স্ট্যান স্বামী, জেসুইট পাদ্রি, লিবারেশন থিয়োলজিস্ট ও বাগাইচা বিষয়ক দু-চার কথা

Stan Swamy

পার্থ প্রতিম কুণ্ডু

সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য সর্বজন স্বীকৃত। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই গ্রাহ্য হবে এটাই রীতি। কিন্তু যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে জয়ী রাষ্ট্রনায়কের দমনপীড়ন বিচারবুদ্ধি নিকট অসহনীয় মনে হয়, তখন কিছু প্রশ্ন থেকেই যায় এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ।

গতকাল (৫ জুলাই ২১ সোমবার) অশীতিপর পাদ্রি স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু সমগ্র মানবজাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন আগে তালোজা জেল থেকে তিনি ভিডিয়ো কনফারেন্সে আবেদন জানিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী জামিনের। আদিবাসী লড়াইয়ে উৎসর্গকৃত প্রাণ ফাদার স্ট্যান ছিলেন রাষ্ট্রের চোখে মারাত্মক ষড়যন্ত্রকারী(!) এক ব্যক্তি। গরিব আদিবাসীদের উপর রাষ্ট্রের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে গিয়ে খ্রিস্টের শান্তির বাণী প্রচারক ফাদার স্ট্যান স্বামী কখন কীভাবে যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন, সেটাই ছিল ন্যায়ালয়ের বিচারাধীন। চূড়ান্ত অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২৮ মে (তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে), ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয় গত পরশু আর গতকাল অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের শুনানির আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। রাষ্ট্রের বিচারে, এনআইএ-র চোখে তাঁর তেমন কোনও ‘বড় অসুখ’ ছিল না। অথচ চশমাবিহীন তিনি ছিলেন অন্ধ এবং শুধুমাত্র তরল খাবারই স্ট্র ও সিপারের সাহায্যে কোনওক্রমে খেতেন। ‘বিশেষ’ সতর্কতার কারণে ওই দু’টি জিনিসও আদায় করতে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। এই মৃত্যু তাই রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনের বিচারে হত্যারই শামিল।

এই ‘ষড়যন্ত্রকারী'(!) বৃদ্ধ স্ট্যানের মৃত্যু কতগুলি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ন্যায় বিচার ও একটু মানবিকতা কি প্রাপ্য ছিল না তাঁর? ‘রাষ্ট্র খুন করল এক আপসহীন মানবাধিকার কর্মীকে’— জয়রাম রমেশের এই মন্তব্য কি কোনও ঝড় তোলে না আমাদের বিবেকে? এটাকে পরিকল্পিত হত্যা বলে বর্ণনা করেছেন তিস্তা শেতলবাদ।

রবীন্দ্র নাটকে (মালিনী) ক্ষেমঙ্কর কি একই প্রশ্ন তুলেছিল না রাজার বিরুদ্ধে?

“সত্য মিথ্যা পাশাপাশি নির্বিরোধে রবে
এত স্থান নাহি নাহি অনন্ত এ ভবে।
…………………………………….
কেহ বা ধর্মের লাগি সহি নির্যাতন
অকালে অস্থানে মরে চোরের মতন ,
…………………………………….
হেন বিপরীত ধর্ম এক বক্ষে বহে—”

রবীন্দ্র অনুরণনে সুপ্রিয়ের মতো আমরা কেঁপে উঠে বলি—
“বেশি বল যার
সেই বিচারক। সে যদি চিনিত আজি
দৈবক্রমে, সে বসিত বিচারক সাজি ,
তুমি হতে অপরাধী।”

“Where is the life we have lost in living?
Where is the wisdom we have lost in knowledge?
Where is the knowledge we have lost in information?”

সুদূর ইংল্যান্ডে বসে T.S Elliot এই শাশ্বত পঙক্তিগুলো চয়ন করেছিলেন যে গাঢ়তর উপলব্ধিতে, তার ঠিক বছর তিনেক পর (২৬ এপ্রিল, ১৯৩৭) জন্মগ্রহণ করেন ফাদার স্ট্যান স্বামী। বর্তমান সময়ের চক্র বৃত্তে যে স্বদেশ, যে সময়, বোধের স্তর থেকে টেনে নামাচ্ছে বোধহীনতায়, ঠিক তখনই রাষ্ট্র তার দ্রোহের বিচার সংজ্ঞায়, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে প্রশ্ন তোলার মানুষগুলোকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে সহায়শূন্যতায়। নিত্যকালীন সংকট থেকে মানুষকে পরিত্রাণ দিতে যে মানুষগুলো ভালো আর মন্দের সংঘাতে জর্জরিত হয়ে, ধনী-নির্ধনের ভেদাভেদের সহস্র জিজ্ঞাসা নিয়ে রুখে দাঁড়াচ্ছে, তাঁদেরই একজন হলেন এই ফাদার স্ট্যান স্বামী। অথচ ফেড্রিক ফেলিনির ‘লা দোলচে ভিতা’ ছবির সূচনায় ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতোই আকাশ-শূন্যতায় ভেসে গেলেন এই পাদ্রি। ডেরেক ও’ব্রায়েন টুইট করে যথার্থই বলছেন, “ফাদার এদের ক্ষমা করো, এরা জানে না এরা কী করছে।”

প্রখ্যাত গবেষক বাসু আচার্যর এক অভিজ্ঞতালব্ধ রচনা থেকে সংযোজন:
“ফাদার সম্পর্কে আগেই শুনেছি, যেস্যুইট পাদ্রী তিনি। দেশের একজন প্রমুখ লিবারেশন থিয়োলজিস্ট। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে গোটা ‘বাগাইচা’ ঘুরলাম, একই জায়গায় দু’তিনবারও গেলাম কিন্তু কোনো উপাসনা কক্ষ খুঁজে পেলাম না। শেষে ফাদার স্ট্যানের ঘরের কাছে পৌঁছতে উনি ভেতরে ডাকলেন। ইংরাজিতে যাকে বলে ফ্রেইল, একদম তাই। কণ্ঠস্বরও কাঁপা কাঁপা। কিন্তু চশমার ওপারের চোখদুটো হীরকখণ্ডের মতো জ্বলজ্বল করছে। ওই লম্বা অথচ সিরিঙ্গে রোগা, রোদে পুড়ে যাওয়া কাঠামোটার সমস্ত প্রাণশক্তি যেন ওই চোখ দুটোর মধ্যেই ঘনীভূত হয়েছে। মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে রইলাম ওঁর দিকে। সেই প্রথম আমি স্বচক্ষে কোনো লিবারেশন থিওলজিস্টকে দেখলাম। শুরু হল আলাপ পর্ব। নিজের নাম, পরিচয়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ছোট্ট বিবরণ দিয়ে প্রশ্ন করলাম: “কমরেড ফাদার, গত একঘণ্টায় আমি গোটা ‘বাগাইচা’ ঘুরে দেখলাম। আপনি সত্যিই অসাধ্য সাধন করেছেন। কিন্তু… কোনো উপাসনা কক্ষ তো খুঁজে পেলাম না!” ফাদার স্ট্যান এবার স্মিত হাসলেন। আমি বলে চললাম, “সত্যিই… যেভাবে আপনি বিপ্লবীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তাকে অসাধ্য সাধন ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। তুলনা হয় না কোনো। এরকম বিশাল এস্ট্যাব্লিশমেন্ট পীড়িত মানুষের বন্ধুদের জন্য আপনি যেভাবে খুলে দিয়েছেন, এদেশে তা এক বিরলতম ঘটনা। কীভাবে গড়ে তুললেন ‘বাগাইচা’?” কাঁপা কাঁপা গলায় হে হে করে হেসে ওঠে ফাদার বললেন, “এসবই করেছি যেস্যুইটদের অর্থানুকুল্যে। আমি ওঁদের বলেছিলাম, ‘তোমাদের তো অনেক টাকা, আমাকে আমার মতো করে কাজ করতে দাও না বরং? আমি বিল পাঠিয়ে দেব।’ তা… যেভাবে যেভাবে কাজ এগোতো, আমি বিল পাঠিয়ে দিতাম। সেই অনুযায়ী ওঁরা টাকা দিতেন। এইভাবেই ‘বাগাইচা’ তৈরি হল। পরদিন সকালে আমি লাইব্রেরি ঘরের সামনে পৌঁছে যাই। প্রশ্ন করলাম: “আচ্ছা ফাদার, আপনি তো দক্ষিণ ভারতের মানুষ, পড়াশোনা বিদেশে। তা হঠাৎ এই ঝাড়খণ্ডে কেন?” ফাদার বললেন, “আমি পড়াশোনা করেছি ম্যানিলায়। এখানে আমার আসার উদ্দেশ্য ছিল উপাসনা। উপাসনা করতেই এসেছিলাম। এসেছিলাম এখানকার অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে। যখন আসি তখন বয়স অনেক কম ছিল।” আমি এবার আসল কথাটা সেরে ফেললাম: “লোকে বলে আপনি একজন লিবারেশন থিয়োলজিস্ট।” স্ট্যান আবারও স্মিত হাসলেন। কিন্তু আমি তো ছাড়ার পাত্র নই। প্রশ্নটা তাই নতুন করে ছুড়ে দিলাম: “বেশ। নিজেকে কী বলতে ভালোবাসেন?” আমার দিকে ওই উজ্জ্বল দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে উনি উত্তর দিলেন: ‘কমিউনিস্ট’। এবার আমার বিস্মিত হওয়ার পালা! মুখ দিয়ে আপনা থেকেই বেরিয়ে গেল: ‘কমিউনিস্ট!’ ফাদার সপ্রতিভ কণ্ঠে বলে উঠলেন: “হ্যাঁ, অবশ্যই। যিশু নিজেই তো ছিলেন একজন আর্লি কমিউনিস্ট। তাঁর প্রেরণাতেই আমি আর্ত মানুষের সেবায় নিয়োজিত হয়েছি।” কথাটা শুনেই এঙ্গেলসের ‘হিস্ট্রি অফ আর্লি ক্রিশ্চিয়ানিটি’ মনে পড়ে গেল। আবারও ফিরে গেলাম প্রথম প্রশ্নে, “তার মানে এখানে আলাদা করে কোনো প্রেয়ার রুম নেই, তাই তো?” ফাদার হেসে ফেললেন। আমি করমর্দন করে উঠে এলাম। শিরা বের করা কাঁপা কাঁপা হাতগুলো ছুঁয়ে অনুভব করলাম— কীভাবে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির পেটে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ লুকিয়ে থাকে। ততক্ষণে অন্ধকার নেমেছে, শুরু হয়েছে ঝিঁঝির কোরাস।”

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Tarunkanti Pathak

    লেখাটি পড়েভালো লাগলো, ঋদ্ধ হলাম। ফাদার সম্পর্কে কিছুই প্রায় জানতাম না।
    ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *