকে মূর্ত বা প্রকাশ করেছেন।

আরও পড়ুন: গামছার গান

বড় মহাপ্রভু। ছবি লেখক

বাংলায় জগন্নাথদেবের একক বা বলরাম ও সুভদ্রা সহ দারুবিগ্ৰহগুলি অনেকক্ষেত্রেই এই ভাবনার সঙ্গে মিশে এক নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের কারণে বিশ্বকর্মা জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রার অর্ধ সমাপ্ত বিগ্ৰহ রেখে চলে যান। ওই অবস্থাতেই বিগ্ৰহ ত্রয়ী সেই তখন থেকেই পূজিত হতে থাকেন। প্রাচীন ভারতের শিল্পকলা ও ইতিহাসের ছাত্রী রূপে আমরা জানি কী করে দেববিগ্ৰহ ধাপে ধাপে নির্মিত হয়। প্রতীক বা লিঙ্গ উপাসনা থেকে টোটেম বা পশু রূপ (নাগ) পশু ও মানুষের মিশ্র রূপ (নৃসিংহ) থেকে নানা ধরনের মানুষী অবয়বের দেবদেবীর রূপায়ণ হয়। সেক্ষেত্রে জগন্নাথ দেবের এই বিগ্ৰহকে আমরা এক অন্তর্বর্তীকালীন প্রতীকী মানুষী মূর্তি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। অনেক গবেষক এখানে আদিবাসী দের দেবতার ছায়া দেখেছেন।

যাইহোক, চৈতন্যদেবের প্রভাবে বাংলার শিল্পীরা শুরু করলেন জগন্নাথদেবের মানুষীমূর্তি নির্মাণ। তাঁকে প্রকট করা হল বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিয়ে। তাই অনেকক্ষেত্রেই তাঁর আঙুলসহ হাতও নির্মাণ করলেন। এর মধ্যে হুগলির গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দিরের জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার বিগ্ৰহটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এমন বিশালাকায় জগন্নাথ সচরাচর দেখা যায় না। জগন্নাথদেবের দুই হাতে আছে শঙ্খ ও চক্র বিষ্ণুর প্রতীক আর বলরামেরও দু’হাত আছে। এছাড়া জগন্নাথদেবের চোখের আকৃতিও গোলকারের বদলে পাতার মতোই। অপরূপ সুন্দর এই বিগ্ৰহের সময়কাল ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দ। অন্যদিকে, নবদ্বীপের নৃসিংহ মন্দিরেও রয়েছেন এমন হাতওয়ালা প্রাচীন জগন্নাথ। বলা হয়, ইনি নাকি একসময় শান্তিপুরে ছিলেন। তবে ইনি পুরীর জগন্নাথদেবের মতোই।

অবিভক্ত বাংলার পাবনার হান্ডিয়াল জগন্নাথ মন্দিরের বিগ্ৰটি চৈতন্য পূর্ব সময়ের বলে গবেষকরা দাবি করেন। ইনি নীলমাধব। রথের পরে এনার হাত লাগানো হয়। সাজানো হয় নানা বেশে। এনার রূপকল্প খুব শিল্পসুষমা যুক্ত। কিন্তু বর্তমান বছরে তাঁকে নীলের বদলে কালো বর্ণ দেওয়া হয়েছে। মুখমণ্ডলের হয়েছে পরিবর্তন। বলা হয়েছে, জগন্নাথদেব যেমন বেশ চান তেমনভাবেই তাঁর নবকলেবর হয়।

বাংলাদেশ সিরাজগঞ্জে আছেন গোস্বামী পরিবারের প্রায় ৪৫০ বছরের স্বপ্নাদিষ্ট নিমকাঠের নীল জগন্নাথ। এনারা খেতুরির নরোত্তম ঠাকুরের শিষ্য গঙ্গানারায়ণ চক্রবর্তী পরিবারের। হান্ডিয়ালের জগন্নাথদেবের মতো গড়িয়া রথবাড়ির নীল বর্ণের জগন্নাথদেব হয়েছেন কালো। বণিক পরিবারের কথায় তাঁদের জগন্নাথদেবের ওপর রামচন্দ্রের প্রভাব আছে। তাঁদের কথায় নোয়াখালি চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই কারণেই ধরনের নীল জগন্নাথদেব দেখা যায়। অর্থাৎ জগন্নাথদেব একীভূত হয়েছেন কখনও কৃষ্ণ আবার কখনও রামচন্দ্রের সঙ্গে। এঁরা দু’জনেই আবার বিষ্ণুর অবতার। চৈতন্যদেবের প্রভাবেই সংকীর্তনের ভঙ্গির দু’হাত তোলা জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার দারুবিগ্ৰহ দুই বাংলার কোথাও কোথাও দেখা যায়। শ্রীচৈতন্যদেব আবার দুই বিষ্ণুর এই কৃষ্ণ ও রামকে মিলিয়েছেন। ষড়ভুজ মূর্তি তার অন্যতম উদাহরণ। তাই বৈষ্ণবদের কাছে ত্রেতায় রাম, দ্বাপরে শ্যাম, কলিতে গৌরাঙ্গের নাম।

আরও পড়ুন: চূর্ণী নদীর তীরে…

সিমলার গোসাঁই পরিবারের ছোট মহাপ্রভু। দু’পাশে রয়েছে শ্রী খুন্তি। ছবি লেখক

বৈষ্ণব প্রভাবে প্রভাবিত শান্তিপুরে হয় অস্ত্রহীন রামচন্দ্র বা রঘুনাথের রথযাত্রা। বলা হয়, কৃত্তিবাসকে সম্মান জানাতেই এখানে রঘুনাথের রথ হয়। এখানকার রথের মেলায় মেলে সুন্দর জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রার ওই টানা চোখের মাটির মূর্তি। আবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের নিকটবর্তী আটিসরা, কীর্তনখোলা, ছত্রভোগ শ্রীচৈতন্যদেবের স্মৃতিবিজড়িত। এখানেও আছেন নানা প্রাচীন জগন্নাথ মন্দির ও বিগ্ৰহ। এখানেও রথে পাওয়া যায় সংকীর্তনের ভঙ্গিতে দু’হাত তোলা আঙুল দেওয়া জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রার মাটির‌ মূর্তি। সাবেক কালের ঘরানার এমন মূর্তি সারাবছর তৈরি করেন মৃৎশিল্পী শম্ভুনাথ দাস। এভাবে চৈতন্য প্রভাবে জগন্নাথদেবের বিগ্ৰহ অন্যরূপ ধারণ করেছে বাংলায়।

বৈষ্ণব পরিবারে থাকে শ্রীখুন্তি। নবদ্বীপে শ্রীচৈন্যদেবকে নগরসংকীর্তন করার ফরমান দিয়েছিলেন এর মাধ্যমে চাঁদ কাজী। অনেকে বলেন, এটি হল মহাপ্রভুর হাতের পাঞ্জার প্রতীক। সমস্ত নগরসংকীর্তনে এই শ্রীখোন্তাকে নেওয়া হয়। আমাদের পরিবারে মহাপ্রভুকে চতুর্দোলায় বসিয়ে যখন পরিক্রমার মধ্যে দিয়ে পালাদারদের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হত, তখন এটি থাকত। আবার জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সময় কীর্তনের দলের সঙ্গেও নেওয়া হত। এভাবে রথযাত্রায় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নানা প্রথা দেখা যায়। হুগলির গুপ্তিপাড়ায় উল্টোরথে হয় মাসির বাড়িতে জগন্নাথদেবের স্ত্রী লক্ষ্মীদেবীর নির্দেশে ভাণ্ডারা লুটের অনুষ্ঠান। এমন লুট হয় রাসের সময় খড়দহে শ্যামের শ্রীমন্দিরে।

আরও পড়ুন: বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

নীল জগন্নাথ, সিরাজগঞ্জ, বাংলাদেশ। ছবি কৃষ্ণেন্দু গোস্বামী

নীলাচলে থাকাকালীন শ্রীচৈতন্যের জন্য সারাবছরের শুকনো খাবার করে পাঠাতেন রাঘব দাস গোস্বামীর বিধবা বোন দময়ন্তী দেবী। এর নাম রাঘবের ঝালি। অনেক ভক্ত সমাগমে এই ঝালি যেত রথের একমাস আগে। কারণ তখন এখনকার মতো পুরী যাবার সহজ পথ ছিল না। এর সঙ্গে চৈতন্যদেবের পছন্দের গর্ভ মোচা, থোর মাথায় করে যেতেন ওনার অনুরাগী এক সবজি ব্যবসায়ী। সন্ন্যাসের আগে নিমাই বাজার থেকে এগুলো তাঁর কাছ থেকে নিয়ে পালিয়ে যেতেন। শেষপর্যন্ত পৌঁছনোর পর তা অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেলেও চৈতন্যদেব সেটিই গ্ৰহণ করতেন।

পুরীর জগন্নাথদেবের রথের আগে শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর দল নিয়ে কীর্তন করতেন। যেখানে থাকতেন তাঁর প্রধান কীর্তনীয়া গোবিন্দ দত্ত। সুখচরে এনার পূজিত গৌর-নিতাইয়ের বিগ্ৰহ আছে মহেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের দেবালয়ে। এখানেও এই মন্দিরে রথযাত্রা উৎসব হয়। আর রাঘবের ঝালি আজও রথের দু-তিনদিন আগে বরাহনগর পাটবাড়ির ব্যবস্থাপনায় পুরী যায়। এই ঝালি মাথায় করে গম্ভীরা মঠে নিয়ে যান ভক্তরা। সমস্ত ভক্ত তাঁদের সামগ্ৰী দিয়ে আসেন বরাহনগর পাটবাড়িতে। আমি বছর দু’য়েক আগে তা দর্শন করেছি। মরশুমি ফল, আনাজ, বড়ি, আচার, সবজি, কী নেই সেখানে! আসে রাঘব ভবন থেকে বিশেষ উপাচার। জগন্নাথদেবকে এভাবেই বাংলার সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছেন শ্রীচৈতন্যদেব।

তথ্যসূত্র
১) কৃষ্ণদাস কবিরাজ,  শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা।
২) R. C. Majumdar, Chittagang Copper Plate of Kantideva, Epigraphia Indica, Vol 27, pp 313-318.
৩) অনির্বাণ চৌধুরী, ফিরছেন তিনি, আসুন আমরা সংযত হই!, প্রতিদিন, ৩১ অক্টোবর ২০১৬।
৩) সোমা মুখোপাধ্যায়, সরযূবালার ভেষজকথা, কলাবতী মুদ্রা, কলকাতা, ২০১৬।
৪) সোমা মুখোপাধ্যায়, বাংলার দারুবিগ্ৰহ, পশ্চিমবঙ্গ, মার্চ-জুন ২০১৮।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা
অরুণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রদীপ গোস্বামী

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *