একাকী নির্জন পথে সুধীর চক্রবর্তী

পূর্বা মুখোপাধ্যায়

অনুশীলন পরিশীলন ধী-স্থিতি অধ্যবসায় কৃচ্ছ্রসাধন প্রজ্ঞানির্ভরতা ইত্যাদি শব্দগুলি ক্রমশ অভিধানগত অর্থে সীমাবদ্ধ হবে একদিন। প্রকৃত চর্চাক্ষেত্রের অভাবে ভাবগুলির অপমৃত্যু হবে। কারণ মধ্যমেধার ঢেউ কখনও তত উঁচুতে ওঠে না। আমরা আলস্যবশত ততদূর উঁচুতে যেতে চাই না। পূর্বসূরিদের হাত থেকে মশাল তুলে নেব বলে হাত বাড়াই না। আমরা পরিশ্রমকাতর। কিন্তু অতীতগৌরব ছাড়তে পারি না বলে উচ্চকণ্ঠে স্বীকার করি আমাদের একজন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন, একজন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ছিলেন, আমাদের একজন সুধীর চক্রবর্তী কিছুক্ষণ আগেও ছিলেন। দু’হাজার কুড়ি আমাদের নিঃস্ব করে লুঠে নিয়ে গেল।

সুধীর চক্রবর্তী কে? এক কথায় কী এর উত্তর? দক্ষ শিক্ষাব্রতী? লোকায়ত গবেষক? রবীন্দ্রগানের নিমগ্ন বোদ্ধা? সুপণ্ডিত সম্পাদক? না আলোকিত-আত্মপথিক, যাঁর দুর্বার প্রাণশক্তি বহুধা বিভক্ত হয়ে শুধু নিজেকে আবিষ্কার করতে ভালোবেসেছিল? এক জীবনে তিনি যতকিছু হয়েছেন, তার যে কোনও একটি পরিচয়েই প্রভূত যশ, প্রতিপত্তি, বিত্ত এবং সুনিশ্চিত সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন করা সম্ভব। ধুলোবালির সংসারে বাধাবহুল ক্ষেত্রগবেষণা করতে নামার দরকারই পড়ে না।

তবু, আজীবন তিনি কোন আনন্দে ভেসে রইলেন, কোন জাদুতে লোকজীবনের অন্দরে প্রবেশ করে তাদের পরমাত্মীয়তা অর্জন করলেন, আশিরনখ পরিশীলিত রবীন্দ্রানুরাগী শিক্ষাবিদ, যাঁর কলমে রবীন্দ্রসৃষ্টিলোক স্বতন্ত্র বিভায় ভাস্বর, সেই মানুষটিই কেমন করে আউল বাউল ফকিরের সঙ্গে ধূলিধূসর হয়ে তত্ত্ব-আলোচনায় মাতলেন, তাঁদের সুখ-দুঃখের দোসর হলেন, দুর্দিনের নির্ভরও হলেন, আসল মানুষটির দেখা মেলে সেইখানেই। তিনি ছাড়া মরমিয়া সাধনার অরূপ লীলা এমন প্রাঞ্জল করে কে জানাতেন আমাদের? আনন্দবাদী তিনি। আনন্দ ছাড়া আর কোনও শর্তে আবদ্ধ নন। অশীতিপরতাকে রুখে দেওয়া সেই আনন্দ মাত্র কিছুক্ষণ আগে আড়াল হল। তিনি এখন পঞ্চভূতে বিরাজমান। অনিবার্য মরণের মুখোমুখি অগ্নিশুদ্ধ চিরায়ত তাঁর সেই অনশ্বরতাকে মুগ্ধমনে প্রণাম করি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *