ধ্বংসের দোরগোড়ায় সুন্দরবন: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও আজকের বিতর্ক

সমীরণ মণ্ডল, লাহিড়ীপুর (সাহেবঘাট), গোসাবা

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অধ্যাপিকা মঞ্জু ব্যানার্জির মতানুযায়ী, প্লেস্টোসিন যুগ থেকে ফুলের রেণু পরীক্ষা করে সুন্দরবনের যে বনভূমি সৃষ্টি, তার বয়স কম করে ১৪ হাজার বছর এবং প্রাণী জগতের আগমন প্রায় ১২ হাজার বছরের। ডক্টর নির্মলেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতে, বনভূমি ১৪ হাজার বছর আগে সৃষ্টি হলেও তারও ৪ থেকে ৫ হাজার বছর আগে ভূমি গঠিত হয়েছে। আরও একটি মতে, প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার বছর আগে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং তার শাখাপ্রশাখা হিমালয় এবং ছোটনাগপুর পর্বতমালা থেকে নুড়ি, বালি, কাদামাটি-পলি বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বয়ে এনে ক্রমে-ক্রমে গড়ে তুলেছে এই সুন্দরবন ব-দ্বীপ। ডায়মন্ড হারবারের উত্তরে হুগলি নদীর তীরে পেট্রোলপোতায় মধ্য প্রস্তর যুগের পাথরের হাতিয়ার এবং দক্ষিণের হরিনারায়ণপুরে নব্য প্রস্তর যুগের পাথরের হাতিয়ার পাওয়াকে অস্থায়ীভাবে মানুষের আগমনের প্রথম দিকের উদাহরণ বলে অনেকেই মনে করেন।

আরও পড়ুন: ইয়াস: এক ত্রাণকর্মীর জবানবন্দি

যদিও ১৭৭০-এর দশকে জঙ্গল কেটে লোকবসতি তৈরি হওয়ার আগে এখানে মানব সভ্যতার কোনও অস্তিত্ব ছিল না বলে ধারণা করা হত। সেই সময়ে সামান্য কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেলেও কেউ তার বিশেষ কোনও গুরুত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করেননি। অন্যদিকে, যত জঙ্গল পরিষ্কার করা হতে থাকে ততই আবিষ্কার হতে থাকে অতীত সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসগুলো। জি ওল্ডহ্যাম নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধান করে মন্তব্য নথিভুক্ত করেন যে, ‘‘এই অঞ্চলের ভূগর্ভে যে পরিমাণ নুড়ি ও কাঁকুড়ে বালির স্তর পাওয়া গেছে, তাতে মনে হয় এখানে ছোট ছোট পাহাড় ছিল। যা ভূমিকম্প সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বসে গেছে। তিনি আরও মনে করেন যে, কোনও ব-দ্বীপ অঞ্চলে এ ধরনের পাথর এবং কাঁকুড়ে বালির স্তর থাকতে পারে না।   

আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কংক্রিট নদীবাঁধ নাকি প্রাকৃতিক বাঁধ, জোর চর্চা

শিয়ালদহে ৩০ ফুট মাটি খুঁড়ে সুন্দরী গাছের গুঁড়ি পাওয়া অথবা মাতলার কাছে দশ-বারো ফুট মাটির নিচে সারিবদ্ধ সুন্দরী গাছের কঙ্কালকে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাকে কোনও কারণে মাটি বসে যাওয়ার উদাহরণ বলে ধরা যেতে পারে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প ও সুনামি সহ আরও একপ্রকার প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিঃশব্দ ঘাতকের মতো সুন্দরবনের মাটি অবনমের জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়, যেটি অতলস্পর্শ। সতীশচন্দ্র মিত্র মহাশয় এর অবস্থান নির্ণয় করেছিলেন রায়মঙ্গল এবং মালঞ্চ মোহনার দক্ষিণে, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও খুলনার দক্ষিণে একুশ ডিগ্রি থেকে একুশ ডিগ্রি বাইশ মিনিট অক্ষরেখার মাঝখানে। যার চারধারে বহুদূর পর্যন্ত জলের গভীরতা ৫০ থেকে ৬০ ফুট হলেও এটির গভীরতা ১৮০০ ফুটের মতো। সমুদ্রের তলদেশের মাটি ক্ষয়ে অতলস্পশীর ভিতরে গিয়ে পড়ে এবং এই ক্ষয় উদ্ধারে উপকূল ভাগ আমাদের অজান্তে বসে যেতে থাকে। এভাবেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার দক্ষিণের ভূমি অবনমন ঘটেছে বলে অনেকেই মনে করেন। মাটির নিচে চাপা পড়ে যেতে থাকে প্রাচীন নগর, বন্দর, জনবসতি।

আরও পড়ুন: লকডাউনে বাদাবনের বাঘ

বর্তমান সময়ে সুন্দরবন ধ্বংসের দোরগোড়ায় বলে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে জনমানসে, তার কারণ সম্ভবত ২০০৮-০৯ সালে অথবা তারও আগে বা পরের গ্রিনপিস নামের একটি NGO রিপোর্ট। যে রিপোর্টটিতে বলা হয়েছিল, শতবর্ষ ধরে মানুষের উন্নততর জীবনযাত্রার কার্যকলাপের কারণে গত দুই দশকে পৃথিবীর উষ্ণতা ০.৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলশ্রুতিতে আমরা বর্তমান কয়েক শতকে আবহওয়ার লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখছি। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোতে খরা ও বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপকূলীয় জীবন-জীবিকা নির্বাহকারীদের অস্তিত্ব ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁরা বলেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ার আবহওয়া পরিবর্তনের ফলাফল সবথেকে বেশি পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হবে, যা এর আগে কখনও এই অঞ্চলে লক্ষ করা যায়নি। আবহওয়া পরিবর্তন সংক্রান্ত নীতিমালা প্রস্তুত করা না হলে তিন থেকে চার ডিগ্রি বেড়ে যাবে। সাড়ে বারো কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবেন। যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেটের মধ্যে রাখা যায়, তাহলে বাস্তুচ্যুতর সংখ্যাটি ৫০ লক্ষের আশপাশে থাকবে। যদিও এই রিপোর্টে সুন্দরবনের দিকে সরাসরি অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়নি, তবুও সুন্দরবন অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলের মধ্যেই পড়ে। গ্রিনপিস ধারণা করেছিল, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ থেকে ২০২১-এর মধ্যে ১ কোটি মানুষ ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে ফেলবে। সুন্দরবনের ওপরে আবহওয়া পরিবর্তনজনিত প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলছিল তখন থেকেই। IPCG মন্তব্য করেছিল যে, আবহওয়া পরিবর্তনজনিত উষ্ণতা বৃদ্ধি যেভাবে চলছে, একইভাবে চলতে থাকলে এশিয়া হবে তার প্রভাবে ভয়ানক বিপর্যস্ত অঞ্চল। এই কথা শুনে যে-সমস্ত NGO সক্রিয় হয়ে ওঠে, গ্রিনপিস ছিল তার অন্যতম।

আরও পড়ুন: কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমা কেবলমাত্র চলচ্চিত্রের গুণেই ভাস্বর

এছাড়াও দিল্লির ‘সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ ঘোড়ামারা দ্বীপ নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করে বলেছিল যে, আবহওয়া পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের জল প্রতিবছর ২ মিলিমিটার করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে ঘোড়ামারা সহ সমুদ্রের দিকের ন’টি দ্বীপ আগামী ১৫ বছরের মধ্য তলিয়ে যাবে। যদিও চোখের সামনে ঘোড়ামারার দক্ষিণের লোহাচরা আর সুপরিডাঙা তলিয়ে গেছে এবং নয়াচর বৃহত্তম আকার নিয়েছে। রিপোর্ট বের হওয়ার ১৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও ঘোড়ামারা দ্বীপ আজ ইয়াসের কারণে মানবশূন্য হয়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ১ কোটি মানুষের জীবিকা ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার কোনও খবর নেই। কিন্তু রিপোর্টের প্রভাব রয়ে গেছে জনমানসে। মানুষ প্রতিবার, সেই আয়লার সময় থেকে ইয়াস পর্যন্ত, ভীতসন্ত্রস্ত সুন্দরবন ধ্বংসের সেই অগ্রিম রিপোর্টের ভিত্তিতে। জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রভাবে এখন সুন্দরবনের যে জনবসতি ক্ষতি হয়েছে, তার অধিক ক্ষতি হয়ছে পরিচর্যাহীন দুর্বল বাঁধ ভেঙে।

ছবি ঋণ: সুন্দরবন প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *