সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’: সুখপাঠ্যের অন্তরালে

স্বর্ণালী দত্ত

‘অসম্ভবের ছন্দে’ সুকুমারের ‘আবোল তাবোল’ শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেরই সুখপাঠ্য। ছড়ার ছন্দ ব্যবহার করে, অসম্ভব, উদ্ভট, কিম্ভূত শব্দ-ছবি এঁকে কবি উপহার দিয়েছেন মন ভালো করা একাধিক অমর সৃষ্টি। “ছড়ায় উদ্ভট (অ্যাবসারড) ও আপাত অর্থহীনতার (নন্‌সেন্স) মধ্য দিয়ে রসসৃষ্টির কৃতিত্বে সুকুমার রায়ের জুড়ি নেই। আবোল তাবোল-এ সেই কৃতিত্ব সমধিক উজ্জ্বল। এর অন্তর্ভুক্ত পঁয়তাল্লিশটি ছড়ার মধ্যে বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা এত বেশী যে কোনও একপ্রকার শ্রেণীতে এদের বাঁধা যায় না।” শুধুমাত্র হাস্যরসের আধার হলে ‘আবোল তাবোল’ নিয়ে ব্যাখ্যার স্বরূপ লঘু হত। কিন্তু ছড়াগুলোর মধ্যে যে রসদ লুকিয়ে আছে, তা সন্ধান না করতে পারলে এর পাঠ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আপাত অর্থের আড়ালে সুকুমার যত্নে বপন করেছেন একাধিক গভীর বিষয়ে নিয়ে নানান কথা। ‘আবোল তাবোল’-এর ছড়াগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থগুলো সন্ধান করতে গিয়ে কতগুলি বিভাগে ভাগ করতে পারা যায়— (১) সামাজিক, (২) রাজনৈতিক, (৩) প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, (৪) গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি এবং (৫) অন্যান্য। সব ছড়াকেই যে এই বিভাগগুলির অন্তর্ভুক্ত করা যায় এমন কথা বলা যায় না। এমন অনেক ছড়াই আছে, যা শুধুমাত্র হাসির উদ্রেকের জন্যই, শুধুই আনন্দদায়ক। হয়তো এদের মধ্যেও কোনও অর্থ লুকিয়ে আছে, তবে তার সন্ধান মেলেনি। উল্লিখিত বিভাগগুলির বিশ্লেষণ করা যাক—

আরও পড়ুন: গতকাল যেভাবে এইসব লিখেছিলাম

১) সামাজিক:
এই পর্যায়ের মধ্যে যে ছড়াগুলোর উল্লেখ করা যায়, তা সবই অনুমান নির্ভর। নিবিড় পাঠের দ্বারা ছড়া ও তার একটি বিশেষ কারণকে মিলিয়ে দেখলে দেখা যায়, কবি ছড়াগুলোর মাধ্যমে আমাদের কাছে কয়েকটি বিশেষ সামাজিক অবস্থান তুলে ধরতে চেয়েছেন। এই শ্রেণির প্রথম উদাহরণ হিসেবে ‘খিচুড়ি’ ছড়াটির উল্লেখ করতে পারি। এই ছড়াতে কবি বলেছেন,  “হাঁস ছিল; সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),/ হয়ে গেল ‘হাঁসজারু’ কেমনে তা জানি না।/ বক কহে কচ্ছপে— ‘বাহবা কি ফুর্তি!/ অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি’।” প্রথম কয়েকটি লাইনের মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন, একটি প্রাণী কি সহজেই নিজের অর্ধেক অংশের সঙ্গে অন্য একটি প্রাণীর অর্ধেক অংশ যুক্ত করে একটি কিম্ভূত কিমাকার চেহারা  নেয়, অথচ তাদের এই রূপ ‘খাসা’। নতুন এই অবতারে তারা যথেষ্টই ‘ফুর্তি’ অনুভব করছে। প্রশ্ন জাগতেই পারে কবি হঠাৎ এই খিচুড়ি রূপ বর্ণনা করতে গেলেন কেন? কবির গভীর মনস্তত্ত্ব বোঝা যায় ছড়াটির পাঠ বিশ্লেষণ করলেই। আসলে এই ছড়ার মাধ্যমে কবি একটি সামাজিক ব্যঙ্গ তুলে ধরেছেন পাঠক মহলের কাছে। খিচুড়ির প্রত্যেকটি প্রাণী আসলে নিজের প্রকৃত পরিচয় অবলুপ্তকারী মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ। বিশেষ করে নব্যশিক্ষিত বাঙালিশ্রেণির কথাই কবি বলেছেন। ব্রিটিশ শাসনের সময় এই বাঙালিরা সরকার মহলকে তুষ্ট করার জন্য নিজেদের পোশাকে, আচারে, সংস্কৃতিতে ইংরেজি আদবকায়দার সংমিশ্রণ ঘটাচ্ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এইভাবে ওপর মহলে, সরকারি দপ্তরে নিজের জায়গা করে নেওয়া। নিজেদেরকে ইংরেজি কেতাদুরস্ত করে তোলার জন্য ধুতি পাঞ্জাবির ওপরে কোট, পায়ে পাম্পশু পরে হাস্যকর পরিবেশের সৃষ্টি করত। বলা বাহুল্য, তাদের মনোবৃত্তি কবি যেভাবে ছরায় ফুটিয়ে তুলেছেন তা সত্যিই অতুলনীয়— “সিংহের শিং নেই, এই তার কষ্ট—/ হরিণের সাথে মিলে শিং হল পষ্ট”।

আরও পড়ুন: নীলাঞ্জন হাজরার কবিতা: ‘অস্বীকার করেছি মানচিত্রের কঠোর সীমানা’

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি বয়কট আন্দোলন। আমরা দেখেছি এই স্বদেশি আন্দোলনের সময় সমস্ত বিদেশি দ্রব্য বয়কট করা এবং দেশীয় জিনিস ব্যবহার করা নিয়ে সমাজে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। বিদেশি দ্রব্যের তুলনায় দেশে উৎপাদিত সামগ্রীর মান অনেক অনুন্নত এবং দামও বেশি। ফলে সমাজের সর্বত্র এই আন্দোলন সাদরে গৃহীত হয়নি। এই বিষয়কে ভাবনার মধ্যে রেখে সুকুমার লিখে ফেললেন ‘ছায়াবাজি’। এই ছড়ায় ছায়ার রকমফের বিবৃতকারী ও ছায়াধরা ওষুধ বিক্রেতা লোকটি সাধারণ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করে ছায়ার উপকারিতা এবং ছায়া কী কী ভাবে রোগ নিরাময় করতে পারে— “গাছ গাছালি শেকড় বাকল মিথ্যে সবাই গেলে,/ বাপ্‌রে বলে পালায় ব্যামো ছায়ার ওষুধ খেলে।/ নিমের ছায়া ঝিঙের ছায়া তিক্ত ছায়ার পাক,/ যেই খাবে ভাই অঘোর ঘুমে ডাক্‌বে তাহার নাক্‌।” ঠিক এইভাবেই যেন স্বদেশিরা জনগণকে দেশীয় পণ্যের উপকারিতা বুঝিয়েছিল। কিন্তু এই পণ্য অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ, নিম্নবিত্ত সমাজের কাছে আকাশছোঁয়া হয়ে পড়েছিল। ছায়ার ব্যবসায়ী অনেকটা ছায়ার বর্ণনা করার পর অবশেষে বলে, “পাক্কা নতুন টাট্‌কা ওষুধ  এক্কেবারে দিশি—/ দাম করেছি শস্তা বড়, চোদ্দ আনা শিশি”, বলা বাহুল্য ‘শস্তা’ বলতে তৎকালীন প্রেক্ষিতে যা বোঝায় এই ওষুধ তার থেকে দামি, চোদ্দ আনা অর্থাৎ এক টাকার কিছু কম অর্থমূল্য সেইসময়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে ওষুধের জন্য ব্যয় করা কষ্টসাধ্য ছিল। ছায়া ধরার আড়ালে এ সত্যই ‘আজগুবি নয়, আজগুবি নয়, সত্যিকারের কথা’।

আরও পড়ুন: শঙ্খ ঘোষ: ‘আমার চলা ছিল আমার নিজস্ব’

এইরকম আরও একটি ‘সত্যি’ পাওয়া যায় ‘সৎ পাত্র’ছড়ায়। বহুকাল ধরে প্রচলিত কুলীনব্যবস্থা নিয়েও সুকুমার ব্যঙ্গ করেছেন হালকা চালে। পাত্র গঙ্গারামের সামাজিক অবস্থান মন্দ, তবুও ‘মন্দ নয়, সে পাত্র ভালো’, ‘বিদ্যে বুদ্ধি’ অস্তাচলে, পরিবারের লোকজনও বিশেষ সুবিধার নয়, সম্মানের নয় তা সত্ত্বেও ‘এমন কি আর মন্দ ছেলে?’। সুকুমার জানিয়েছেন, সে কংসরাজের বংশধর অর্থাৎ তার বংশ গৌরব একচিলতেও নেই, শ্যাম লাহিড়ী নামটার পিছনে শ্যামবর্ণ ভারতীয় কোনও এক নাম করা ব্যক্তিকে বোঝাতে চেয়েছেন যিনি গঙ্গারামের দূরের কেউ। কুলীন পাত্রের স্বরূপ কি ছিল তা গঙ্গারামকে দেখলেই স্পষ্ট হয়। এই রকম সামাজিক নানান বিষয় নিয়ে সুকুমারের ছড়াগুলি হালকা চালের এবং বিশেষ উপভোগ্য।

আরও পড়ুন: প্রকৃত কবিতা থাকে শুভকামনার মতো জন্মে ও বিদায়ে

২) রাজনৈতিক:
বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের মধ্যে লেখা একাধিক ছড়ায় আমরা প্রচ্ছন্নভাবে ব্রিটিশ সরকার, জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, সরকারি নানান ব্যবস্থা নিয়ে কথা পাই। ‘কুম্‌ড়োপটাশ’-এ যে উদ্ভট কুম্‌ড়োপটাশকে কবি এঁকেছেন, বেশিরভাগ সমালোচক মনে করেন সেই ছবি আসলে ১৯১৬ সালে ভারতে ভাইসরয় হয়ে আসা লর্ড চেল্মসফোর্ড-এর। তাঁর কর্মকাণ্ডকে ব্যঙ্গ করেই ছড়াটি রচনা হয়। কবি শেষে ভাইসরয়ের ক্ষমতাকে তাচ্ছিল্য না করার জন্য মজা করে সাবধান বাণীও দেন— “তুচ্ছ ভেবে এসব কথা করছে যারা হেলা,/ কুম্‌ড়োপটাশ জান্‌তে পেলে বুঝ্‌বে তখন ঠেলা।/ দেখবে তখন কোন্‌ কথাটি কেমন ক’রে ফলে, আমায় তখন দোষ দিও না, আগেই রাখি ব’লে”। ‘একুশে আইন’ যে আসলে ১৯২১ সালের রাওলাট আইনের কাঠিন্যকেই তুলে ধরে লেখা, তাতে সন্দেহ হয় কি? এই আইন ছিল সত্যই, “শিবঠাকুরের আপন দেশে,/ আইন কানুন সর্বনেশে”। এই আইনের মারপ্যাঁচ সুকুমারের মনে প্রশ্ন তুলেছিল বলেই তিনি লিখেছিলেন, “চল্‌তে গিয়ে কেউ যদি চায়,/ এদিক্‌ ওদিক্‌ ডাইনে বাঁয়,/ রাজার কাছে খবর ছোটে,/ পল্টনেরা লাফিয়ে ওঠে,/ দুপুর রোদে ঘামিয়ে তায়/ একুশ হাতা জল গেলায়”। এইভাবে আইন অমান্য করলে ‘একুশ টাকা দণ্ড’ হয়, নস্যি দিয়ে ‘একুশ দফা হাঁচিয়ে মারে’, ‘সেলাম ঠোকায় একুশবার’ এবং ‘একুশটি পাক ঘুরিয়ে তাকে/ একুশ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখে’। ব্রিটিশ সরকার থেকে যে তরুণরা আইসিএস হয়ে ভারতে এসে কাজে যোগ দেন তাঁদের কাজের ধরনের করুণ অবস্থা দেখে সুকুমার অবাক হন। সম্পূর্ণ অজানা অচেনা দেশে এসে কাজ করতে গিয়ে এইসব অফিসাররা মনে করত, “উৎসাহে কি না হয়? কি না চেষ্টায়?/ অভ্যাসে চট্‌পট্‌ হাত পাকে শেষটায়।”

কিন্তু শেষপর্যন্ত যে তারা এই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি ও জোড়াতাপ্তি দিয়ে কাজ করছিল তার ব্যঙ্গ করতে সুকুমার পিছপা হননি— “ছেলে হও, বুড়ো হও, অন্ধ কি পঙ্গু,/ মোর কাছে ভেদ নাই, কলেরা কি ডেঙ্গু—/ কালাজ্বর, পালাজ্বর, পুরানো কি টাট্‌কা,/ হাতুরির একঘায়ে একেবারে আট্‌কা!” (হাতুড়ে)। কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ নিয়ে দু’টি উল্লেখযোগ্য ছড়া ‘বাবুরাম সাপুড়ে’ ও ‘নারদ! নারদ!’। প্রথমটিতে, বাবুরামকে যে দু’টি সাপ আনতে বলা হয়েছে সে-দু’টি হল আলোচ্য দু’টি দল। ব্রিটিশ সরকার নিজেদের মনের মতো করে দলদু’টিকে পরিচালনা করতে চেয়েছিল। এদের মধ্যে অহিংসায় বিশ্বাসী গান্ধিজির প্রসঙ্গ আছে বলে অনুমান করা যেতে পারে কারণ, সেই সাপই চাই যার ‘শিং নেই নোখ্‌ নেই’, ‘কাউকে যে কাটে না’। এইরকম সাপ আনতে পারলেই, অর্থাৎ, এইরকম দল হলে সরকার খুব সহজেই নিজের কার্যসিদ্ধি করতে পারবে— “সেই সাপ জ্যান্ত/ গোটা দুই আনত!/ তেড়ে মেরে ডাণ্ডা/ ক’রে দিই ঠান্ডা”। শেষের ছড়ায় দ্বন্দ্ব এই দুই দলের মধ্যেই। ধরা হয়, কংগ্রেসের নরমপন্থী থেকে চরমপন্থী হওয়া নিয়ে মুসলিম লিগের সঙ্গে সংঘাতের রূপ ফুটে উঠেছে ছড়ায়। এখানে কবির আঁকা ছবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একজনকে পইতে পরে আর অন্যজনকে দাঁড়ি মুখে দেখা যায়। সেখান থেকেই এই দুই দলকে অনুমান করা হয়েছে। দাড়িওয়ালা লোকটি বলছে, “হ্যাঁরে হ্যাঁরে তুই নাকি কাল সাদাকে বল্‌ছিলি লাল?”, “তোদের পোষা বেড়ালগুলো শুন্‌ছি নাকি বেজায় হুলো?”। এরপর দু’জনের মধ্যে ঝগড়া বাঁধলে দুতরফাই অবস্থা হয়, ‘কামেন্‌ ফাইট্‌! কামেন্‌ ফাইট্‌!’। মারপিটের তোড়জোড় করে তারপর ‘মামা’ অর্থাৎ, পুলিশকে ডেকে সব মিটিয়ে নেওয়ার যে চেষ্টা তাতে কবির যে ব্যঙ্গ তা মনে করিয়ে দেয় বহুল প্রচলিত প্রবাদকে— ‘মুখে মারিতং জগৎ’।

৩) প্রথম বিশ্বযুদ্ধ:
সুকুমারের ছড়াগুলির মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিশেষ প্রভাব দেখা যায়। তাঁর অনেক কবিতায় এই সংকটকালীন পরিস্থিতির বিভিন্ন দিকের উল্লেখ আছে। এই গোত্রের ছড়াগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কাঠ বুড়ো’, ‘গোঁফ চুরি’, ‘লড়াই ক্ষ্যাপা’, ‘গানের গুঁতো’, ‘খুঁড়োর কল’। ছড়াগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুকুমার কতটা নিপুণভাবে শব্দ বুনেছেন একটা বিশ্বব্যাপী অস্থির অবস্থাকে তুলে ধরতে। ‘কাঠ বুড়ো’১০-তে কবি লিখলেন, ‘আকাশেতে ঝুল ঝোলে, কাঠে তাই গর্ত?’— আপাতত দৃষ্টিতে এটি একটি উদ্ভট কথা মনে হলেও এর পশ্চাতে একটি উদ্ভট কাজ লুকিয়ে আছে। ধরা হয় যে, ১৯১৪ সালের দ্বিতীয়ার্ধে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য সৈন্য নিয়োগের সময়ে ‘martial races’ তত্ত্ব প্রয়োগ করে বিশেষ ক্ষেত্রে ‘caste’ অনুযায়ী নিয়োগ করা হয়। এই তত্ত্বের বাংলা করলে দেখা যায়, এর অর্থ যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত জাতি। ব্রিটিশ আধিকারিক H. H. Risley ভারতে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকার সময় ‘জাতিভেদ প্রথা’র ওপর ভিত্তি করে হিন্দু জনসংখ্যা নির্ণয় করেছিলেন। তাঁর এই হটকারী সিদ্ধান্ত সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে এবং যুদ্ধের সময় সৈন্য নির্বাচনেও এর প্রভাব দেখা যায়। দেশীয়দের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের নিম্ন মনভাব কবি তুলে ধরেছেন বেশ কয়েকটি লাইনে—  “… “জানি কোন্‌ কাঠ কিসে হয় জব্দ।/ কাঠকুটো ঘেঁটেঘুঁটে জানি আমি পষ্ট,/ এ কাঠের বজ্জাতি কিসে হয় নষ্ট।/ কোন্‌ কাঠ পোষ মানে, কোন্‌ কাঠ শান্ত,/ কোন্‌ কাঠ টিম্‌টিমে, কোন্‌টা বা জ্যান্ত।“ ‘কাঠ’ শব্দের সংস্কৃতরূপ ‘কাষ্ঠ’। প্রকৃত সংস্কৃত উচ্চারণে আমরা সহজেই ‘কাষ্ঠ’ ও ‘caste’-কে মিলিয়ে নিতে পারি এবং ‘বুড়ো’ আসলে যে Risley, তাতেও সন্দেহ থাকে না। ‘গোঁফ চুরি’১১-তে সরকারি অফিসের ‘বড়বাবু’র কথা বলা হয়েছে যিনি দিব্যি থাকেন তাঁর ‘চেয়ারখানি চেপে’। লক্ষণীয়, কবি যে বড়বাবুর ছবি এঁকেছেন, তাতে তিনি পশ্চিমি পোশাকে ও সাজে। এখান থেকে সহজেই বড়বাবুর মানসিকতা ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। বড়বাবু নিজের কল্পনাতেই যে গোঁফ হারানো নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তা আসলে বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে তাঁর ক্ষমতা, চেয়ার এবং পোস্টের রূপক মাত্র। সরকারি ওপরমহলের অধীনে নিজের অবস্থান হারিয়ে ফেলার দুঃস্বপ্নই তিনি দেখেছিলেন, তাইতো ‘একলা বসে ঝিম্‌ঝিমিয়ে হঠাৎ গেলেন ক্ষেপে’। এই ছড়ায় আরও একটি দিকের ওপর আলো ফেলেছেন কবি। সাধারণত ‘শ্যাম’ নামটি কবি শ্যামবর্ণের ভারতীয়দের বোঝাতেই ব্যবহার করেছেন। সেইদিক থেকে বিচার করলে ভারতীয় বড়বাবুর আর এক ভারতীয় শ্যামবাবুর প্রতি তাচ্ছিল্য ভাব এবং তাদের গয়লার প্রতি ঘৃণার ভাব ফুটে ওঠে এইভাবে— ‘‘নোংরা ছাঁটা খ্যাংরা ঝাঁটা বিচ্ছিরি আর ময়লা,/ এমন গোঁফ ত রাখ্‌ত জানি শ্যামবাবুদের গয়লা।’’ কর্মস্থলে নিজের জায়গা যে কেনা যায় না, কর্মক্ষমতা দিয়ে অর্জন করতে হয় এবং বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিবেশে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করা ভারতীয়রা কতটা নীচ ছিল তার কথাই বলেছেন ছড়ায়। শেষে কবির চরম ব্যঙ্গ: ‘‘গোঁফকে বলে তোমার আমার— গোঁফ কি কারো কেনা?’’ এই ছড়ার মতোই কবির আঁকা ছবি থেকে তাঁর অন্য ছড়াগুলোকেও পাঠ করা যায়। যেমন, ‘খুড়োর কল’১২ ছড়ায় আমরা দেখতে পাই, সুকুমার এঁকেছেন এক বিদেশি পোশাকের লোক গায়ে কল লাগিয়ে এগোচ্ছে, কলের সামনে দড়িতে খাবার আটকানো, খাবারের লোভেই যেন সে ছুটছে। স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যায়, ছড়ার যে খুড়ো ‘পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা যাবে দেড় ঘণ্টায় চলে’, সে আসলে খিদের তাড়নায় ব্রিটিশ যন্ত্র দ্বারা চালিত এক অসহায় খুড়ো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পাশ্চাত্যের কার্টুনিস্ট W. H. Robinson তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক কার্টুন এঁকেছিলেন। সেগুলির সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে, Some ‘Frightful’ War Pictures (Duckworth, London)। এই সংকলনের একটি বিশেষ ছবির সঙ্গে আলোচ্য ছড়ার মিল পাওয়া যায়। সেই ছবিতে দেখানো হয়েছে, যুদ্ধের সময় কীভাবে নেটিজেনদের যন্ত্রে পরিণত করা হত। ছবির বাঁ-দিকে লেখা ছিল: “XV. BRITISH PATENT (applied for)/ The Lancing Wheel for teaching young Lancers to lance.”। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সংঘটিত আর একটি ঘটনার রূপকরূপ পাওয়া যায় ‘গানের গুঁতো’১৩-তে। যে ইলাস্ট্রেসন করেছেন সুকুমার রায়, তার সঙ্গে ‘হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবির মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যুদ্ধের সময় মাদ্রাজ শহরে জার্মান যুদ্ধ জাহাজ ‘এমডেন’-এর গোলাবর্ষণের ফলে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সময়টা আনুমানিক অক্টোবর-নভেম্বর, ১৯১৪। এই জাহাজটি ঘটনার দিন কয়েক আগে থেকে বঙ্গোপসাগরে ঢুকে চুপচাপ ছিল (“জলের প্রাণী অবাক মানি গভীর জলে চুপ চাপ্‌”)। এরপরই কলকাতা-রেঙ্গুন-কলম্বো বাণিজ্যিক জলপথে আক্রমণ শুরু করেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার খবরটি প্রকাশ্যে আনে না। এরপরেই সে গোলাবর্ষণ শুরু করে এবং “আওয়াজখানা দিচ্ছে হানা দিল্লী থেকে বর্মা”। ছড়ায় ভীষ্মলোচন শর্মার ‘গানের গুঁতো’ আসলে এমডেনের ‘gun’-এর গুঁতো। আরও একটি প্রতীক হল, HMAS Sydney জাহাজ, যা থাকত Goat Island-এ। এটাকেই ছড়ায় ‘ছাগলের গুঁতো’ বলা হয়েছে। এটা যে নেহাতই কাকতালীয় নয়, সুকুমার সচেতনভাবেই যে লিখেছেন, তা বুঝতে বাকি থাকে না। এইভাবেই আমরা অন্যান্য ছড়ার বিশ্লেষণ করে এই পর্যায়ের ছড়াগুলোকে পৃথক করে নিতে পারি।

৪) গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি
এই পর্যায় যে কয়েকটি ছড়া পাওয়া যায়, তারমধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় ‘বোম্বাগড়ের রাজা’১৪ছড়াটির কথা। এই লেখাটি নিয়ে নানারকম মতভেদ পাওয়া যায়। তবে সম্ভাব্য যে মতটি অধিক গৃহীত তা হল, লন্ডনের মে ফেয়ারের রোলস রয়েসের শোরুমের সামনে দিয়ে খুবই সাধারণ ভারতীয় পোশাকে মহারাজা জয়সিং যাচ্ছিলেন। তাঁর খুব গাড়ির শখ ছিল। তিনি দেখেন, সেখানে নতুন কতগুলি মডেল প্রদর্শিত হচ্ছে। গাড়ি দেখতে গেলে দোকানের কর্মচারী সাধারণ পোশাকের অপরিচিত লোকটিকে পাত্তা দেয় না। ফলে জয়সিং খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হন। তিনি কিছু না বলেই দোকানের একদম ভিতরে প্রবেশ করে সাতটি গাড়িই কিনে ফেলেন। তবে তাঁর একটি শর্ত ছিল যে, গাড়ির সঙ্গে সেই কর্মচারীকেও ভারতে পাঠাতে হবে গাড়ি হস্তান্তর করার জন্য। বিনা পয়সায় ভারত ভ্রমণের সুযোগে সে ভারী আহ্লাদিত ছিল। কিন্তু ভারতে এসে রাজার অবস্থান দেখে সে চকিত হয়, কারণ রাজা আদেশ দেন সাতটি গাড়িকেই রাজ্যের আবর্জনা সংগ্রহের কাজে লাগানো হোক। কর্মচারীটি তখন নিজের ভুল বুঝতে পারে। এটা সম্পূর্ণ সত্য ঘটনা। লন্ডনের ‘The Telegraph’ পত্রিকায় পরবর্তীকালে এই ঘটনাটি নিয়ে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। আবর্জনার গাড়ি হিসাবে রোলস রয়েসের ব্যবহার সকলকে যেমন চমকে দেয়, ছড়ায় বোম্বাগড়ের অদ্ভুত কাজকর্মও আমাদের চমকে দেয়— “রাত্রে কেন ট্যাঁক্‌ ঘড়িটা ডুবিয়ে রাখে ঘিয়ে” বা “কেন রাজার বিছ্‌না পাতে শিরীষ কাগজ দিয়ে”।

সত্য ঘটনার সঙ্গে যে অংশটি মিলে যায় তা হল— “সিংহাসনে ঝোলায় কেন ভাঙা বোতল শিশি?” এবার একটি বিদেশি ঘটনার উদাহরণ দেওয়া যাক। ছড়াটি হল ‘গন্ধ বিচার’১৫। “সিংহাসনে বস্‌ল রাজা বাজ্‌ল কাঁসর ঘণ্টা,/ ছটফটিয়ে উঠ্‌ল কেঁপে মন্ত্রীবুড়োর মনটা।”— আলোচ্য লাইনগুলোতে যে রাজার কথা পাওয়া যায়, অনুমান করা হয় তিনি আসলে রাজা পঞ্চম জর্জ। ইতিহাস বলে এইসব উপাধি অনেক সময়েই অর্থ দিয়ে কেনা হত। পঞ্চম জর্জের সময়ে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লয়েড জর্জ। তাঁর ক্যাবিনেট খুব চালাকি করে একটি নতুন উপাধি বানালেন, ‘Order of The British Empire’, যাতে কম খরচায় অনেকেই উপাধি পেয়ে যায় এবং ব্যক্তি স্বার্থ সিদ্ধি হয়। ফলে এমন লোকজন উপাধি পেতে থাকে যে লোকে উপহাস করে এই উপাধির নামকরণ করে ‘Order of The Bad Egg’। এই ‘bad egg’ বা পচা ডিমের গন্ধ থেকেই লেখা হয় ‘গন্ধ বিচার’। ১৯২১ সালে রাজার জন্মতিথিতে বিশেষ ব্যক্তিদের উদ্দেশে যে উপাধির তালিকা প্রকাশ পায়, তা দেখে রাজা ক্ষুণ্ণ হন কারণ, সেই তালিকায় অনেক অপরাধীর নাম ছিল। তাই ছড়ার ভাষায় রাজা মন্ত্রীকে ডেকে বলেন— “মন্ত্রী তোমার জামায় কেন গন্ধ?” মন্ত্রী অস্বীকার করেন। তাঁর সঙ্গে বদ্যি, পাত্র, কোটাল, পালোয়ান, এমনকী রাজার শালাও নিজেকে নির্লিপ্ত রাখেন। সহজেই অনুমান করা যায় এরা ক্যাবিনেটের দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। ছড়ার শেষে যে নব্বই বছরের বৃদ্ধ গন্ধ সহ্য করে নিজ তেজে টিকে গেলেন, তিনি পঞ্চম জর্জের নতুন মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী আন্ড্রিউ বোনারড ল, মাত্র ছ’মাসের জন্য মন্ত্রী ছিলেন। তারপর মারা যান। এইভাবে ‘ভূতুড়ে খেলা’, ‘ফসকে গেল’ ইত্যাদির মধ্যেও নানান ঘটনার বীজ খুঁজে পাই।

৫) অন্যন্য:
এই পর্যায়ের মধ্যে সেই ছড়াগুলোকে রাখা হয়েছে, যাদের কোনও বিশেষ অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র হাসির জন্য, আনন্দের জন্য এদের সৃষ্টি। ‘কি মুস্কিল’, ‘নোটবই’, ‘অবাক কাণ্ড’, ‘ভাল রে ভাল’, ‘গল্প বলা’, ‘ঠিকানা’ এইসকল ছড়াগুলোর নির্ভেজাল আনন্দই পাঠক উপভোগ করে। বিখ্যাত বা সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাও যে সাধারণ মানুষের মতো কাজকর্ম করে সেটায় অনেকেই বিশ্বাস করতে পারে না। তাই ‘অবাক কাণ্ডে’১৬ সুকুমার বলেছেন, “শুন্‌ছ দাদা! ঐ যে হোথায় বদ্যি বুড়ো থাকে,/ সে নাকি রোজ খাওয়ার সময় হাত দিয়ে ভাত মাখে?/ শুন্‌ছি নাকি খিদেও পায় সারাদিন না খেলে?/ চক্ষু নাকি আপনি বোজে ঘুমটি তেমন পেলে?” ‘ভাল রে ভাল’১৭ ছড়ায় কবি দেখাতে চেয়েছেন জগতের সবকিছুই ভালোর চোখে দেখা দরকার। চাইলেই আপোষ করে নেওয়া যায়— “এই দুনিয়ার সকল ভাল”। শেষে প্রশ্রয় দেওয়া জগতের রাজনীতি, সামাজিক নিয়ম বা অবস্থা থেকে শতদূরে অবস্থান করা একটি শিশুর চাহিদা খুবই সামান্য, তাঁর ভালোলাগাও খুব সামান্য, আর ভালবাসা— “পাউরুটি আর ঝোলা গুড়”।

আবোল তাবোল
‘আবোল তাবোল’ ছড়ার সংকলনটির প্রথম ও শেষ ছড়া দু’টি এই একই শিরোনামে লেখা হয়েছে। শুরুর ছড়ায়১৮ কবি ডাক দিয়েছেন আপন ভোলা, খেয়াল খোলা, পাগল, ক্ষ্যাপা মন, বেয়াড়াদের তাঁর অদ্ভুত রসের জগতে আসার জন্য। তবে তাদেরকে ‘মত্ত মাদল’ বাজিয়ে আসতে হবে। মনে পড়বে ব্রতচারী গান ‘চল চল চল/ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,/ নিম্নে উতলা ধরণীতল,/ অরুণতলের তরুণদল,/ চলরে চলরে চল”-এর কথা। একই ধরনের ডাক দিয়েছেন সুকুমার। এইখানেই ছোট্ট করে কবি তাঁর আসল উদ্দেশ্য জানিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই আপাত পাগলের আসল অর্থ যে দেশের জন্য পাগল, তা অনুধাবন করা গেল। কবি আরও বলেছেন যে, এই জগতে সবকিছুই নিয়মহারা, কোনও বাঁধন নেই। তাই সকলে নিশ্চিন্তে এই ভুলের ভবে আসতে পারে। এই দুনিয়ার ছন্দ ‘অসম্ভবের ছন্দ’ অর্থাৎ, প্রচলিত গতে বাঁধা জীবনের ছন্দ এটি নয়। সুকুমার রায় সংকলনের শুরুতেই বলেছিলেন, এইভাবেই ‘আবোল তাবোল’-এর শুরু। শেষের ছড়াতেও১৯ তিনি প্রথম ছড়ার প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছেন। সেখানেও বলেছেন, “তাল বেতালের খেয়াল সুরে,/ তান ধরেছি কণ্ঠ পুরে।/ হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা,/ নাইরে বাঁধন নাইরে বাধা”। ‘স্বপ্নদোলা’ খেয়াল খোলাদের দুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক খেয়াল রসের দুনিয়ায়। অদ্ভুত ও উদ্ভট এই জগতে সবাইকে নিয়ে আসার পর এবার কবির বিদায় জানানোর পালা। তাই “আজকে দাদা যাবার আগে/ বল্‌ব যা মোর চিত্তে লাগে”। আবোল তাবোলের রত্নসম্ভার উজাড় করে দেওয়ার পর তিনি যে আনন্দ পেয়েছিলেন তার প্রতিফলন পড়েছে এই লাইনগুলোতে— “আপনাকে আজ আপন হতে/ ভাসিয়ে দিলাম খেয়াল স্রোতে”, “আজকে আমার মনের মাঝে/ ধাঁই ধপাধপ তবলা বাজে”। অনুমান করা হয়, ‘মঞ্চে নাচেন পঞ্চ ভূত’, এই পঞ্চ ভূতের রূপকে তিনি তাঁর ছড়ায় উল্লিখিত সেইসব মানুষদের কথা বলেছেন যাদের তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। কবি উল্লেখ করেছেন, ছড়াগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ আসলে “আলোয় ঢাকা অন্ধকার”। শেষ ছড়াটি লেখার সময়ে সুকুমার রোগশয্যায় ছিলেন। ভাবতেও অদ্ভুত লাগে, মৃত্যু পথযাত্রী কবি কীভাবে এত হাস্যরসের ধারা প্রবাহিত করতে পারেন। তিনি বুঝেছিলেন, তাঁর জীবনে সন্ধ্যা নেমে আসছে। তার ইঙ্গিতও কবি দিয়েছেন শেষে, কিন্তু তারমধ্যে কোনও বিষাদ নেই, বেদনা নেই, শুধু আছে চূড়ান্ত রসিকতা—

“আদিম কালের চাঁদিম হিম
তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম।
ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর, গানের পালা সাঙ্গ মোর।”

সুকুমারের প্রত্যেকটি দ্ব্যর্থবোধক ছড়াগুলোর সময়কাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘটনার সময়কালের থেকে প্রকাশের সময়কালের ব্যবধান ছয়মাস- একবছর। এইরকম সময়ের ব্যবধান হিসাবে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা যায় ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় এতগুলো লেখা আলাদা আলাদা সংখ্যার জন্য নির্বাচন করার ফলে প্রকাশিত হতে সময় লেগেছে। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারব, সুকুমার খুব কৌশলে ছড়াগুলো প্রকাশ করেছেন। কোনওভাবে তাঁকে যাতে রাজরোষে না পড়তে হয় বা সামাজিক পরিস্থিতি তাঁর বিপক্ষে না চলে যায়, এইসব ভাবনাচিন্তা করেই তিনি ঘটনার আবহাওয়া শান্ত হওয়ার পর সেই সংক্রান্ত তাঁর ছড়াগুলো প্রকাশ করেছেন। ফলে পাঠকের কাছে তা শুধুই প্রাণখোলা হাসি ও নির্মল আনন্দে পরিণত হয়েছে। এখানেই সচেতন সুকুমারের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। কবি সুকুমারের জয় জয়কার বাঙালির গৃহকোণে, মনের মন্দিরে ধ্বনিত হয়।

ভাষার জগৎ
‘আবোল তাবোল’-এর উদ্ভট ও অদ্ভুত জগতে আছে আমাদের পরিচিত সত্যেরই আর এক রূপ। এই উদ্ভটভাব ভাষাবাহিত হয়েই আমাদের চেতনায় প্রবেশ করে। ‘আবোল তাবোল’-এর কাব্যভাষার  উদ্ভটরূপ এবং প্রাণময়তার কারণে ছড়াগুলো ক্লান্তিকর হয়ে ওঠেনি, উপভোগ্যতা হারায়নি। এই জগৎ এক ভাষাসম্ভবের জগৎ, ভাষার গুণে তৈরি এক ভিন্ন বাস্তব। স্বাভাবিক সুপরিচিত বাংলাভাষাকে কখনও তিনি পদ্যছন্দে এনেছেন, কখনও বা গদ্যছন্দে— “শুনে লোকে দৌড়ে এল, ছুটে এলেন বদ্যিমশাই, সবাই বলে, ‘কাঁদছ কেন? কি হয়েছে নন্দগোঁসাই’?” (হাত গণনা২০)। পুরনো বাংলা শব্দ যেমন— ‘তাহা’, ‘কভু’, ‘কাহারে’, ‘নাহি’ ব্যবহার করেছেন প্রয়োজনে। কোথাও ব্যবহার করেছেন মৌখিক বাংলাগদ্য— “বাপ্‌রে কি ডানপিটে ছেলে!— খুন হ’ত টম্‌ চাচা ওই রুটি খেলে। সন্দেহে শুঁকে বুড়ো মুখে নাহি তোলে, রেগে তাই দুই ভাই ফোঁস্‌ ফোঁস্‌ ফোলে” (ডানপিটে২১)। ‘বুঝিয়ে বলা’২২য় বুঝিয়ে বলার মৌখিক গদ্যভাষার রূপটি খুবই স্বচ্ছন্দ—  “অর্থাৎ কিনা, এই মনে কর্‌ রোদ পড়েছে ঘাসেতে, এই মনে কর্‌, চাঁদের আলো পড়লো তারি পাশেতে”। আবার, ঝগড়ার রূপটিও ভীষণ স্বাভাবিক— “হ্যাঁরে হ্যাঁরে তুই নাকি কাল সাদাকে বল্‌ছিলি লাল?” (নারদ! নারদ!২৩)। আর একটা জিনিস লক্ষণীয়, ঝগড়ার সময়ে বাঙালি যে বেংলিশ ভাষা ব্যবহার করে তাও স্বাভাবিকভাবেই এসেছে ছড়ায়— “ক্যান্‌ রে ব্যাটা ইসটুপিড? ঠেঙিয়ে তোরে কর্‌ব টিট্‌”। আবার বিশেষ ক্ষেত্রে বাঙালি কায়দা করে হিন্দিটাও বলে ফেলে— “রাজা হাঁকেন, বোলাও তবে— রামনারায়ণ পাত্র” (গন্ধ বিচার২৪)। এই ছড়াতেই দেখা যায় হিন্দিভাষী পালোয়ান ভীমসিং স্বাভাবিকভাবেই হিন্দিবাংলা মেশানো কথা বলেছে, “রাতে আমার বোখার হ’ল বলছি হুজুর ঠিক বাৎ”। ‘খিচুড়ি’তে সুকুমার তৈরি করেছেন নতুন নতুন জোড়কলম শব্দ— ‘হাঁসজারু’, ‘হাতিমি’, ‘জিরাফরিং’। এই ধরনের নতুন নতুন উদ্ভট শব্দ কুমড়োপটাশ, ট্যাঁশগরু, ধুপধুপিয়ে, খ্যাশ খ্যাশানি, চড়নদার, ল্যাগব্যাগ প্রভৃতি সমগ্র ‘আবোল তাবোল’-কে সমৃদ্ধ করেছে।

‘ফসকে গেল’২৫-তে ‘পড়্‌ পড়্‌ পড়্‌বি পাখি’ শব্দগুচ্ছ পাখি পড়ার আগে শিকারির মনের যে আকুপাকু তা স্পষ্ট করেছে, ‘‘গুড়্‌ গুড়্‌ গুড়্‌ গুড়িয়ে’ শব্দগুলোর মধ্যে গোষ্ঠ মামার ধীরে ধীরে ফাঁদ পাতার স্বরূপ ফুটে উঠেছে এবং দু’টি ক্ষেত্রেই পাঠক নিজেই আঁকুপাঁকু ও ওঁতপাতা অনুভব করবে। অন্যদিকে, ‘শব্দকল্পদ্রুম’২৬-এ ‘ঠাস্‌ ঠাস্‌ দ্রুম্‌ দ্রাম্‌’ করে ফুল ফোটা, ‘শাঁই শাঁই পন্‌পন্‌’ করে ফুলের গন্ধ ছোটা, বা, ‘দুড়্‌ দাড়্‌ চুরমার’ করে ঘুম ভাঙা, ‘ধেই ধেই ধিন্‌তা’করে মনের নাচা আপাতদৃষ্টিতে অসংলগ্ন কতগুলি শব্দ মনে হলেও সুকুমার শব্দ ব্যবহারের ব্যাকরণগত কৌতুকও ধরিয়ে দিতে চান পাঠককে। এরই সঙ্গে কী বিস্ময়কর কৌশলে চোখ ও অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের অনুভবকে, এমনকী রাত কাটা, ফুল ফোটা, ঘুম ভাঙার মতো নিছক ধারণার বিবৃতিকে শ্রুতির অনুভবে রূপান্তরিত করেছেন তা লক্ষণীয়। আরও একটি দিক লক্ষ করার মতো, তিনি প্রায় সব ক্ষেত্রেই হসন্ত ধ্বনি অবিকৃত রেখেছেন। যেমনটি আমাদের উচ্চারণ ঠিক তেমনভাবেই শব্দরূপ বজায় রেখেছেন তিনি। ফলে পাঠ করার সময় ছড়াগুলোর ধ্বনিগত মাধুর্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘আবোল তাবোল’-এ  তাঁর প্রধান অস্ত্র বাংলা শব্দের দ্ব্যর্থকতা, তারই দোহনের ফলে এই বিপুল রসের আনন্দ উল্লাস তৈরি হয়েছে। শব্দকে ভেঙেচুরে, উলটে পাল্টে, নানাভাবে সাজিয়ে তিনি দেখতে চান তাঁর চেনা শব্দ ও ধ্বনি দিয়ে কীভাবে পাঠককে নতুন নতুন আনন্দ উপহার দিতে পারেন। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে সুকুমারের ‘আবোল তাবোল’-এর প্রাথমিক পাঠক খুদে সদস্যরা। তাই সুকুমারের ভাষা ব্যবহারের, উদ্ভট ভাষা ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ছোটদের আনন্দ দেওয়া, তাদের মনকে হাসিতে ভরিয়ে দেওয়া। কোনও সন্দেহ নেই, সুকুমার তাঁর উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ সফলতা পেয়েছিলেন এবং এখানেই ‘আবোল তাবোল’-এর অমরত্ব।

আকর গ্রন্থ:

সুকুমার সাহিত্যসমগ্র, সম্পা: সত্যজিৎ রায় ও পার্থ বসু, প্রথম খণ্ড।

সহায়ক গ্রন্থ:

১। নানা সুকুমার, সম্পাদনা: তাপস ভৌমিক, কোরক।

২। সুকুমার রায়: জীবনকথা – হেমন্ত কুমার আঢ্য।

৩। প্রসঙ্গায়নে বাংলা শিশুসাহিত্য – নবেন্দু সেন।

৪। বাংলা কিশোর সাহিত্যের ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়।

৫। বাংলা শিশু কিশোর সাহিত্য পাঠের ভূমিকা – নির্মাল্য কুমার ঘোষ।

৬। শিশুসাহিত্যের সোনালি অধ্যায় – পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়।

৭। বাংলা শিশুসাহিত্য সেকাল ও একাল , সম্পাদনা: আসরফী খাতুন।

৮। Rhymes of Whimsy, Niladri Roy, Haton Cross Press.

তথ্যসূত্র:

১।  চক্রবর্তী কৃষ্ণরূপ, ‘সুকুমারের আবোল তাবোল’, “নানা সুকুমার”, সম্পা: তাপস ভৌমিক, কোরক, প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০২০, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৬২।

২। ‘সুকুমার সাহিত্যসমগ্র’, জন্মশতবার্ষিকী সংস্করণ, প্রথম খণ্ড, সম্পা: সত্যজিৎ রায় ও পার্থ বসু, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৬, প্রথম সংস্করণ ১৯৭৩, কলকাতা, পৃষ্ঠা ২।

৩। ওই, পৃষ্ঠা ১০।

৪। ওই, পৃষ্ঠা ৫।

৫। ওই, পৃষ্ঠা ১১।

৬। ওই, পৃষ্ঠা ২১।

৭। ওই, পৃষ্ঠা ১৪।

৮। ওই, পৃষ্ঠা ৯।

৯। ওই, পৃষ্ঠা ২৪।

১০। ওই, পৃষ্ঠা ৩।

১১। ওই, পৃষ্ঠা ৪।

১২। ওই, পৃষ্ঠা ৮।

১৩। ওই, পৃষ্ঠা ৭।

১৪। ওই, পৃষ্ঠা ১৭।

১৫। ওই, পৃষ্ঠা ৩২।

১৬। ওই, পৃষ্ঠা ৩৩।

১৭। ওই, পৃষ্ঠা ৫।

১৮। ওই, পৃষ্ঠা ১।

১৯। ওই, পৃষ্ঠা ৪০।

২০। ওই, পৃষ্ঠা ৩১।

২১। ওই, পৃষ্ঠা ২৬।

২২। ওই, পৃষ্ঠা ২০।

২৩। ওই, পৃষ্ঠা ২৪।

২৪। ওই, পৃষ্ঠা ৩২।

২৫। ওই, পৃষ্ঠা ৩৮।

২৬। ওই, পৃষ্ঠা ৭।

স্বর্ণালী দত্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনার শিরাকোল কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। গবেষণা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।  

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *