মেদিনীপুরের আলুই-রায়পাড়ার শ্রীধর মন্দির

চিন্ময় দাশ

অজস্র মন্দিরের সমাবেশ ঘাটাল মহকুমাজুড়ে। অধিকাংশই নির্মিত হয়েছিল ইংরেজ আগমনের সামান্য আগে বা পরে। বর্তমানে তার কোনওটি টিকে আছে, কোনওটিবা ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। কেউবা সেই পথের পথিক। গ্রাম পরিক্রমার সময় চোখে পড়ে, একটি বিশালাকার দিঘির ধারে নির্জনে নিরালায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দিন গুনছে একটি দেবালয়। সেই জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল আজ এখানে।

আরও পড়ুন: ‘বাংলার শিবাজি’ শোভা সিংহের শীতলা মন্দির, রানির বাজার (ঘাটাল থানা, মেদিনীপুর জেলা)

প্রথমে মন্দির প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দেখে নেওয়া যাক। ঘাটাল মহকুমায় চন্দ্রকোনা হল বহু শতাব্দীর প্রাচীন এক নগরী। সেখানে খয়ের মল্ল বা আদিমল্লের হাতে মল্লেশ্বর মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। তার পরবর্তীকালে কেতু রাজবংশ, ভান রাজবংশও মন্দির নির্মাণ করেছে সেখানে। সর্বশেষ রাজকীর্তি বর্ধমানের রাজপরিবারের। অন্যদিকে, ঘাটাল এবং দাসপুর থানায় কয়েকটি রাজকীর্তি আছে, সেগুলি প্রধানত ‘বাংলার শিবাজি’ হিসাবে পরিচিত রাজা শোভা সিংহের।

আরও পড়ুন: রাধাগোবিন্দ মন্দির, দক্ষিণ ময়নাডাল (থানা- পাঁশকুড়া, মেদিনীপুর)

এগুলি বাদে ঘাটাল মহকুমার তিনটি থানার শত শত মন্দির নির্মিত হয়েছিল ইংরেজ এদেশে আসবার কিছুকাল আগে থেকে কিছুকাল পর পর্যন্ত। এর কারণ বা পশ্চাৎপটটি সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলা যেতে পারে। সমগ্র ঘাটাল মহকুমা অনেকগুলি নদীর জলধারায় পুষ্ট। রূপনারায়ণ, কংসাবতী, শিলাবতী ছাড়াও রত্নাকর, কেঠে, আমোদর, পুরন্দর ইত্যাদি ছোট বড় আরও অনেকগুলি উপনদী এবং শাখানদীর সমাবেশ এই মহকুমায়। সে-কারণে, সমগ্র মহকুমা জুড়ে উর্বর কৃষিক্ষেত্র বিরাজমান। কৃষিজ সম্পদের উৎপাদন এবং বিপণনে অর্থপুষ্ট হয়েছিল ঘাটাল। এর সঙ্গে ছিল রেশম চাষ। উন্নত রেশম সুতো এবং রেশম বস্ত্রের উৎপাদনের জন্য খ্যাতি ছিল এই মহকুমার। দিল্লির নবাব দরবার যেমন এখান থেকে রেশম বস্ত্র সংগ্রহ করত, ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও কদর ছিল এখানকার রেশমশিল্পের। আর্মেনিয়ান, ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজ বণিকগণ সরাসরি এখানে এসে কুঠি এবং সেরেস্তা গড়ে ব্যবসা করত। কৃষিজ সম্পদ এবং রেশমশিল্পের বাণিজ্য থেকে মহকুমা জুড়ে যেসব ধনী পরিবারের উদ্ভব হয়েছিল, তারা সকলেই বহু মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

আরও পড়ুন: রাধাদামোদর মন্দির, মাংলই (পাঁশকুড়া থানা, মেদিনীপুর)

ইংরেজ আসবার পর, নতুন করে আর একবার ঢেউ ওঠে জমিদারি প্রতিষ্ঠা এবং মন্দির নির্মাণে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রচলন করেন। তার সুবাদে ছোট-বড় নানা মাপের জমিদারি প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। এই নব্য জমিদারেরা বহু দেবমন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

কলকাতায় ব্যবসা-বাণিজ্য করে অর্থবান বা জমিদার হয়ে ওঠা পরিবারগুলির হাতেও বহুসংখ্যক মন্দির নির্মিত হয়েছিল এই জেলার পূর্বাঞ্চলের গ্রামগুলিতে, বিশেষত যেগুলি কলকাতার নিকটবর্তী। তেমনই একটি পরিবারের বসবাস ছিল ঘাটাল থানার পশ্চিম এলাকার আলুই গ্রামে। সেটি ছিল সদগোপ জাতিভুক্ত রায় পদবির পরিবার। সেই পরিবারের যজ্ঞেশ্বর রায় এবং হীরালাল রায় নামিত দুই উদ্যমী পুরুষ কলকাতায় চলে যান ব্যবসার উদ্দেশ্য নিয়ে। সেখানে তাঁরা ছাতা ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। ছাতা তৈরির কারখানা স্থাপন করে যেমন উৎপাদন শুরু করেন, বিক্রয়ের জন্য দোকানও চালু করেন। ব্যবসায় সফল হতে বিলম্ব হয়নি তাঁদের। সেই সম্পদ থেকে রায় পরিবার ছোটখাটো একটি জমিদারিও প্রতিষ্ঠা করেছিল নিজেদের দেশবাড়িতে।

আলুই গ্রামের একেবারে উত্তর প্রান্ত ঘেঁষে বিশালাকার এক দিঘি। নাম— চাথরা। সেই দিঘির ঈশান কোণে ছিল রায় পরিবারের ভদ্রাসন। যজ্ঞেশ্বরের পিতা, সম্পন্ন কৃষক মাধবরাম রায়, তাঁদের কুলদেবতার জন্য ভদ্রাসনের সংলগ্ন করে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সময় তখন ইংরেজি ১৮৮১ সাল। অর্থাৎ শ’দেড়েক বছর হতে চলেছে মন্দিরটির আয়ুষ্কাল।

মহাপ্রভু চৈতন্যদবের আবির্ভাবের পর, গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে রায় পরিবারও বিুষ্ণ আরাধনার প্রচলন করেছিল। শ্রীধরজীউ নামের শালগ্রাম মন্দিরে অধিষ্ঠিত। বর্তমানে রায়বংশ কলকাতার অধিবাসী। দেবতার সেবাপূজা বহাল আছে পুরোহিতের দায়িত্বে।

এবার দেখা যাক মন্দিরের স্থাপত্য-রীতিটি। ইটের তৈরি পূর্বমুখী মন্দির। আকৃতি সম্পূর্ণ বর্গাকার। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয়ই ১৫ ফুট এবং মন্দিরের উচ্চতা আনুমানিক ৪০ ফুট। প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়, মন্দিরে লগ্ন মার্বেল পাথরে লিখিত দু’টি লিপি থেকে। একটি লিপি আছে মন্দিরগাত্রে, অন্যটি আছে মন্দিরে উঠবার সিঁড়িতে। বানান এবং যতিচিহ্ন অপরিবর্তিত রেখে, দু’টি লিপির বয়ান এরকম— ১. ”শ্রীশ্রী ঁসিধর জিউ/ পরিচারক শ্রীমাধবচন্দ্র রায়/ সন ১২৮৭ সাল ৩১ বৈসাখ”। ২. ”শ্রীমন্দির মাধব চন্দ্র রায়/ সাং আলই সন ১২৮৭ সাল/ ইং সন ১৮৮১ সাল তাং ৩১ বৈশাখ / বুধবার”।

অর্থাৎ ১৩৯ বছর পূর্বে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখানে বলা যেতে পারে, আলুই গ্রামে হুবহু আরও একটি মন্দির আছে ভূঞ্যা পরিবারের। রাধা-দামোদরের সে-মন্দিরটিও নবরত্ন-রীতির মন্দির। দু’টি মন্দিরেই স্থপতি সূত্রধরের নাম লেখা নেই। পুরাবিদরা দু’টি মন্দিরের স্থাপত্য বিশ্লেষণ করে উভয় মন্দির একই নির্মাতার হাতের কাজ বলে অনুমান করেন।

মন্দিরটির গঠন রত্ন-রীতির। এর রত্ন বা চূড়াগুলিতে কলিঙ্গধারায় ‘রথবিন্যাস’ এবং ‘পীঢ়-রীতি’র প্রয়োগ দেখা যায়। ন’টি রত্নেরই বাঢ় এবং গণ্ডি অংশ জুড়ে রথবিন্যাস করা। কোনের আটটি রত্নে ত্রি-রথ এবং কেন্দ্রীয় বড় রত্নটিতে পঞ্চ-রথ বিন্যাস করা। দেখা যায়, ন’টি রত্নেরই মাথার গণ্ডি অংশ ভূমির সমান্তরালে কতকগুলি থাক বা পীঢ়ে বিভক্ত। কেন্দ্রীয় রত্নে একাদশ-পীঢ় এবং অন্যগুলিতে পঞ্চ-পীঢ় বিন্যাস। রথবিন্যাস এবং পীঢ়-রীতির প্রয়োগ করা হয় মন্দিরে সৌন্দর্য বিধানের জন্য।

স্বল্পোচ্চ পাদপীঠ অতিক্রম করলে প্রথমে একটি আয়তাকার অলিন্দ। তাতে প্রবেশের তিনটি খিলান-রীতির দ্বারপথ। অলিন্দ থেকে গর্ভগৃহে প্রবেশের দ্বারপথ একটিই। অলিন্দের ভিতরের ছাদ বা সিলিং নির্মিত হয়েছে টানা-খিলান করে। গর্ভগৃহের সিলিং চারটি ছোট পাশ-খিলানের উপর গম্বুজ স্থাপন করে নির্মিত। মন্দিরে দ্বিতলে উঠবার সিঁড়ি নির্মিত আছে।

অলংকরণের কাজও কিছু দেখা যায় মন্দিরটিতে। ১. সামনের দেওয়ালে কার্নিশেরর নীচ বরাবর এক সারি এবং দুই দিকের কোনাচে সংলগ্ন দু’টি খাড়া সারিতে ছোট ছোট খোপে টেরাকোটা ফলক স্থাপিত ছিল। কালের আঘাত, দীর্ঘদিনের অযত্ন এবং বহিরাগতদের অত্যাচার— এই তিন আঘাতে তার অধিকাংশই বর্তমানে বিনষ্ট। ২. গর্ভগৃহের বাইরে উত্তরের দেওয়ালে একটি ভিনিশীয় রীতির অর্ধোন্মুক্ত দরজায় প্রতীক্ষারতা ‘দ্বারবর্তিনী’ মূর্তি স্থাপিত। ৩. মন্দিররের দ্বিতলের উত্তরের দেওয়ালের প্রান্তদেশে স্তম্ভ সহ ভিনিশীয় রীতির দুই পাল্লা বিশিষ্ট ‘প্রতিকৃতি গবাক্ষ’ রচিত আছে।  মন্দিরের সংলগ্ন করে একটি রাসমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এটিও নব-রত্ন রীতির। আটটি স্তম্ভ এবং আটটি দ্বারপথ বিশিষ্ট এই সৌধের চূড়াগুলির গঠন ‘বেহারীরসুন’ গোত্রের। প্রত্যেকটি দ্বারপথের মাথার উপরের অংশে টেরাকোটা ফলক যুক্ত করা হয়েছিল। সেগুলিরও অধিকাংশই বর্তমানে অবহেলা এবং অত্যাচারে বিনষ্ট। কোনও লিপি নেই, তবে এটি মূল মন্দিরের সমসাময়িক কালের নির্মাণ বলে অনুমান করা যায়।

সাক্ষাৎকার
অধ্যাপক শ্রীমদন মোহন রায় (টেলিফোন যোগে)— উল্টোডাঙা, কলকাতা। শ্রীস্বপন কুমার সাঁতরা এবং শ্রীতরুণ কুমার কয়োড়ী (পুরোহিত)— আলুই।

পথনির্দেশ
মেদিনীপুর শহর কিংবা চন্দ্রকোনা রোড স্টেশন থেকে ক্ষীরপাই হয়ে ঘাটাল যাওয়ার পথে রাধানগর। ঘাটাল শহর থেকেও বিপরীত পথে, রাধানগর আসা যাবে। রাধানগর থেকে দক্ষিণে ৩ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে (নিয়মিত ট্রেকার ইত্যাদি ছোট গাড়ি যাতায়াত করে) কাটান পুল। সেখানে নেমে পূর্বমুখে ১ কিমি দূরে আলুই গ্রাম।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *