স্মৃতিতে সুন্দরলাল

মানস প্রতিম দাস

সাধারণ জ্ঞানের বই বা বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য লেখা পাঠ্যপুস্তকে পরিণতিটা লেখা থাকে মাত্র। ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে চামোলি জেলায় গাছ কাটতে এসেছিল ইলাহাবাদের এক কোম্পানি, যারা খেলাধুলোর সরঞ্জাম বানায়। ‘সাইমন্ডস’ নামে সেই কোম্পানির কাছে চোদ্দটা বড় গাছ কাটার অনুমতি ছিল। কিন্তু চণ্ডীপ্রসাদ ভাট ও দশোলি গ্রাম স্বরাজ্য মণ্ডলের অধিবাসীরা আটকে দিল সেই রুটিন কাজটা। সেই বছরেরই ডিসেম্বর মাসে গোপেশ্বর থেকে ষাট কিলোমিটার দূরে ফটা-রামপুর জঙ্গলে আবার গাছ কাটার পথে বাধা পেল সাইমন্ডস। গাছেদের জড়িয়ে ধরে বাঁচানোর প্রচেষ্টা থেকে এই আন্দোলনের নাম হয় ‘চিপকো’। পরের বছর এই প্রতিরোধের জায়গাটা বদলে হল যোশিমঠ ব্লকের রেনি গ্রাম। ১৯৭০ সালে অলকানন্দা নদীর বন্যায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই এলাকা। কিন্তু গাছের বাণিজ্য তাতে থামেনি। ঋষিকেশের কনট্রাক্টর জগমোহন ভাল্লা চার লক্ষ সত্তর হাজার টাকায় পেঙ-মুন্দ্রা অরণ্যের ৪৭০ হেক্টর এলাকা নিলামে দখল করেন। অর্থাৎ সেখানে যাবতীয় গাছ কাটার অধিকার তাঁর। কিন্তু ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ যখন কনট্রাক্টরের লোকজন গাছ কাটতে আসে, তখন গ্রামের মহিলারাই তাড়িয়ে দেয় তাদের। এই ঘটনার উত্তাপ পৌঁছে যায় প্রশাসনের দপ্তরে। ৯ জন সদস্যের একটা কমিটি তৈরি হয় যার মধ্যে সরকারি আধিকারিক ছাড়াও ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার গোবিন্দ সিং নেগি, চণ্ডীপ্রসাদ ভাট ও যোশিমঠ ব্লকের প্রমুখ গোবিন্দ সিং রাওয়াত। দু’বছর পরে এই কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। পরবর্তী দশ বছরের জন্য রেনি অঞ্চলে গাছের বাণিজ্যক বিপণন বন্ধ করা হয়। একইসঙ্গে অলকানন্দার উচ্চ অববাহিকায় বারোশো বর্গ কিলোমিটার এলাকায় গাছ কাটা বন্ধ হয় এই সময়ের জন্য। ১৯৮৫ সালে এই নিষেধের মেয়াদ বাড়ানো হয় আরও দশ বছরের জন্য। ১৯৭৫ সালে সরকার নিজের উদ্যোগে এবং মালিকানায় গড়ে তোলে ‘বন নিগম’। ভাবা হয়েছিল যে সরকারি সংস্থা বেসরকারি কনট্রাক্টরদের মতো নিষ্ঠুরতা দেখাবে না। কিন্তু কাজে দেখা গেল যে, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। ফলে বন নিগমের বিরুদ্ধেও আন্দোলন পরিচালিত হল একটা সময়।

আরও পড়ুন: ‘এ তুফান ভারী দিতে হবে পাড়ি’, জন্মদিনে ঝোড়ো কবি নজরুল

তেহরি-গাড়োয়াল এলাকায় এই চিপকো আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেন সুন্দরলাল বহুগুনা। ১৯৭৭ সালের মে মাসে হেনওয়াল উপত্যকায় গাছ কাটা বন্ধ করতে গ্রামবাসীদের সংগঠিত করলেন তিনি। এই আন্দোলন ও প্রতিরোধ ছড়িয়ে দেওয়া হল আশপাশের অঞ্চলে এবং পরের বছর তেইশ জন স্বচ্ছাসেবক গ্রেপ্তার হল গাছ কাটার বিরোধিতার জন্য। বহুগুনার লড়াই থামল না। তিনি প্রথমবার গ্রেপ্তার হলেন ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে। একদিকে চামোলি এবং অন্যদিকে তেহরি-গাড়োয়াল এলাকায় এই আন্দোলন কখনও তীব্র, কখনও স্তিমিত আকারে দেখা গেল আশির দশকের মধ্যভাগ অবধি। তার পর থিতিয়ে এলো পুরো ব্যাপারটা। ভাট মন দিলেন বৃক্ষরোপণ এবং মহিলাদের সংগঠিত করে ‘মহিলা মঙ্গল দল’ তৈরির কাজে। বহুগুনাও সরে গেলেন আন্দোলনের বৃত্ত থেকে। সেই সময় তিনি তেহরি বাঁধ নির্মাণের বিরোধিতার কাজেও সময় দিচ্ছেন। ফলে নেতৃত্বের অভাবে ক্ষীণ হয়ে পড়ল আন্দোলন। যদিও বলা হয়, বহুগুনার প্রভাবে সবুজ গাছ কাটার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা গিয়েছিল। ১৯৮০ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের ফলে শ্রীমতী গান্ধি পরের পনেরো বছরে সবুজ নিধনের উপরে নিষেধ আরোপ করেছিলেন বলে দাবি করেন কেউ কেউ। (Amit Mitra, Chipko: an unfinished mission, Down To Earth, 30 April 1993).

আরও পড়ুন: ২৬ মে, ১৯২৮: ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে একটি না ভোলা দিন

মূলে যে কারণ

কিন্তু আবারও বলতে হয় যে, এসব তো পরিণতি মাত্র। প্রাথমিক কারণ খুঁজতে পিছিয়ে যেতে হবে চিন-ভারত যুদ্ধের অব্যবহিত পরের সময়টাতে। ১৯৬২ সালের অক্টোবরে বাধল যুদ্ধ। ভারতের কাছে সম্ভবত অপ্রত্যাশিত ছিল এই সংঘর্ষ। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে যথেষ্ট সেনা সমাবেশ ঘটানো হয়নি। নভেম্বর মাসের ২১ তারিখে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে চিন। এর পরে উত্তরপ্রদেশ সীমান্তের লাগোয়া অংশ, আজ যা উত্তরাখণ্ড, সেখানে উন্নয়নের জোয়ার দেখা দিল। সম্ভবত, সীমান্তে সেনা নিয়ে যাওয়ার সুবিধে বাড়াবার জন্য রাস্তা নির্মাণে বিপুল জোর দেওয়া হয়। গাছ কাটা ছিল এর আবশ্যিক অঙ্গ। ব্যবসা করতে এলো সবাই, দেশীয় কোম্পানির সঙ্গে ঢুকে পড়ল বিদেশের বাণিজ্যিক সংস্থাও। এদিকে স্থানীয় মানুষজন একান্তভাবে নির্ভরশীল ছিল স্থানীয় অরণ্যের উপর। ফলপাকুড় থেকে শুরু করে জ্বালানি কাঠ আসত সেখান থেকেই। অন্য দিক থেকে ভাবলে ভূমিক্ষয় রোধ এবং জল পরিশোধন সম্ভব হত অরণ্য থাকার ফলে। সরকারের নীতিতে মানুষ হারাল সবকিছু। পৃথিবীর সব দেশের মতোই এদেশেও কাগজেপত্রে লেখা নিয়ম মেনে কাজ করে না বেসরকারি সংস্থা। প্রকৃতির ভারসাম্যের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে বৃক্ষছেদনে মনযোগী হল তারা। অথচ অন্যদিকে, অরণ্যে ঢুকে সামান্য রসদ সংগ্রহ করার অধিকার হারাল এলাকার মানুষ। গাছ কেটে ফেলার ফলে ন্যাড়া হল ভূখণ্ড, বাড়তে লাগল ভূমিক্ষয়। যেটুকু চাষ হত তার ফলনও কমতে লাগল। মাটির নীচে জলের স্তর গেল নেমে আর বাড়তে লাগল বন্যার ভয়াবহতা। ১৯৭০ সালে অলকানন্দার ভয়াবহ বন্যায় ভেসে গেল গ্রাম, বাস ভর্তি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। নিশ্চিহ্ন হল বেলাকুচি নামে একটা গ্রাম, ভেসে গেল হরিদ্বার অবধি তেরোটা সেতু আর মাটি ও ওপড়ানো গাছে আটকে গেল জলপথের দীর্ঘ বিস্তার। দেশ জুড়ে বিতর্ক শুরু হল এই বন্যার কারণ নিয়ে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ বলতে লাগলেন যে গাছ কাটা এবং ভূমিক্ষয়ের সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলের বন্যার তেমন কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু স্থানীয় মানুষ নিশ্চিত ছিল যে অরণ্যের নির্বিচার ছেদনের ফলেই এই বিপর্যয় ঘটেছিল। কুড়ি বছর পর থেকে বিজ্ঞানীরাও মেনে নিতে শুরু করলেন যে, পাহাড়কে ন্যাড়া করে দেওয়াই বন্যার বিভীষিকার কারণ (Recent and past floods in the Alaknanda valley: causes and consequences, CURRENT SCIENCE, VOL. 105, NO. 9, 10 NOVEMBER 2013). এদিকে গান্ধিবাদী চণ্ডীপ্রসাদ সেই ১৯৬৪ সালেই তৈরি করেছেন দশোলি গ্রাম স্বরাজ্য সংঘ। পরে ‘সংঘ’ হল ‘মণ্ডল’। এরাই হল গাছ রক্ষার জন্য চণ্ডীপ্রসাদের অহিংস বাহিনী। গাছের প্রতি শহুরে প্রেম নয়, নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই অরণ্য রক্ষায় উদ্যোগী হয়েছিল গ্রামবাসীরা। অন্য ক্ষোভও ছিল। চাষবাস করার জন্য কিছু কাঠের দরকার পড়ে, প্রশাসনের কাছে সামান্য কিছু গাছের থেকে সেই কাঠ নেওয়ার আবেদন করেছিল গ্রামবাসীরা। প্রশাসন রাজি হল না। কিন্তু সেই আধিকারিকরাই আরও বড় এলাকা দিয়ে দিল বাণিজ্যিক সংস্থাকে। এ আসলে ব্রিটিশ আমলের ধারাবাহিকতা। অরণ্যকে নিছক বাণিজ্যের জন্য ব্যবহার করার ধারা পাল্টায়নি স্বাধীন দেশে, বঞ্চিত হতে থাকল ভূমিপুত্ররা।

আরও পড়ুন: ‘উন্নয়নবিরোধী’ এক প্রকৃতিপ্রেমিক মানবদরদি সুন্দরলাল বহুগুনা

অলকানন্দার ভয়াবহ বন্যা

ষোড়শ শতক নাগাদ পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ অরণ্যই সাফ হয়ে গিয়েছিল। ইউরোপের উত্তর অংশ থেকে তখন কাঠ আসছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য। ১৬০০ থেকে ১৭০০ অব্দের মধ্যে আয়ারল্যান্ডের বনাঞ্চল শেষ করে দেওয়া হয় ব্রিটেনের জাহাজ নির্মাণ, লোহা গলানো এবং চামড়ার ট্যানিংয়ের প্রয়োজনে। শিল্পকে চাঙ্গা রাখতে কোনও দেশের অরণ্যকে ছাড় দেয়নি ব্রিটেন। এদিকে ইংল্যান্ডে ওক গাছের ভাণ্ডার শেষ কিন্তু কাঠের সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে রয়্যাল নেভিকে রক্ষা করতে। অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে ব্রিটেনের সবথেকে বড় ঢাল হল সেই নৌবাহিনী। এই সময় কাজে এলো ভারত থেকে সরবরাহ হওয়া সেগুন কাঠের সম্ভার। নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধে ব্রিটেনকে রক্ষা করেছিল ভারতের অরণ্য। গোয়া ও মালাবার উপকূলে নির্মিত হত কাঠের জাহাজ। ইংল্যান্ডে কাঠ নিয়ে গিয়েও করা হত নির্মাণের কাজ। এদিকে রেলপথ নির্মাণের কাজেও ভারতের অরণ্যের নির্বিচার বিনাশ ঘটিয়েছিল ব্রিটিশরা। গাড়োয়াল এবং কুমায়ুন হিমালয়ের আলোচনা এখানে প্রাসঙ্গিক বলে সেই এলাকার উল্লেখ করা দরকার। রেলের স্লিপার বানাতে দু’টো এলাকাকে প্রায় বৃক্ষশূন্য করে ফেলেছিল ব্রিটিশের বরাত পাওয়া দেশি ও বিদেশি কনট্রাক্টররা। এত বেশি গাছ কাটা হত যে, সেগুলো সরিয়ে কাজে লাগাতেও পারত না ব্যবসায়ীরা। কাটার পর সেখানেই ফেলে রেখে চলে যেত তারা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনওরকম তদারকির ব্যাপার ছিল না। রানিগঞ্জের কয়লাখনি পুরোপুরি চালু হওয়ার আগে রেল নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত লোকজন স্থানীয় অঞ্চলের অরণ্য থেকে গাছ কাটত জ্বালানির জন্য। সেখানেও কোনও বাছবিচার ছিল না। সিপাহি বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ প্রশাসনের টনক নড়ল। কাঠ তাদের দরকার, গাছ কাটায় কোনো আপত্তি নেই তাদের কিন্তু বেসরকারি কনট্রাক্টররা যেভাবে শেষ করে দিচ্ছে জঙ্গলের পর জঙ্গল তা সাম্রাজ্যের পক্ষে অনুকূল নয়। অতএব নিয়ন্ত্রণ দরকার, ১৮৬২ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল এই লক্ষ্যে একটা দপ্তর প্রতিষ্ঠার কথা বললেন।

আরও পড়ুন: ‘এ তুফান ভারী দিতে হবে পাড়ি’, জন্মদিনে ঝোড়ো কবি নজরুল

১৯২০ সালে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার চিত্র। গাছের গুঁড়ি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রেলপথের মাধ্যমে

রেল দপ্তরের দরকার ছিল শাল, সেগুন ও দেওদার (দেবদারু) গাছের কাঠ। তাদের কাজের জন্য এগুলোই ঠিকঠাক, শক্তপোক্ত। দক্ষিণ ভারতে শাল ও সেগুনের অরণ্য রেলপথের কাছে অবস্থিত হওয়ায় কাঠ সংগ্রহে অসুবিধে হল না। সেই সব কাঠের উৎস শেষ হওয়ায় উত্তর-পূর্ব ভারতে অভিযান চলল দেওদার কাঠের জন্য। ১৮৬৪ সালে তৈরি হল ইম্পিরিয়াল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট। এর পরের সময়টায় শতদ্রু নদীর অববাহিকায় থাকা দেবদারু কাঠ নিঃশেষ হল। শুধু যমুনা নদীর অববাহিকায় ছেড়ে রাখা হল কিছু অরণ্য। ১৮৬৯ থেকে ১৮৯৫ সালের মধ্যে দেবদারু কাঠের সাড়ে ছ’লক্ষ স্লিপার সরবরাহ হল। এর মধ্যে আবার আইনও তৈরি করল ব্রিটিশ প্রশাসন। প্রথম ফরেস্ট অ্যাক্ট ১৮৬৫ সালে এবং তার পরে ১৮৭৮ সালে সেই আইনের আরও কড়া সংস্করণ তৈরি হল। এর মাধ্যমে নিজের ইচ্ছেমতো অরণ্যভূমি রেল দপ্তরের ব্যবহারের জন্য সরকার চিহ্নিত করবে বলে জানানো হল। বাকিটা নিয়ে কী করা হবে তার জন্য সময়ে-সময়ে আইন বদলানো হবে। এই অঞ্চলে গ্রামবাসীরা থাকতে পারবেন, ঘুরতে পারবেন কিন্তু সেটা ব্রিটিশ প্রভুদের ইচ্ছাধীন। নিজেদের অধিকার হরণের এই আদেশকে ভালোভাবে নেয়নি অরণ্যচারী মানুষরা যাদের পরিচয় গবেষণাপত্রে দেওয়া হয় ‘ট্রাইবাল’ হিসাবে। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে শক্তিতে নগণ্য হলেও বারবার বিদ্রোহ করেছে তারা এবং পরাজিতও হয়েছে। যেখানে বিদ্রোহ সরাসরি হয়নি সেখানেও অসন্তোষ ছিল মানুষের মনে। ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ অধিকৃত গাড়োয়ালে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সীমা ঘোষণার সময় সেখানকার সেটলমেন্ট অফিসারের বয়ানে মানুষদের ক্ষোভ ধরা পড়ে। অফিসারের মনে হয়েছিল যে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম আশি বছরে কোনও নিয়ন্ত্রণ আরোপিত না হওয়ার কারণে অরণ্যের উপর নিজেদের অধিকার স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করেছিল অরণ্যকে ঘিরে থাকা মানুষরা। এর ফলে পরবর্তী সময়ের আইনকানুন বা নিষেধ নিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়েছিল এরা। ১৯১৬ এবং ১৯২১ সালে গাড়োয়ালে সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে অরণ্যের অধিকার ফিরে পেতে। ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে গান্ধিজি যে অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন, তার সঙ্গে সমাপতিত হয় অরণ্যচারীদের অধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলন। এর ফলে সরকার বেশ কিছু অরণ্য অসংরক্ষিত ঘোষণা করলেও মূল আইনের কোনও পরিবর্তন হয়নি। বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা অরণ্যে আদিবাসীদের প্রবেশের অধিকার ছিল না। এর ফলে অস্তিত্ব রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছিল তাদের পক্ষে। অন্যদিকে, তারা অরণ্যের রক্ষা বা উন্নতিতে কোনও উদ্যোগ নিতে চাইত না কারণ অরণ্য সমৃদ্ধ হয়ে উঠলে, বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় হয়ে উঠলে আবার সরকার তার দিকে হাত বাড়াবে। দেশীয় রাজারাও নিজেদের এলাকায় থাকা অরণ্যের আর্থিক মূল্য বুঝতে শুরু করলেন। তেহরি গাড়োয়ালের রাজা ১৮৬৫ থেকে ব্রিটিশ সরকারকে লিজ দিলেন কিন্তু তারপরে আয়ের পরিমাণ দেখে নিজেই বাণিজ্য শুরু করলেন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সহায়তায়। এর বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করেছে স্থানীয় মানুষ। বিংশ শতকের প্রথম ভাগে দু’টো বিশ্বযুদ্ধেও ভারতের অরণ্য সম্পদকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করেছে ব্রিটিশ সরকার। সেখানেও বঞ্চিত হয়েছে অরণ্যচারী মানুষজন।

আরও পড়ুন: আসবে ঝড়, নাচবে তুফান…

অসহযোগ আন্দোলনের সময় গান্ধিজি

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৫২ সালে যে অরণ্য নীতি রচিত হয়, তাতে অরণ্যকে ‘জাতীয় সম্পদ’ বলে উল্লেখ করা হয়, খাটো করা হয় স্থানীয় মানুষের অধিকারকে। ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ আইনের আদলেই যে সেটা তৈরি হয়েছে, তা ব্যক্ত করা হয় কোনও রকম সংশয় না রেখে। আইনের অনুচ্ছেদগুলো ঘাঁটলে খুঁজে পাওয়া যাবে এমন পঙক্তি যেখানে সংলগ্ন গ্রামের অস্তিত্বের প্রশ্নকে পাশে সরিয়ে রেখে তুলে ধরা হয়েছে ‘জাতীয় স্বার্থ’কে। অরণ্যকে ব্যবহার করে নানা সম্পদ তথা রাজস্ব আদায়ের উপর জোর দেওয়া হয় এবং সেটা কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, তা আলোচিত হয়নি। (Ramachandra Guha, Forestry in British and Post-British India: A Historical Analysis, Economic and Political Weekly, Oct. 29, 1983). চিপকো আন্দোলনকে দেখতে হবে এই প্রেক্ষাপটে। সুন্দরলাল বহুগুনা তথা সমসময়ের পরিবেশ আন্দোলনকারীদের ভূমিকাও বিচার্য হবে এই পরিমণ্ডলে।

বহুগুনার জীবন

তাঁর জন্ম ১৯২৭ সালে গঙ্গার তীরে তেহরি গাড়োয়ালের এক গ্রামে। স্বাধীনতা সংগ্রামী শ্রীদেব সুমনের সঙ্গে আলাপ হয় ছোটবেলায় এবং সুমনের কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতার লড়াইতে যোগ দেন। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারি এড়াতে লাহোরে পালিয়ে যান তিনি। পরে তেহরিতে ফেরেন যখন সংগ্রাম তুঙ্গে। স্বাধীনতার পরে সমাজসেবার ব্রত নিলেন তিনি। সংসারী হয়ে সিলিয়ারা গ্রামে বসবাস করতে শুরু করেন তিনি। তাঁর স্ত্রী বিমলাও নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন গ্রামবাসীদের সেবায়। বহুগুনার জীবনে কয়েকটা ঘটনা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে একটা হল রিচার্ড সেন্ট বারবে বেকারের সঙ্গে তাঁর আলাপ। গাছেদের রক্ষা করার কাজে অসামান্য অবদানের জন্য রিচার্ডকে চেনে বিশ্ববাসী। ১৯৭৭ সালে একটা সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি এসেছিলেন তিনি। সেখানে বহুগুনার সঙ্গে দেখা হলে তিনি সম্মেলন ছেড়ে চলে যান চিপকো আন্দোলনের ঘটনাস্থল নিজে চোখে দেখার জন্য। উদ্যোক্তাদের কোনও বারণ শোনেননি তিনি। এগারো দিন ধরে একসঙ্গে ছিলেন তাঁরা। মহাত্মা গান্ধির শিষ্য বিনোবা ভাবের কাছে রিচার্ডকে নিয়ে যান বহুগুনা। পরবর্তী সময়ে নিজের বক্তব্যে অসংখ্য বার বহুগুনার ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছেন রিচার্ড। গাছেদের জন্য অনশনে বসা একমাত্র মানুষ হিসাবে বহুগুনাকে তিনি পরিচয় করান বিশ্ববাসীর সঙ্গে। এটা বলতেই হবে যে, রিচার্ড বেকার ভারতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে অপরিচিত ছিলেন না কোনোদিনই। স্বাধীনতার আগে থেকেই এদেশে এসেছেন তিনি এবং দেখা করেছেন মহাত্মা গান্ধি থেকে শুরু করে জহরলাল নেহরুর সঙ্গে। এ দেশের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রিত বক্তা হয়েও উপস্থিতি থেকেছেন তিনি। ১৯৮০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের জনগণের প্রতি বার্তায় কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা উচ্চারণ করেন তিনি। আড়াইশো বছর আগে, সেপ্টেম্বর মাসে, অমৃতা দেবীর নেতৃত্বে ৩৫৩ জন সাহসী নারী ও পুরুষ গাছ জড়িয়ে ধরে সবুজকে রক্ষা করতে উদ্যোগী হন। নিজের প্রাণের বলিদান দেন তাঁরা। এই পথ ধরেই চিপকো আন্দোলন এক অসামান্য আদর্শ উপহার দিয়েছে। ফ্রেন্ডস অফ দ্য ট্রিজ সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে ভারতের অরণ্য বাঁচানোর সংগ্রামে যুক্ত এই আন্দোলন। গান্ধি ও বিনোবা ভাবের অবদান উল্লেখ করে তিনি বলেন এঁদের বিকেন্দ্রীকরণ ও গ্রাম স্বরাজের বার্তা শুধু ভারত নয়, গোটা পৃথিবীর জন্য আবশ্যক। রিচার্ড বেকার ভারতের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন, যেখানে অন্তত তেত্রিশ শতাংশ অরণ্যভূমি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত সেখানে এ দেশে মাত্র বারো শতাংশ বনাঞ্চল রয়েছে। ভারতে অরণ্য বাড়িয়ে পঁচাত্তর শতাংশে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি। আজকের উন্নয়ন ভাবনায় রিচার্ড বেকারের এই কথা অবাস্তব মনে হলেও তাঁর আবেদনের মর্ম বুঝতে অসুবিধে হয় না। গাছ বাঁচানোর সৈনিক সুন্দরলাল বহুগুনার উপরে তাঁর প্রভাব ছিল গভীর। (RICHARD ST. BARBE BAKER, MAN OF THE TREES, A CENTENARY TRIBUTE).

আরও পড়ুন: বিশ্ব সাহিত্যে চার চিকিৎসক ও বর্তমান অতিমারি

মদ্যপান বিরোধী আন্দোলনে বহুগুনার অংশগ্রহণও অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। সাধারণভাবে উত্তরাখণ্ড এলাকার মানুষদের মধ্যে মদ্যপানের প্রচলন ছিল না। কিছু বহিরাগত বণিক শ্রেণির মানুষ নিজেরাই নিজেদের পানীয় তৈরি করতেন কিন্তু দেহরাদুনের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রেও ব্যবসায়ীরা মদ মজুত করতেন না। ব্রিটিশ শাসকরা ১৮১৫ সাল থেকে সৈন্য নিয়োগ শুরু করেন এই অঞ্চল থেকে। ১৮৫৮ সালে পিথোরাগড় এলাকায় নিয়োগকেন্দ্রও খোলা হয়। যত সেনা শিবির বা ক্যান্টনমেন্ট বাড়তে লাগল, ততই বেড়ে চলল মদ্যপানের প্রবণতা। তবে গ্রামাঞ্চলে এই প্রবণতা তখনও প্রবেশ করেনি। কিন্তু চাহিদা যে বাড়ছিল তার লক্ষণ স্পষ্ট ছিল, ভোটিয়া বণিকদের কাছ থেকে মদ কিনে পান করছিল বদ্রীনাথ মন্দিরের কর্মচারীরা। ১৮৯১ সালে ব্রিটিশ প্রতিনিধি মুখে বললেন যে, গ্রামে মদের দোকান খোলা হোক তা তাঁরা চান না। কিন্তু সেই বছরেই কেদারনাথের নীচে ফেগু এবং যোশিমঠে খোলা হল মদের দোকান। মদ থেকে যে ভালো পরিমাণ রাজস্ব আয় হতে পারে তা বিলক্ষণ জানত ব্রিটিশ এবং এই সুযোগ তারা হারাতে চায়নি। তবু গ্রামের মানুষ খুব বেশি এই নেশার দিকে ঝোঁকেনি। বরং ১৯০৭-০৮ সালে নতুন করে মদের দোকান খোলার বিরোধিতা করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, স্থানীয় মানুষ নেশা না করলেও মদ্যপানে আসক্ত তীর্থযাত্রীদের কেনাকাটার কারণে ব্যবসা বাড়ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে মদ্যপান বিরোধিতা একটা বড় ইস্যু করে কংগ্রেস। গোপালকৃষ্ণ গোখেলের নেতৃত্বে কংগ্রেস ১৯১২ সালে রাষ্ট্রের সমর্থনে মদের বিপণন বন্ধ করার দাবি তোলে। গান্ধি এ ব্যাপারে অত্যন্ত কড়া মনোভাব দেখিয়েছিলেন। এমনি ১৯৩২ সালের গান্ধি-আরউইন চুক্তিতে তিনি একটা পঙ্‌ক্তি ঢুকিয়ে দেন যে, মদের দোকানের সামনে পিকেটিং করা বৈধ বলে গণ্য হবে। কিন্তু এটা মানতেই হবে যে মদ্যপানের ব্যাপারে কংগ্রেসের সবাই গান্ধির পক্ষে ছিলেন না। গান্ধিজির মৃত্যুর পরে যেমন, তেমনি তাঁর জীবিত অবস্থাতেও সেটা প্রকাশ পায় নানা কাজের মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে লোক ভর্তি করার তাগিদ বাড়ল, সেনা অফিসারদের আনাগোনা বৃদ্ধি পেল এবং সঙ্গে-সঙ্গে উত্তরাখণ্ডে বাড়ল মদের জোগান।

আরও পড়ুন: হাতুড়ি

ব্রিটিশ ক্যান্টনমেন্ট

স্বাধীনতার পরে মদ্যপান নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা গেল না সংসদে। মদের বাণিজ্য থেকে লোভনীয় পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের হাতছানি কংগ্রেসি শাসকরাও ঝেড়ে ফেলতে পারলেন না মন থেকে। ফলে বিষয়টা ছেড়ে দেওয়া হল রাজ্যের প্রশাসন এবং বিনোবা ভাবের মতো সমাজসেবীর উপর। সর্বোদয় আন্দোলনের নেতারা বিষয়টার বিরোধিতা করতে লাগলেন নিষ্ঠার সঙ্গে কিন্তু বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক বিকাশের সঙ্গে ব্যাপারটা যুক্ত করে দেখার চেষ্টা করলেন না। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে উত্তরপ্রদেশের বহু জেলাকে মদের জোগান মুক্ত এলাকা (dry) ঘোষণা করা হল বটে কিন্তু সরকারি নীতির পরিবর্তনে মদ ঢুকতে শুরু করল বিপুলভাবে। ১৯৬২ সালে চিন যুদ্ধের পরে সীমান্ত এলাকায় তিনটে আলাদা জেলা তৈরি হল— পিথোরাগড়, চামোলি ও উত্তরকাশী। সৈন্য পরিবহণের জন্য শুরু হল বড়-বড় রাস্তার নির্মাণ যা আগেই উল্লিখিত হয়েছে। একইসঙ্গে বেড়ে গেল অ্যালকোহলের বিপণন। একইসঙ্গে অবশ্য শুরু হল প্রতিরোধ। সর্বোদয় আন্দোলনের নেতা বিনোবা ভাবের শিষ্য সোহনলাল ভূবিক্ষুক ১৯৬২ সালেই শুরু করলেন প্রচার। তাতে কাজ না হওয়ায় লখনউয়ের বিধানসভা ভবনের সিঁড়িতে বসে পড়ে অনশন আন্দোলন শুরু করলেন। সরকার তাঁকে সম্মান দিয়ে তীর্থযাত্রার পথে চারটে মদের দোকান বন্ধ করলেন বটে কিন্তু এর পর এই আন্দোলনে তেমন সাড়া পাওয়া গেল না।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)

বিনোবা ভাবে

১৯৬৫ সালে সর্বোদয় আন্দোলনের আরও দু’জন বিশিষ্ট অংশগ্রহণকারী শুরু করলেন আন্দোলন। এঁরা আমাদের পরিচিত— সিলিয়ারা গ্রামের সুন্দরলাল ও বিমলা বহুগুনা। তাঁদের উদ্যোগে তেহরি জেলায় ছড়িয়ে পড়ল আন্দোলন। পাশের জেলাতেও আঁচ পৌঁছল। এক সময় গান্ধিবাদী নেতা সরলা দেবী বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতে সাক্ষাৎ করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সুচেতা কৃপালনীর সঙ্গে। ফল মিলল, বন্ধ করা হল বহু মদ উৎপাদন কেন্দ্র। ১৯৬৯ সালে গান্ধিজির জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে সীমান্তবর্তী পিথোরাগড়, চামোলি ও উত্তরকাশীকে ‘ড্রাই’ বলে ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। এই সময় মহিলা ও তরুণরা যুক্ত হলেন মদ বিরোধী আন্দোলনে। বহু দোকান পুড়িয়েও দেওয়া হল। ১৯৭০ সালে তেহরি ও পৌরি জেলাকেও মদ মুক্ত বলে ঘোষণা করা হল। কিন্তু ১৯৭১ সালে ইলাহাবাদ হাইকোর্টের এক রায়ে এই নিষেধ বেআইনি বলে ঘোষিত হল। তবে রাজ্যের মানুষের আন্দোলনের চাপে পরের বছর দোকান খোলা গেল না। পাঁচটা রাজ্যকে আবার ‘ড্রাই’ বলে ঘোষণা করতে হল। ১৯৭৭ সালে কেন্দ্রে এল জনতা সরকার। নির্বাচনে মদের বাণিজ্যের বিরোধিতা কোনও ইস্যু ছিল না। কিন্তু শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের সিদ্ধান্তের কারণে উত্তরাখণ্ডের আটটা জেলাতেই নিষিদ্ধ করা হল মদ। একইসঙ্গে অ্যালকোহল রয়েছে এমন বেশ কিছু ওষুধকে আবগারি দপ্তরের আওতায় আনা হল। তবে ততদিনে চোরাপথে মদের সরবরাহ শক্ত জমি খুঁজে নিয়েছে। ফলে খুব লাভ হল না এই নিষেধে। শিবাজি পাঠক মনে করেন যে সর্বোদয় আন্দোলনের নেতাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতার অভাব মদের বাণিজ্যকে বাড়তে সাহায্য করেছিল। আর্থ-সামাজিক নকশার একটা উপাদান হিসাবে না দেখে মদ্যপানকে কেবলমাত্র একটা নৈতিক স্খলন হিসাবে দেখেছিলেন বিনোবা ভাবে থেকে শুরু করে সুন্দরলাল বহুগুনার মতো নেতারা। এর ফলে মদ্যপান বা মদের বাণিজ্য বিরোধী আন্দোলন একটা সময়ে ব্যাপকতা লাভ করলেও স্থায়িত্ব পায়নি। (Shekhar Pathak, Intoxication as a Social Evil: Anti-Alcohol Movement in Uttarakhand, Economic and Political Weekly Aug. 10, 1985).

আরও পড়ুন: আম চাষ: ইতিহাস-বৃক্ষ ঘেঁটে

সুন্দরলাল ও বিমলা বহুগুনা

তেহরি বাঁধ

আধুনিক সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন হিসাবে নদীবাঁধকে চিহ্নিত করেছেন বহু বিশেষজ্ঞ। তবে এটা ছিল বিংশ শতকের মধ্যভাগ বা তার কিছুটা শেষের দিকের মনোভাব। আজ এই মনোভাবে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের মতো সংগ্রাম বাঁধের বিপদকে সামনে এনেছে, এক্ষেত্রে উপকারের থেকে বিপদ যে অনেক বেশি তা বুঝিয়েছে মানুষকে। যাই হোক, বিদেশের বিভিন্ন প্রকল্পের অনুকরণে আমাদের দেশেও বড় বাঁধের পরিকল্পনা শুরু হয় স্বাধীনতার পরে। কৃষির জন্য সেচের উৎস তৈরি এবং কিছুটা পরিমাণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে প্রাধান্য পায় বাঁধ। ১৯৭৯ সাল নাগাদ এদেশে দেড় হাজারের উপর বড় বাঁধ নির্মিত হয়। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশের অবস্থাটা কেমন ছিল, তা দেখা যাক। ১৯০০ সালের আগে সে রাজ্যে ছিল একটা বাঁধ, ১৯০১ থেকে ১৯৫১-র মধ্যে ছিল বাইশটা। ১৯৫২ থেকে ১৯৭৯-র মধ্যে উনপঞ্চাশটা বাঁধ গড়ে ওঠে এবং রাজ্যের মোট চুরাশিটা বাঁধের মধ্যে বারোটা ছিল নির্মাণের অধীন। নির্মীয়মাণ বাঁধের মধ্যে তেহরি ছিল সবথেকে খরচসাপেক্ষ এবং পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে উঁচু বাঁধগুলোর মধ্যে একটা। হিমালয় থেকে প্রবাহিত দু’টো নদী, ভাগীরথী ও ভিলাঙ্গনা, নিয়ে এই বাঁধের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া এই বাঁধের পরিকল্পনা করে কিন্তু অনুমতি মেলে (commissioned) ১৯৭২ সালে। কাজ শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। দু’লক্ষ সত্তর হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনবে ২৬০.৫ মিটার উচ্চতার এই বাঁধ, এমনই ছিল পরিকল্পনা। ৩৪৬ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও ছিল এই বাঁধের সাহায্যে। কিন্তু যে পরিমাণ এলাকা জলমগ্ন করবে এই বাঁধ তা বিরাট। তেহরি শহর এবং তেইশটা গ্রাম পুরোপুরি ডুবে যাবে, এমনই ছিল পরিকল্পনার অঙ্গ। সঙ্গে আরও বাহাত্তরটা গ্রাম আংশিকভাবে ডুবে যাওয়ার কথা ছিল। প্রতিরোধের পালা শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকের শুরুতেই। স্বাধীনতা সংগ্রামী বীরেন্দ্র দত্ত শাকলানির নেতৃত্বে বাঁধ নির্মাণ শুরু হওয়ার আগেই তৈরি হয় ‘তেহরি বাঁধ বিরোধী সংঘর্ষ সমিতি’। ১৯৭৮ সালে নির্মাণকাজ উদ্বোধনের জন্য ইঞ্জিনিয়ার ও আধিকারিকরা পৌঁছলে সমিতির হাজার-হাজার নারী-পুরুষ-শিশু তাঁদের পথ আটকায়। বহুগুনাও যুক্ত হন এদের সঙ্গে। বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সংগৃহীত হয় দশ হাজার স্বাক্ষর। সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়ে রিট পিটিশন। সাকালানি, বহুগুনা এবং কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার সচিব বিদ্যাসাগর সই করেন অন্যান্যদের সঙ্গে। এই সংগ্রামের ফলে সরকার বিভিন্ন কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়, বাধা পড়ে নির্মাণে। ১৯৮৬ সালে রায় কমিটি বাঁধের বিরুদ্ধে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানায়। হনুমন্ত রাও প্যানেল পুনর্বাসনের ব্যাপারে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করে। পাশাপাশি সুন্দরলাল বহুগুনা ১৯৯২, ১৯৯৫, ১৯৯৭ এবং ২০০১ সালে একাধিকবার অনশনে বসে এই নির্মাণ আটকানোর চেষ্টা করেন। বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রী নানারকম আশ্বাস দেন এ-ব্যাপারে। ১৯৯৯ সালে চামোলি জেলার ভয়াবহ ভূমিকম্প জানিয়ে দেয় প্রকৃতির বিপর্যয়ের ব্যাপকতা সম্পর্কে। কিন্তু টুকটুক করে এগিয়ে চলে বাঁধের কাজ। এদিকে বহুগুনার মুখ থেকে বেরনো ছড়া ঘুরতে লাগে লোকের মুখে-মুখে:

তেহরি বাঁধ কি দেনেই চার
অত্যাচার, বেঘরবার, ভ্রষ্টাচার, নরসংহার।

স্থানীয় এলাকার লোকবিশ্বাস, গঙ্গা এবং হিমালয়কে দেবতা ভাবার রীতি— এসবকে কাজে লাগিয়ে বিধ্বংসী উন্নয়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন বহুগুনা সহ অন্যান্যরা। কিন্তু ধীরে-ধীরে এই আন্দোলনের রাশ চলে যেতে থাকে দক্ষিণপন্থী, ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর হাতে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মসূচির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন বহুগুনা। তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনার সঙ্গে কতটা দূরত্ব ছিল এইসব সংগঠনের আদর্শের তা বিশ্লেষণ করবেন বিশেষজ্ঞরা কিন্তু এটা ঠিক যে, এর ফলে উত্তরাখণ্ডের পরিবেশ আন্দোলন একটা সংকীর্ণ গণ্ডিতে বাঁধা পড়তে লাগল।

আরও পড়ুন: মরণোত্তর দেহদান আন্দোলনের প্রাণ ব্রজ রায়

তাঁর অন্যতম পরামর্শদাতা চিদানন্দ সরস্বতীর মতোই বহুগুনা বারবার বলে গিয়েছেন হিমালয়ের সৌন্দর্য ও শান্তি রক্ষার কথা। তেহরি বাঁধ নিয়ে লিখেছেন বহু প্রবন্ধ এবং চিঠি। এমনই একটা চিঠির শেষে বলেছেন: ‘‘মা ভাগীরথীর কোলে বসে, তার আচ্ছন্ন করা কুলুকুলু ধ্বনির প্রবাহ দেখে, তার মধুসম জল পান করে অদ্ভুত এক শান্তি পাই আমি। জীবনের শেষ নিশ্বাস অবধি এই উপভোগের ইচ্ছে রাখি।’’ (Mukul Sharma, Passages from Nature to Nationalism: Sunderlal Bahuguna and Tehri Dam Opposition in Garhwal, Economic and Political Weekly, February 21-27, 2009). তেহরি বাঁধ নির্মাণ নিয়ে সংঘর্ষ যখন চরমে, সেই ১৯৮৮ সালে বহুগুনা এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন: ‘‘তেহরি বাঁধ যদি নির্মিত হয় তবে বিংশ শতাব্দীর সবথেকে বড় বোকামির স্মারক হিসাবে তা দঁড়িয়ে থাকবে।’’ (Sunderlal Bahuguna, TEHRI DAM: A BLUEPRINT FOR DISASTER, Imprint, April 1988).

আরও পড়ুন: ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা

না, বিংশ শতকে শেষ হয়নি এই বাঁধ। ২০০৫ সালে শেষ হয়েছিল নির্মাণের কাজ। নথি তাই বলছে। কিন্তু বহুগুনার চেষ্টা বিফল হয়ছে এ কথা বলা যাবে না কখনোই। আসলে তিনি মানুষের স্মৃতিতে থেকে যাবেন পরিবেশ আন্দোলনের এক শক্তিশালী ধারার অন্যতম নির্মাতা হিসাবে। বহুগুনাকে এককভাবে কল্পনা করা কঠিন। আপাত অখ্যাত গৌরা দেবী থেকে শুরু করে বিনোবা ভাবে, চণ্ডীপ্রসাদ ভাট, শাকলানি, চিদানন্দ সরস্বতী প্রমুখের সঙ্গে এক হয়ে তিনি তৈরি করেছেন এই ধারা। প্রতিবাদের এই প্রবাহ, আন্দোলন সংগঠিত করার এই সাহস, মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে এক করে দেখার এই আগ্রহ হয়ত আরও শক্তি সঞ্চয় করবে আগামী সময়ে। তখন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন সুন্দরলাল বহুগুনা। আরও বেশি করে আলোচিত হবে তাঁর দর্শন যার মূল কথা— পরিবেশ এক স্থায়ী অর্থনীতি (Ecology is permanent economy). গান্ধিজির আদর্শ সম্বল করে চিপকো আন্দোলনের সময় হিমালয় জুড়ে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার পদব্রজে ঘুরেছিলেন তিনি। আন্দোলনকে দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন পরিচিতি। আজ এত বছর পরেও সেই পরিচিতি অটুট। আশা করা অযৌক্তিক হবে না যে, আরও বহু শতক ধরে মানুষের স্মৃতিতে অটুট থাকবেন সুন্দরলাল বহুগুনা।

বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন মানস প্রতিম দাস। স্বাধীন গবেষক তিনি। ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ফেলো। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের লেখাপড়া করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় ছিল পদার্থবিজ্ঞান। পরে এখানেই পিএইচডি করেন কলকাতায় তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাস নিয়ে। পেশায় অনুষ্ঠান প্রযোজক। আকাশবাণী কলকাতার প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ। ১৯৯৯ থেকে ২০১৮, এই দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে এফএমে পরিবেশন করেছেন লাইভ ফোন-ইন অনুষ্ঠান ‘বিজ্ঞান রসিকের দরবারে’। গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় এর কোনও তুলনা নেই। সমাজ ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছেন নিয়মিতভাবে। সম্মানিত হয়েছেন কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পুরস্কারে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

4 comments

  • Malyaban Chattopadhyay

    গাছের প্রতি শহুরে প্রেম-এর বাইরে বেরুনোর চেষ্টা করা এক মানুষের কথা আর তাঁর জীবনের অন্যকথাকে একটি সূত্রে জুড়েছেন লেখক.. যা বুঝতে সাহায্য করে সুন্দরলাল বহুগুনা শুধুমাত্র চিপকো আন্দোলন-এর প্রতিবিম্ব নন, তিনি একটা বড় সময়ের প্রতিবিম্ব।

  • Debashis Majumder

    Excellent article. Absolutely enriching.

  • খুবই ভালো আর্টিকেল একটা, বহুদিন পরে এইধরনের একটা আর্টিকেল পড়লাম। জানলাম অনেক কিছু। লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

  • We often associate names with a movement as routine..This article provides a deep insight into the man who had become synonymous with the movement.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *