সুন্দরবন ভ্রমণের জায়গাসমূহ

সমীরণ মণ্ডল (লাহিড়ীপুর, গোসাবা)

বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী প্রশস্ত বনভূমি সুন্দরবন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের জায়গা। ১৯৩২ সালের ২৯ ডিসেম্বর এই বনভূমির শোভা পরখ করতে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিল্টন ছিলেন একজন স্কটিশ ব্যবসায়ী। বলা হত, এই বাংলাই ছিল তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। তিনি গোসাবায় একটি জমিদারি স্থাপন করেছিলেন। সেখানে তিনি গ্রামীণ ও সামাজিক উন্নয়নের কর্মসূচি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। তিনি এমন এক সময়ে গ্রামীন পুনর্গঠন কর্মসূচির স্বপ্নদ্রষ্টা এবং নির্মাতা ছিলেন, যখন ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সেই সময় তিনি পল্লির উন্নতি ও স্বনির্ভরকরণকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন সমবায় আন্দোলন। তাঁর এই ভাবনাকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধির মতো ব্যক্তিত্বরাও। আর গান্ধিজি তো খোদ তাঁর আপ্ত সহায়ক মহাদেব দেশাইকে গোসাবায় হ্যামিল্টনের আবাসে পাঠিয়েছিলেন। সেই আবাসে এখন আমজনতার প্রবেশ নিষেধ। তবে এ-কর্মযজ্ঞ থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, সুন্দরবন নিয়ে মানুষের আগ্রহ অটুট। ইউনেস্কো-স্বীকৃত বিশ্বের এই অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থানের সজনেখালি, ঝিঙেখালি, নেতিধোপানি, হলদিবাড়ি, বুড়ির ডাবরি, দোঁবাকি ও চোরাগাজি খালিতে বর্তমানে ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে।

আরও পড়ুন: গোলপাতা চাষ ও গোল গুড় উৎপাদন হতে পারে সুন্দরবন উপকূলের বিকল্প কর্মসংস্থান

সজনেখালি  সজনেখালি লজ ও বিট অফিসের মাঝখানে কামট, কচ্ছপ কুমির পুকুর। প্রতিদিন বিকালে খাবার দেওয়া হয় এদের। বিকালের খাবারের আশায় কুমির পুকুরের পাড়ে আসে হরিণেরা। এছাড়া আছে সুন্দরবনের হিন্দু-মুসলিম সংহতির প্রতীক লৌকিক দেবী বনবিবির মন্দির। ম্যানগ্রোভ ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার ও প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্র। মিউজিয়ামটি সজনেখালির অন্যতম দর্শনীয়। এছাড়াও যথেষ্ট দর্শক হলে ভিডিয়ো ফিল্ম শো-এর মাধ্যমে অরণ্যবাসীদের রোজকার জীবনচর্চা দেখে নেওয়া সম্ভব।

আরও পড়ুন: ভেষজ বিজ্ঞানে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের ব্যবহার

সুধন্যখালি  সজনেখালি থেকে মিনিট পঞ্চাশের দূরত্বে সুধন্যখালি ওয়াচ টাওয়ার। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পথ চলে গেছে জেটি থেকে টাওয়ারে। সুন্দরবনের রাজা বেঙ্গল টাইগারের স্বাভাবিক বাসভূমি ছেষট্টি প্রকারের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের গভীর জঙ্গলে আচ্ছাদিত। হেতালবনে মিষ্টি জলের পুকুর, ওয়াচ টাওয়ারের নিচে। বন্যরা আসে পিপাসার্ত হয়ে মিষ্টি  জলের আশায়, আসে রয়্যাল বেঙ্গলও।

কলস দ্বীপ  ঠাকুরুন নদী ধরে শেষ দ্বীপ বঙ্গোপসাগরের কাছে কলস দ্বীপ অথবা চুলকাটি। বাঘেদের রাজ্য কলস দ্বীপ জনবসতিহীন। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য ‘সুন্দরবন জীব পরিমণ্ডল’ তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এখানে।

বনি ইকো ক্যাম্প  কলস থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা ও ক্যানিং থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার জলপথে বনি ক্যাম্প ওয়াচ টাওয়ার। এখানে রাতে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। একটি আধুনিক কটেজ ভাড়া ১৫০০ টাকা। এছাড়াও ১৫০ টাকা জনপ্রতি ১০ শয্যার ডর্মিও রয়েছে। যোগাযোগ: বনাধিকারিক, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, ১২ বিপ্লবী কানাই ভট্টাচার্য সরণি, ৫ম তল, কলকাতা-৭০০০২৭, ফোন- ০৩৩-২৪৭৯৯০৩২।

যেতে-যেতে ডাইনে মোহময়ী বালিয়াড়ি হাতছানি দেয় চড়ুইভাতির সুন্দর পরিবেশ সাজিয়ে। ভিতরে নারিকেল ছায়ায় মিষ্টি জলের পুকুরে বাঘেরা তৃষ্ণা মেটায়। প্রতিমুহূর্তে বিপদ ও বিপদ গন্ধ ভাসে সেখানে। ভাটায় জল সরে গেলে বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি ছুঁয়ে দেখা যেতেই পারে সতর্কতার সঙ্গে।

হ্যালিডে দ্বীপ  বঙ্গোপসাগরের কাছে মাতলা নদীর মুখে প্রায় ৬ বর্গকিমি বনাঞ্চল নিয়ে অবস্থিত এই দ্বীপ। নভেম্বর-মার্চে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার কয়েকদিন আগে পরে অলিভ রিডলে কচ্ছপেরা এসে ডিম পাড়ে হ্যালিডে ও কলস দ্বীপে।

নেতিধোপানি  হ্যালিডে ছেড়ে উত্তরে চওড়া হয়েছে মাতলা নদী। ডাইনে বাঁক নিলে নেতিধোপানির ঘাট (জেটি)। মনসামঙ্গল কাব্যে বেহুলার সঙ্গে নেতাই ধোপানির দেখা হয়েছিল এখানে। এখানেও মিষ্টি জলের পুকুর ও ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। পুকুরের অপর পাড়ে চাঁদ সওদাগরের শিব মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ এখন বাঘেদের জলসাঘর। ঘন জঙ্গল-বিপদসংকুল পরিবেশ, জনবসতিহীন নেতিধোপানি। কিছুটা দূরেই বিদ্যা নদী মাতলার সঙ্গে মিশে সাগরমুখী হয়েছে।

বুড়ির ডাবরি  দত্তর গাং, মরিচঝাঁপি উল্টো দিকে বাগনা ফরেস্ট অফিস রেখে ঝিলা নদী পেরিয়ে বামে সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে বুড়ির ডাবরি ওয়াচ টাওয়ার। অনুমতি নিয়ে গাইড সহ বাদাবন পেরিয়ে ২২ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে বাঘের সঙ্গে বাংলাদেশি সুন্দরবনও চলে আসবে দৃশ্যপটে। মাঝখানে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের সীমান্ত এঁকেছে রায়মঙ্গল নদী। ঘণ্টা দুইয়ের দূরত্বে বংঙ্গোপসাগর। এছাড়াও বিদ্যা নদীর পাড়ে দোবাঁকিতে বন্যজীবন দেখার আদর্শ পরিবেশ। জালে ঘেরা পথে ওয়াচ টাওয়ারে উঠে চিতলদের সঙ্গে বাঘ দেখার প্রবল সম্ভাবনা।

ভাগবতপুর কুমির প্রকল্প   নামখানা থেকে ২০ কিলোমিটার জলপথে লোথিয়ান দ্বীপের ভাগবতপুরে কুমির প্রকল্পে কুমির চাষ হচ্ছে। এখানে কুমিরের ডিম সহ বিভিন্ন বয়সি কুমিরের দেখা পাওয়া যায়। এছাড়া ধাঞ্চি ফরেস্টের দ্বীপ-দ্বীপে চিংড়ির ভেড়ি সহ মৎস্য প্রকল্প গড়ে উঠেছে। নামখানা থেকে যাত্রী ভুটভুটি যাচ্ছে দুপুর ১টা, ২.৩০ মিনিট এবং ৩টেয়। ভুটভুটি যাত্রীরা কুমির প্রকল্প দেখে সেই রাতে নামখানা ফিরে আসতে পারবেন না। ভাগবতপুরে থাকার ব্যবস্থা অতিসাধারণ দু’টি ঘরে। তাই ভাগবতপুরে থাকার ব্যবস্থা নেই ধরে নিতে হবে। ভ্রমণার্থীরা কাকদ্বীপ সেচ দপ্তর থেকে সীতারামপুর বাংলো বুক করে। দুপুর ১টার ভুটভুটিতে নামখানা থেকে ভাগবতপুর গিয়ে, ভাগবতপুর থেকে ছেড়ে আসা দ্বিতীয় ভুটভুটি ধরে ১ ঘণ্টায় কুমির প্রকল্প দেখে দিনের শেষে সীতারামপুর পৌঁছে সেচ দপ্তরের বাংলোয় রাতে বিশ্রাম নিতে পারেন। দ্বিতীয় দিনে ভুটভুটিতে করে নামখানা পৌঁছে বাসে বা ট্রেনে কলকাতা।

সুন্দরীকাটি ইকো ট্যুরিজম সেন্টার  ভাগবতপুর থেকে তিন ঘণ্টা মতো সময় লাগে সুন্দরীকাটি ইকো ট্যুরিজম সেন্টার পৌঁছতে। ফোটো, ছবি ও লেখায় সুন্দরবনকে চেনার এক অনবদ্য ঠিকানা এখানকার মিউজিয়াম। ওয়াচ টাওয়ার আছে এখানেও।

লোথিয়ান দ্বীপ  সপ্তমুখী নদীর মোহনায় মাতলার পশ্চিম পাড়ে বঙ্গোপসাগরের কাছে সুন্দরবনের অন্যতম আর এক অভয়ারণ্য লোথিয়ান দ্বীপ এই পথেই। বাঘের অভাব থাকলেও সাপের আধিক্যে জনবসতিহীন লোথিয়ান দ্বীপ। ৩৮ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত লোথিয়ানের ম্যানগ্রোভ বোটানিক্যাল গার্ডেনে বাইন, কেওড়া ও গরাণের জঙ্গলে চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর ছাড়াও পরিযায়ী পাখির মেলা। নামখানা থেকে পাথরপ্রতিমার দেড় ঘণ্টার জলযানে যাওয়া যেতে পারে লোথিয়ান। এক ঘরের রেস্টশেড আছে। বুকিং: DFO, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, ৩৫ গোপাল নগর রোড, কলকাতা- ২৭।

পিয়ালি নদী বা কেল্লা  কলকাতা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে। শিয়ালদহ-লক্ষ্মীকান্তপুর ট্রেনে চেপে দক্ষিণ বারাসত পৌঁছে ট্রেকারে পিয়ালি নদী দ্বীপে বা কেল্লা যাওয়া যায়। পিয়ালি নদী বাঁধ জলাধার গড়েছে এখানে, যার ফলে হয়েছে সবুজায়ন অম্বিকা নগরে। নীল আকাশের নীচে নদী ঘেরা স্বপ্নময় সবুজ দ্বীপ, পিয়ালি নদী দ্বীপ। জনহীন এই দ্বীপে সূর্য লুকোচুরি খেলে বাদাবনের সঙ্গে। নতুন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলেও পর্যটন মানচিত্রে ব্রাত্য প্রচারের অভাবে।

এখানে ব্যক্তিগত মালিকানায় রাজ্য পর্যটনের ট্যুরিস্ট কটেজ রয়েছে। ৮৫০ টাকা জনপ্রতি একজনের একদিন থাকার খরচ। কনটাক্ট ৭৮৭২৫২৪৭২৩/ ৯৫৬৪২২৩৩০৬/ ৯৪৩৩৪৩৫১৮১, খাবার জনপ্রতি ৪০০ টাকা।

WBTDC রয়েছে পিয়ালি দ্বীপে, দূরভাষ- ২২৪৮৮২৭১।

সুসজ্জিত ও যন্ত্রচালিত ভুটভুটি চলে নদীর জলে। এ-পথেই জয়নগর-মজিলপুর স্টেশন থেকে ৩০ কিমি দূরে মাতলা নদী আর মনোরম ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের মাঝে পটে আঁকা ছবির মতো কৈখালিও ঘুরে দেখা যায়। রামকৃষ্ণ আশ্রম পরিচালিত WBTDC-র KOIKHALI TOURIST LODGE-এ থাকা ও খাওয়ার জন্য জনপ্রতি ৪০০ টাকা খরচ হয়। যোগাযোগ রামকৃষ্ণ আশ্রম, নিমপীঠ, দূরভাষ- ০৩২১৮-২২৬০০১।

ক্যানিং থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে বাস বা ভুটভুটিতে মাতলা নদীর তীরে ইউক্যালিপ্টাস-বাবলা-ঝাউ-নারকেল-তাল গাছে ছাওয়া ডাবু। চাষবাস হচ্ছে এখানে। প্রধান জীবিকা মাছধরা। থাকার ব্যবস্থা সেচ বাংলোয়।

শীত-বসন্ত সুন্দরবন ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। পাখিরালয় ভ্রমণার্থীদের জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে যাওয়াই উচিত। WBTDC, Tourism Center, 3/2 BBD Bag, Call:- 22488271/22436440. অক্টোবর থেকে মার্চ, উইক এন্ড-এ দুই-তিন দিনের সুন্দরবন ভ্রমণের প্যাকেজের ব্যবস্থা করে। তাছাড়াও যোগাযোগ করতে পারেন সমীরণ মণ্ডলের সঙ্গেও। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেন ৯১২৩৮৮৬৪৮৮ নম্বরে। ইমেল- samiranmondal862@gmail.com

সুন্দরবন ভ্রমণে পরিচিত হওয়া যায় সেই মানুষদের সঙ্গে যাঁরা সাপের মাথায় নাচে, কুমির-কামটের সঙ্গে জলকেলিতে মাতে, বাঘের সঙ্গ ভালোবাসে। সেই সমস্ত বাঙালি বনজীবীর এক অংশ, প্রতিপদে যাঁদের মৃত্যুভয় তাড়া করে ফেরে। মুখোশ পরা মৌলে, বাউলে, জেলে-জিমনি যাঁদের থেকে শেখা যায়— জীবন মানে যুদ্ধক্ষেত্র, যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা/ যোগ্যতমের টিকে থাকা, লড়াই সারাবেলা।

ছবি সংগৃহীত

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *