সুলেমানের গল্প

অলক্তা মাইতি

একটু ছোট্ট পরিসরে সুলেমান কাজীর গল্পটা বলে যাই আজ। হাতে মিনিট খানেক সময় থাকলে শুনো, নইলে ইগনোর করাও খুব সহজ। সুলেমানের গল্প খুব একটা জমকালো কিছু নয়। খুব সাদামাটা। তবে বেশ ধবধবে। মালিন্য নেই বিশেষ একটা। পরিবার বলতে ঠিক যা বোঝায়, সে-পাট তার বহু আগেই চুকেছে। বিয়ে হয়েছিল কিন্তু বউটা বাঁচেনি বেশি দিন। দাম্পত্যের যেটুকু পাড় ভাঙলে সম্পর্ক আটপেড়ে হয়, সেই চৌকাঠ পেরোনোর আগেই বউটা মরল। পেটের ভেতর তিন মাসের ভ্রূণ মরে পচে সে এক বীভৎস ব্যাপার। তবু সে বীভৎসতার লেশমাত্র অবশেষে ছিল না মুখে যখন মাটি দিতে নিয়ে গেল সবাই। যেন নিশ্চিন্তের ঘুম ঘুমোচ্ছে। সুলেমান বউকে ভালো যে বাসার খুব একটা সুযোগ পেয়েছিল, এমনটা নয়। ক’টা দিনই বা কাছাকাছি থাকা, তবু নিথর স্তব্ধ চোখ বোজা মুখটা দেখে ভারী মায়া হয়েছিল তার। আহারে কতটুকুই বা বয়স!

ওই ওইটুকুই। মন দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার তেমন ছিল না, তাই শোক থাকেনি বেশি দিন। এমনিই ছেলেটা কেমন ফকির ফকির এসবের পর যেন আরও কোনও আগল থাকল না। বউ মরার বছর চারেক পর মা-টাও মরল। ব্যস, দায়দায়িত্বের পাট চুকল। টুকটাক হেল্পারি করে যা রোজগার হয়, তা দিয়েই মোটামুটি ভাত ডাল গোস আলু জুটে যায়। আর কি চিন্তা।

সুলেমানের মাপের নজরে ছিল সাংঘাতিক। আস্ত একটা মেজারিং টেপ সর্বদা যেন চোখের কোলে বসানো। এক ইঞ্চির এদিক-ওদিক নেই। লোকে যেমন গাইতে পারে, বাঁশি বাজাতে পারে, সুলেমান তেমন মাপতে পারে। নিখুঁত চোখ তার। রাজমিস্ত্রি লাইনে ওর গুরু করিম মিঞা ওর নাম রেখে ছিল ওলন্দাজ। ইটের লাইনে চোখ রেখে দু-সেকেন্ডে বলে দিত লেভেল হয়েছে কি হয়নি। কখনও সে হিসেবে ভুল হয়নি। ক্রমে করিম মিঞার শাগরেদ বড় বড় কন্ট্রাক্টরের চোখে পড়তে লাগল। এমন পরিশ্রমী ছেলে, বেশি খাই নেয়, দু-নম্বরি করে না আবার কাজেও সাক্ষাৎ বিশ্বকর্মা… এমন ছেলে কে না চায়। ডাক আসতে শুরু হল সুলেমানের। বড় বড় ইমারত, স্কুলবাড়ি, কলেজ গেট, সরকারি ভবন থেকে মন্ত্রীর কোয়ার্টার… বড় কাজ মানেই সুলেমান। কোনও এক এজেন্সির হয়ে পর পর কাজ করা তার হয়েই ওঠে না। একবার এ ডাকে একবার ও ডাকে। প্রতিবার সাইটে গিয়ে নিজে হাতে নিজের একটা আস্তানা মতো বানিয়ে নেয়। ওখানেই থাকে। হাজার বললেও বাড়ি ফেরে না। অবশ্য নিজের বাড়ি বলতেও তো ওই ইট কাঠ দেওয়াল দরজা। একমাত্র অতিরিক্ত খানিক তোষকের আরাম। সেসব সুলেমানের না হলেও চলে। বিস্তীর্ণ ধু-ধু প্রাঙ্গণ থেকে এক এক করে পিলার ওঠে যখন, যখন দেওয়াল হয় সুলেমান বড় তৃপ্তির চোখে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। এ যেন নিজেই খোদা হওয়ার শামিল। ওর সাধারণ দু’টো হাতে এমন এমন ইমারত প্রাণ পায় ভাবতেই বাচ্চার মতো আনন্দ হয় তার। বড় বড় সাহেব-সুবোদের স্নেহ পায় সুলেমান। সবাই তাকে ভরসা করে। সেবার মন্ত্রীর ঘরের খোলনোলচে পাল্টে সে এক বিশাল ব্যাপার হবে। ডাক পড়ল সুলেমানের। সম্মানের কাজ। সময় অল্প। আজকাল সুলেমান নিজেই দল পাকিয়েছে। দলের ছেলেগুলোও মন্দ নয়। জানপ্রাণ লড়িয়ে কাজ উঠিয়ে দিল সবাই। সুলেমান বোধহয় ওজু নামাজ ভুলে কাজ করেছে। এক লমহা বিরাম দেয়নি। সময়মতো কাজ শেষ হলে হ্যান্ড ওভারের আগের দিন মিত্র সাহেব নিজে এসে সুলেমানের পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘অসাধ্য সাধন করেছ ভায়া, তোমার কাজের জবাব নেই।’ উদ্বোধনের দিন নেমন্তন্ন অবধি করেছিল। বলেছিল প্যাকেট নিয়ে যেও। মিস্ত্রি জীবনে এ হল বিরাট পাওয়া। ওই লেভেলের অফিসার তাকে নামে চেনে, খাতির করে নেমন্তন্ন করেছে… এ তো ভাবাই যায় না।

আরও পড়ুন: অন্ধেরা, নির্বোধেরা

সুলেমান তবু যায়নি দাওয়াতে। সে কাজে আছে ভোজে নেই। প্রতিবার বাবুই পাখির মতো একটা একটা খড়কুটো জোগাড় করে বাসা বানায় সুলেমান। তারপর ছেড়ে যায়। আর ফিরে আসে না। ছেড়ে যাওয়ায় কষ্ট আছে, লোকে বলে। সুলেমানের অভ্যেস হয়ে গেছে। ঝলমলে নতুন রঙের বাড়িতে যখন আলো জ্বলে লোক সমাগম হয়, তখন মরে যাওয়া বউটার কথা মনে পড়ে সুলেমানের। আহা কি মায়া ছিল রে মুখটায়! বউটাকে ভালোবাসাবাসির সময় পায়নি সুলেমান, তবু প্রতিবার কাজ শেষ হলে ওর মুখটাই… আসলে ওর মুখটা মনে পড়লে ছেড়ে যাওয়া সহজ হয়। নইলে কবেই হয়তো কোনও ইমারতকে ভালোবেসে নিজের বাড়িঘর ভেবে ফেলতে হত।

নয় নয় করে বয়স তো কম হল না। এখন আর চোখে তেমন তাপ নেই। সেই নির্ভুল মাপ দু-এক সুতো সরে যায় আজকাল। মন্ত্রীর ঘর বানানো ইস্তক কাজ থামাতে চাইছিল সুলেমান। জানাজার খাটিয়ায় শোয়ার আগে দিন কতক তোষকে শোয়ার শখ হয়েছিল বুড়োর। বড্ড সাধ হয়েছিল নিজের একটা দু-কামরার বাড়ি বানাতে। কেন এমন শখ হল কে জানে। কিন্তু প্রায়শই বলত, এ কাজটা শেষ হলেই দেশ চলে যাব।

গতকাল সকালে সবাই দেখল, সাইটের হাট মেন্টে বালাপোষের বিছানায় চিৎপাত হয়ে পড়েছিল সুলেমান। ঘুমের মধ্যেই কখন… কি ভীষণ মায়া লেগেছিল চোখেমুখে।

ছবি ইন্টারনেট…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *